একটি মুরিদজীবন ও একটি গোরস্তান

 2,051 total views

 ধারাবাহিক উপন্যাস

 একটি মুরিদজীবন ও একটি গোরস্তান

 দ্বিতীয় অধ্যায়-  ’গোরস্তান’

 “মানুষকে তাহার জীবনব্যাপি মাপিয়া দেখিলাম                                            

 সে তাহার লাশের সমান বড়                                                 

 জীবনব্যাপি মানুষের অহংকারকে মাপিয়া দেখিলাম                                                

 অহংকার আর কিছুই নয়, মৃত্তিকাতে একটু লবণের আধিক্যমাত্র।”

–           আব্বাহুজুর পীরসাহেবের নোটখাতা, পেছনের মলাটে লিখিত                                                

 আগেই বলেছি আমার বয়স যখন মাত্র তিন দিন ছিল ,তখন একটি কুকুর আমাকে একটি ভাঙা কবরের মধ্যে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।  কবরটি ছিল আমার আঁতুর ঘর থেকে বিশ-বাইশ হাত দূরে। সেদিন  কুকরটির কামড়ে আমার মাথার বামপাশের কিছু অংশ মাংস-সমেত উঠে গিয়েছিল । কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আমার তেমন একটা চিকিৎসা করা হয়নি । দাদির কাছে শুনেছিলাম সে নাকি শুধুমাত্র কেরোসিনের সলতে পুড়িয়ে ক্ষত জায়গায় লাগিয়েছিল কয়েকদিন ধরে, আর এভাবেই ক্ষতটা আস্তে আস্তে সেরে উঠেছিল। তবে ক্ষতচিহ্নটা আমার শরীরের বৃদ্ধির সাথে আস্তে আস্তে বড় হয়ে গিয়েছিল এবং আমাকে রীতিমত কিম্ভুতকিমাকার লাগতো। ফলে মানুষের সাথে মিশতে আমার সংকোচ হতো এবং বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই কারও সাথে খুব একটা মিশতে পারতাম না আমি।

  প্রকৃতপক্ষে আমি নিজেকে মানসিকভাবে পরিপূর্ণ মনে করিনি কখনও।  অবশ্য আমার ধারণা এমন ছিল যে, কোনো মানুষই নিজেকে কখনও পরিপূর্ণ বলে ভাবতে পারে না, অর্থাৎ এমনটা ভাবার ক্ষমতা মানুষের  নেই। মানুষ নিজের মানসিক সামর্থ্য বিচার করে পারিপার্শ্বিক মানুষগুলোর মানসিক সামর্থ্যরে সাথে তুলনা করে। আমার তখন সমস্যা এটা ছিল যে, আমার কাছে আমার চারপাশের মানুষজনকে বেশি বুদ্ধিমান বলে মনে হতো। মনে হতো যে, তারা চতুর, ফাটকা, মানুষকে ঠকানোর ক্ষমতা রাখে, উপহাস করার ক্ষমতা রাখে, অপরের বোকামিতে হাসার ক্ষমতা রাখে, যেগুলো আমি পারি না। তবে  নিজেকে নিয়ে এমন ভাবলেও সবসময়ে আমার মনে হতো যে, একটা অদ্ভুত ক্ষমতা  আছে আমার । মনে হতো যে,আমি যে কোনো বিপদ বা সমস্যা কিভাবে যেন আগে থেকে আঁচ করতে পারি। এ অবস্থা ছিল আমার বয়োসন্ধিকালের আগ-পর্যন্ত এবং আমার এ ক্ষমতাটা বয়স বাড়ার সাথে সাথে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এরপরে আমার আচরণে মানসিক সমস্যার মতো অথবা আছরগ্রস্তের মতো কিছু উপসর্গ দেখা  গিয়েছিল । আমি একটা কালো কুকুরকে দেখতাম এবং এটা দেখতাম আশেপাশের কোনো মানুষের মৃত্যুর প্রাক্কালে এবং আমার স্বপ্নে।  এছাড়া রাতের বেলায় আমাকে বোবায় ধরত  এবং এইসব অস্বাভাবিক ঘটনাটাগুলির  উপর আমার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।  বোবায় ধরাটা এমন ছিল যে, আমার মনে হতো, একটি কুকুরজাতীয় প্রাণী এসে আমার গলা বা বুকের উপর চেপে বসে রয়েছে। এছাড়া আমি মাঝে মাঝে আমার কানের ভেতর এক ধরনের গায়েবী আওয়াজ শুনতে পেতাম। আওয়াজটি ছিল মহিলা কণ্ঠের এবং  কুটিল হাসির । আমি বুঝতে পারতাম না ঠিক কোন্ কারণে আমার এমন হতো, ছোটবেলায় কুকুরটির কামড়ানোর কারণে নাকি গোরস্তানের সন্নিকটে বাড়ি হওয়ার কারণে।

