একটি মুরিদজীবন ও একটি গোরস্তান

 2,234 total views

অধ্যায় ৪.

গোরস্তানের পাশে শ্মশান

শমসের খাঁর এই কাহিনী পড়ে আমার লেখার প্রতি সাদিয়ার আগ্রহ বেড়েছে। সে শমসের খাঁকে দেখতে চাইল। দেখতে চেয়েছে মানে দেখবেই সে।  সাদিয়াকে নিয়ে আমার এই একটা জ্বালা। একটা কিছু মনে জাগলেই বাচ্চাদের মতো জিদ ধরে বসে সে। কিন্তু শমসের খাঁকে কিভাবে দেখাব আমি?  সে তো মারা গেছে সেই কবে। সাদিয়াকে বললাম যে, সে মারা গিয়েছে এবং তার কবর  গোরস্তানের ঐ পাশে,যেখানে শ্মশান আছে। তবে শমসের খাঁ যে মারা গিয়েছে এ কথাটি বলতে আমার দ্বিধা লাগল, কারণ আমি জানি যে শমসের খাঁ আসলে মরে নাই;  সে জিন্দা আছে কবরে ।

সাদিয়া শমসের খাঁর মৃত্যুর কথা জানতে পেরে কষ্ট পেল। তবে সে বলল, সে দরবেশ কাকার কাছ থেকে শমসের খাঁ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে। ভাবলাম জিজ্ঞাসা করতে চায় করুক।  তবে কাকা তার  সাথে যে কথা বলবে না এটা আমি জানি।কারণ তিনি সাদিয়াকে মোটেও সহ্য করতে পারেন না। তিনি মনে করেন, এই সাদিয়ার কারণেই তিনি এই বাড়ি হারাতে বসেছেন। কিন্তু  সাদিয়া যে কাকার চোখের বিষ এটা বোঝার সাধ্য সাদিয়ার নেই।

শমসের খাঁ কবে বা কখন হুগলী দরবার শরীফ থেকে আগত পীর হুজুরের মুরিদ হয়েছিল তা আমরা ছোটরা জানতাম না। জানার কথাও  ছিল না,কারণ বড়রাই বিষয়টি সম্পর্কে অতটা জানত না। বড়রা আলোচনা না করলে আমরা ছোটরা আসলে কোনো কথাই জানতে পারতাম না। তবে একদিন দেখেছিলাম যে, আমার দরবেশ কাকা আর কাজেম উদ্দিন তাকে নিয়ে আলোচনা করছেন। কাজেম উদ্দীন বলছেন, “শমসের খাঁর মতোন বে-নামাজি বেদ্বীন লোকেক হুজুর মুরিদ করে ফেলালে!ইডা কি ঠিক হোলে, কওতো দরবেশ ?”

“হ, হুজুর ইডা মনে অয় ঠিক কাম করলে না, ও যদি হুজুরের কোনো ক্ষতি করে ফেলায়?”

“ক্ষতি করবের পারবি ননে মনে অয় । হুজুরের সে ক্ষেম্তা আছে, হুজুরিক বান মারলি পরে সে বান কাটার ক্ষেমতাও হুজুরের আছে। ওসব কুফরিকালাম-টালাম হুজুরের কাছে কিছুই লয়, বুচ্ছেও?”

“তুমি কি জানো না নবীজিকও শত্রুরা কুফরীকালামের বান মারিছিলে। পীর হুজুর কী নবীজির চায়াও বড়? ”

“তালি তো চিন্তের বিষয় হয়া গেল দরবেশ। শমসের যদি উয়ের বাপের কাছতিন বদকালাম শিখে লিয়ে হুজুরেক মারে, তালি তো র্সবনাশ। এই জন্যিই তো কচ্ছিলেম হুজুর উয়েক মুরিদ বানায়া কামডা ঠিক করে নাই। হুজুর আমাদের কাছতিন একবার জিজ্ঞাসও করলে না।”

 এইটুকুই শুনেছিলাম সেদিন। তবে আমার মনে হয়,তাদের  এই অস্বস্তির কারণ পীরহুজুরের নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত ছিল না । কারণটা ছিল মূলত শমসের খাঁর মতো একজন ব্যক্তির মুরিদ হয়ে যাওয়া। সামাজিকভাবে যার বাপকে তখন একঘরে করে রাখা হয়েছে , এবং যার সাথে ছোটবেলা থেকে কোনো মুসলমান ছেলেকে মিশতে দেয়া হয় না,  সে বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে পীর হুজুরের মুরিদ হয়ে যাবে- এটা তাঁরা ঠিক মানতে পারছিল না।

দরবেশ কাকা আর কাজেম উদ্দীন এ তল্লাটের মধ্যে সর্বপ্রথম হুজুরের মুরিদ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এটা নিয়ে তাঁদের মনে খুব গর্ব ছিল । তাঁদের ধারণা ছিল যে, তারা আগে থেকেই পাঞ্জেগানা নামাজ পড়ে বলে এবং তাদের ঈমান শক্ত বলেই হুজুর তাদেরকে মুরিদ করেছেন। কিন্তু যখন তারা দেখলেন যে,শমসের খাঁয়ের মতো হিন্দু-মোশরেক সহবতে থাকা বে-দ্বীন লোককেও হুজুর মুরিদ বানিয়েছেন,তখন তারা মনে মনে বেশ বেজাড় হলো। হুজুরের দরবারে শমসের খাঁর সাথে তাদেরকে এক কাতারে বসতে হবে-এটা  তো মেনে নেয়া যায় না। তাই শমসের খাঁ যে হুজুরের মুরিদ হয়েছে, একথা তারা মুখ ফুটে কখনো বলতেন না। লোকজন শমসের খাঁকে হুজুরের খানকায় ঘন ঘন যাতায়াত করতে দেখে প্রশ্ন করলে বলতেন, “মুসলমানের ছাওয়াল বেদ্বীন হয়া গেছে,তাই দ্বীনের পথে আনার জন্যি হুজুর তাক্ ডাকে।” প্রকৃতপক্ষে শমসের খাঁর মুরিদ হওয়ার বিষয়টি তারা কৌশলে চেপে যেতে চাইত ।

