একটি মুরিদজীবন ও একটি গোরস্তান

 2,073 total views

প্রথম ভাগ
১.


এই যে জানালাটির সামনে তুমি এখন দাঁড়িয়ে আছো, গোরস্তানটি এর পাশ থেকেই শুরু হয়েছিল,আর ঐ যে কোণাটাতে আমি ভুমিষ্ঠ হয়েছিলাম তার ঠিক পাঁচ হাত দূরেই ছিল নতুন একটি কবর। আমার বয়স যখন মাত্র তিন দিন হয়েছিল, তখন একটি কুকুর আমাকে কামড়ে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ঐ কবরের কাছেই। মা দেখেছিল কুকুরটাকে। কালা কুটকুটে,চোখ জ্বলজ্বলে ছিলেরে—–ওডার কতা আর কইসনে তুই, কথাগুলো মা বলেছিল আমাকে, পরে বলেছিল, যখন আমি কথা বলতে ও বুঝতে শিখেছিলাম । ভয় পেয়েছিলাম খুব। এরপরে আর কখনও জিজ্ঞাসা করি নাই। এই যে দেখো, মাথার বামপাশে একটা দাগ, এটা কিন্তু ঐ কুকুরেরই কামড়ের দাগেই হয়েছে। আগে ছোট ছিল, এখন বড় হয়ে গেছে। যত বড় হয়েছি, তত বড় হয়েছে ।


আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এ ঘরেই। আগে এখান থেকে সব দেখা যেত। অবশ্য এই বাউন্ডারিটি ছিল না তখন । কবরে মাটি দিতে আসা মুসুল্লীদের গায়ের আতরের গন্ধ সারা বাড়ি ছড়িয়ে পড়তো। কী,ভয় পাচ্ছ ,ভয় পেয়ো না, আসলে এ ঘরে আমি একলা থাকতাম না। দাদি থাকত সাথে। তবে ভয় আমার সব সময়ই ছিল। কারণ আমার মনে হতো, কোনোদিন সেই কুকুরটা আবার ঘরে ঢুকে পড়বে, আবার আমাকে টেনে নিয়ে যাবে কবরের মধ্যে। তবে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম তখন,যখন দখিনা বাতাস শত শত কবরের নির্যাস নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ত । দাদি এ বাতাসকে ভালো মনে করত না। সে এই দমকা বাতাসকে বলত ‘গোরস্তানের হাঁফ’ ।


ঐযে, ঐখানে, একটু মাথা উঁচিয়ে দেখো, গোরস্তানের ঐপাশটায় নদীর কিনারে ছিল একটা বড় আকারের বটগাছ। ওটার কয়েকটি ডাল নদীর মাঝখানে গিয়ে পড়েছিল। সেই প্রমত্তা নদী এখন আর নেই। ছোট ছোট খালে বিভক্ত হয়ে গেছে। আগের জঙ্গলও সব কেটে ফেলা হয়েছে। ঐ যে ঐখানেই ছিল বটগাছটা । আমার বয়স যখন আট হয়েছিল, তখন একদিন বটগাছের ডালে বসে বৃষ্টিতে ধ্বসে যাওয়া একটা কবরের ভেতরে লাশ দেখেছিলাম। ভয় পেয়েছিলাম খুব। এখন কবরটি মিশে গেছে । ঠিকমত ঠাহর করা যায় না। তোমাকে তো এই ভয় পাওয়ার গল্পটা কলেজে থাকতে বলেছিলাম বোধ হয়? বলিনি? ওহ! বলিনি তাহলে। বলা উচিত ছিল। আচ্ছা, সমস্যা নেই, তোমাকে একদিন নিয়ে যাবো ওখানে । ওখানে এখন প্রকান্ড একটি বাঁশঝাড় হয়েছে । বাঁশগুলো অবশ্য কেউ রোপন করেনি, কবরের চেরা বাঁশ থেকেই হয়েছে। এরকম বাঁশঝাড় এ গোরস্তানে অনেকগুলি আছে। এই যে বিশাল বিশাল ঝাড় দেখছো এগুলোর সবই হয়েছে ওভাবে । মৃত মানুষের পচে যাওয়া শরীর বাঁশের ফলনের জন্য বেশ ভালো। বাঁশের ফলন এখানে এত ভালো যে, শুধুমাত্র বাঁশ বিক্রির টাকা দিয়ে এই বিশাল বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করা গেছে। ঐযে লাশ রাখার ঘর, ওটিও কিন্তু নির্মাণ করা হয়েছে বাঁশ বিক্রির টাকাতেই । তবে ও ঘরে কোনো লাশ রাখা হয় না। ভয়ে কেউই রাখে না। লোকজন বলে, ফজর নামাজের আগে আগে এ ঘরের ভেতর থেকে একটা নারীকন্ঠের চিৎকার শোনা যায়।


