একটি মুরিদজীবন ও একটি গোরস্তান

 2,165 total views

 অধ্যায় ৩.

     বধ্যভূমি

 ১৯৮৭ সালের দিককার কথা।শমশের খাঁ গোরস্তানের নিবিড় নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রায় প্রতিদিনই ফজরের নামাজ পড়তে যায় ।  ঈদগাহর শান বাঁধানো অংশে কাঁধের গামছা পেতে নামাজ পড়ে সে । সূর্য ওঠা অবধি একটানা জিকির করে । জিকিরের শব্দ অনেকটা কান্নার আওয়াজের মত লাগে। শমশের খাঁ তখন সবেমাত্র হুগলী শরীফের পীর সাহেবের মুরিদ হয়েছে আর পীর সাহেবের কাছ থেকে ছবক নেওয়ার পর পরই সে যেন বদলে গিয়েছে। এ রকম বে-দ্বীন একটা লোক হঠাৎ করে দ্বীনদার হয়ে ওঠাতে গ্রামের লোকদেরকে  তখন বিভিন্ন মন্তব্য করে। জিকিরের স্বর ও সুর নিয়ে হাসাহাসি করে। লোকজন লোকজন বলাবলি করে যে,  লোকটা আবার নতুন করে ভেক ধরেছে।

এমন বলার কথা ছিল। মুরিদ হওয়ার কিছুদিন আগেও নামাজ-কালাম কিছুই পড়ত না এই শমসের খাঁ। এমনকি জুম্মার নামাজেরও খবর ছিল না। সারাটা দিন তখন তার কাটত হিন্দুপাড়ায় ।তবলা বাজিয়ে আড্ডা দিয়ে, এটা সেটা আজাইরা কাজ করে কাটত তার। কালিবাড়িতে পুরোদমে গাঁজাভাং চলত। পূজাপার্বণে গানের দলে আগে আগে থাকত সে।  মাথায় ঝাঁকড়া চুল, ময়লাযুক্ত– কতদিন যে  গোসল করেনি ইয়ত্তা নেই— তেল চিটকে মুখ, মাথা। আর কাঁসি-ঢোলের বাজনার সাথে তার বাবরি দুলতো বেদম। এতকিছুর পরেও সে তার জীবিকাটা ভালোই বুঝত।এক সন্তানহীন পুরোহিতের মুদিখানায় বসত সে। বৃদ্ধ বাপের বাইরে চলাফেরা মানা, এক ঘরে অন্তরীন, তাই তাকে দোকানে বসতেই হতো।  না বসলে খাবার জুটত না। পুরোহিত লোকটি আবার তাকে পুত্রজ্ঞান করত। দোকানে যখন বেচাকেনা কম হতো, এমনকি লোকজন যখন কম থাকত, তখন শমসের খাঁ বৃদ্ধ পুরোহিতকে বেদ পড়ে শোনাত। মুসলমানরা এটা দেখে ছি ছি করত। অনেকে তো ঘৃণায় তার দোকানে যেত না। কেউ কেউ বলতে দ্বিধা করত না যে,শমসের খাঁ তার বাপের মত কাফের হয়েছে। জনশ্রতি ছিল, শমসের খাঁর বাবা সফদার খাঁ আসামের কামরূপ কামাখ্যায় গিয়ে হিন্দুদের কাছ থেকে কুফরীমন্ত্র শিখে এসেছে। ফলে শমসের খাঁর বাবাকে গ্রামবাসীরা  যতটা ঘৃণার চোখে দেখত তার চেয়ে বেশি ঘৃণা করত  শমসের খাঁকে।