অথচ, মুরিদ হওয়ার পরপরই শমসের খাঁর মধ্যে আমূল পরিবর্তন  এসেছিল। তার মতো ইবাদত বন্দেগী কেউ  আর তখন করত না। সে  তখন আর হিন্দুপাড়ার পাটনিবাড়ির আড্ডায় যেত না। আফিম-গাঁজা খেত না। গানের দলের সাথে কীর্তনও গাইত না। কিন্তু পুরোহিত নিমাই ভট্টাচার্যের দোকানটা সে ছাড়তে পারেনি। কারণ এ দোকানটাই ছিল তার জীবিকার একমাত্র উৎস। মুসলমানরা  অবশ্য এতে খোটা দিতে ছাড়ত না। বলত, ও মুরিদ হলি কী হবি ,ওর রিজিক তো  হালাল লয়, ওখানতেন  সদায় খেলে নামাজ কবুল হবি লয়, বউও তালাক হয়া যাবের পারে, ইত্যাদি। তবে মুসলমানদের কেউ কেউ আবার তার দোকান থেকেই পণ্যসামগ্রী  কিনত।  তাদের কথা ছিল, হিন্দুর দোহানেত্তেন তো ঠিকই গোল্লা খাও, চমচম খাও, রসমালাই খাও, তখন তো নামাজ ঠিকই কবুল হয়, খালি চাল-ডাল কিনলি পরেই সমস্যা , তাইনে?

এদিকে হিন্দুরা, তারা কুলীন হোক আর নিম্নজাত হোক,আগের মতই শমসের খাঁর সাথে কথা বলত, সদায় কিনত। সদায় কেনার সময় তারা ভাব বিনিময়ও করত। কোনো কোনো বাড়ির বৌদি,জ্যাঠিমা পূজার পরে তার জন্য নারিকেলের নাড়–ও পাঠাত। অবশ্য নিম্নশ্রেণির হিন্দুরা, বিশেষ করে পাটনি ও জেলেবাড়ির মহিলারা যারা শমসের খাঁর পিতা, সফদার খাঁর কাছ থেকে কবিরাজি ওষুধ খেয়ে সন্তান লাভ করেছিল  অথবা জটিল মেয়েলি অসুখ  থেকে মুক্তি পেয়েছিল, তারাই এটা করত। হিন্দু মালিকের দোকানে বসে শমসের খাঁ যখন টুপি-পাগড়ি পরে দোকানদারী করত, তখন এটা দেখে মুসলমানদের মনে ঘৃণার উদ্ভব হলেও  এইসব হিন্দুদের মনে হয়ত হতো না । তাদের আচরণ দেখে অন্ততপক্ষে এটাই মনে হতো।

শমসের খাঁ যে মাগরিবের নামাজ আর ফজরের নামাজ মসজিদের জামাতে আদায় করত না, এটা নিয়েও লোকজন কথা বলত। নেতিবাচক সব কথা। তবে এসব ব্যাপারে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না । সে  প্রতিদিন মাগরিবের পরপর গোরস্তানের ভেতরে ইদগাহ মাঠের এক কোণায় বসে জিকির করতে শুরু করত, আর থামতো এশার আযানের ঠিক আগে আগে। পৃথিবীর অগণিত নগন্য মানুষজন, যাদের বেশিরভাগই বেশিরভাগ সময় অগণিত অনর্থক বিংবা নগন্য কথা বলে, তাদেরকে যেন সে পাশ-কাটিয়ে চলতে চাইত।  তবে তার এসময়ের জিকির আমাদের বাড়ির পাশের বাঁশবাগান থেকে শোনা যেত না।  শুধুমাত্র ফজরের পরের যেটা, সেটা শোনা যেত কিছুটা। তার জিকিরের শব্দ ছিল অদ্ভুত ধরনের । দম দম করে শব্দ। একটানা। মনে হতো যে গোরস্তানের মধ্যে বর্ষাকালের ক্ষুধার্ত বাগডাশ ডেকে চলছে , গৃহস্থের কচি একটা মোরগ পেলে তবেই থামবে এই ডাক। শুনেছিলাম, আগে সে হিন্দুদের শ্যামাগান খুব ভাল গাইতে পারত, কিন্তু তার জিকিরের শব্দ এমন খাটাসের মত ক্যান ছিল , এই প্রশ্নটা তখন আমার মনে থেকে থেকে জাগত।

