আমার মুরিদজীবন।। তৃতীয়খণ্ড, সেকশন-২, মেডিক্যাল কলেজে

 3,885 total views

আমার মুরিদজীবন।। তৃতীয়খণ্ড, সেকশন-২, মেডিক্যাল কলেজে

আমার মুরিদজীবন

 ( Section-2. মেডিক্যাল কলেজ অংশ)

…………..এদিকে সাদিয়া আমাকে মাঝে মাঝে  ফোন দিয়ে বিরক্ত করত।সে ফোন দিলেই সেই শূন্য অনুভূতির কথা, সাদিয়ার সাথে কাটানো সেই অন্ধকারময় মুহূর্তের কথা আবার মনে পড়ে  যেত আমার। মাঝে মাঝে ফোন ধরতাম তবে বেশিরভাগ সময়েই এড়িয়ে  যেতাম। ক্যাম্পাসে দেখা হলে সামান্য সময়ের জন্য কোথায়ও বসতাম। সে আমার সাথে ঘনিষ্ট হয়ে বসতে চাইত।  আমি দূরে সরে যেতাম। এতে সে মনে করত যে, আমি লজ্জা পাই। সে মনে করত, আমি জীবনে কখনও কোনো নারীর স্পর্শ পাই নাই ,তাই আমি এ রকম করি। মানে, আমি এসবে অভ্যস্ত নই। আমি যে লজ্জা পাই,এতে আবার সে খুশি হয় । ছেলেরা যেমন কুমারী মেয়ে চায়, মেয়েরাও তেমনি কুমার ছেলে চায়।  সে আমাকে কুমার হিসেবে পেয়ে খুশি ছিল। তাই সে আমাকে অতি আগ্রহের সাথে শেখাতে চাইছিল কেমন করে  প্রেমিকার ঘনিষ্ট হতে হয়, কেমন করে আদর করতে হয়।  সে হয়ত জানত না যে, পৃথিবীর কোনো প্রাণীকেই সঙ্গম  শেখাতে হয় না, এমনকি যে সম্পূর্ণরূপে পাগল, তাকেও না। এটা অনেকটা প্রতিবর্তী ক্রিয়ার মতো। এদিকে আমি আশ্চর্য হতাম এ কারণে যে, তার মত ধার্মিক একটা  মেয়ে কেন এত অধার্মিক আচরণ করে। বিয়ের পূর্বে তো এসব করা ঠিক না। কিন্তু দেখতাম, তার মধ্যে ভালবাসার জোয়ার এত জোরালোভাবে আসে যে, তার সব সংষ্কার, সব বিশ্বাস যেন মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যায়। আর আমি তখন আমার ধর্মবিশ্বাসের খুঁটিটা  কোনোমতে আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকি।

 স্কাল বিষয়ক বিভিন্ন বইপত্র ঘেঁটে আমি তেমন কিছু  পাই না। ক্র্যানিওসাইনোসটোসিস হলে মাথার গঠন নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং সামান্য মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে  বলে কিছু কিছু হাইপোথিসিস পাওয়া যায় মাত্র। তবে দেখি,  অন্য একটা জেন্ডার ভিত্তিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। কিন্তু এ গবেষণাটা আমার কোয়েরির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। আমার কোয়েরি আসলে এটা ছিল যে, ডেড বডিটা তার জীবৎকালে  তার স্কালের গঠনগত সমস্যার কারণে সিজোফ্রেনিয়ায়, বিশেষত, সিভিয়ার হেলুসিনেশনে আক্রান্ত হয়েছিল কিনা ।

 অবশেষে পরীক্ষা চলে এলো। পরীক্ষা ভাল দিলাম। রেজাল্ট দিল কিছুদিনের মধ্যে। ফলাফল ভালো । সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান আমার। এখানে উল্লেখ্য যে, মেডিক্যাল কলেজে মেধাতালিকা সে অর্থে দেয়া হতো না। ট্রান্সক্রিপ্টের নম্বর দেখে আমরা নিজেরাই মেধা তালিকা তৈরি করে ফেলতাম। এটা না করলে যেন প্রতিযোগিতা জমত না। যা হোক, মেধা তালিকায় তিথি চৌধুরী নামটা খুঁজলাম। সে পঞ্চম স্থানে । সাদিয়া রেজাল্ট ভালো করতে পারেনি। দুটো বিষয়ে ফেল করেছে সে । সাদিয়া ফোন দিয়ে অভিনন্দন জানাল আমাকে এবং একই সঙ্গে জানাল যে, সে আমার সাথে দেখা করতে চায়। রেজাল্টের দিন বিকালেই দেখা করলাম । আমরা বরাবরের মতো একই জায়গায় বসলাম কিন্তু আগের মতো সে আর আমার সাথে ঘনিষ্ট হয়ে বসার চেষ্টা করল না।  কিছুক্ষণ নীরবে সে কেঁদে  গেল আর তার পায়ের কাছের মোটা পাতার নরম নরম ঘাসগুলিকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে একাকার করতে থাকল। ফেল করার কষ্ট হয়তো সে তার ঘাস ছেঁড়ার ভেতর দিয়ে প্রকাশ করতে চাচ্ছিল।

এরপর হঠাৎ সে তার নীরবতা ভঙ্গ করল। তার তখন কথা বেশ বলতে কষ্ট হচ্ছে। গলা ধরা ধরা। সে তার গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, “তুমি কি জানো আমি ভর্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছিলাম?”

আমি আসলে জানতাম না যে, ভর্তি পরীক্ষায় সে প্রথম হয়েছিলো। কখনও বলেনি সে । তবে এটা জানতাম যে, ভর্তি পরীক্ষায় কোনো ছেলে নয়, একটা  মেয়ে প্রথম হয়েছিল।  ইত্তেফাক পত্রিকায় ‘মেয়েরা কেন পড়াশুনায় ছেলেদের থেকে এগিয়ে যাচ্ছে’ এতদ্বিষয়ক বিষয়ক কলাম ছাপা হয়েছিল সেসময়।

 আমি বললাম,  “নাতো!, তুমি প্রথম হয়েছিলে তা তো আমাকে বলোনি। ”

 সে ধরা ধরা গলায় বলল, “আমি এবার কেন ফেল করেছি তা কি তুমি জানো?”

বললাম, “না, বলো , কেন তোমার এমন হলো?” আমি ভাবছি পরীক্ষার সময়ে তার হয়তো বড় ধরনের কোনো অসুখ হয়েছিল, যা সে আমাকে বলেনি।

 সে বলল, “যেদিন তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিলে, সেদিন রাত থেকেই স্বপ্নে তুমি আমার কাছে আসো। তুমি বলো  যে,আমি তোমার বউ। তারপর…..”