অন্যদিকে হিন্দুরাও যে তাকে খুব একটা পছন্দ করত, তা নয়। শমসের খাঁর মুখ থেকেই শুনেছিলাম, দেশ যখন স্বাধীন হয়নি, তখন গ্রামের নিম্নশ্রেণির হিন্দুরা তাকে কিছুটা পছন্দ করলেও কুলীন হিন্দুরা পছন্দ করত না একদম । কোনো মুসলমান, কোনো হিন্দুর বাড়িতে ঢুকুক ,তাদের বাড়ির থালায় খাবার খাক, তাদের চেয়ারে বা মাদুরে বসুক –তা তারা চাইতো না ।  যদিও বা একান্ত চক্ষুলজ্জার কারণে কেনো মুসলমানকে মুড়ি বা খই খেতে দিতে হতো, পরে সেই  খাবার পাত্র, হোক  সেটা কাঁসার বা কড়ির, আর ঘরে ঢুকতো না। ওসব খাবার পাত্র সোজা চলে যেত বাড়ির পোষা কুকুরের সামনে। কুলিন হিন্দুরা মনে করতো, এ বাংলা অঞ্চলে যারাই  হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে, তারা কেউই জাতের হিন্দু ছিল না, সবাই ছিল নিম্নজাতের। শূদ্র শ্রেণির। মুচি, মেথর,  চাঁড়াল ,নাপিত এইসব। তাই তাদেরকে ওভাবেই দেখতে হবে। আগে তাও বা হিন্দু ছিল। সমধর্মের ছিল। এখন আবার হয়েছে মুসলমান। মুসলমানদেরকে তাই তারা শূদ্রশ্রেণির হিন্দুর চাইতেও আরও বেশি শূদ্র ভাবত।

শমসের খাঁ আমাদেরকে বলেছিল,একদিন যখন সে কুলীন স্বরদের বাড়িতে (তিথিদের পিতৃবাড়িতে,  তিথির তখন জন্ম হয়নি) গানের দলের সাথে শ্যামাগান গাইতে গিয়েছিল , সেদিন ঐ বাড়ির ঠাকুমা তাকে বাড়ি থেকে খেঁকিয়ে বের করে দিয়েছিল। বের করে দেয়ার সময় স্বরবাড়ির কোনো পুরুষ-সদস্য প্রতিবাদ করেনি।  চেয়ে চেয়ে দেখেছিল শুধু।অথচ ঐ বাড়ির মালিক শ্রীধর স্বর, যিনি তখন মহাজনী ব্যবসা করতেন,তিনি শমসের খাঁদের বাড়িতে গিয়ে সেগুন কাঠের চেয়ারে পায়ের পর পা তুলে বসতেন। তিনি প্রায়ই যেতেন, বসতেন,গল্প করতেন। তারপর শমসের খাঁর দাদাকে সুদের উপর টাকা নেয়ার জন্য বলতেন,  এটাতে রাজী না হলে এ কথা সে কথা বলে বলে শেষমেষ তার কাছে জমি বিক্রি করার  কথা বলতেন । বলতেন, তোমার ত রস বাতে পা ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছে গো খাঁর বেটা, তো ভাল ডাক্তার দেখাচ্ছ না যে! চিকিৎসা করাও,টাকা লাগলে দিব—টাকা না নিলে না নাও, ঘুনার চকের ঐ লম্বা আঁশি জমিতে ফসল ভাল হচ্ছে না তো , ওটা আমার কাছে  বিক্রি করে দাও। শমসের খাঁ শ্রীধর স্বরের ফন্দিফিকির বুঝতে পারলেও তাঁর সাথে ভাল সম্পর্ক  রাখার চেষ্টা করত, তবে মুখ ফুটে প্রতিবাদ করতে পারত না কখনও কারণ তাকে তখন হিন্দুদের সাথে মিশতে হয়। শ্রীধর স্বর শমসের খাঁর সাথে বাইরে খোলাখুলি স্নেহের ভঙ্গিতে কথা বলতো, হেসে হেসে কথা বলতো,কিন্তু ঐদিন, যেদিন তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় সেদিন সে একটা কথা পর্যন্ত বলেনি, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছিল। শমসের খাঁ তার এমন নীরবতায় বেশ কষ্ট পেয়েছিল সেদিন। শমসের খাঁ পরে আরো শুনেছিলো যে, সে বাড়ির মধ্যে ঢোকার কারণে বাড়ির উঠান ও বাড়িতে ঢোকার রাস্তা গোবর দিয়ে লেপেপুঁছে পয়-পবিত্র করেছিল বাড়ির ঠাকুমা ।