তার জিকির শোনার আমার প্রথম অভিজ্ঞতাটা ছিল বেশ মজার। তখন ১৯৮৯ সালের শরৎকাল। একদিন সুবেহ্ সাদেকের সময় বাঁশবাগানে হাঁটছি। ঝরা বাঁশপাতার নরম গদির ওপর দিয়ে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছে, হঠাৎ কোথা থেকে যেন অদ্ভুত একটা আওয়াজ আসলো। প্রথমে মনে করলাম,দমকা বাতাসে বাঁশের ঘর্ষণে বুঝি এরকম শব্দ হচ্ছে। কিন্তু বাতাস থেমে যাওয়ার পরও যখন শুনি আওয়াজ আসছেই,  থামছে না, তখন ভুতের শব্দ মনে করে ভয়ে এক দৌড়ে চলে  গেলাম বাড়ির মধ্যে।  তারপর সকালবেলা দরবেশ কাকাকে এমন অদ্ভুত শব্দের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তখন জানতে পারলাম যে,ওটা শমসের খাঁর জিকিরের আওয়াজ। বিশ্বাস হলো না কাকার কথা। ভাবলাম, জিকিরের আওয়াজ  এত অদ্ভুত হয় কী করে! জিকির তো নতুন শুনছি না। কাকার জিকির তো শুনছি সেই কবে থেকে— তাঁরটা তো এমন নয়— কী সুন্দর একটা তাল আছে তাঁর জিকিরের, লয়ও আছে । ফলে আমি তখন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে নিলাম যে, ওটা নিশ্চিতভাবেই ভুতের আওয়াজ।  ভুতের আওয়াজ মনে করার যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল।  গোরস্তানের পাশেই ছিল শ্মশান।  শ্মশানে ন্যাড়ামতো একটা ঝাউগাছ  ছিল।  ভেবেছিলাম, ঐ গাছ থেকেই বুঝি শব্দগুলো এসেছে।

 একদম গোরস্তানের সাথে লাগোয়া ছিল এ শ্মশানটি। গোরস্তানের সীমানা আর শ্মশানের সীমানার মাঝে মাত্র  সাত-আট হাত প্রশস্থ একফালি ফসলী জমির ব্যবধান ছিল। ঐ সময়ে থেকে তিন চার বছর আগে(১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে), যখন শমসের খাঁ পীর সাহেবের মুরিদ হয়নি,  তখনও বেশ ঘন ঘন চিতা জ্বলত এ শ্মশানে । ততদিনে  কুলিন হিন্দু চাটুজ্যেরা এবং স্বররা গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেও রহমতপুরে হিন্দুর সংখ্যা কম ছিল না। পাঁচশয়ের অধিক ছিল তারা। তাই শ্মশানে মৃতদেহ আসতো ভালোই। চিতা জ¦লতো ঘন ঘন। মৃতদেহগুলি আসতো বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে। হরি নামের সাথে সাথে। শব্দ শুনলেই আমরা ছোটরা দৌড়ে চলে  যেতাম  শ্মশানে। জেলে বা পাটনি সম্প্রদায়ের কেউ মারা গেলে শমসের খাঁকেও শ্মশানে দেখা যেত । দেখা  যেত যে, সে খুব ব্যস্ত ,একবার কেরোসিন খুঁজছে, একবার ধুপ। আবার গলা উঁচিয়ে ডাকছে ‘এ নরেন, এ গোসাই…’। দেখা যেত, হিন্দুরাও তার সাথে অবলীলায় মিশছে, হাসছে, কথা বলছে। আমরা  মুসলমানরা, যারা  তখন লাশ পোড়ানো দেখতে যেতাম ,তারা শমসের খাঁকে আমাদের সমাজে দেখে অতীব ঘৃণা করলেও, শ্মশানে তার উপস্থিতি দেখে ভালো লাগতো। কারণ, তাকে তখন লাশ পোড়ানো উৎসব উপভোগের জন্য দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগসূত্র বলে মনে হতো। মনে হতো যে, শমসের খাঁ ওদের সাথে আছে বলেই অতটা কাছে গিয়ে আমরা লাশ পোড়ানো উপভোগ করতে পারছি।

 শ্মশানে যাওয়ার জন্য গোরস্তানের মাঝখান দিয়ে একপেয়ে একটি সরু রাস্তা ছিল। শ্মশানে চিতা সাজানো হলে কে কার আগে যাবে, তখন এ নিয়ে আমাদের ছোটদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো । আমরা দূর থেকে আগুনের শিখা দেখতে পেতাম, আর প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকতো।  মনে হতো,আহা, এই বুঝি পোড়ানো শেষ হয়ে গেল! সন্ধ্যার সময় চিতা জ্বললে আগুনের শিখা আকাশ ছুঁই ছুঁই হতো। বড়রা নাক ধরে দূরে দাঁড়িয়ে দেখতো। লাশ পোড়ার গন্ধ নাকি অসহ্য লাগে।  তবে এ গন্ধ আমাদের বিচলিত করতো না।  হয়তো উৎসবের আমেজে আমাদের নাকে কোনো গন্ধ আসতো না।  একটা মানুষের দেহ ভস্মীভূত হয়ে চিরকালের মত এমন করে অদৃশ্য হয়ে যাওয়াকে উৎসব ভাবতাম আমরা । কোনো কষ্ট হতো না আমাদের। আগুনের শিখা যত উপরে উঠতো, আমরা তত হুল্লোড় দিতাম। লাশের মানুষটিকে নিয়ে বড়দেরকে কথা বলতে দেখতাম। পেশাগত কারণে মুসলমানদের সাথে একসময় এ মৃত মানুষদের পরিচয় ছিল, উঠাবসা ছিল।  কেউ ছিল নাপিত, কেউ জেলে, কেউ মুদি দোকানদার। কেউ  আবার ছিল প্রাইমারি বা হাইস্কুলের শিক্ষক। আমি নিজেও অনেককে চিনতাম। তবে  সবার নাম জানতাম না।