এই গোরস্তানে কড়া আইন চলে। একদম নিয়ম করে কবর দেয়া হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পরেই গোরস্তান কমিটি অনেক ভেবে-চিন্তে কিছু নিয়ম পাশ করেছিল ,সেগুলিই চলছে । নিয়মগুলি লিখিত ও অকাট্য। হাসছো যে, হেসো না। ভাবছো গোরস্তানের আবার নিয়ম-কানুন কী! ভাবতেই পারো তা ,তবে এটাই সত্যি । এই নিয়মগুলি করেছিলেন আব্বাহুজুর পীরসাহেব। এখন অবশ্য মুরিদরা এর নাম দিয়েছে ‘গোরস্তানের সংবিধান’। এ সংবিধান মোতাবেকই আত্মহত্যার লাশগুলোকে কবর দেয়া হয় শ্মশানের পাশ্ববর্তী দক্ষিণ-পূর্ব কোণে। নারী ও পুরুষের কবর আবার একই এলাকায় দেয়া নিষিদ্ধ। তাদের কবর দেয়া হয় পৃথক পৃথক এলাকায় -উত্তর ও দক্ষিণ পাশে । কবর দেয়ার ক্ষেত্রে নারী পুরুষের এ বিভক্তি কেন করা হয়েছে,তা আমি গোরস্তান কমিটির বর্তমান সেক্রেটারিকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি কোনো উত্তর দেননি।

যা হোক,এভাবে আমি আমার সদ্য বিবাহিতা দ্বিতীয় স্ত্রী সাদিয়াকে এ গোরস্তানের বর্ণনা দিচ্ছি। কবিরাজ লস্কর মন্ডলের বাড়ি থেকে সাদিয়াকে এনেছি মাত্র কয়েকদিন আগে। মানসিকভাবে অসুস্থ সে। সুস্থ আর হবে না হয়তো। কবিরাজ লস্কর মন্ডল তেমন কোনো আশা দেয়নি।


কিছুদিন আগে সাদিয়া এই গোরস্তানের ভেতরে যাওয়ার বায়না ধরেছিল। সেদিন সে কী করেছিল, বলা নেই , কওয়া নেই , হঠাৎ সে নাঁকি কণ্ঠে বলে বসল, “আঁমি এঁই গোঁরস্তানের ভেঁতরে যাব।” যে বলা সেই কাজ। সে প্রাচীর টপকাতে চাইল। পারল না। এরপর এখানে-ওখানে হন্যে হয়ে মই খুঁজতে লাগল। দরবেশ কাকার বহুপুরাতন ভগ্ন-দশা একখান মই পেল সে । সেটাই ঠেকিয়ে দিল প্রাচীরে। আমার মা-বাবা, চাচি,রফিকের বউ তো তাকে পাঁজাকোল করেও ধরে রাখতে পারে না। গায়ে অসুরের শক্তি তার। চাচি তো বলেই বসলো, “ গতরে মাংস নেই, শুকে শটি, কিন্তু এত বল ক্যা ছেরির!” কথাটা তাচ্ছিল্যে পরিপূর্ণ হলেও ঠিক ছিল। দীর্ঘ দশ বছর মানসিক হাসপাতালে থেকে থেকে সে হাড্ডিসার হয়ে গিয়েছিল। ওজন হয়ে পড়েছিল মাত্র তেতাল্লিশ কেজি।


গত দুদিন ধরে অবশ্য সে একটু ঠাণ্ডা হয়েছে। এখন আর অতটা যেতে চায় না। উল্টো ভয় পায়। এখন সে শুধু একটা কালো কুকুর, আর শ্মশানটার কথা বলে। শ্মশানটার অবস্থান গোরস্তানের ঠিক পাশেই । সে বলে যে, কালো কুকুরটি ঐ শ্মশানেই থাকে আর তাকে শুধু কামড়াতে আসে। অবশ্য ,তার মতো এমন কালো কুকুর আমিও দেখেছি বেশ ক’বার। এমনকি আমার প্রতিবেশি খুনে মজিদও শুধু কালো কুকুরই দ্যাখে । মজিদ এখন পুরো পাগল । সে এই কালো কুকুরটিকে হত্যা করতে গিয়ে গ্রামের শ’খানেক কুকুরকে ইতোমধ্যে মেরে ফেলেছে ।
যে বাড়িটিতে বসে কথা বলছি,গোরস্তানের প্রাচীরের সাথে লাগোয়া এ বাড়িটি আজ অথবা আগামীকাল অথবা পরশু ভাঙা হবে। যে কোনো দিন ভাঙা হতে পারে। আতঙ্কে আছি, কারণ প্রতিদিনই মনে হয় ভাঙবে আজকেই ।এরকম মনে হওয়ার কারণ হলো আমরা মামলায় হেরে গেছি এবং এ বাড়ি থেকে আমাদেরকে উচ্ছেদ করা হবে। পাঁচদিন হলো আদালতের নোটিশ এসেছে । নোটিশের স্মারক নং জকোপা/১৩১, তারিখ ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯। চিঠিটি আমার মুখস্থ হয়ে গেছে।স্মারক নংও।
চলে যাব। যেতেই হবে। তবে এ বাড়ি ছেড়ে যেতে হচ্ছে বলে খুব কষ্ট পাচ্ছে আমার বাবা-মা। কষ্ট পাচ্ছে আমার চাচা-চাচিও। সাদিয়ার অবশ্য এ বিষয়ে তেমন ভাবনা নেই। কারণ সে এই বাড়িতে এসেছে মাত্র কিছুদিন হলো। তার কোনো মায়া জন্মেনি। এ মুহূর্তে তার যত ভাবনা গোরস্তানটাকে নিয়ে। সে গোরস্তান সম্পর্কে একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে কয়েকদিন ধরে। সে দাবী করে বলে, সে এই গোরস্তানটাকে গত দশ বছর যাবৎ দেখে এসেছে।