“তারপর কী? বলো?” আমি মনে মনে তখন বেশ মজা পাচ্ছি।

 সে বলল,“ সেটাও বলতে হবে। বউয়ের সাথে স্বামী কী করে তুমি বুঝো না?”

 সে বলতে থাকল, “গত ক’মাস ধরে প্রতিটি রাতে তুমি আমার কাছে আসতেছ। আমি তোমাকে বিষয়টা বলিনি কারণ ভেবেছি, তুমি মনে করতে পারো  যে আমি তোমাকে মিথ্যা বলছি।  এছাড়া আমি ভেবেছিলাম, স্বপ্নতো স্বপ্নই, এগুলো বলেই কী, আর না বলেই কী? আর তুমিও কেমন যেন সবসময় চুপচাপ থাকো। বললে কী বা কী মনে করো এ জন্য ভয়ে বলিনি।”

আমি বললাম, “এগুলো স্বপ্ন। অবসেশন থেকে এটা হতে পারে। অবসেশনের চিকিৎসাতো তুমি জানো!”

 সে বলল, “আমি আসলে ইচ্ছা করেই চিকিৎসা নেইনি এতদিন। প্রথমে ভেবেছিলাম ঠিক হয়ে যাবে। পরে আমার এই স্বপ্ন দেখাটাই নেশা হয়ে গেল। তোমাকে  দেখব বলে, কাছে পাব বলে ,আমি ঘুমের পিল খেয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে  যেতাম এই আশায় যে তোমাকে দেখব, কাছে পাব।  জানো,পরীক্ষার রাতেও এটা করেছি । আমি ঘুমানো মাত্র তুমি আমার কাছে চলে আসো।এই আকর্ষণ আমি কিভাবে রুখবো বলো? তুমি আমার সাথে গল্প করো, আমার সাথে বেড়াতে যাও। তাহলে এখন বলো আমার ফেল করাটা কি স্বাভাবিক না?”

 সে অত্যন্ত করুণস্বরে কথাগুলি বলে যাচ্ছিল। খুব মায়া হচ্ছিল তার উপর । ভালো করে  খেয়াল করে দেখলাম সে কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। ড. সাহেবের বাড়িতে গান গাইতে আসা, শাদা শাড়ি পরা সেই সাধন-সঙ্গীনীদের মতো চেহারা হয়ে গেছে তার।  গুণে দেখলাম,তাকে আমার এড়িয়ে চলার চেষ্টাটা ততদিনে ২০ দিন হয়ে গেছে, এবং  এই ২০ দিন তার মুখের দিকে ভালো করে তাকাইনি। মুখমণ্ডলে আগেকার পবিত্র জ্যোতি আর নেই, শরীরের সব রক্ত যেন কোনো একটা বিশাল জোঁক শুষে নিয়েছে। আমার পাড়ার মহিলারা বাচ্চাপ্রসব করার পরপর তাদের চেহারা এমন দেখাতো। আমি ছোটবেলায় এমন দেখেছি। মনে আছে বেশ। বাচ্চাকে বেশ নাদুসনুদুস দেখালেও মাকে দেখাতো কঙ্কালসার। তখন মা-দের প্রতি আমার মায়া হতো আর কোলের সন্তানগুলোকে দেখে মনে হতো এক-একটি জোঁক। ভাবতাম,তারা জোঁকের মতো তাদের মায়ের শরীরের দুধ শুষে নিয়ে মোটা-তাজা হয়েছে আর বেচারা মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে।

স্বপ্ন নিয়ে বানিয়ে কথা বলা সহজ। তাই ভাবলাম, হতে পারে সাদিয়া যা বলছে তা সবই মিথ্যা। সে ফেল করেছে বলে এখন আমি তাকে অবহেলা করতে পারি, এ ভয়ে হয়ত সে কথাগুলোকে সাজিয়েছে , মনে মনে বললাম আমি। কিন্তু তার মতো একটা ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে-  যে সমগ্র দেশের মধ্যে মেডিক্যাল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল,  সে ফেল করবে কেন? নিশ্চয়ই রহস্যজনক কিছু আছে। সাদিয়ার জন্য আমার কষ্ট হতে থাকল খুব। আমি তাকে কোনো কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু সে হয়ত মনে করল যে,আমি রেগে চলে যাচ্ছি। সে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল। তারপর সে আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। আমি অনুভব করলাম, সে আমাকে জড়িয়ে ধরে তির তির করে কাঁপছে। পাখির বাচ্চাকে হাতে নিলে বাচ্চাটা  যেমন করে কাঁপে তেমন করে কাঁপছে সে। আমার পিঠে লেপ্টে আছে তার বুক। আমি আমার দুপাশের স্ক্যাপুলায় তার স্তনের স্পর্শ নিদারুণভাবে অনুভব করতে পারছি। এ ষ্পর্শানুভূতির সাথে পৃথিবীর অন্যকিছুর তুলনা চলে না। তবে এ স্পর্শানুভূতির গভীরতর তল দিয়ে আমি তার হৃৎ-স্পন্দনকে অনুভব করতে পারছি। প্রতি মিনিটে এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া আমি অনুভব করতে পারছি যে,তার শরীর অসম্ভব গরম।  কেন সে এত গরম? উত্তেজনায়? নাকি ঘুমের মধ্যে প্রতিরাতে আমার রূপ নিয়ে যে সত্তা তাকে দেখা দেয়, তার কারণে? সে কি এখন তার শরীরে ভর করে আছে? আমার কাছে কোনো উত্তর নেই এইসব প্রশ্নের। এরপর আমার যেন কী হলো। যুবতী নারীর একান্ত সংস্পর্শে সকল যুবকের এমন হয় কিনা আমার জানা নেই । নাও হতে পারে। তবে আমার হলো।  তবে আমি এখনও নিশ্চিত এ হওয়ার মাঝে কোনো ভালবাসা ছিল না। আমি চকিতে তার দিকে ঘুরে তার মুখখানা দুহাতে তুলে ধরলাম। তার কন্ঠনালীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এক্সটার্নাল জগুলার ভেন দিয়ে বেদম বেগে রক্ত প্রবাহিত হওয়া আমার দুহাতে অনুভব করতে পারলাম আমি । হৃৎস্পন্দন দ্রæত চলছে তার। চোখ বুজে আছে সে। আমি দেখছি,তার চোখের পাপড়ি অনেক সুন্দর। তার ঠোঁট, আমার গ্রামে জালছার দিনে বিক্রি হওয়া গোলাপী রঙের হাওয়াই মিঠাইয়ের চেয়েও গোলাপী। ঐ  ঠোঁটে চুমু দেওয়া মাত্র মনে হবে যে আমি ঠোঁটে চুমু খাইনি,ঐ ঠোঁট যুবকের কল্পনায় দেখা কোনো এক দূরবর্তী সুন্দরীর ঠোঁট, কল্পনায় চুমু দেয়া মাত্রই হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মিলিয়ে যাবে। কিন্তু স্বাদ তখনই মিলাবে না, অটুট থাকবে আরও, আরও কিছুক্ষণ। কিন্তু আমি চুমু খেতে পারছি না। কে যেন বাধা দিচ্ছে। আমার মাথার পেছনে কেউ একজন ক্রুর অট্টহাসি হেসে যাচ্ছে তখন। আমার দুহাতের তালুর মধ্যে তার নূরানী মুখখানা ঐ অসম্ভব সুন্দর ঠোঁটসমেত নিস্তেজ পড়ে থাকল। দেখে মনে হলো যে, সে ঘুমিয়ে গেছে অথবা আমার চুমুর অপেক্ষা করছে। অথবা সে স্বপ্ন দেখছে- আমি প্রতিরাতের মতো তার কাছে গিয়েছি, আর, আমি তাকে আদর করছি প্রাণ ভরে।