তবে অনেকের সাথে চেনাজানা, বোঝাপড়ার সম্পর্ক ছিল আমার। বাবা যে দোকান থেকে আমাকে বাতাসা কিনে দিতেন, সে দোকানদার লোকটার সাথে আমার কেমন করে যেন একটা বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছিল। অনেক বৃদ্ধ ছিল সে। অস্থিচর্মসার দেহ। বাজারের এক কোণায় ধুতি পরে বাবা লোকনাথের মত  স্টাইল করে বসে থাকত সে।  আমার বাবার সাথে কথা বলত হেসে হেসে । আমি  মনোযোগ দিয়ে তাদের কথোপকথন শুনতাম।  দেখতাম,লোকটি হাসে বেশি, হাসতে গিয়ে মাঝে মাঝে  আবার কেশে ফেলে। হাঁপানি রোগ ছিল হয়তো। সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে নিদারুণভাবে হাঁপাতে দেখতাম কাশি থামার পরেও। বুকের ছাতি তার হাঁপানির দাপটে ফুলে ফুলে উঠতো।

তারপর একদিন মারা  গেল লোকটি ।

তখন ১৯৮৬ সাল। মনে আছে সেদিন এপ্রিল মাসের প্রথম দিকের যে কোনো একটা দিন হবে । কিছুদিন পরেই আমার তৃতীয় শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল । স্কুল থেকে যখন মৃত্যুর খবর শুনলাম, তখনও জানি না যে ঐ দোকানদার লোকটিই মারা গিয়েছে। শুধু শুনেছি, একজন হিন্দুলোক মারা গিয়েছে। হিন্দুপাড়া থেকে তখন ঢোলের শব্দ শোনা যাচ্ছিল আর আমার মনের মধ্যে লাশ পোড়ানো দেখার নেশা জেগে উঠছিল। তারপর লাশটি পোড়ানো দেখবো বলে স্কুল থেকে আমরা কয়েকজন শ্মশানঘাটে  ছুটে গেলাম  হই হই করে।  শ্মশানে গিয়ে দেখি, চিতা সাজানো হয়ে গিয়েছে আর মৃত লোকটিকে চিতায় শোয়ানো হচ্ছে । লোকটাকে দেখামাত্র আমি চিনতে পারলাম। “আহা এই লোকটি মারা গিয়েছে!” আমার মন যেন বলে উঠল ভেতর থেকে। লোকটির মুখ দেখে খুব খারাপ লাগল । চোখ দুটো তার একদম কোটরাগত নির্মীলিত, কিন্তু কী অসম্ভব সৌম্য আর কান্তি তার চোখে-মুখে ছড়ানো । মনে হচ্ছিলো,কেউ একটু শব্দ করলেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে এখনই ঘুম থেকে জেগে উঠে বলবে, “ এই থাম তোরা, এত হট্টগোল করছিস ক্যানরে!”

 লোকটা সবসময় হাসি মুখে কথা বলতো। তার পোষা কালো কুকুরটি সবসময় তার পাশে থাকতো। মাঝে মাঝে কুকুরটির সাথে কথা বলতো সে। বলতো, “কিরে পল্টু তাকায়া আছস ক্যান? কিছু খাবি?”  কুকুরটিও কুই কুই করে লেজ নাড়িয়ে কী যেন বলতে চাইতো।  তবে আমি দোকানে গেলেই আমার চারপাশে ঘুরতে থাকতো কুকুরটি । তখন আমি ভয় পেতাম। লোকটির হাত থেকে আমি কতবার  যে বাতাসার ঠোঙা নিয়েছি তার ঠিক নেই। ঠোঙাটা এগিয়ে দেবার সময় তার হাতটা তির তির করে কাঁপত। ছোট একটা দাঁড়িপাল্লা বামহাতে নিপুনভাবে ধরে সে বাতাসা মাপত। মাপা শেষ হলে ঠোঙার মধ্যে অতিরিক্ত একটা বাতাসা দিয়ে দিত (অবশ্য তার পরপরই কুকুরটিকেও আরেকটি বাতাসা ছুঁড়ে দিত সে)। অতিরিক্ত ঐ একটি বাতাসা তার আর আমার মাঝে মুহূর্তের মধ্যে একটা বন্ধন  তৈরি করে দিত। মনে হতো যে, লোকটি আমার অনেক ভালবাসার একজন। আমার শিশুমন তখন কে হিন্দু, কে মুসলমান তা বুঝতো না। আমার মনে হতো যে, সে আমার দাদুর মতো একজন। অবশ্য আমি আমার দাদাকে কখনও দেখিনি। আমার জন্মের পূর্বেই তিনি মারা গিয়েছিলেন।

 যা হোক, লোকটিকে আমার সামনেই মেহগনি আর আমের  চেরা ডালের উপর শুইয়ে  দেয়া হলো। তার শরীরের উপরেও একে একে  চাপানো হলো অনেকগুলো  কেরোসিন মাখানো কাঁচা ডাল । কিন্তু আশ্চর্য়ের বিষয় ছিল, আমি অনুভব করছিলাম,  যতবার ডাল চাপানো  হয়, ততবার আমার বুক-পেট যেন চেপে চেপে যায়। ভাবতেছিলাম,আগে তো অনেকবার লাশ দাহ করা দেখেছি, কখনও তো আমার এমন বোধ হয়নি, এখন কেন হচ্ছে?  প্রকৃতপক্ষে খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার। যেখানে সব সময় লাশ পোড়ানো দেখে মজা পেতাম, ফূর্তি করতাম, কিন্তু আমার  কষ্ট হচ্ছিল। প্রশ্ন জাগছিল মনে,কেন হচ্ছে গো এমন। রফিককে বলেছিলাম, চল্ চলে যাই। কিন্তু রফিক তো নড়ে-চড়ে  না। সে পোড়ানো দেখবে। অগত্যা আমি চিতা থেকে অদূরে ফসলী জমিতে বসে চিতায় সাজানো সব ডালের ভার যেন একা একা বুকের ‘পরে বহন করতে থাকলাম।