আমি পেশায় একজন ডাক্তার। সাইক্রিয়াট্রিস্ট। ২৮তম বিসিএস ক্যাডারভুক্ত একজন সরকারি ডাক্তার ছিলাম । ১০ বছর চাকরি করেছি। এখন চাকরি নেই। বরখাস্ত হয়েছি। একেবারে ডিসমিসাল,মানে, ফিরে পাওয়ার আর সম্ভাবনা নেই। ডিসমিসাল হওয়ার কারণ হাসপাতালে আমি এক অন্যায় কাজ করে ফেরেছিলাম। সাদিয়া , যে তখন আমার স্ত্রী ছিল না, রোগি ছিল, তাকে আমি হাসপাতালের ভেতরে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। এটা করা উচিত ছিল না। তবে আমার কিছু করার ছিল না। এটা হতোই।নিয়তি ছিল এটা। এখানে একটু বলে রাখি যে, সাদিয়া আমার পূর্ব পরিচিত ছিল এবং মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন আমি সাদিয়ার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমি তাকে শ্রেফ বন্ধু হিসেবে দেখলেও সে এক তরফাভাবে আমাকে ভালেবেসে ফেলেছিল । তবে ঐ সময়ে আমার পক্ষে তাকে ভালবাসা সম্ভব ছিল না কারণ আমি তখন তিথি চৌধুরীকে (যে পরে আমার স্ত্রী হয়েছিল,প্রথম স্ত্রী) ভালবাসতাম। সাদিয়া, তিথি এবং আমি- তিনজনই একই মেডিক্যাল কলেজে,একই বর্ষে পড়াশুনা করতাম।
সাদিয়া আমাকে তার জীবনে না পেয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল, এবং তার এই পাগল হওয়ার কারণ যে আমি ছিলাম, সেটা আমি তখন পুরোপুরি জানতাম না। তারপর দশ বছর পরে সে যখন আমার হাসপাতালে আমারই পেশেন্ট হয়ে এসেছিলো,তখন আমি জানতে পেরেছিলাম যে, সে মূলত আমার কারণেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল। আমি তখন আরও জানতে পেরেছিলাম যে, গত দশ বছর যাবৎ সে আমাকেই মনে মনে স্বামী হিসেবে মেনে এসেছে । তারপর তার প্রতি আমার তীব্র ভালবাসা জেগেছিল এবং তারপর আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। তারপরে যা ঘটেছিল তা আমার জন্য সুখকর ছিল না মোটেও।
যতটুকু বললাম তা অবশ্য আমার ও সাদিয়ার গল্পের শেষের দিকের কথা। মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন সময়ের আমাদের দুজনের আরও কিছু গল্প আছে। তখন আমাদের উঠাবসা ছিল, সখ্যতা ছিল। তবে সেগুলো এখনই বলতে চাই না। এখন এখনকার কথা বলতে চাই। এ মুহূর্তে বাড়ি এবং চাকরি দুটোই হারিয়ে খুবই অসুবিধায় আছি। আর্থিকভাবে একপ্রকার নিঃস্ব বলা যায়। মানসিকভাবেও একদম নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার এ মানসিক অবস্থার কারণ—আমি আমার প্রথম স্ত্রী তিথি, যাকে আমি প্রচণ্ড ভালবাসতাম, ভালোবাসি এখনও, তাকে হারিয়েছি, এবং হারিয়েছি আমার একমাত্র মেয়েকে। আরও কী কী হারিয়েছি? হ্যাঁ, হারিয়েছি গ্রামবাসীর আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা।
হাতে টাকা-পয়সার সংকট। মেয়ের জন্য আদালত কর্তৃক নির্ধারিত মাসোহারা পাঠাতে হচ্ছে আমাকে । পরিমাণটা নেহাৎ কম নয়। এর মধ্যে আবার বাড়ি ছাড়ার নোটিশ। তবে আমি ভেঙে পড়িনি। প্রকৃতপক্ষে আমি ভাবছি, এ বাড়ি ছেড়ে অর্থাৎ গোরস্তানের পাশ থেকে আমার এবং সাদিয়ার দুজনেরই চলে যাওয়া বরং ভালো হচ্ছে। সাদিয়ারই বেশি যাওয়ার দরকার ভাবছি। এ গোরস্তানকে নিয়ে ইদানিং সে খুব বেশি হেলুসিনেশন দেখছে। এটাকে হেলুসিনেশন বলব কিনা জানি না। হেলুসিনেশনের সাথে বাস্তবতার মিল থাকে না। অথচ সে যা বলে তা বাস্তব। সে ঠিকঠাক বলে দিতে পারে, গোরস্তানের কোন্ জায়গায় কী গাছ আছে, কোন্ জায়গায় ঢিবি , কোন্ জায়গায় সমতল। যেন সে গোরস্তানের সবকিছু দেখে এসেছে ছোটবেলা থেকে । অথচ এ বাড়িতে নতুন বউ সে। সুদূর মুন্সীগঞ্জে তার বাপের বাড়ি। গোরস্তানের ভেতরকার সবকিছু জানা তারা জন্য অসম্ভব। বিষয়টা চরমভাবে ভূতুড়ে।