ঝাঁকুনি দিলাম। সে  যেন একটা  ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। তাকে এখন আমি কিভাবে স্বান্তনা দেব? স্বান্তনাই বা কেন দেব? তাকে তো আমি শুধু ফ্রেন্ড হিসেবেই দেখি,  দেখেছি। তার প্রতি তো আমার ওরকম কোনো টান নেই। তাকে ঐদিন কে জড়িয়ে ধরেছিল তা আমি জানি না।আমি তো নই! আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। দূরে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটা অযাচিত অপরাধবোধ কাজ করতে থাকল আমার ভেতর। এক অপরাধ বার বার করা যায় না। সেদিন করেছি আমার অজান্তে। কিন্তু আজকে কেন করলাম?  আজকেই বা কেন তার মুখখানা দুহাতে তুলে ধরলাম আমি ? এটা ঠিক করিনি আমি। কাউকে পুরোপুরি ভালো না বেসে, তার মধ্যে ভালোবাসার ভাব জাগানো একদমই উচিত নয়।  খামাখা মানুষের হৃদয় খুঁচানো খারাপ। ফেক আশা জাগানো খারাপ। এটা মহাপাপ। আমার মনে এই চিন্তা এলো যে, তাকে বলে দেয়া দরকার যে, আমি তাকে নয়, তিথিকে ভালবাসি। কিন্তু সে কি এখন আমার কথা বিশ্বাস করবে? অনেক দেরি হয়ে যায়নি কি? সে যে আমাকে ভেবে ভেবে এতদূর পর্যন্ত যাবে তা কে জানত! আমার মতো আনস্মার্ট ছেলেকে সে কেন যে এত ভালোবাসলো, ধূর!

কিন্তু তাকে বলতে পারলাম না কিছুই। তাকে তার হলে রেখে ফিরে এলাম নিজের হলে। তখন অনেক ক্লান্ত আমি। বালিশে মুখ গুঁজলাম। নিজেকে চরিত্রহীন বলে মনে হতে লাগল কিছুটা। এক মন কিভাবে তিন জন নারীকে ভালোবাসতে পারে? নিজেকে বুঝতে পারছি না আমি। আমার চোখের সামনে তখন তিন তিনটা মুখের  স্ন্যাপসট হচ্ছে। তিন জন নারী। শাহনাজ, তিথি, সাদিয়া। শাহনাজের মুখটা মনের পর্দায় আসতেই যেন আমি অবশ হয়ে যাচ্ছি। সে ব্যতিত পৃথিবীর অন্য কোনো নারীর হাসি এত সুন্দর হতে পারে না। কী অসম্ভব সুন্দরী ছিল সে? সে তার সমগ্র মুখমণ্ডল দিয়ে হাসতে পারত আর মুহূর্তেই তার চারপাশ উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। তাকে আমি পাঁচবছর হলো দেখি না। শুনেছি সে নাকি আমাকে দেখতে এসেছিল। সে কোথা  থেকে যেন শুনেছিল যে,আমি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ফেল করেছি। তাই সে আমাকে  দেখতে এসেছিল।  আমাদের দেখা হয়নি সেদিন । আচ্ছা, তার সাথে তখন দেখা হলে সে কী বলত? সে কি আমার দিকে জাস্ট তাকিয়ে থাকত? নাকি নাছিমা আপার মতো সাহস দিয়ে বলত, “আবার ভাল করে পরীক্ষা দে, আমি তো তোকে চিনি। তুই পারবি। তোকে অনেক দূর যেতে হবে। তুই বড় কিছু হলে আমার যে শান্তি লাগে।” হায়রে ভালবাসা!  সে তখন ছিল দুই সন্তানের জননী। অন্য ঘরের ঘরণী। তবুও সে আমাকে ভালবাসার টানে দেখতে  এসেছিল। আমি শাহনাজের সেদিনের কান্নার দৃশ্য স্পষ্ট স্মরণ করতে পারি। আহা, সে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “এ জীবনে তো তোকে পালেম না, পরের জীবনে তোকে আমি চাবো। আর তুই যদি আমার আগে মরে যাস, তাহলে সে জীবনে তোকে পাওয়ার জন্য আমি সবসময় আমার মৃত্যু কামনা করব।” কেমন মেয়েরে বাবা, এত গভীর করে কি কাউকে ভালবাসা যায়?

 আর তিথি?