 এরপর নদী থেকে এক কলস পানি নিয়ে  লোকটার ছেলে চিতা প্রদক্ষিণ করল,তারপর আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে একটু দূরে গিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠল। আগুন জ্বলতে থাকল। আমরা সবাই বাতাসের উল্টোদিকে বসে আকাশের দিকে আগুনের ফেঁদে ওঠা দেখতে থাকলাম । ফ্যাঁত ফ্যাঁত শব্দ করে আগুনের জিহবাগুলো উপরের দিকে উঠে যাচ্ছিল, সকলে বড় বড় চোখ করে দেখছিল আর মুখে বিষ্ময়বোধক শব্দ করছিল। এদিকে দুই জন লোক চিতার সার্বক্ষনিক পরিচর্যায় নিয়োজিত ছিল। একজনের হাতে ছিল একটা কাঁচা বাঁশের লাঠি। লাঠির মাথা বল্লমের মতো চোখা করা। লাঠি দিয়ে  সে মাঝে মাঝে চিতার অভ্যন্তরে খোঁচাচ্ছিল। কোথায় যে খোঁচাচ্ছিল তা  বোঝা যাচ্ছিল না।  তবে প্রতিটা খোঁচাতে আমি  শিউরে শিউরে উঠছিলাম। ভয় হচ্ছিল,লাশের গায়ে খোঁচা দিচ্ছে কি খবিশ লোকটা? অন্যজনকে মাঝে মাঝে কেরোসিন ঢালছিল। এ দুজনকে দেখে মনে হচ্ছিল যে, এরা পৃথিবীর সবচেয়ে নির্দয় ব্যক্তি। চোখেমুখে শোকের চিহ্নমাত্র নেই ওদের । উৎসববাড়ির বাবুর্চিরা যেমন নিরেট মনোযোগের সাথে মাংসের ডেকচিতে লাঠি দিয়ে ঘুঁটে দেয়, লাঠি ধরে থাকা ঐ ব্যক্তি এমনটাই করছিল। দুজন মাঝে মাঝে হেসে হেসে কী যেন আলাপও সারছিল। 

 লোকটি আস্তে আস্তে পুড়ে যাচ্ছিল  আর তৎসঙ্গে চিতাটি  ক্রমান্বয়ে দেবে যাচ্ছিল। এদিকে আমার মনের পর্দায় যেন এ লোকটির ধবধবে ফর্সা আর কোঁচকানো মুখ ক্রমাগত স্পষ্ট হচ্ছিল। আমি দেখছিলাম যে, আমার দিকে সে বাতাসার ঠোঙা ধরে রেখেছে স্নেহের ভঙ্গিতে আর আমি আমার মনের ভেতরের কোনো এক নিভৃত কোণে তার মুখ-চোখ-হাতকে আগুনের শিখা থেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। পৃথিবীর কোনো আগুন যেন সেই স্নেহময় চোখকে পোড়ানোর ক্ষমতা রাখে না।

লাশটি পুড়ছিল। বাঁশের গিরা পুড়ে যাওয়ার সময় যেমন শব্দ হয়, মোটা মোটা হাড়গুলো পুড়ে যাওয়ার সময় তেমনই শব্দ হচ্ছিল।  একটা শব্দ হয় আর আমরা দেখি মাথা উঁচিয়ে। সন্ধ্যার অন্ধকার বেয়ে বেয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছিল আগুনের লকলকে শিখাগুলি । লোকজনও মাথা উঁচিয়ে সেটা দেখছিল আর উচ্ছাস করছিল। হুল্লোড়  দিচ্ছিল।  কিন্তু আমার  কোনো উচ্ছাস ছিল না। আমি বেদনায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। তারপর হঠাৎ একসময় দেখি, লাশটি চিতার উপরে বসে পড়েছে। জ্বলন্ত হাত দিয়ে ইশারা করে কী যেন দেখাচ্ছে লাশটি। যেন আমাকেই কিছু একটা বলছে। আমি চরম ভয় পেয়ে  গেলাম। উপস্থিত অনেকেই ভয়ে চিৎকার করে উঠল। লাশ পোড়ানোর কাজে নিয়োজিত লোকসকলও কলরব করে উঠল একইসাথে।  তবে তারা কলরব করছিল আমাদের মতো ভয়ে নয়। তারা আসলে চাচ্ছিলো কেউ একজন লাশটিকে পিটিয়ে চিতায় মিশিয়ে দিক।  অতঃপর বাঁশ দিয়ে জ্বলন্ত হাত দুটিকে প্রথমে পিটিয়ে ভেঙে দিল তারা। তারপর লাশটির বুকে বাঁশ ঠেসে ধরে চিতার আগুনের সাথে মিশিয়ে দিল । এটা করার সময় তারা লাশটিকে অকথ্য ভাষায় গালিও দিল।

লোকের কোলাহল তবুও থামছিল না।চিতায় এরকম হয়, এর আগেও অনেক লাশের এমন হইচে–পুরোহিত নিমাই ভট্টাচার্য বিজ্ঞের মত বলে চলল—-যে লাশগুলো চিকন হয়,শীর্ণকায় হয় তাদের এমন হয়,আগুনে রগগুলো একসাথে সংকুচিত হলে এমন হয়,বিশেষ করে পায়ের ও ঘাড়ের রগ। শমসের খাঁ তখন হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে । তাকে উদ্দেশ্য করে পুরোহিত বলল, “তুই একটু বোঝা নারে মনি!” শমসের খাঁ এটা-ওটা বলে বোঝানো শুরু করল। কিন্তু ভালোমতো পারল না। কেমন যেন তোতলাতে থাকল  সে।  এদিকে দর্শকদের ঘোর কাটে না। বিশেষ করে মুসলমান দর্শকদের। তাদের কেউ কেউ তৎক্ষণাৎ বাড়ি ফিরে  গেল। দূরে দাঁড়িয়ে লাশ পোড়ানো  দেখতে থাকা মহিলাদের কেউ কেউ চিৎকার করে কান্না করতে করতে চলে  গেল বাড়ির দিকে।  পাশের গোরস্তানের  জঙ্গলে সেই চিৎকারের শব্দগুলি মৃদু প্রতিধ্বনি তুলল। সালেকার কণ্ঠ সব কণ্ঠকে ছাড়িয়ে শোনা  গেল। সে সবসময় এসব ব্যাপারে এক কাঠি সরেস ছিল। কান্না, হাসি,ঝগড়া- সবকিছুতেই। যা হোক, কিছু পুরুষ এবং কিছু মহিলা ধরে নিল যে, এই লোকটি নিশ্চিত ভুত হয়ে গেছে।