চাকরি হারানোর পর থেকে অর্থাৎ গত ছয় মাস ধরে আমি এই গ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে বসছি। হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ড. ইমতিয়াজ আলী। বছরখানেক আগে মারা গেছেন । অদ্ভুত চরিত্রের লোক ছিলেন তিনি। শিয়ালের কামড়ে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিকিৎসা আমিই করেছিলাম। আমি তখন পাবনা সদর হাসপাতালে জেনারেল ফিজিশিয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলাম। যা হোক, তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী গ্রামের এ হাসপাতালটি তাঁর নামেই করা হয়েছে। এখন ড. ইমতিয়াজ সাহেবের স্ত্রী হাসপাতালটি পরিচালনা করছেন। তবে আমাকে এ হাসপাতালটিও এখন ছাড়তে হবে। গ্রামের লোকজন আমাকে গ্রামে আর দেখতে চাচ্ছে না। কারণ আমি তাদের বিপদের কারণ হয়েছি।
গ্রাম থেকে চলে যেতে হবে কিছুদিনের মধ্যেই , যেতেই হবে সবকিছু ছেড়ে , এই বোধে বাড়ির সবাই যখন ভারাক্রান্ত, ঠিক এ মুহূর্তে আমি এই কাহিনী লিখতে বসেছি। হাসপাতালে বসা বন্ধ করেছি, বাড়িতে শান্তি নেই একরত্তি। দরবেশ কাকা ও চাচি থেকে থেকে ডুকরে কেঁদে ওঠে বলে–“ ইডা তুই কী করলি রে বাপ!” তারা বোঝায় যে, তিথিকে ( প্রথম স্ত্রী) রাগানো আমার কোনোমতেই ঠিক হয়নি। সে প্রশাসনের অনেক বড় র্কমকর্তা, অনেক ক্ষমতা তার। তিথি বর্তমান থাকতে আমি কেন সাদিয়াকে বিয়ে করতে গেলাম! এই বিয়ের তো কোনো দরকার ছিল না। তারা আতঙ্কে থাকে, কখন যেন সরকারি বুলডোজার চলে আসে বাড়িতে, সবকিছু ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে চলে যায়! এ বাড়ির প্রতি অনেক মায়া তাদের। স্বাভাবিক এটা। যদিও মনের গহীনে তাঁরা অনূভব করে যে,তাঁদের অসুস্থ মেয়ে নাছিমার ভূতের আছর ছাড়াতে এ গোরস্তানের পাশ থেকে তাদেরই চলে যাওয়াই মঙ্গল । তবে এ বিষয়ে তারা গ্রাহ্য করে না। নাছিমা তো পাগল হয়েই গেছে, এখন বাড়ি ছেড়ে গিয়েই কী আর না গিয়েই কী। বয়স চল্লিশ পেরিয়ে গেছে , বিয়ে-থা তো আর হবে না। বিষয়টাকে তাই তারা আমলে নেয় না। তারা বোঝাতে চায়, তাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে এবং এই মূহুর্তে তাদের ঘাড়ে চেপে বসা এই হঠাৎ বিপদের সব দায় আমার। আমি ডাক্তার হওয়ার সুবাদে এঁরা আমাকে এতদিন সমীহ করতেন। এতই সমীহ করতেন যে কোনো কথা বলতেও ইতঃস্তত করতেন, আর এখন যা ইচ্ছা তা-ই বলে । খুব কষ্ট হয় আমার ।
আমার শহরের চেম্বারটি আগেই বন্ধ হয়েছে, ফেসবুকে আমার চরিত্রহীনতার খবর ব্যাপক প্রচার পাওয়ার পর এটা হয়েছে। ফেসবুক কঠিন জিনিস। মানুষকে হিরো বানাতে পারে আবার জিরো করতে পারে। আমি এখন জিরো হয়ে গেছি। গ্রামের হাসপাতালেও বসতে পারছি না, পুরোই বাড়িতে আটকে আছি। বাড়ির কারও সাথে খুব একটা কথা হয় না। অনেকটা কোয়ারেন্টিন অবস্থা। সাদিয়ারও একই অবস্থা। তবে তার একটা সুবিধা আছে। সুবিধাটা হলো, সে স্বপ্নের জগতে বাস করে। ঘুমালেই সে স্বপ্ন দেখে। উদ্ভট সব স্বপ্ন । ভয়ের স্বপ্ন। তার দিন কেটে যায় স্বপ্নকে ভেবে ;এনালাইসিস করে, আলোচনা করে। আমার দিন কাটে না। ফাঁপড় ছোটে আমার। আমার জানালার ঠিক ওপারেই বিশাল গোরস্তান, আমার