তিথিকে কোনো ছেলের সাথে ঘুরতে দেখি না কেন? সে তার বান্ধবীদের সাথে ক্যান্টিনে খেতে যায়। ইদানিং আবার দেখি মুসলমান মেয়েদের মতো করে মাথায় ওড়না দেয় সে। ফলে ভয়াবহ সুন্দর লাগে তাকে। আচ্ছা সে কি আমাকে মনে মনে ভালবাসে? আমার সহপাঠিদের সবারই তো এ্যাফেয়ার আছে, এ কলেজের না হলেও বুয়েটের বা ঢাকা ভার্সিটির ছেলেমেয়েদের সাথে  প্রেম করে তারা । কিন্তু তিথি কেন এখনও কোনো সম্পর্কে জড়ায়নি? সে কি আমার জন্য অপেক্ষা করছে? সে আমার জিকির করা নিয়ে কী একটা বলেছিল বলে সেই যে কবে থেকে তার সাথে আমি কথা বলা বাদ দিয়েছি, তার পরে তো আর কোনো কথা হয়নি আমাদের। আমি না হয় রাগ করে কথা বলা বাদ দিয়েছি কিন্তু সে?  সে কেন আমার দিকে তাকায় না? এত অভিমান কেন তার?  ভুল তো সে-ই করেছিল। কিন্তু আমি তো এখন অভিমান ভুলে গেছি, অথচ সে? আমাদের এত বন্ধুত্ব ভুলে গেছে সে? রসায়নের কঠিন রিয়্যাকশনগুলো তাকে আমি কত সুন্দর করে বোঝাতাম। শুধুমাত্র তাকে বোঝাতে হবে বলে নিজে নিজে বাড়িতে প্রাকটিস করতাম। আমার নিজের জন্য হলে এতটা মনোযোগ দিয়ে কখনো পড়তাম না । আমাদের মধ্যে কত বোঝাপড়া ছিল। আমরা যদি এখন আবার একসাথে স্টাডি করতে পারতাম, তাহলে এই ডাক্তারি পড়াটাকে এত কঠিন বলে মনে হতো না। আমার কাছে তো নিউরোলোজি খুব কঠিন লাগে। বাজে একটা সাবজেক্ট। এক সিজোফ্রেনিয়াই  যে কত প্রকার আছে তা খোদা মালুম। তার কাছে কি নিউরোলজি সহজ লাগে? জানতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু সে তো আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।

 তবে আমি দুয়েকদিনের মধ্যে তার সামনে দাঁড়াব। দাঁড়াবই ,আমিই তার সাথে আগে কথা বলব। এখন আর আমার মধ্যে কোনো সংকোচ নেই। পরীক্ষায় এবার তো আমি তাকে পেছনে ফেলেছি। আমি হয়েছি দ্বিতীয়, আর সে পঞ্চম। কোচিং করার সময় আমি গ্রামের ছেলে বলে, মাথায় ক্ষতচিহ্ন আছে বলে, আমার  মধ্যে যে সংকোচ ছিল, এখন তো সেই সংকোচ নেই। আমার তোতলানোও কমে গিয়েছে অনেকটা । যে ধ্বনিগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে তোতলানো আসে আমি এখন সে ধ্বনিগুলো উচ্চারণের আগেই সাবধান হয়ে যাই— কথা বলার স্পিড কমিয়ে ফেলি। আর যখন আমি ক্লান্ত থাকি তখন তো আর কথাই বলি না। তবে এখনও তো আমি প্রমিত বাংলায় কথা বলতে পারি না। ক্লাশের সবাই সুন্দর করে কথা বলে, শুধু আমি পারি না।  আমার দ্বারা হবেও না বোধ হয়। হলিক্রস, ভিকারুন্নেসা থেকে আসা মেয়েগুলোর কেউ কেউ কেমন যেন ঠোঁট উচুঁ করে শব্দ উচ্চারণ করে, আমার ভাল লাগে না। তাদের কথা বলার ভঙ্গি দেখে মনে হয় তারা তাদের মা-বাবার সাথে আহ্লাদী ভঙ্গিতে কথা বলছে। আবার তারা বাংলার মধ্যে হুট করেই ইংরেজি বলে। বাংলার মধ্যে হুটহাট ইংরেজি বলার কি দরকার? ভাব একটা! বড্ড বেমানান লাগে। বোঝাই যায়, কেমন জাহিরি স্বভাব কিংবা নিজের স্বাজাত্যবোধকে অস্বীকার করার মানসিকতা। এরা ডাক্তার হওয়ার পরে গ্রামের রোগিদের সাথে কিভাবে কথা বলবে? গ্রামের রোগিরা তো এদের কথা বুঝতেই পারবে না!

 আচ্ছা, এতদিন পরে তিথির সামনে দাঁড়িয়ে কোন্ কথাটা প্রথমে বলব ? সে তো আবার ঘাড় ঘুরিয়ে চলে যাবেনা? আচ্ছা সে কি আমাকে সাদিয়ার সাথে দেখে ফেলেছে ? আমি যে যে জায়গায় সাদিয়ার সাথে বসেছি সে জায়গাগুলোতে তো তার চোখ যাওয়ার কথা না। তবে সে যদি আমাকে মনে মনে ভালবেসে থাকে, তাহলে অবশ্যই আমাকে ফলো করেছে। সে হয়ত কারো কাছ থেকে শুনে ফেলেছে  যে আমি সাদিয়ার সাথে ঘুরি।  তা যা-ই হোক, আমি তার মুখোমুখি দাঁড়াবই। আচ্ছা আমি কি তাকে সরাসরি বলব যে, কেমন আছো তিথি? পড়াশোনা  কেমন হচ্ছে? এগুলো? নাকি, বলব, কনগ্র্যাচুলেশন্স তিথি, তুমি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেছো, পঞ্চম হয়েছো, এজন্য তোমাকে কনগ্রাচুলেশন্স,চলো তোমাকে ট্রিট দিই। এভাবে বলব কি? নাহ, এভাবে বলা যাবে না। এতে সে মনে করতে পারে যে, আমি দ্বিতীয় হয়েছি বলে তাকে উপহাস করছি। দ্বিতীয় হওয়া ব্যক্তি পঞ্চম হওয়া ব্যক্তিকে ট্রিট দিতে পারে না, পঞ্চম হওয়া ব্যক্তি পারে। তাই আমি যদি ট্রিট দিতে চাই তাহলে তাকে উপহাস করা হবে।