 তারপর একসময় আগুন পুরোটা নিভে  গেল। ছাই হয়ে গেল সব । একটা আস্ত দেহ কিভাবে যে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে  গেল , তা বুঝতে পারলাম না আমরা । তারপর, কিছুক্ষণ পরে, প্রায় সবাই যখন চলে গিয়েছে, তখন শমসের খাঁকে আর পুরোহিত নিমাই ভট্টাচার্যকে একটি মাটির পাতিলে করে লাশের অর্ধপোড়া কিছু অংশ মাটিতে পুঁতে দিতে দেখলাম । কেউ একজন তখন বলল, “দেখছিস, উডা লাশের লাই (নাভি)। মানষের লাই কিন্তুক আগুনে পোড়ে না।” আমরা ছোটরা  তারপর শ্মশানে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত তেলচিটকে বালিশ, ছেঁড়া কাঁথা আর খেজুরের পুরাতন মাদুর উল্টেপাল্টে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম।  আমাদের ধারণা ছিল,মৃত হিন্দুব্যক্তির ব্যবহৃত বালিশ-তোষকের ভেতরে টাকা-পয়সা পাওয়া যায়। এই ধারণা আমাদের মধ্যে কিভাবে গ্রোথিত হয়েছিল, তা আমি ঠিক জানি না।

  গ্রামে তখন মাত্র আড়াইশর মতো হিন্দু পরিবার অবশিষ্ট ছিল। জীবন-জীবিকার পথ তেমন একটা ছিল না তাদের। জীবিকার তাগিদে হিন্দু দোকানদাররা মুসলিমদের জালছা অনুষ্ঠানের দিনে জালছা প্যান্ডেলের আশেপাশে দোকানপাট বসাত।  অবশ্য  তাদের সাথে কিছু মুসলমান লোকও বসাত। তবে তারা সংখ্যায় কম ছিল । আমরা ছোটরা দোকান থেকে চিনির তৈরি হাতি, ঘোড়া, জেব্রা ইত্যাদি কিনে  খেতাম। নিজের নাম পেঁচিয়ে লেখা জিলাপি খাওয়াটা ছিল। বেশ মজার । নারিকেলের চাকতি ছিদ্র করে দোকানদার যখন হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নামের অক্ষরগুলো লিখতে থাকত, তখন বেশ আনন্দ হতো। তবে এসময় সংগোপনে আমার ইচ্ছা হতো শাহনাজের নাম লিখে নিয়ে সেই জিলাপিটাকে ভেঙেচুড়ে খাই। এখানে বলে রাখি যে, শাহনাজ আমার ক্লাশমেট ছিল এবং সে ছিল অসম্ভব সুন্দরী। কিন্তু আমি দোকানদারকে শাহনাজের নাম লিখতে বলতে পারতাম না। সাহসে কুলাতো না। কারণ আমার মনে হতো, কেউ না কেউ এটা দেখে ফেলে শাহানাজের চাচাকে বলে দিবে। তার চাচা ছিল চরমপন্থী দলের নামকরা সদস্য। তবে আমি তার চাচাকে ভয় পেলেও  শাহনাজকে অতটা ভয়  পেতাম না। কারণ আমার দিকে সে ঝুঁকে পড়া ছিল কিনা তা আমি আগেই পরীক্ষা করেছিলাম। একদিন আমি ক্লাশরুমের বেঞ্চে লাল কালি দিয়ে (ঝ+ঝ) লিখে রেখেছিলাম।  এই দুটি অক্ষরের মানে ছিল, শিশির + শাহনাজ। যার অর্থ ছিল ব্যাপক, নিছক ভালবাসার চেয়ে বেশি, অনেকটা অসভ্য এবং বাজে টাইপের, দুটি দেহ একত্র হওয়া বা সঙ্গমের সমার্থক। শাহনাজ সেটা দেখেছিল কিন্তু সে তখন কোনো  বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।

আমার নামে অক্ষর বেশি বলে জিলাপি বানাতে বেশি খরচ পড়ত আমার। রফিকের কম । ও তাতেই খুশি ছিল। ওর বাবা ওকে বেশি টাকা দিত না। অবশ্য আমার বাবাও দিত না,তবে আমি বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করতাম। বড় নোট নিতাম না, কিন্তু এক টাকা ,দুটাকা অথবা পয়সা থাকলে, সোজা পকেটে চালান করতাম। তখন পাঁচ পয়সা ও দশ পয়সার মুদ্রা ছিল। দশটি দশ পয়সা একসাথে পেলেই অনেক খুশি হতাম । দশ পয়সা দিয়ে চাউলের পরিবর্তে ভিখারিকে ভিক্ষা দেওয়া  যেত। ভিক্ষুক তাতেই খুশি হয়ে মিনিটখানেক দোয়া করত।