শমসের খাঁ তার এসব কষ্টের কথা হিন্দু বা মুসলমান কারো কাছে বলতে পারত না । মুসলমানদের কাছে তো কোনো সুযোগই ছিল না বলার । কারণ হিন্দুদের সাথে তার এত মাখামাখি মেশামেশি মুসলমানরা একদম পছন্দ করত না। অন্যদিকে গানের দলের হিন্দুসদস্য ও অন্যান্য শুভাকাক্সক্ষী হিন্দু, যাদের সাথে সে মিশতো, তাদের কাছেও বলতে পারত না সে । কারণ সে বুঝতে পারত যে, নিম্নশ্রেণির হিন্দুরাও বরং তার কারণে বেশ বিব্রত। শুধুমাত্র তার সাথে মেশার কারণে বা তাকে তাদের ধর্মীয় গানের দলে ঢোকানোর কারণে যে কুলীন হিন্দুদের কাছ থেকে সময়ে সময়ে তাদেরকেও বিভিন্ন কথা শুনতে হয়, এটা শমসের খাঁর অজানা ছিল না। শুধুমাত্র সন্তানহীন বৃদ্ধ পুরোহিত নিমাই ভট্টাচার্য্যের অনুরোধে যে তারা শমসের খাঁর সাথে মেশে,গান গায়,গাঁজা-ভাং খায়,এমনকি ভাতও খায়—-শমসের খাঁ এগুলো ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারত।

 পূর্ব পাড়ার কুলীন হিন্দু চাটুজ্যেদের বাড়ি থেকেও সে নিদারুণ অসম্মান পেয়েছিল । যদিও সে-বাড়ির নারী-পুরুষ, বৌদি,ঠাকুমা প্রায় সবাই শিক্ষিত ছিল, অথচ শমসের খাঁর সাথে আচরণের সময় তারা চরম বৈষম্য করতো। তাকে তখন তার দোকান থেকে চাটুজ্যে বাড়িতে নিয়মিত গাওয়া ঘি সরবরাহ করতে হতো। কিন্তু  এ কাজের জন্য ও বাড়িতে গেলে শমসের খাঁকে বসতে দেয়া হতো সিঁড়ির নিচের ধূলিময় নোংরা চটের ওপর। চটের ’পর বসে ঘিয়ের বয়াম থেকে নিক্তি দিয়ে বিরাট চাটুজ্যেবাড়ির বউদের জন্য  ঘি মেপে দিতে থাকতো সে। তখন তাদের পবিত্র ঘিয়ের বয়ামে শমসের খাঁর অপবিত্র হাতের ছোঁয়া যাতে না লাগে, এ বিষয়ে তাকে বারে বারে সাবধান করা হতো মাথার উপরের দোতলার বারান্দা থেকে। এই সাবধানে মাইপো! হাত ছোঁয়াবা না কিন্তু! এ কথাগুলো উপর থেকে নারী কণ্ঠ ও চুরির নিক্কনের সাথে তাচ্ছিল্যপূর্ণভাবে ভেসে আসতো। সে শুনতো আর অতীব সাবধানতার সাথে মাপতে থাকতো । তাদের এসব আচরণ শমসের খাঁকে বড় কষ্ট দিত। শমসের খাঁর মন ছিল উদার,বাউল স্বভাবের। মানুষে মানুষে  ছোটবড় ভেদাভেদ ,ধর্ম বা গোত্রভিত্তিক বিভাজন তার ভালো লাগতো না।