 আমার জীবনটা অন্যান্য সাধারণ মানুষের জীবনের মতো ছিল না। ভেতরে ভেতরে আমি রীতিমত অস্বাভাবিক ছিলাম, যেটা অবশ্য বাইরের লোকজন খুব একটা বুঝতে পারত না। তবে আমি পড়াশুনায় ভালো ছিলাম এবং ক্লাশে বরাবর ফার্স্ট হতাম। অবশ্য প্রতিবছর ফার্স্ট হওয়ার পরেও শিক্ষকগণ আমাকে খুব একটা প্রাধান্য দিতেন না,কারণ তাঁরা হয়তো , অন্যান্যদের মতো,আমার আচরণে অস্বাভাবিকত্ব  বুঝতে পারতেন।

  আমি বন্ধুদের সাথে মিশতে পারতাম না। সমবয়সী ক্লাশমেটদের সাথে মিশতে না পারার কারণে আমি আমার ক্লাশের অপেক্ষাকৃত একা একা থাকা হিন্দু সহপাঠিদের সাথে মিশতাম। ক্লাশে আমার কাছের বন্ধু ছিল ক্ষিতিশ আর লক্ষণ। ক্ষিতিশ ও লক্ষণ এদিকে আবার বর্ণগতভাবে আলাদা ছিল বলে তারা একে অপরের সাথে খুব একটা কথা বলতো না। ফলে দুইজনই একাকীত্বে ভুগতো । তাদের এই একাকীত্বের সুযোগে আমি আলাদাভাবে  তাদের দুজনের সাথে মিশতে পেরেছিলাম। তবে এই মেশাটা শুধু স্কুলেই ছিল। স্কুলের বাইরে ,আমার নিজস্ব মুসলিম পরিবেশে, আমি নিদারুণভাবে একা ছিলাম।  অগত্যা এই একাকীত্ব কাটানোর জন্য আমি প্রচুর পরিমাণে ওয়াজ মাহফিল শুনতাম এবং পরবর্তীতে গ্রামের পীরের দরবারে যোগদান করেছিলাম। এই পীরসাহেব আমার জীবনে বড় একটা প্রভাব রেখেছিল। তবে আমি যেমন পীরের দরবারে যেতাম, তেমনিভাবে আবার নাস্তিকপন্থী ডক্টরেট ডিগ্রিধারী ইমতিয়াজ সাহেবের বাউল গানের আসরেও যেতাম।  প্রকৃতপক্ষে , আমার নির্দিষ্ট কোনো ভাল লাগা ছিল  না, অর্থাৎ,আমি নির্দিষ্ট কোনোকিছুতে বুঁদ ছিলাম না মানসিকভাবে। আমার মন ছিল  পরিবর্তনশীল—এক্ষণে এটা ভালো লাগে তো ,পরক্ষণে ওটা । তবে  এই বাউল গানের আসর এবং পীরের দরবার—এই দুই বিপরীতধর্মী মজমায় গিয়ে আমি আমার বিশ্বাসকে পরখ করতে শিখে গিয়েছিলাম এবং ভালো মন্দের পার্থক্য আস্তে আস্তে শিখে গিয়েছিলাম।

 আমার  জন্ম  হয়েছিল এ বাড়িটির গোরস্তানসংলগ্ন ঘরটিতে এবং এ ঘরটির ভাঙা বেড়া দিয়ে একটি কুকুর আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল একটি ভাঙা কবরের মধ্যে।  কুকুরের এই টেনে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমি বার বার আপনাদের বলছি এবং এটা আসলে এতবার বলা আমি নিজেও  ঠিক মনে করছি  না । কিন্তু,আমার এই চল্লিশ বছরের জীবনে এটা নিয়ে আমি যতটা ভেবেছি, অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কখনও ভাবিনি। ঘটনাটি আমার মাথায় গেঁথে গেছে, এবং এ চিন্তা করাটা  আমার মুদ্রাদোষের মতো হয়ে গেছে।  যা হোক, যে ঘরটিতে বসে আমি এখন এই কাহিনী লিখছি,  স্কুলজীবনে এটিই ছিল আমার পড়ার ঘর। ঘরটি এমন ছিল যে, জানালা খুললেই একদম সামনে দেখা  যেত গোরস্তান, সারি সারি কবর।  আর, জোৎস্নারাতের গোরস্তান দেখার অনুভুতি ছিল  সবসময়েই শিহরণ জাগানিয়া। যদিও শীতকালটাতে গোরস্তানকে ভীতিকর লাগতো বেশি। কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারে শিয়ালের জ্বল জ্বল করা চোখ দেখতাম।  এছাড়া বর্ষাকালে তারা বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া নরম কবর খুঁড়তো থাবা দিয়ে। লাশের গন্ধে যেন নেশাগ্রস্থ হয়ে যেতো  শিয়ালগুলো। যা হোক, ওসব কথা থাক। বলতে চাচ্ছি যে,  এভাবে লাশ ও কবর দেখে দেখে আমি বেড়ে উঠেছিলাম আস্তে আস্তে। আমার শিশুকাল, কিশোরকাল ও যুবক বয়সের অর্ধেকটা সময় কেটেছিল এ গোরস্তানের সান্নিধ্যে।