 আমাদের পাড়ায় তখন একজন কালো মতো হিন্দুলোক আইচক্রিম বিক্রি করার জন্য হাঁক তুলত। লোকটি আইচক্রিম বলত না। বলত,মালাইবরেফ। গলায় মোটা স্বর তুলে সে বলতে থাকত “এই মালাই বরেফ, এই মালাই বরেফ।” আমি মালাই বরফ খেতে পছন্দ করলেও বেশি খেতে পারতাম না। দাঁতে সমস্যা ছিল । আমার তিনটি দাঁতের মাঝ বরাবর বড় গর্ত হয়ে গিয়েছিল  এবং সেখানে ঠাণ্ডা কিছু ঢুকলেই সরাসরি মাথায় হিট করত। চোখে ঝাপসা দেখতাম। অবশ্য এমন হলে আমি ফাঁকা জায়গায় কিছুক্ষণ দৌড়াতাম। এমন করলে ব্যথা অনেকটাই কমে যেত।

 এ লোকটা জালছাতেও মালাইবরফ বিক্রি করত।  তবে এ সময় সে হাঁক দিত না। হাঁক দেবার প্রয়োজন পড়ত না। সে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত  আর ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা তাকে ঘিরে ভীড় জমাতে থাকত। আমার দাঁতে সমস্যা  ছিল বলে আমি ওদিকটায়  যেতাম না।  আমি অন্য কোনো মিঠাইয়ের তালাশ করতাম। আমার হিন্দু সহপাঠিরাও বেড়াতে আসতো জালছাতে। আমরা একসাথে গল্প করতাম; চিনির তৈরি খাজা,কদমা এগুলো খেতাম।

 একদিন ক্ষিতিশ আসলো। এদিন গোরস্তানের ভেতরে ঈদগাহ মাঠে জালছা হচ্ছে। ক্ষিতিশ মালাই বরফ পছন্দ করে বলে আমি তাকে মালাই বরফ কিনে দিলাম।  অবশ্য আমি নিজেও একটা নিলাম,যদিও ঠাণ্ডা খেতে আমার খুব কষ্ট হতো । আমি দাঁতে না লাগিয়ে কোনোমতে খাচ্ছিলাম  আর এ দোকান সে দোকান তার সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম । ক্ষিতিশকে আমি পছন্দ করতাম, কারণ সে ক্লাশে আমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দিত।

 যা হোক,তারপর হঠাৎ আমার মাথায় ব্যথা শুরু হলো। আমার মনে হতে থাকল যে, সবকিছু  কেমন যেন আবছা দেখছি। তবে আমি ক্ষিতিশকে আমার সমস্যার ব্যাপারে কিছুই বললাম না।  আমি ঐ অবস্থাতেই ঘুরতে ঘুরতে একটি দোকানে  গেলাম। অন্যান্য দোকান থেকে একটু বিচ্ছিন্ন জায়গায় ছিল এ দোকানটি । দোকানের পেছনে লতাপাতায় আবৃত একটি বরই গাছ । বরই গাছটির গলা পরিমাণ অংশ আবার উইয়ের ঢিবিতে ঢাকা । লোকে বলত, ঢিবির মধ্যে অনেকগুলো নীলচে-কালো গোখরা সাপ আছে। তবে ক্ষিতিশ এগুলো বিশ্বাস করত না। ফলে ভয়ও করত না। সে  দোকান থেকে তিলে-খাজা কেনার প্রস্তাব দিলো এবং দোকানের পেছনে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা জায়গা ,যার কাছাকাছি বরই গাছটি অবস্থিত,সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। আমি দোকানদারের কাছে এক টাকা পঁচিশ পয়সার খাজা চাইলাম।

 দোকানদার হাত বাড়িয়ে খাজার ঠোঙাটা আমার দিকে এগিয়ে ধরেছে। আমি হাত বাড়িয়ে দিয়েছি, ঠিক এ সময় খেয়াল করলাম যে দোকানদারটি আর কেউ নয়, সেই মৃত বৃদ্ধ হিন্দু দোকানদারটি। সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে । মুখে কোনো দাঁত নেই তার ।  বাড়ানো হাতখানা কাঁপছে আগের মতো তির তির করে । গা পুরোটা খালি। বগলের দিকে  ঝোলানো চামড়া ।  গাছের ডালে ঝুলন্ত মৌমাছির চাক যেমন জোর বাতাসে দুলতে থাকে , তেমনি করে তার বগলের উপরের ঝুলন্ত চামড়া দুলছে।

এ লোকটি তো ছয় মাস আগেই মারা গিয়েছে,আমি নিজ চোখে তাকে শ্মশানে পোড়াতে দেখেছি, এ লোকটি এখানে কেন!  লোকটি  আসলেই ভুত হয়ে গিয়েছে নাকি! আমি ভয় পেয়ে চিৎকার দিলাম। দৌড়ে দূরে চলে গেলাম মুহূর্তে। ক্ষিতিশ কিছু বুঝে উঠতে পারল না। সে আমার পেছন পেছন গেল।

“ক্যারে তুই দেহি কুত্তে দেহেও ভয় পাস?”

“কী কস তুই? তুই কুত্তে কোনে পালু?”

“আরে কানা, তোর সামনে দিয়েই তো একটা কুত্তে দৌড় দিলে,  একটা কালা কুত্তে, দেহিসনি তুই?”

আমি ভয়ে কাঁপছি তখন। ক্ষিতিশ যে কুকুরটির কথা বলছে সেদিকে আমার খেয়াল নেই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,  “ যে লোকটা দোকানে বসে আছে,তুই কি তাকে চিনিস?”