আর,সাদিয়া? সাদিয়াকে নিয়ে আমি কী করব? কী করতে পারি। তার কথা ভাবলেই যে মনে একটা পেইন আসে। আচ্ছা, সে তো আমাকে মনে-প্রাণে ভালবাসে কিন্তু আমি তাকে ভালবাসি না কেন? তার প্রতি আমার মনের গহীন থেকে ভালবাসা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায় না কেন? যেমনটা আসে তিথির জন্য। সাদিয়ার সমস্যা কোথায়? সাদিয়ার তো কোনো সমস্যা নেই। সে নিতান্তভাবে ভাল একটা মেয়ে। আমার জন্য জানপ্রাণ দিতে পারে। আর সে ধার্মিক,ভদ্র,সহজ-সরল। তার তো কোনো সমস্যা নেই। তারপরেও সে আমাকে কেন টানে না। সে আর দশটা এভারেজ মেয়ের মতো টিপিক্যাল মেয়েমানুষ, এজন্য? তার সাথে রাগ দেখালে সে অভিমান করতে পারবে না, কষ্ট পেয়ে কাঁদবে, কিন্তু উল্টো আমার উপর রাগ করতে পারবে না এজন্য?  হয়তো এ জন্যই। আমি কথা বলা বন্ধ করলে সে  উল্টো বন্ধ করতে পারবে না, ধমক দিলে, উল্টো ফোঁস করে উঠতে পারবে না। বরং, ধমক খেয়ে আরো নত হবে। বলবে,বলো কী করতে হবে, এখনই করে দিচ্ছি, ইত্যাদি। হ্যাঁ, আমি তো এ ধরনের মেয়ে পছন্দ করি না। এ ধরনের মেয়েরা যেন ঢ্যাপা মরিচের মত, ঝাল কম। প্রতিবাদ করতে পারে না, ’না’ বলতে পারে না। এ ধরনের মেয়ে আমি দেখে এসেছি আমার জীবনব্যাপী। আমার মা, চাচি, ছোলেমানের বউ, মজিদের বউ, গ্রামের আর দশটা মেয়ে বা মহিলা সবাই এ ধরনের। এরা স্বামীর হাতে প্রচণ্ড মার খেয়েও প্রতিবাদ করে না। মারের ব্যথা কমে গেলে আবার নিলর্জ্জের মতো স্বামীর গা  ঘেঁষে। এ মেয়েগুলো যেন পৃথিবীতে পয়দা হয়েছে  শুধু সেবা দেয়ার জন্য,পরের ফরমায়েশ খাটার জন্য। কষ্ট সহ্য করে খামাখা।  যেন বৃক্ষের মতো তারা, ডালপালা কেটে ফেললেও মাটিতে শিকড় দাবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নীরবে, প্রতিবাদ করে না। এরা মানুষের মতো নয়। এরা স্বভাবে কুকুর প্রজাতির অথবা এরা কুকুরের চেয়েও কুকুর প্রকৃতির।  চামড়ায় ক্ষতযুক্ত, হাড়গিলে,একজিমাযুক্ত , নোংরা লেলচে কুত্তে টাইপের এরা। আমি এ ধরনের মেয়ে চাই না। আমি চাই একজন  ’মানুষ’ মেয়ে, যে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে, যে প্রতিবাদী হবে। তিথির মতো হবে। অভিমানী কিন্তু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। আগ বাড়িয়ে কথা বলতে না আসা টাইপের। কিন্তু  আবার এরকম যে ,মুখে উচিত কথা এসেছে তো বলে ফেলা সারা। কুচ পরোয়া নেহি।

সাদিয়ার মুখের স্পর্শ যেন এখনও আমার হাতে লেগে আছে। তার জগুলার ভেন দিয়ে লাফিয়ে চলা রক্তের  প্রবাহ আমার আঙুলে যেন এখনও অনুভব করছি। তার জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে। এটা কি ভালবাসার কষ্ট? না, তা নয় বোধ হয়, এ কষ্টটা মানবিকতার সাথে সম্পৃক্ত। তার প্রতি আমার একটু মায়া হয়েছে, এই যা। এই মায়াটা হয়েছে এ জন্য যে, তাকে  ছয় মাস আগে যেমন দেখেছি,  এখন দেখতে সে তেমন নেই। সে শুকিয়ে গিয়েছে অনেক। তার কী হয়েছে তা আমি জানি না। তবে তার যা হয়েছে তার সাথে আমি জড়িত নিশ্চয়ই।  সে আমাকে বলেছে সেটা। জানি। কিন্তু আমি তার জন্য কী করতে পারি? আচ্ছা সে এমন কেন? একজন মানুষ তার প্রিয় একজন মানুষের প্রতি কতটা অবসেস্ড হলে প্রতিরাতে তাকে নিয়ে স্বপ্নে দ্যাখে,পড়াশুনা বাদ দিয়ে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে থাকে শুধু তার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য!  আজব ব্যাপার। পাগল মেয়ে একটা। এটা অবশ্য আমার অভিজ্ঞতার উল্টো । আমার জ্বর হলে বোবায় ধরা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঘুমাতে ভয় পাই, ঘণ্টার পর ঘন্টা না ঘুমিয়ে রাত পার করে দিই ,আর সে  তো দেখি উল্টো,শুধু ঘুমাতেই চায়।

দুইদিন পর ক্লাশে গেলাম। আগেরদিন শুক্রবার না হলে আগেরদিনই কলেজে গিয়ে আমি তিথির মুখোমখি দাঁড়াতাম। যা হোক,  জানলাম যে,একটু পরেই কমিউনিটি মেডিসিনের উপর একটা ক্লাশ হবে। রুটিনে ছিল না এটা। যা হোক, কমিউনিটি  মেডিসিন আমার প্রিয় সাবজেক্ট ছিল । আমি ভাবছিলাম, এ ক্লাশটি করেই আমি তিথির সাথে দেখা করতে যাব। তিথি তখন অন্য সেকশনে ক্লাশ করত । তবে সে এসেছিল কিনা তা আমি তখনও জানতাম না ।

 তবে সাদিয়া যে ক্লাশে আসবে জানতাম।  দেখলাম সে এসেছে এবং তাকে আরো বেশি ক্লান্ত  দেখাচ্ছে।  যেন রাতে সে ঘুমের ওষুধ বেশি খেয়ে ফেলেছে। বেশি ঘুমানোও একটা নেশা, ঘুম ঘুমকে ডেকে আনে, আমি ভাবলাম এটা। তবে সাদিয়া কেন যেন আমাকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করতে থাকল এদিন। সে তার ব্যক্তিগত স্বপ্নের বিষয়টা আমাকে বলে দিয়েছে বলে যেন একটু লজ্জায় পড়ে  গেছে। লজ্জা পাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। ব্যক্তিগত দূর্বলতার কথা প্রকাশ করলে নিজেকে ডাউন মনে হয়।

সাদিয়াকে ক্লাশরুমে রেখে আমি তিথির সাথে দেখা করার জন্য বাইরে বের হলাম। কিন্তু আমি তখন বুঝতে পারছি যে, সাদিয়া আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু আমি পেছনে তাকালাম না। তার সাথে সহজভাবে মিশে তার যথেষ্ট ক্ষতি করেছি আমি, আর না; আমি তাকে উপেক্ষা করলেই বরং এখন তার মঙ্গল। এদিকে আমি ততক্ষণে তিথির সাথে কথা বলার জন্য উপযুক্ত উপলক্ষ্য খুঁজে পেয়েছি। কমিউনিটি মেডিসিনের ক্লাশ করার সময়েই আইডিয়াটা আমার মাথায় এসেছে। আইডিয়াটা হলো, কমিউনিটি মেডিসিনের উপরে আমি একটা নাটিকা লিখব এবং কলেজ অডিটরিয়ামে সেটা মঞ্চস্থ করব। তারপর আমি তিথিকে নাটকের একটি চরিত্র দেয়ার প্রস্তাব দিব। এটা একটা ভালো প্রস্তাব হবে । প্রস্তাবে গ্র্যাভিটি থাকবে বেশ। আমি এমন একটা প্রস্তাব দিয়ে আমাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের জমাট বরফ গলাবো। এটা নিশ্চয় বেশি কার্যকর হবে। “তুমি কেমন আছো, তোমাকে তোমার রেজাল্টের জন্য কনগ্রাচুলেশন্স”-এ কথাগুলি দিয়ে কথা শুরু করার চেয়ে এ ধরনের ক্রিয়েটিভ একটি বিষয় দিয়ে কথা শুরু করা শতগুণে ভাল হবে।