   মূল লেখাটায় কিভাবে ঢুকব,তা নিয়ে দ্বিধায় আছি। পীরসাহেবের হাতে বাইয়্যেত হওয়ার সময় থেকে শুরু করব নাকি একদম শিশুকাল থেকে শুরু করব,  তা বুঝতে পারছি না। আমি অতটা ভালো বর্ণনাকারী নই, আমি কবিতা মোটামুটি লিখি, গদ্য আমার তেমন হয় না। গদ্যের ক্ষেত্রে লেখার ঝোঁক তখনই আসে যখন আবেগ আসে বাঁধভাঙা। এখন এ বাড়ি ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে, গোরস্তানের সন্নিকট ছেড়ে চলে  যেতে হবে বলে আবেগ আসছে, লেখা আসছে অবলীলায়, কিন্তু চার-পাঁচদিন পরে, যখন এখান থেকে চলে যাবো, তখন এই লেখার ঝোঁক যে থাকবে না–এটা আমি নিশ্চিত। হয়তো কোনো কিছুই আর লেখা হবে না তখন । তাই মনে করছি যে, আমার লেখাটা মোটামুটি প্রথম থেকেই শুরু করব।

 যতটা মনে পড়ে, আমি চারপাশ সম্পর্কে মোটামুটি বুঝতে শিখেছি তখন। আমার জানালার পাশ থেকে শুরু হওয়া গোরস্তানটি মটমটি লতা,ভাঁটি গাছ,পিতরাজ গাছ, নাম না জানা আরো অনেক গাছে পরিপূর্ণ  ছিল। বাউন্ডারি ওয়ালটি ছিল না তখন। প্রতিবছর, বসন্তের আগে আগে, মটমটি লতাগুলি ফুলে ফুলে ছেয়ে যেত। সাদা সাদা ফুল নিয়ে লতাগুলি উঠে  যেত বড় বড় পিতরাজ গাছগুলির মাথায়।  দুধসাদা ফুলগুলো ঢেকে ফেলত সব গাছের মাথা। ফুলের ঝালরে  তখন মনে হতো  যে,গাছগুলো বৃদ্ধ ন্যুব্জ দরবেশের মতো সাদা পাগড়ি পড়ে  দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের জানালা খুললে এ সব পরিষ্কার দেখা যেত।

 জানালার পাশেই ছিল একটা কবর। অনেক পুরনো। বাঁধানো কিন্তু শ্যাওলা পড়া।  কার কবর জানতাম না ।  কেউ জানত না। ছলিমের বয়োবৃদ্ধ দাদি বা  শতবর্ষী সফদার খাঁও বলতে পারত না।এখনও কবরটি ওরকমই আছে। এপিটাফ আছে কিন্তু  কোনো নাম লেখা নেই সেই ইপিটাফে। আরবিতে কয়েকটি লাইন লেখা আছে, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- হে পথচারী, একটু দাঁড়াও, শোন! আজ তোমরা যেভাবে হাঁটছো, আমিও একসময় ওভাবে হাঁটতাম, আজ তোমরা যেভাবে হো হো করে হেসে যাচ্ছ, আমিও ওভাবে হাসতাম। আজ আমাকে দেখো, আমি এখানে শুয়ে আছি।  তোমাদের কাছে এ পৃথিবীকে কি তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছে না? —–  এ লেখা পড়ে অনুমান করা যায় যে, আমাদের বাড়ির পাশের এ জায়গাটাতে কোনো এক সময়ে পায়ে হাঁটার রাস্তা ছিল। রাস্তা না থাকলে কখনও লেখা হতো না , হে পথচারী!