পাশে মানসিক ভারসাম্যহীন স্ত্রী, বাড়ির লোকের অনীহা, বাড়ি ছাড়ার টেনশন, গ্রামের লোকজনের প্রচ্ছন্ন থ্রেট—সবকিছু মিলে আমি নিজেও প্রায় ভারসাম্যহীনতার দ্বারপ্রান্তে। এই মুহূর্তে পীরসাহেব এরেস্ট না হলে খানকা ঘরে গিয়ে পড়ে থাকতাম। রাতদিন জিকির-আজগার করতাম। তবে এটাও বোধ হয় করতে পারতাম না, কারণ অন্যান্য মুরিদরা নিশ্চয়ই আমাকে আর মুরিদ হিসেবে গ্রহণ করতো না। যা হোক, মানসিক টানাপোড়েন কাটাতে অগত্যা লিখতে বসেছি। অবশ্য লেখালেখি আমার পুরনো অভ্যাস। অত্যধিক মানসিক চাপ হলেই আমি লিখতে বসতাম। বই পড়লে যেমন দৈনন্দিন টানাপড়েন, চিন্তাভাবনা , হতাশা ইত্যাদি থেকে মুক্তি মেলে, তেমনি লেখালেখিতেও মেলে। এখন,আপনাদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগছে কী ধরনের লেখা লিখি আমি। হ্যাঁ,কবিতা বেশি লিখি, গদ্য কম লিখি। লেখার সাহিত্যমূল্য কেমন হয় জানি না। তবে লিখি। নিজেই লিখে নিজেই পড়ি। বারবার পড়ি। কোনো বই এখনও প্রকাশিত হয়নি আমার। সুতরাং আমার কোনো পাঠক নেই। তবে মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময়ে একটা নাটিকা আমি লিখেছিলাম। সেটা প্রশংসিত হয়েছিল। সেই নাটকে তিথি সুন্দর অভিনয় করেছিল।
সাদিয়া ইতোমধ্যে জেনে গেছে যে আমি আমার ছোটবেলার কথা লিখছি, গোরস্তান সম্পর্কে লিখছি, এমনকি তার নিজের সম্পর্কে ও তিথি সম্পর্কে লিখছি, তাই আমার লেখা নিয়ে তার অনেক কৌতুহল। আমি লিখি আর সে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে আমাকে পেছন থেকে জাপটে ধরে পড়ে,কাঁধের ওপর থুতনি রেখে পড়ে। আমার ভালো লাগে। ভালো লাগে এটা ভেবে যে, আমার অন্ততঃ একজন মনোযোগী পাঠক আছে। অপ্রকৃতিস্থ হোক, আর যা-ই হোক, পাঠক তো। গোরস্তান সম্পর্কে তার জানার ইচ্ছা সবচেয়ে বেশি। তবে সে তিথি সম্পর্কেও জানতে চায়, সে এটা জানতে চায় যে, আমি কিভাবে তিথির মতো একটা হিন্দু মেয়ের প্রেমে জড়িয়ে পড়েছিলাম। প্রকটমাত্রার মানসিক সমস্যাগ্রস্থ হলেও এখনও সে ঠিক আন্দাজ করতে পারে যে, তিথির প্রতি আমার এখনও ভালবাসা আছে। সে আসলে এই ভালবাসার পরিমাণটা পরিমাপ করতে চায়। আন্দাজ করে দুঃখিত হতে চায়। আমি বুঝতে পারি, এসব ভেবে দুঃখিত হওয়াটা তার জন্য দুঃস্বপ্ন দেখার চেয়ে আরামদায়ক।

ইদানিং এই বাড়ির বাইরে খুব একটা যাচ্ছি না। যাওয়ার উপায় নেই আসলে। গত রাতেও পুলিশ ঢুকেছিল গ্রামে। কাউকে পায়নি। পাওয়ার কথা ছিল না। আমি ছাড়া সক্ষম পুরুষ লোক গ্রামে কেউ নেই এখন। আমি পালাইনি কারণ আমি জানি তিথি আমাকে গ্রেফতার করাবে না। পুলিশ আমার হাতে হাতকড়া পরাবে, লোকজনের সামনে টেনে নিয়ে যাবে– আমার এ অপমান তিথি কখনও সহ্য করবে না। কারণ আমি জানি, তার হৃদয়ের বেশিরভাগ জায়গা এখনও আমি দখল করে আছি। শুধুমাত্র আমার উপর তুমুল-তুমুল অভিমানে সে এসব কেচ-কাচারি করেছে।
যা হোক, গ্রামে মহিলা, শিশু ও কিশোররা আছে শুধু। কিশোররাই সব বাজার-ঘাট করে। সংসার সামাল দেয়। এদিকে ক্ষণে ক্ষণে পাড়ার মহিলাদের খিস্তি ভেসে আসে কানে। পাড়ার এরা, আমার বাড়ির লোকজনের মতোই মানসিকতা এদের, অবিরাম অভিশম্পাত করে যায় আমাকে। ঠিকই করে। তারা বড় বিপদে পড়েছে। মাঠের ধান পেকে মাঠেই ঝরে পড়ছে,কাটার লোক নেই। চাষ-বাষ ,বাজার-ঘাট করার লোক নেই। দুধেল গাইয়ের ওলান দুধের চাপে ফাট-ফাট করে, বেদম ডেকে চলে গাই, দোহনের লোক নেই। মহিলাদের তো আবার গাই দোহন