আমি সামনের ভবনে চলে  গেলাম। তিথির ক্লাশ তখনও শেষ হয়নি। আমি কাচের জানালার এ পাশ থেকে তিথিকে দেখতে  পেলাম। সে মাথায় ওড়না পড়ে এসেছে, মুসলিম মেয়েদের মতো। দেখতে পবিত্র লাগছে। তাকে এখন যেই দেখুক কেউ তাকে হিন্দু বলতে পারবে না। তার চেহারায় হিন্দুয়ানি কোনো লক্ষণ নেই।

 সে হিন্দ্।অথচ আমি নেশাগ্রস্তের মতো তার পেছনে ঘুরছি। এর পরিণতি কী হবে? আমার মতো পীরবাদী একজন মানুষ, যে শুধু পীরবাদীই নয়, সরাসরি একজন মুরিদও, সেই আমি কিভাবে একজন হিন্দু মেয়ের প্রেমে পড়লাম? আমি নিজেই নিজেকে শাসালাম, বোঝালাম। বললাম,ফিরে চল্, তোর ঈমান,আমল সব বরবাদ হয়ে যাবে। তোর ঘাড়ে যে কালো কুকুরটা আছে ,তুই তার প্রলোভনে এটা করছিস। তুই ফিরে চল। তুই বরং সাদিয়াকে ভালবাস্, মেয়েটা কত ভালো দেখছিস, তোকে কত ভালবাসে। এত ভালবাসা পায়ে ঠেলতে নেই। বুঝবি , পরে বুঝবি। তুই যে একটা মহিলার হাসির গায়েবি আওয়াজ শুনিস,এ হলো সেই। ওর কণ্ঠস্বরও তো সেই গায়েবী মহিলার মতো,তবুও কেন বুঝিস না? তুই ফিরে চল।

 আমার মন এসব ভেবে চলছে আর আমার চোখ তখন দেখে যাচ্ছে যে, তিথি তার নোট খাতায় স্যারের লেকচার লিখে যাচ্ছে। তার হাতের আঙুল কী শুভ্র, সুন্দর। আঙুলে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আলো পড়ে মুক্তার মত জ্বলজ্বল করছে সেগুলো ।

আমি মনে মনে আমার লেখা প্রিয় কবিতাটা আবৃত্তি করলাম-

“তোমার আঙুল ছুঁয়ে দেখবো একদিন                                                                                           

কলাডেমা গুল্মের মতো কাতর এ বুক ধক্-ধক্                                                             

ও স্বর্ণ অঙুরীয় নিছক- অপ্রয়োজনে আসীন                                                                          

আঙুল তোমার স্বেদ জ্বল-জ্বল বাইশ ক্যারেট ত্বক।”

 তিথির ক্লাশ শেষ হয়েছে। সবাই একে একে বেরিয়ে আসছে। স্যার বেরিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে একটা মুচকি হাসি দিলেন। আগে দিতেন না । পরীক্ষায় দ্বিতীয় হওয়ার পর থেকে আমার পরিচিতি বেড়ে গিয়েছে বলে দিলেন। আমার ইয়ারমেটরাও বেরিয়ে যাওয়ার সময় কথা বলল, করমর্দন করল। সবাই বেরিয়ে  গেল একে একে । তিথি বের হলো না।  দেখি, সে তার খাতাপত্র, নোট, ব্যাগ এটা-সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।  কিছু খুঁজছে সে। সে হয়তো একটা কিছু হারিয়ে ফেলেছে।

হঠাৎ সে বেঞ্চে মাথা নামাল।

 বেঞ্চে চুপচাপ মাথা নামিয়ে হয়তো কিছু ভাবছে সে , হয়তো  কিছু মনে করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমার তর সইছে না। আমি বিড়ালের মত নিঃশব্দে তার সামনের চেয়ারে গিয়ে বসলাম। আমার সামনে আমার তিথি। আমার আকাঙ্ক্ষিত তিথি। দূরন্ত যৌবন তার। তার দেহ থেকে ঝরে পড়ছে সৌন্দর্য।

 সে তার মাথা তুলেছে। কিন্তু চোখ খোলেনি। সে পেছনের বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসেছে। চোখ বুজে আছে এখনও। ধ্যানরত কিংবা চিন্তামগ্ন। কোনো কঠিন দুঃশ্চিন্তায় তাকে পেয়ে বসেছে  যেন। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে সে তার মুখে হালকা একটা হাসি ধরে রেখেছে। দুঃশ্চিন্তা করলে মুখে এই হাসির ঔজ্জ্বল্য থাকতো না। হাসিটা মোনালিসার হাসির চেয়ে কিঞ্চিৎ কম হলেও সৌন্দর্য মোনালিসার চেয়ে  বেশি। তার মুখের আলো আমার মুখে এসে আছড়ে পড়ছে। আমি এটা অনুভব করতে পারছি। তার মুখের হাসি হাসি ভাব আমাকে বলে দিচ্ছে যে, সে আমার উপস্থিতি টের পেয়েছে। আসলেই কি সে আমাকে দেখতে  পেয়েছে?  ভাবছি আমি।  অবশ্য দেখে থাকতে পারে। মেয়েরা এটা পারে। মেয়েদের সিক্সথ সেন্স প্রবল হয়।আমি যে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ আগে, এটা হয়ত সে আগেই দেখতে পেয়েছে।

 সে আবার তার মাথা বেঞ্চের উপর রাখল। আমি তখন শুধু তার মাথার ওড়নাটা দেখতে পাচ্ছি। ওড়নার নিচ দিয়ে বিনুনি করা লম্বা চুল পিঠ বেয়ে কতদূর নেমে গেছে তা এপাশ থেকে ঠাহর করতে পারছি না। তবে চুল থেকে সুন্দর গন্ধ পাচ্ছি একটা। এমন গন্ধ আমি তাছলিমার চুল থেকে পেয়েছিলাম। চেনা গন্ধ। পৃথিবীর সব সুন্দরীদের চুলে বোধ হয় এই একইরকম গন্ধ থাকে।