 যা হোক,এ কবরটি পেরোলেই ছিল ঘন জঙ্গল ( এখন জঙ্গল নেই)। নিবিড় , ছায়াময় ছিল সে জঙ্গল। আব্বা আমাকে পড়াতে গিয়ে পিটুনি শুরু করলে আমি  দৌড়ে গিয়ে ঐ জায়গাটাতে পালাতাম। অনেকবার পালিয়েছি, মনে পড়ে। তখন এসব ঘন গভীর জঙ্গলে থাকত শিয়াল, বাগডাশ, বেজি,গুইসাপ। কোনো কোনো দুপুরে বাগডাশের গুরুগম্ভীর ডাক শোনা যেত, আর সন্ধ্যায় শিয়ালের হুয়া হুয়া কানে বাজত। ভাঙা কবরের গর্তে শিয়ালগুলো বসবাস করত। গোরস্তানের ভেতরে কোনোদিন সাপ দেখিনি। অথচ সাপের ভয়টাই ছিল বেশি । মাঝে মাঝে দমকা বাতাস হলে সাপের খোলসের পাতলা অংশবিশেষ ঘন জঙ্গলের ভেতর থেকে উড়ে আসত। মোটা ব্যাসার্ধের, আইশযুক্ত, নীল নীল ছিল সব খোলস । গোরস্তানের একদম ভেতরে বসবাসরত সাপের খোলস ছিল ওগুলো। লোকে বলত, কবরের ভেতরে পাপিষ্ঠ লাশগুলোকে উপর্যুপরি কামড়ানোর সাপ ওগুলো। ফেরেস্তা সাপ । অবশ্য চিকন খোলসও দেখতাম। ওগুলো ছিল সুতানড়ি সাপের। সুতানড়ি সাপ গোরস্তানের ভেতরে থাকত না। আমাদের বাড়ির সীমানার একটুখানি বাইরে, জাম্বুরা গাছে অথবা দেবদারু গাছের ঘন পাতার মধ্যে থাকত ওরা । টুনটুনি পাখি ধরত। খুব চটপটে আর সুন্দর  ছিল ওরা। মাঝে মাঝে ব্যাঙ ধরত। ডাকের উৎস ধরে আমি খুঁজে বের করতাম ব্যাঙকে । সাপগুলো এত চিকন ছিল,তবুও মাঝে মাঝে বড় মাপের ব্যাঙ ধরে ফেলত। গেলার আপ্রাণ চেষ্টা করত। আমি দেখলেই বাঁশের কঞ্চি বা এটা ওটা দিয়ে খোঁচা বা বাড়ি মারতাম। ব্যাঙটি তখন লাফিয়ে বাঁচত অথবা দুই-একটা লাফ দিয়েই পানিতে চার পা এলিয়ে দিত। বুঝতাম,বাঁচবে না। মাকে যখন সাপে ব্যাঙ ধরার গল্প বলতাম, মা বলত, “কারো মুহির খাবার কাড়ে লিবের নেইরে ,বাপ।”

অনেক বেজি ছিল গোরস্তানে। দলে দলে ঘুরতো ওরা। শিকারের  খোঁজে তক্কে তক্কে থাকত। আমার দাদির ঘরে হরহামেশাই ঢুকে পড়ত। দাদির থালাবাসন, পানের বাটা চিৎকাৎ , তছনছ করত। ব্যাপারটা তখন এমন হতো, বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎই ঝন ঝন ঝন শব্দ। সবাই বুঝতো বেজি ঢুকেছে রান্নাঘরে। দাদি হাহাকার করে উঠত– হায় হায় হায় বাটির ঝোলটুকু ফেলে দিলোরে, মনে করেছিলেম আছেরের ওক্তে খাবো। দাদি সময়মত তাড়াতে পারত না বেজিগুলোকে। আমাকে বলতো,এ গেদা দেখতো, শিগগির যা, সব মনে হয় নিয়ে গেলরে। দাদির  মাজায় ব্যথা ছিল। বসা থেকে দাঁড়াতেই লাগত বেশ সময়। তারপর আবার  তার বুড়োর লাঠি খোঁজোরে, চশমা খোঁজোরে। ততক্ষণে বেজিদের যা করার তা করে ফেলত। দাদির মাজার ব্যথা ছিল মারত্মক। আমাকে পা দিয়ে পাড়িয়ে দিতে বলত। মাঝে মাঝেই বেদেনী এসে শিঙা লাগিয়ে মাজা থেকে বিষরক্ত  তুলতো মাজা থেকে। শিঙায় উঠে আসতো কালো কালো রক্ত। দাদি সেই রক্ত দেখে দাঁতবিহীন মুখে হাসতো। মনে করত, এই বুঝি তার মাজার ব্যথা চিরকালের মতো বিলীন হলো। দুই একদিন অবশ্য ভালো থাকতো। তখন বেজি ঢুকলেই দাদি একসাইডে বাঁকা হয়ে খেঁকিয়ে ঢুকে পড়ত ঘরে। হাতের লাঠি দিয়ে তাড়াত বেজিগুলোকে। ওগুলো তখন দৌড়ে ঢুকে পড়ত গোরস্তানে। চারদিকে প্রাচীরযুক্ত নাম-না-জানা পুরাতন ঐ কবরটির ভেতরে ছিল অনেক গর্ত। ঐ গর্তগুলোতেই ঢুকত বেশি।