নিষিদ্ধ। পীরসাহেব মানা করে দিয়েছেন বলে মহিলারা ওলানে হাত দেয় না। ফলে বিভিন্ন অসুবিধায় এদের মুখে খিস্তি লেগেই আছে। “ঐ ডাক্তারেক বাড়িত্তিন ডাহে লিয়ে আয় যা, গাইডা দুয়ে দিক।” ছোলেমানের বউ তার কিশোর ছেলেকে গলা ছেড়ে বলে যাতে আমার বাড়ি পর্যন্ত তার গলার স্বর পৌঁছে। অশিক্ষিত মানুষের কাছে সবাই তার নিজের মতো, সমান সমান । কে ডাক্তার , কে ব্যারিষ্টার তা তাদের দেখার সময় নেই। আমি মহিলার খিস্তি শুনে ভেতরে ভেতরে গুটিয়ে যাই। ভয় পাই কিশোর ছেলেগুলোকে। ওরা তো বিদ্রোহী হয়ে উঠছে না আমার প্রতি? ওরা দরবেশ কাকার মজমা ঘরের কাছে গাট্টি পাকিয়ে কী যেন আলাপ করে। একসময় আমাকে মান্যগণ্য করত এরা, এখন দুচোখে দেখতে পারে না। ফলে এই ঘর,বাড়ি আর বাড়ির একদম নিকটস্থ এই গোরস্তান ছাড়া বাইরে যাওয়ার উপায় নেই আমার।
সারাদিন লিখি। বিকাল হলে অবশ্য গোরস্তানের ভেতরে যাই। সাদিয়া বলে যে, সেও আমার সাথে গোরস্তানে যাবে। সে বলে আমার সাথে গেলে নাকি তার ভয় করবে না। কিন্তু আমি তাকে নিই না। সে বেজাড় হয়। আমার নিজেরই তো ইচ্ছা করে না, তাকে নিই কিভাবে? প্রকৃতই গোরস্তানে যেতে একদম ইচ্ছা করে না। তবুও যাই। এড়াতে পারি না। এটা অনেকটা নেশার মত। আগে বিকাল হলেই পীরজাদার সাথে গোরস্তানের মধ্যে হাঁটতে বের হতাম। এখনও ও রকম করেই হাঁটি—-ধীর পায়ে, দেখে দেখে, শোকগ্রস্থ ভাব নিয়ে।তবে এভাবে একা একা হেঁটে আরও শোক আসে মনে। পীরজাদা দলবল, মুরিদের বহর নিয়ে হাঁটতেন। কদিন আগেই গ্রেফতার হয়ে গেছেন তিনি। আমার সাথে এখন হাঁটার কেউ নেই।
গোরস্তানের ভেতরে এই যাওয়াটা আমি বন্ধ করতে পারছি না। কী এক অনিবার্য নেশার মতো হয়ে গেছে এটা। বাড়ির বাইরের পরিবেশ, বিশেষ করে নদীটা, বাড়ির সামনের রাস্তাটা, বড় দেবদারু গাছটা, গোরস্তানের বড় বড় পিতরাজ গাছগুলো, ঘন বাঁশ ঝাড়গুলো, ঈদগাহ মাঠ, মাঠ পেরিয়ে গেরুয়া প্রাচীরে ঘেরা শ্মশান, শ্মশানের বড় ঝাউগাছটা সবকিছুতে আমার অন্যরকম মায়া। এইসব প্রতিবেশ কেন যেন আমাকে টানে এখনও । আমি কাজেম উদ্দীনের কবর দেখি;মরিয়ম, ছলিমের কবর দেখি, মনে পড়ে সবকিছু,আহা কী ট্র্যাজিক মৃত্যু ছিল মরিয়মের! প্রেম করে ছলিমকে বিয়ে করার অপরাধে বাপের হাতে তাকে মরতে হয়েছিল। চরমপন্থী ছলিম যে কবরটার গর্তে রাইফেলগুলি রেখেছিল, যেটা এখন মিশে গেছে মাটিতে, ঠাহর করা মুশকিল,সে কবরটার অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করেছি গতকালও। আমি গোরস্তানের ঈদগাহের বেদিতে বসে বয়ান দিতে থাকা পীর সাহেবের মুখায়বব মনে করার চেষ্টা করি। আরও মনে করতে চেষ্টা করি,পীরজাদা কর্তৃক মরিয়মের বাপ কমল শেখের কবরের ভেতরকার আজাব অবলোকনের দৃশ্য, শমসের খাঁর ফজর পরবর্তী জিকিরের দৃশ্য, জিকিরের সাথে সাথে তার শুকনো বুকের খাঁচার অসামান্য উঠানামা। আমি দেখি ক্রসফায়ারে মৃত মানুষগুলির কবর, চৎরা বিলে এক রাতে খুন হয়ে যাওয়া সাত জন জেলের কবর। দেখি শমশের খাঁর কবর, যেটার অবস্থান গোরস্তান ও শ্মশানের মধ্যবর্তী জায়গায়, শ্মশানের ছাই-ভস্ম স্তুপের মাঝে এবং প্রতিবারই এই কবর দেখে আমার উপলব্ধি হয় যে, শমসের খাঁ কবরের ভেতরে এখনও মরে নাই, জিন্দা আছে। মনে পড়ে, মাত্র কয়েকদিন আগেও যেদিন পুলিশ রেইড দিয়েছিল এই গোরস্তানে, সেদিন আমি শমসের খাঁর কবরের কাছে গিয়ে মুর্ছা গিয়েছিলাম। সেদিন, শ্মশানের ছাই ভস্ম পেয়ে লম্বা ও তাগড়া হয়ে ওঠা তুলসী গাছের ভেতরে শত শত মানুষ মাথা নিচু করে পালিয়ে ছিল। ভয়ার্ত সেইসব মানুষের ফিসফিস আওয়াজ এখনও আমার কানে বাজে।