একটু পরেই তো এ রুমে আবার ক্লাশ শুরু হবে । সিনিয়রদের ক্লাশ। তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বর্ষের। রুম থেকে তাই তাড়াতাড়ি বের হওয়া দরকার তখন। কিন্তু আমি তিথিকে কিভাবে ডাক দিব? অবশেষে অনেক সাহস সঞ্চয় করে ডাক দিলাম,“তিথি?” তিথি মাথা না তুলেই জড়ানো কণ্ঠে বলল, “বলো। ” আমার ধারণা ঠিক । সে আগেই আমাকে দেখতে পেয়েছে এবং বুঝতে পেরেছে যে, আমি তার সাথে দেখা করতে এসেছি। ঠিকই, মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ভালো কাজ করে। এদিকে আমি কী বলব তা ঠিক করার জন্য অপেক্ষা করছি, সময় চলে যাচ্ছে কিন্তু মাথায় কিছুই আসছে না। কমিউনিটি মেডিসিন নিয়ে আমি যে নাটিকা বানাব আর সেই নাটিকার প্রধান নারীচরিত্রটা যে আমি তিথিকে দিয়ে করাবো, তা তো আর হুট করে বলা যায় না। সবকিছুরই একটা জো লাগে। আর, আমার মনে হচ্ছে, আমি এখন যা কিছু বলব, তা মুখ দিয়ে ঠিক মতো বের হবে না।  আমার মনে হতে থাকে,হঠাৎ করে আমি খুব কাহিল হয়ে পড়েছি। এখন যদি আমি কোনো কিছু বলতে যাই তাহলে নিশ্চিত আমার তোতলানি শুরু হবে। আর একবার তোতলানি শুরু হলে সেটা ছাড়ানো মুশকিল হয়ে পড়বে। দীর্ঘ দেড় বছর পর তার সাথে দেখা করতে এসে আমি  তোতলানির মত বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে চাই না, আমার তোতলানিতে ইন্টারমিডিয়েট লাইফে  এমনিতেই সে চরম বিরক্ত ছিল, নতুন করে সেই বিরক্তি এখন ফিরে আসলে সবকিছু মাঠে মারা পড়বে।

 আমি দেরি করছি  দেখে তিথি একটু জোর দিয়ে বলে, “আরে কী বলবে,বলো?” সে তখনও তার কপাল বেঞ্চে ঠেকিয়ে  রেখেছে। তার গলায় কাকের স্বরের মতো আওয়াজ। আওয়াজটা  সেই গায়েবি মহিলার মতো।  অথচ,একসঙ্গে কোচিং করার সময় এবং পেয়ার স্টাডি করার সময় তার কণ্ঠের আওয়াজকে এমন মনে হয়নি কখনও। যা হোক, আমি ভাবি, এত সুন্দর একটা মেয়ের কন্ঠস্বর এতো বাজে কেন? তারপর ভাবলাম, ব্যাপার না। দু-একটা বাজে গুণ থাকতেই পারে মানুষের। দোষে-গুণে মানুষ। আমিও তো তোতলাই। তোতলানো বা কন্ঠস্বরের নিয়ন্ত্রণ তো নিজের হাতে থাকে না। এগুলো প্রাকৃতিক।

 তারপর, হঠাৎ আমার মনে হলো, সাদিয়া আমার পেছনে অপেক্ষা করছে। সাদিয়া এ সেকশনে কখন এলো? কেন এসেছে? সে কি আমাকে ফলো করছে?  আমি দেখলাম,তার মাথায় উস্কোখুস্কো চুল। চোখের নিচে কালি পড়া অথবা এবড়ো-থেবড়ো কাজল । তার পরনে ঢোলা একটা কাপড়, যেটা পা পর্যন্ত বা পা-কে ছাড়িয়ে আরো একটু বড়। সে যেন জোরে একটা চিৎকার দেবে এখনি। আমি ওর দিক থেকে লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নিলাম। এরপর  তিথি হঠাৎ কী যেন বলে উঠল। আমি পেছনে তাকালাম আবার ,  কিন্তু দেখি,সাদিয়া নেই। সাদিয়া হঠাৎ যেন হাওয়া হয়ে  গেছে। এদিকে শুনলাম যে, তিথি বলছে, “ তোমার গায়ে এত কড়া সেন্ট দিয়েছো কেন! আমার মাথা ব্যথা করছে। এগুলো আর ব্যবহার করবে না, সেন্টে আয়ন থাকে, তুমি জানো না!”

 সে ঠিকই বলেছিল। তার সাথে দেখা করব বলে আমি একটু বেশি করে গায়ে সেন্ট দিয়ে এসেছিলাম। অস্বস্তি লাগল আমার । তাকে বললাম, “চলো হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। তুমি আগে আগে চলো, আমি পিছে পিছে। তাহলে তোমার গন্ধ লাগবে না।” সে তা-ই করল। তবে দেখলাম, তবুও একটু অস্বস্তি তার মধ্যে। ইতস্ততঃ বোধের সাথে গড়িমসি। তারপর সে উঠল। হ্যাঁচকা টানে সে তার ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে দ্রæত হাঁটতে  থাকল। আমরা করিডর দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। আমাদের  মধ্যে কোনো কথা নেই। আমি কিছুটা পেছনে হাঁটছি। তার শরীরের গন্ধে আমার শরীরটা যেন ভরপুর হয়ে যাচ্ছে।  ভাবছি সে তো সেন্ট ব্যবহার করে না, তারপরও তার শরীরে এত মিষ্টি গন্ধ এলো কোথা থেকে?

 “তোমার কি এখন অফ-টাইম, ক্লাশ নেই?” সে  জিজ্ঞাসা করল যেতে যেতে।

বললাম ,“ক্লাশ আছে, কিন্তু করব না। চলো ক্যান্টিনে বসি। কফি খাই।”

সে বলল, “ঠিক আছে, কিন্তু বেশি দেরি করতে পারব না। আমার নিউরোলোজি ক্লাশ আছে । মিস করতে পারব না। ফেব্রিট ক্লাশ আমার ।”

নিউরোলোজি আমার সবচেয়ে অপছন্দের সাবজেক্ট ছিল। আমি এমনটাই চেয়েছিলাম যে,এটা যেন তিথির প্রিয় সাবজেক্ট হয়। আমার ভালো লাগছিল এটা ভেবে যে সামনের দিনগুলোতে আমি তিথির সাথে নিউরোলজি বিষয়ে আলোচনা করে প্রোডাকটিভ একটা সময় ব্যয় করতে পারব। কোচিংয়ে  ঠিক যেভাবে আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা এক সঙ্গে স্টাডি করে পার করে দিতাম।