মাঝে মাঝে  আবার বেজিগুলো আমাদের রান্নাঘরে  ঢুকে পড়ত। আমার ছোটবোনের দুধের বাটিতে মুখ দিত। বেড়া বেয়ে শিকায়ও উঠে পড়ত। কী  জ্বালা। মায়ের তখন দুঃখের শেষ ছিল না। সে বলত, এ বাড়িতে বিয়ে হওয়াতেই তার কপাল পুড়েছে। আসলেই মার কপাল পুড়েছিল। আমার জন্মের আগে আমার একটা বোন হয়েছিল। গোরস্তানের হাঁফ বা খারাপ বাতাস লেগে নাকি দুদিন বয়সেই মারা গিয়েছিল। দাদি এই হাঁফের কথাই বলত মাঝে মাঝে।বলতো যে, হাঁফ না লাগলি পরে কি সারা গাও ঐ রকম নীল হয়া যায়, আহারে কী পরীর মতন মুখখান ছিল আমার বুবুডার!

গোরস্তানের হাঁফ কী জিনিস তখনও জানতাম না।  তবে বুঝতাম, এই গোরস্তানকে নিয়ে মায়ের খুব ভয় আছে। তার এত ভয় ছিল যে, সে আমার মাথার ক্ষতচিহ্নের দিকেও সেভাবে তাকাত না।  আমি বুঝতাম কেন তাকাত না। তাকালেই হয়তো তার সেদিনের কথা মনে পড়ে  যেত।  প্রকৃতপক্ষে এই ক্ষতচিহ্ন ছিল সেই বিভিষিকাময় রাতের স্মারক চিহ্ন। সে গোরস্তানের দিকেও সেভাবে তাকাত না। কেন যে আমার নানা তাকে এ বাড়িতে বিয়ে দিয়েছিল, এই আক্ষেপ সে মাঝে মাঝেই করত । অবশ্য বাবাকে  অনেক বলে কয়ে সে একটা পাটখড়ির বেড়া বানিয়ে নিয়েছিল আড়াআড়ি। প্রতিবছর বর্ষার সময় এই বেড়া ভেঙে গেলে, বেড়াটি মেরামত না করা পর্যন্ত সে গোঁ ধরে থাকত। এ বেড়াটির মাধ্যমে গোরস্তানকে সে মোটামুটি তার দৃষ্টির বাইরে পাঠিয়ে দিতে পেরেছিল ।

বাড়ি জুড়ে অনেক মুরগি ছিল,মুরগির বাচ্চা ছিল। দাদি আমার মাকে  লক্ষ্মী বউ বলত শুধু তার এই মুরগি-ভাগ্য ভালো ছিল বলে। পাড়ার সব ডেগি মুরগি রাণীক্ষেত, বসন্ত , কলেরা ইত্যাদিতে মারা পড়ত, মরে সাফ হতো, অথচ আমার মায়ের মুরগির রোগ বালাই হতো না। শুধু মুরগি নয়, পাড়ার সবচেয়ে বড়, লাল টয়াবিশিষ্ট মোরগটি মায়েরই ছিল।তবে বেজিগুলো খুব ডিস্টার্বিং ছিল। সুযোগ পেলেই উঠান থেকে মুরগির বাচ্চা মুখে নিয়ে দিত ভোঁ-দৌড় । মুরগির কক্ কক্ চিৎকার শুনে বাড়ির সবার মুখে তখন সমস্বরে ধর ধর চিল্লানি উঠত। মা-মুরগি তখন বেজির পেছন পেছন উড়াল দিত আর সবার চিল্লানী শুনে ক্লান্ত দুপুরে ঝিমুতে থাকা কুকুরটি আড়মোড়া ভেঙে আমাদের আঙুল বরাবর দৌড় দিত। ঝোপ-ঝাড় ভেঙে চলত কুকুর। পেছনে চলতে থাকত দাদির বাঁজখাই গলার আওয়াজ। আমি দৌড়াই। মা দৌড়ায়। দাদি দৌড়াত পারত না, কিন্তু তার গলার স্বর চলে যেত গোরস্তানের জঙ্গল পেরিয়ে শ্মশান পর্যন্ত। বেজির তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কুকুরের টাইমিং ভালো হলে বেজি মুরগির বাচ্চা ফেলে রেখে প্রাণে বাঁচত। বাচ্চাগুলোও আত্মরক্ষার প্রক্রিয়া বেশ ভালো জানত। যেন গেরিলা ট্রেনিং পাওয়া থাকে তাদের। আত্মরক্ষার শিক্ষা যেন তারা ডিমের মধ্যে থেকেই  পেয়ে আসে। এরকম গজব পার হওয়ার পরপরই তারা আস্তে আস্তে এঝোড়-ওঝোড় একোনা-ওকোনা থেকে বেরিয়ে এসে মা-মুরগির পাখনার নিচে অথবা পেটের নিচে আশ্রয় নিত । মাত্র দুই দিন বয়সী মুরগির বাচ্চাকেও এমন করতে দেখতাম।  দেখতাম যে,আকাশে চিলের  ছায়া দেখামাত্র সব বাচ্চা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে।