“চিনি। লোকটার বাড়ি তো আমার বাড়ির কাছেই।” 

 এরপর একটু থেমে সে জিজ্ঞাসা করল, “তোক খারাপ কিছু কয়ছে?”

 “না, সে রহম কিছু লয়,” বললাম আমি ।

 আমি তখন কথা বলছি বটে কিন্তু আমি ভেতরে ভেতরে ভয়ে কাঁপছি।  তবে ক্ষিতিশকে কিছু বুঝতে দিচ্ছি না। কারণ আমার মনে হচ্ছে যে, সে যদি বুঝতে পারে যে আমি ভুত দেখেছি তাহলে পরের দিন ক্লাশে গিয়ে সবাইকে বলে দেবে। আর ক্লাশে সবাই তখন আমাকে ভুতে-ধরা বলবে । বেঞ্চে আমার পাশে কেউ বসতে চাইবে না।  শাহনাজ তো আরো বসবে না। সবাই মিলে হয়তো তখন বলবে, আমাকে সফদার খাঁ বদ-কালাম করেছে। এরকম ভাবনাটা আমার মনে এজন্য এসেছিল যে, কিছুদিন আগেই রোকেয়া ভুত দেখে ভয় পেয়ে ফিট হয়ে গিয়েছিল বলে তার পাশে অন্য মেয়েরা বসতে চায়নি রোকেয়া ।  এ কারণে স্কুলে আসছিল না সে। তাই আমি চাচ্ছিলাম যে, আমার ক্ষেত্রে তেমন কিছু না ঘটুক।

  কিন্তু ক্ষিতিশ নাছোড়বান্দা। সে জিজ্ঞেস করেই গেল, আমি কেন চিৎকার দিয়েছি, কী দেখেছি , দোকানদার লোকটি কিছু বলেছে কিনা ইত্যাদি। অগত্যা মিথ্যা বললাম। বললাম যে, আমার দাঁতে হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথা হওয়াতে আমি চিৎকার দিয়েছি।  দাঁত ব্যথা হলি পরে কেউ কি এবা করে চিক্কুর দেয়হে–প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল সে। আমি আর কিছু বললাম না। সে আমার দিকে  বিষ্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল  কিছুক্ষণ।  আমি তখন আমার ডান হাতে ধরা তিলে খাজার পুরোটা তাকে দিয়ে দিলাম।

  ক্ষিতিশ যেভাবে আমাদের জালছার দিনে বেড়াতে আসত, আমিও সেভাবে তাদের দূর্গাপূজার সময়  যেতাম। অন্যান্য মুসলমান ছেলেরাও যেত। তবে তারা আমাকে সাথে নিত না। না নেওয়ার কারণটা ছিলো আমার কিম্ভুতকিমাকার চেহারা। আমার মাথায় ছিলো বিশাল একটা কামড়ের দাগ, যেটা বড় হওয়ার সাথে সাথে  আকারে আরও বড় হচ্ছিল এবং যেটাকে চুল দিয়ে পুরোপুরি ঢাকতে গিয়ে আমি বারে বারে ব্যর্থ হতাম। ওরা সবাই জানত, আমার মাথার দাগটা কুকুরের কামড়ের হয়েছিল, অথবা হয়তো এটা জানত যে, কুকুর নয় ভূতের কামড়ে হয়েছিল। যা হোক, আমি তখন একা-একাই যেতাম হিন্দুদের পূজা-পার্বনে।  এরপর ক্ষিতিশকে খুঁজে বের করতাম। এটা-ওটা কিনতাম। জীব-জন্তুর বিভিন্ন আকারবিশিষ্ট মিষ্টান্ন , যেমন–ঘোড়া, হাতি,পাখি, মাছ– এ রকম আরও বিভিন্ন রকমের ছাঁচে ঢালা মিছরির মিষ্টি কিনতাম। তবে ক্ষিতিশ তার নিজের টাকা দিয়ে কখনও কিছু কিনতো না। কিনতে পারতো না আসলে। ওদের সামর্থ্য ছিল না ।ওরা তখন চরম মাত্রায় গরীব হয়ে গিয়েছিল। তিন বেলা ভাতের যোগাড় করতে পারাটাই ছিল কঠিন । আগে গরীব ছিল না ওরা। মাছ ধরার দুটো বড় নৌকা, বেড় জাল,  দু-দুটো খরা তৈরি করা যায় এমনসংখ্যক বাঁশ, সবই ছিল ওদের। কিন্তু হিন্দু জেলেদের জলমহালগুলো যখন মুসলমান নব্য-জেলেরা দখল করে নিল, তখন ওদের নৌকা খাল থেকে আর জাগল না, খরা তৈরির বাঁশ আটি বাধা অবস্থায় ওভাবেই ঝুলে থাকল টিনের ঘরের আড়ার সাথে। বছরের পর বছর যেতে লাগল। সব ধ্বংস হলো। শুধু বেড় জালটা শত ছিন্নতা নিয়ে ভাড়া খাটতে থাকলো। পুকুরে পুকুরে খেপ খেটে ক্ষিতিশদের সংসার চলতে থাকল কোনোমতে। তখন দেশে কার্প মাছের সবে প্রচলন হয়েছে। সিলভার কার্প, গ্রাস কাপ, তেলাপিয়া, এসব। সব হাইব্রিড জাতের। সবার পুকুরভর্তি এসব মাছ। এক মন মাছ মেরে ক্ষিতিশরা  পেত মাত্র এক কেজি। এভাবে সারাদিন খেটে-খুটে পাঁচ-ছয় কেজি মাছ সংগ্রহ করতে পারত তারা। কিছু খাওয়ার জন্য রাখত আর বাদবাকী বিক্রি করে চাল কিনতো। এভাবে কোনোমতে বেঁচে ছিল তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.