গোরস্তানের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে ইছামতি নদী। এই নদীও দেখি আমি । এই নদীর অনেক অনেক স্মৃতি আমার মানসপটে। দুপায়ের রানের চিপায় ফেলে ,আশরাফ কবিরাজ এই নদীর পানিতেই আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। কী খচ্চর ছিল লোকটা। লোকটা মরে গেছে। শিয়াল তার লাশ তুলে সারা গোরস্তানে ছড়িয়েছিল। হাত এখানে তো পা ওখানে। কী যে গন্ধ ছড়িয়েছিল চারদিকে।বুকের খাঁচা কামড়ে নিয়ে ফেলেছিল আবার এই নদীতেই। গ্রামের পোলাপান গোসল করতে নেমে এই বুকের খাঁচাকে প্রথমে মনে করেছিল নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া দূর্গামূর্তির ফ্রেম। অনেক দিন নদীতে গোসল করাও বন্ধ ছিল এজন্য। যা হোক,এই নদী নিয়ে আমার আরও স্মৃতি আছে। এই মূহুর্তে যেটা স্পষ্ট মনে পড়ছে এবং যেটা লেখার মতো, সেটা হলো, চৈত্রমাসের সামান্য পানিতে শমসের খাঁ অযু করছে, আর গোরস্তান থেকে বের হয়ে কয়েকটি গুইসাপ বিভক্ত জিহবা দিয়ে শমসের খাঁর পাশেই পানি চেটে চেটে খাচ্ছে। গুইসাপগুলির কোনো ভয় নাই। গোরস্তানে শত মানুষের লাশ দেখা সাপ, মানুষ দেখে অভ্যস্ত সাপ, তাই হয়তো জীবিত মানুষকেও মালুম নেই। গোরস্তানের নদী পাড়ের সেই বরই গাছটা এখনও আছে, যার গলাসমান উইয়ের ঢিবি। ঢিবিটা উপরের দিকে বেড়েই চলছে। গাছটিকে গিলে ফেলতে চেষ্টা করছে যেন।ঢিবির গর্তে অনেক সাপ। নীল নীল সব সাপ । পরিত্যক্ত খোসাগুলিও নীল রঙের। এই সাপগুলিও মাঝে মাঝে নদী পার হয়ে ওপারের কাছারপুরের গোরস্তানে যায়। এখনও যায়। মানুষ বলে, ওগুলো নাকি পাপিষ্ট লাশগুলোকে ছোবল দেওয়ার জন্য কমান্ডো সাপ।
নদীটি এখন প্রায় মরে গেছে। মধ্যে মধ্যে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে ছোট ছোট পুকুরের মতো বানানো হয়েছে। কেরামত শেখ গং এটা করেছে। এরা এলাকার প্রভাবশালী। কেরামত শেখের ছেলে মনোয়ার শেখ এলাকার চেয়ারম্যান। এই নদী রক্ষার জন্য এই গ্রামের একমাত্র ডক্টরেট ডিগ্রিধারী পরিবেশবাদী ব্যক্তি ইমতিয়াজ আলী বেশ চেষ্টা করেছিলেন। সফল হতে পারেননি। গ্রামের কোনো কাজেই সফল হতে পারেননি তিনি। তাঁর সাসটেইন্যাবল প্রজেক্ট ফেল করেছে। এই রহমতপুর গ্রামটাকে ইকো ভিলেজে রূপান্তর করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। তিনি কেন ব্যর্থ হয়েছিলেন এ বিষয়ে অবশ্য তিনি একটি থিসিস লিখেছিলেন। থিসিসটা বিদেশি ইউনিভার্সিটি কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছিল। তবে মৃত্যুর আগে আগে তিনি এ গ্রামে একটি হাসপাতাল তৈরি করবেন বলে যে কথা দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়েছে। গত পরশু আমি এই হাসপাতালে বসেছিলাম। অবশ্য গতকাল থেকে আর বসছি না। হয়তো আর বসাও হবে না।