সন্ধ্যা হলে কোনো কোনো দিন শিয়ালের ডাকে সারা পাড়া অস্থির হতো। শিয়ালের ডাক শুনে পাড়ার কুকুরগুলো তখন কীযে ডাকাডাকি শুরু করত।  চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে এলে মা হারিকেনের কাচ মুছতো হাত ঘুরিয়ে, তখন তার চুরির রিনিঝিনি শব্দ শোনা যেত। আমি বুঝতে পারতাম, এই তো এখনি আমাকে পড়ার টেবিলে বসতে হবে। পড়ার টেবিলে বসতে খুবই অনীহা ছিল আমার। তবুও বসতে হতো। গোরস্তানের পার্শ্বস্থ  জানালাটা আমি বন্ধ করে দিতাম। চারদিকে অসামান্য অন্ধকার। আমার টেবিলে হারিকেনের আলো টিপটিপ করে জ্বলতে থাকত। আমি বাধ্য ছেলের মতো পড়ার টেবিলে বই খুলে বসতাম। খুব একটা মনোযোগ থাকত না পড়ায় । মনোযোগ থাকত শুধু বাইরের কুকুরগুলোর দিকে।  আমার মনে খুব ভয়—সন্ধ্যার এই  ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর কুকুরগুলো  এত ছুটোছুটি, এত দাপাদাপি করছে কেন ? ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে কেন? ভয় পেয়েছে কি?  এভাবে কুকুরগুলোর দৌড়ের শব্দ, হাঁপানোর শব্দ পড়ার টেবিলে বসে আমি শুনতে থাকতাম। এগুলো এমনভাবে হাঁপাত যে, মনে হতো, গোরস্তান থেকে বিশাল কোনো জন্তু তাদের ধাওয়া করেছে আর ভয় পেয়ে তারা এমন করে হাঁপাচ্ছে। ভয়ে আমার বুকের মধ্যে ঢেঁকির পাড় পড়তে থাকত।

প্রায় সন্ধ্যায় শিয়াল ডাকত। তবে নতুন কবর উঠলে বেশি ডাকত । শিয়াল ডাকার পরপরই ডাকত কুকুর। কেউ বলত, কবরডাত মনে অয় আযাব হচ্ছেরে, ইস্, মনে অয় ফেরেস্তারা লাশের মাথার পর মুগুর মারতেছে। আমরা বিশ্বাস করতাম,কবরের আযাব পশুপাখি জন্তু-জানোয়াররা বুঝতে পারে,তাই, মৃত মানুষগুলোর চিৎকার শুনে শিয়ালগুলো এত ডাকাডাকি করছে। কেউ বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, পৃথিবীতে সমস্ত প্রাণীর মধ্যে শিয়ালের ডাক সবচেয়ে করুণ । নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী শিশুর কান্নার চেয়েও করুণ  এই ডাক। কুকুরের ডাকও অনেকটা এরকম। শিয়াল আর কুকুর যখন অমন ঘুটঘুটে সন্ধ্যায় একটানা করুণ স্বরে হাহাকার করে ডাকতে থাকত,তখন আমার ভেতরেও যেন অন্যরকমের এক আযাব শুরু হতো।

একটা ঘটনার কথা বলি। তখন ১৯৮৬ সালের দিকে হবে সম্ভবত। বর্ষার শেষের দিকে। আমাদের একটি গরু দড়ি ছিঁড়ে গোরস্তানের একদম ভেতরে জঙ্গলের মধ্যে চলে গেল। সেদিন গ্রামের বয়োবৃদ্ধ মাতবর রহমত শেখ মারা গিয়েছিল।  খুব ভোরে, সূর্য উদিত হওয়ার আগেই কবর দেওয়া হয়েছিল গোরস্তানে ।