ক্যান্টিনে  বসলাম। একটা টেবিলে মুখোমুখি আমরা বসেছি।  কিন্তু এতদিন পর তার সামনে বসে আমি ইজি হতে পারছি না। এটা ছাড়াও আমি ভাবছি ,আমার গায়ের সেন্টের কড়া গন্ধে সে বুঝি খুব বিরক্ত হচ্ছে। আমি ক্যান্টিন বয়কে আমাদের মাথার উপরের ফ্যানটার স্পিড বাড়িয়ে দিতে বললাম।

ক্যান্টিনে কফি রেডি নেই তখন।একটু দেরি হবে। এদিকে আমরা দুজনেই চুপচাপ বসে। এমন অবস্থাটা আমার অসহনীয় লাগছে। কেমন যেন গুমোট গুমোট পরিবেশ। আমার মনে হচ্ছে, কিছু একটা বলা দরকার। তবে আমি ভাবছি, তিথিই বরং আগে কথা শুরু করুক। কিন্তু তার কোনো আগ্রহ দেখা  গেল না। অগত্যা আমিই শুরু করলাম।

“আচ্ছা, পাবনায় তোমাদের বাড়িটা কোন্ জায়গায়?”

“কেন, তোমার জানা এত প্রয়োজন কেন! হাহ্।”

 সে ভ্রু কুঁচকালো। তার মুখে বিরক্তি ভাব। যেন সে অনেকটা অনিচ্ছাকৃত আমার সামনে বসে আছে।  এখনই উঠে পড়বে। কফি-টফি কিচ্ছু খাবে না।

“না,এমনিই জিজ্ঞাসা করছি। আমরা একসঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট পড়লাম, একসাথে কোচিং করলাম,এখন আবার একসাথে ডাক্তারী পড়ছি, আমি কি জানতে পারি না তোমার বাড়ি কোথায়?” আমি তার বিরক্তি ভাঙতে সাধ্যমত ভদ্রভঙ্গিতে বললাম এটা ।

“কিছু মনে করো না, এমনি বললাম আরকি। আমাদের আসলে নিজস্ব বাড়ি নেই। আমরা পাবনা শহরে ভাড়া বাসায় থাকি।” সে বলল আস্তে আস্তে। যেন সে আমার ভদ্র আচরণের একটুখানি মূল্য দিল।

“তাহলে স্থায়ী ঠিকানা কোনটা ব্যবহার করো।” জিজ্ঞাসা করলাম।

আমি ভাবছিলাম যে, সে আমার সাথে ফান করছে।  কারো বাড়ি নেই, বা নিজস্ব ঠিকানা নেই এটা কোনোমতেই বিশ্বাস করা যায় না। তাই আমি তাকে টেকনিক্যালি এ প্রশ্নটা করলাম। কিন্তু সে  সোজাসুজি বলল,

“আমার নানির বাড়ির ঠিকানা।”

“তোমার বাবার বাড়ি ছিল কোথায়?”

“রহমতপুর।”

“রহমতপুর? কোন্ রহমতপুর!”

“ সাঁথিয়া উপজেলায়। ইছামতি নদীর পাশে। রহমতপুরের পাশে নাকি বিখ্যাত আতাইকুলা হাট আছে। বাবার কাছ থেকে শুনেছি।”

আমি তখন চরমভাবে আশ্চর্য হচ্ছি।  ভাবছি, আরে,এতো দেখি আমার গ্রামের নাম বলে। একই উপজেলা, একই নদী, একই হাট। আমার কৌতুহল রীতিমত বেড়ে যায় এবং পাশাপাশি ভয়ও লাগে।

“তোমার বাবা কী করে?” প্রশ্ন করলাম আমি।

বাবার কথা জিজ্ঞাসা করাতে সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে চুপ করে থাকল। ক্যান্টিনের এদিক-ওদিক তাকাল। দেখে নিল,কফি হতে আর কতক্ষণ লাগবে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“বাবা নরসিংদীতে থাকে। শুনেছি একটা ওয়ার্কসপ দিয়েছে। মায়ের সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে।”

“তোমার বাবার নাম কী?”

“উত্তম স্বর।”

“দাদার নাম?”

তিথি আর বলতে চাইল না। সে এতক্ষণে ধারণা করে নিয়েছে যে,আমি তার পিতৃকুলের লোকজনদেরকে চিনি। সে উল্টো আমাকে প্রশ্ন করে বসল, “এই, তুমি কি এঁদের চেনো? তোমার বাড়ি কি রহমতপুর?”

 আমি উত্তর না দিয়ে বললাম, “আচ্ছা, এটা শুধু বলো যে, তোমার  ঠাকুরদাদার নাম তারকনাথ স্বর কিনা?”

 সে  মুখে উত্তর না দিয়ে আস্তে করে একবার মাথা ঝাঁকাল। তারপর আমার দিকে লজ্জার ভঙ্গিতে তাকাল।

 আমার তখন  এটা ভেবে আশ্চর্য লাগছে যে তিথি আমার গ্রামেরই মেয়ে। মুহূর্তে তাকে আমার অন্যরকমভাবে আপন লাগল। এটা প্রেমিকার প্রতি ভালবাসার চেয়ে বেশি। নিজের পরিবারভুক্ত মানুষের মতো ভালবাসাময়।

 তার বাবা উত্তম স্বরকে আমি বেশ চিনতাম । তারা তিন ভাই ছিল। ভাইগুলো দেখতে অনেকটা একই রকমের ছিল । তিথির বাবা লোকটা দেখতে একটু বেশি সুশ্রী ছিল ,দেখেছিলাম আমি । বারো-তেরো বছর আগে তারকনাথ স্বর মারা যাওয়ার পর শ্মশানে পোড়ানোর সময় তাকে দেখেছিলাম। তারপর রহমতপুর বাজারে একবার  তিনি এসেছিলেন। তখন তাকে দেখে মনে হয়েছিল ,একেবারে বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

 আমি ক্যান্টিনে বসে স্মৃতিচারণ করছি এসবের। তিথি নির্বিকারভাবে তখন তার চুলে আঙুল চালনা করছে।

ক্যান্টিন বয় কফি নিয়ে এলো। তিথি ছেলেটির দিকে একটু রাগের ভঙ্গিতে তাকাল। তার ভাবখানা এমন, কফি আনতে এতটা দেরি করায় তাকে এত কিছু বলতে হলো।

 সে কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “আজ আর ক্লাশ করব না।ভালো লাগছে না।”

কফি শেষ করে ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে আসলাম।  এর পর আমরা ক্যাম্পাসের মাঠে  চলে এলাম। আমরা ঘুরছি আর কথা বলছি।…………… (To be continued)

Leave a Reply

Your email address will not be published.