এই গোরস্তানকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি আছে বটে, তবে গোরস্তানটিকে ভালবাসতে পারি না আমি। অবশ্য এই না পারাটা স্বাভাবিকই মনে হয় আমার কাছে । যদিও পীরজাদা বলেছিলেন, গোরস্তানের প্রতি মানুষের ভয় থাকা উচিত নয়, থাকা উচিত ভালবাসা । কিন্তু এই ভালবাসাটা আমার আসে না। আমার ছোটবেলার ও কিশোরকালের অনেক স্মৃতি আছে এই গোরস্তানকে নিয়ে। কিন্তু স্মৃতি যতই থাকুক, গোরস্তানকে ভালবাসতে পারি না আমি। ভয় জাগে। খুব ভয়। তাই প্রতিবারই ভাবি যে, গোরস্তানের ভেতরে যাওয়া শুধু নয়, তাকাবই না। তারপরও যাই। বিকেল হলেই ঢুকে পড়ি। এই ঢুকে পড়াটা কেমন যেন লাগে আমার কাছে। এটা একটা অন্যরকম অনূভুতি । যাকে পছন্দ করি না, ভয় পাই, তার কাছাকাছি থাকার ইচ্ছাটা স্ববিরুদ্ধ। কিন্তু যাই। এখানে ফিলিংসটা এমন যে,গোরস্তানের ভেতরে আমি যতটা না যেতে চাই উল্টো গোরস্তানই যেন আমাকে টেনে ভেতরে নিয়ে যায়। একটা চৌম্বুকীয় আবেশ যেন ছড়িয়ে আছে পুরো গোরস্তানটাতে।
প্রকৃতপক্ষে গ্রামে ফিরে আসার পর প্রায় প্রতিদিনই আমি এ গোরস্তানের ভেতরে গিয়েছি। দাদির কবর বা আমার ছোট বোনের কবর দেখতে কিন্তু যাইনি। এমনি গিয়েছি, কোনো কারণ ছাড়াই। আমার পা হেঁটে গিয়েছে অবলীলায় । তারপর, প্রতিবার যাওয়ার পরপরই, বুকের ভেতরটা একদম খালি হয়ে গেছে। মনে হয়েছে আমি কোনো এক মাধ্যাকর্ষণহীন জায়গায় ঢুকে পড়েছি। এরকম অনুভূতি অবশ্য আমার অন্য কোথায়ও হয় না। হয়নি। এমনকি অনেক ভীতিকর পরিবেশে গিয়েও হয়নি। প্রথমবর্ষে মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় একবার ভুল করে একা একা লাশের ঘরে ঢুকে পড়েছিলাম। সেদিনও এরকম বোধ হয়নি। সেদিন আমার চারদিকে অনেকগুলি লাশ ছিল । লাশগুলোকে দেখে আমার কাছে ঠিক লাশই মনে হয়নি। মনে হয়েছে সবাই যেন কলেজ মেসের সিঙ্গেল বেডে ঘুমিয়ে আছে, একটু শব্দ করলেই জেগে উঠবে।
এই গোরস্তান অতীব পরিচিত আমার, আপনাদেরকে বলেছি বেশ কয়েকবার। তবুও এখানে আমার খুব ভয় । কেন ভয়? গোরস্তান তো তেমন কিছু নয়, অনেক অনেক লাশের সমষ্টি মাত্র। এটাকে বলা যায় বড় ধরনের মর্গ, বা লাশ রাখার জায়গা। ডাক্তার হিসেবে এটা আমি বলতে পারি। আমি অনেক লাশ দেখি, অটোপসি করি, মানুষের খুলি উল্টিয়ে ফেলি, তাই সিম্পলি এটাকে বৃহদাকার মর্গ ভাবলেই কিন্তু ভয় পাওয়ার কিছু থাকে না । অথচ,গোরস্তানটিকে আমার কাছে অসম্ভব ভীতিকর ও নিস্তব্ধ হাহাকারে পূর্ণ একটা জায়গা বলে মনে হয়। এ নিস্তব্ধতার একটা মাথা-ঘুরানি অস্বস্তি আছে;বুকের ওপর চেপে বসা গভীর আতঙ্ক আছে। জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে জীবনের প্রথম বক্তৃতা দিতে গিয়ে উপস্থিত দর্শকশ্রোতাদের চাহনির চাপে বক্তার যেরূপ দমবন্ধ অবস্থা হয়, গোরস্তানে ঢুকলে আমার তেমনই অনুভূতি হয়। চিরকালের মতো শায়িত হাজার হাজার মৃত মানুষের নীরব চাহনিতে মনে যেন এক গভীর অস্থিরতা আসে। মনে হয় আশেপাশে সবাই যেন ফিসফিসিয়ে কী একটা বলছে, বলার চেষ্টা করছে। পৃথিবীর জীবিত সব মানুষগুলির বাহাদুরি, হৈ-হুল্লোড়, নিশ্চিন্ততা, নির্লিপ্ততা দেখে মৃত মানুষগুলি যেন বিষাদময় হাসি দেয়। সহ¯্র কবরের ভেতরে চিরকালের মত নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া এ মানুষগুলো যেন হাতের ইশারায় ফিসফিসিয়ে ডেকে বলে ‘আয়, আয়, চলে আয়!’
আমার কেন এমন হয়,তা জানি না। তবে এ বিশ্বাস জাগে যে, প্রত্যেক জীবিত মানুষের শরীরের ওপরে তার কবরস্থানের মাটির একটা টান আছে। সমুদ্রের ভাটির টান যেমন প্রমোদসাঁতাররত মানুষকে চ্যাংদোলা করে ভাসিয়ে নিতে চায়, টেনে নিতে চায় তার গভীরতার দিকে ,কবরের মাটিরও ওরকম একটা টান আছে। ‘প্রত্যেক মানুষের শরীর তার কবরের মাটি দিয়ে তৈরি’ পীর হুজুর ওয়াজে একদিন বলেছিলেন কথাটা। কথাটি আমার খুব বিশ্বাস হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.