সূর্যের আলো তখনও ফোটেনি । সকালে আমি আর ছলিম ( আমাদের রাখাল) যখন গরু খুঁজতে বের হলাম, তখন দেখি ,লতাপাতার জঙ্গল ভেঙে গরুটি বিকট হাম্বা রবে আমাদের দিকেই দৌড়ে আসছে। চরম আক্রমনাত্মক ভাব গরুটির। আমি ভাবছি, গরুটা তো এমন নয়, গোয়ালের সবচেয়ে ভদ্র ও নিরীহ গরু এটি। কাউকে কোনোদিন ফোঁস করেছে এমন দেখা যায়নি। তাহলে এমন করছে কেন!  দেখি,আশেপাশেও কেউ নেই। জানাজার লোকজন যারা ফজর নামাজের পরপরই গোরস্তানে ঢুকেছিল তারা  ততক্ষণে চলে  গেছে । শুধুমাত্র শমসের খাঁ ঈদগাহ মাঠের একপাশে যথারীতি জিকির করছে মাথা ঝাঁকিয়ে। শব্দ করে জিকির করছে সে। গরুটিকে আঘাত করার মত কেউ নেই। তাহলে এমন করছে কেন গরুটা? সাপ দেখেছে কি? নাকি অন্য কিছু? মনে প্রশ্ন জাগছে। এরপর অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, সদ্য কবর দেওয়া মৃত মানুষটিকে কবরের ভেতরে বোধ হয় ফেরেশতারা খুব মারপিট করছে আর তার চিৎকার শুনেই গরুটি দৌড় দিয়েছে।

 ফেরার পথে ছলিম বলল, “গরুডা ডরায়ছেরে। এখন যতই খাওয়াই আর মোটা হবি ননে।”

 আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এই লোকটার কবরে এত আজাব হচ্ছে ক্যা? ক’তো।”

 ছলিম বলল, “এই লোকটা গরীব মাইনষের জমি জোর করে লেহে নিতে। জমির দালালি করতে, জাল দলিল করতে। হিন্দুগরে মেলা জমি দখল করে লেছে।” সে আরও কিছু  দোষ-ত্রুটির কথা বলতে গেল, কিন্তু গরুটি আবার  ফোঁস করে উঠল বলে বলতে পারল না।

 যা হোক,  প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় শিয়াল ও কুকুরের অবিশ্রান্ত ডাক শুনতাম। কবরের আজাবের কথা মনে পড়ত তখন। ভাবতাম  কবরের আজাবের আলামত দেখেই ওরা ওমন করে ডাকছে। ভাবতে থাকতাম,কার কবরেই যে আজাব হচ্ছে! ঘুটঘুটে সন্ধ্যার মধ্যে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে থাকতো, আর বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে দৌড়াতে থাকতো।  ভয়ে আমারও  তখন নাভিশ্বাস উঠতো। বুকের ভেতর চলতে থাকতো, অবিরাম দড়াম, দড়াম। তবে বুকের ভেতর যতই দড়াম দড়াম করুক না কেন,পড়ার টেবিল থেকে ওঠা আমার জন্য একদম নিষিদ্ধ ছিল।  এ সময়টাতে তাই আমি অনেকটা দম বন্ধ করে বসে থাকতাম। তারপর যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে একদম অন্ধকার হয়ে  যেত,সব ঠাণ্ডা, শুনশান হয়ে যেত , তখন আমার বুকের ধড়ফড়ানি কমতে শুরু করতো। তখন শুধু রান্নাঘরে বাসন-কোসন,পাতিলের খটখট ঝনঝন শব্দ শোনা  যেত। চুলা আর কেরোসিন বাতির আধো আধো আলোয় আমি তখন ঘরের খোলা দরজা দিয়ে রান্নাঘরে মাকে দেখতে থাকতাম । দরবেশ কাকা তখন তার ঘরের বারান্দায় জায়নামাজে বসে মাগরিব-পরবর্তী জিকির শুরু করতো।  তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণে প্রথমবার বলা ‘আল্লাহু’ শব্দটি বুঝতে পারলেও  দ্বিতীয়বার ক্বলবের গহীন থেকে বলা শব্দটি বুঝতে পারতাম না। তাঁর জিকিরের মূর্ছনায় এমনিতেই সন্ধ্যার অন্ধকারে কেমন একটা রহস্যময় পরিবেশ তৈরি হতো ,অধিকন্তু ঐ অস্পষ্ট অজানা শব্দ আরো রহস্যময়তা তৈরি করতো। মনে হতো যে, গোরস্তানের সব আত্মা তাঁর চারপাশে বসে ঐ অস্পষ্ট আওয়াজটি করে দিচ্ছে।

গোরস্তানের মধ্যেই বেশ বড় একটা জায়গা নিয়ে  ছিল রহমতপুরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ। মাঠটির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অংশ ঢেকে ফেলেছিল  নদী-তীরের বটগাছটি । দুটি  লম্বা চিকন ডাল পানির উপর দিয়ে সমান্তরালভাবে চলে গিয়েছিল একদম মাঝনদীতে। আমরা  ছোট ছোট বালকেরা ডাল থেকে লাফ দিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তাম । গাছে উঠে গা ছোঁয়াছুয়ি খেলা বেশ মজার ছিল। আমি ছোটখাটো ও শুকনো  মতো ছিলাম বলে বানরের মতো একডাল থেকে অন্য ডালে লাফিয়ে যেতে পারতাম। একদম চিকন ডালে  ঝুলে পড়তেও ভয় পেতাম না আমি। তবে যখন হাতের নাগালে আর কোনো ডাল থাকত না, তখন থেমে  যেতে  যেতাম, আর তখন পেছনের জন গা ছুঁয়ে ফেলত। খেলাটা বেশ রিস্কি ছিল বলে শমসের খাঁ আমাদের এ খেলাকে পছন্দ করত না। খেলতে দেখলেই আমাদের পেছনে পেছনে দাবড়িয়ে তাড়াত। তার ধারণা ছিল,আমরা কেউ না কেউ একদিন এ গাছ থেকে পড়ে গিয়ে বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটাব।

বটগাছের ফল পাকলে গাছে ওঠা সবচেয়ে মুশকিলের কাজ হয়ে পড়ত। গাছে রাজ্যের পোকামাকড় থাকত এইসময়। বটের পাকা ফলের ভেতরে লুকিয়ে  থাকা পোকামাকড়গুলো পাখিরা  ঠুকে ঠুকে  খেত আর বটগাছের তলাটা বটের হলুদ ফল আর পাখির বিষ্ঠায় ভরে  যেত।  ছোট-বড় হাজার পোকা-মাকড়ের যন্ত্রণায় তখন গাছে ওঠা যেত না। বর্ষাকালে তো আরো যায়  যেত না। তবে আমি নিজে এসব অসুবিধা পরোয়া করতাম না,যদি দেখতে পেতাম যে,শমসের খাঁ আশেপাশে নেই, তাহলে দেরি না করে ঝটপট গাছে উঠে পড়তাম।

একদিন বিকালেতো ঝুম বৃষ্টির মধ্যেও গাছে উঠে পড়লাম। দরবেশ কাকার ছেলে রফিক সাথে ছিল এসময়।  গাছে ওঠার উদ্দেশ্য ছিল গতানুগতিক আগের মতোই। অর্থাৎ, যে ডালটি পানির উপর দিয়ে চলে গিয়েছে সে ডাল দিয়ে মাঝনদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া। তবে গাছের গুঁড়ি পিছল হওয়াতে বেশ কষ্ট করে গাছে উঠতে হলো । এরপর অবশ্য আর অধিকদূর এগোনোর সাহস পাচ্ছিলাম না। ডালে বসে জিরোচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম, আরও এগুবো কি? চরম দ্বিধা মনে। অতঃপর গুঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে চাইলাম, কিন্তু পিছলায় পা ধরল না । কী বিপদ! অবশেষে পশ্চিমপাশের ঝুলন্ত ডাল, যেটি অনেকগুলো পুরাতন কবরের উপর দিয়ে চলে গিয়েছিল, সেটি  ধরে নেমে যাওয়ার জন্য আগালাম । এভাবে কিছুদূর এগোনোর পর নিচের দিকে তাকাতেই দেখি, নতুন একটি কবর । কবরটি চার-পাঁচদিন আগেকার ছিল হয়তো । বৃষ্টির তোড়ে অর্ধেকটা দেবে যাওয়া । পুরো কবর পানিতে ভর্তি আর তার উপর ভেসে আছে হলুদ বর্ণের থোকা থোকা চর্বি । মৃত পচাগলা মানুষের শরীরের চর্বি। কাফনের কাপড়ের একটা অংশ দৃশ্যমান। “ওরে মারে!”- চিৎকার দিলাম। থরথরি কম্প বুকের ভেতরে। কবরটার দিকে দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহস পেলাম না। চোখ বন্ধ ততক্ষণে। গরু ছাগলের চর্বি দেখেছি, মানুষের চর্বি তো দেখিনি । ভয়ে হাত-পা অসার হয়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে কে যেন আমার পা ধরে নিচে নামাতে চাচ্ছে। কে টানছে? কবরের ভেতরের মানুষটি কি আমাকে টানছে?  নাকি কবরটি  নিজেই তার গহবরে আমাকে টেনে নামাতে চাচ্ছে ? থরথর করে কাঁপছি। আমার কাঁপুনি দেখে রফিক তখন আমাকে সাহস দিয়ে বলল “বুহির সাথে ডাল চাপে ধরে আগা,ভয় পাস্ নে।” রফিক  আমার চেয়ে বয়সে বছরখানেকের বড় ছিল আর ছিল সাহসীও।

Leave a Reply

Your email address will not be published.