 শমসের খাঁ আরো বলেছিল, কুলীন হিন্দুরা শমসের খাঁকে কিছুটা সমীহ করতে শুরু করেছিলো কেবলমাত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের পর । কারণ তারা ঠিক তখন থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলো যে, শমসের খাঁয়ের সেদিনের মহান উদ্যোগের কারণেই এখনও তারা বেঁচে-বর্তে আছে; বুঝতে পেরেছিলো যে, শমসের খাঁ যদি সেদিন হিন্দুপাড়ায় ঢুকে পাক-হানাদারদের আক্রমনের খবর সকলকে জানিয়ে না দিত ,তাহলে পার্শ্ববর্তী ডেমরা গ্রামে সকল হিন্দুর ভাগ্যে যা ঘটেছিল, তাদের ভাগ্যেও তা-ই ঘটত; তারা কেউ-ই হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে পারতো না।

 একদিন আমরা, মানে ছোট বালকেরা, একাত্তরের সেদিনের ঘটনা শমসের খাঁর নিজ মুখে শুনতে চাইলাম। অবশ্য তার আগেও বেশ কয়েকবার শুনতে চেয়েছিলাম। বলেনি সে। আমাদের এমন আগ্রহের কারণ ছিলো সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে লোকজনের মুখে শোনা বিভিন্নরকম রহস্যমূলক গল্প। লোকজন বলতো যে,শমসের খাঁ কুফরিমন্ত্র পড়ে কালীর রূপ ধরে লগাই শেখকে সেদিন প্রায় মেরেই ফেলেছিল।  এটাকে লোকজন আবার রঙচং মাখিয়ে বলত। লোকমুখে শোনা এসব কথা আমরা তাই তার মুখে শুনতে চাইতাম। কিন্তু  সে বলতে চাইতো না। বেশি জোরাজুরি করলে গল্পের আসর থেকে ধাঁ করে উঠে যেত। শত ডাকলেও পেছন ফিরে তাকাতো  না। তবে যখন বড়রা থাকতো না,তখন একটু-আধটু বলত। এক বাক্য বা দুই বাক্য বলেই  আচমকা শেষ করত। তখন আরো শোনার জন্য আমার নেশা লাগতো। তার এমন লুকোছাপা করার কী কারণ, তা আমরা বুঝতে পারতাম না। হয়ত সে মনে করত, আমাদের মতো ছোট বালকদের কাছে এমন জঘন্য হত্যাকাণ্ডের কথা না বলাই ভালো। অথবা সে হয়ত ভয় পেত,কারণ যে দু’জন রাজাকার সেদিন হিন্দুদের হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত ছিল, তারা বহাল তবিয়তে তখনও প্রভাব আর দাপটের সাথে বেঁচে ছিল। তার হয়ত ধারণা ছিল যে, গল্প শোনার পর আমাদের মধ্যেকার কেউ না কেউ রাজাকার দুজনকে অথবা তাদের গোঁয়ার ছেলেপুলেদেরকে কথাগুলি বলে দেবো। বলে দিলেই শুরু হবে শমসের খাঁর উপর নতুন করে অত্যাচার। এমনিতেই তার বাবাকে ততদিনে তন্ত্রসাধক বলে এক ঘরে করেছে। ঘর থেকে বের হওয়া নিষিদ্ধ। বাজার ঘাট করা নিষিদ্ধ। কারও মুখের দিকে সরাসরি তাকানো নিষিদ্ধ ইত্যাদি। শমসের খাঁ বোধ হয় রফিককে বেশি সন্দেহ করতো। কারণ রফিক ছিল আমাদের ছোটদের দলে সবচেয়ে ইঁচড়ে-পাকা ।

তারপর একদিন চৈত্রের গুমোটপড়া দুপুরে আমরা যখন গোরস্তানের বটতলায় বসে আব্দুল কারিগরের গল্প শুনছিলাম, তখন শমসের খাঁ খেয়ালের বশে হোক বা গল্প বলার ঝোঁকে পড়ে হোক, সেদিনের  সেই পুরো ঘটনাটি  শুনিয়ে দিল আমাদের ।

ঘটনাটি ছিল এ রকম:                                                 

ঊনিশশ’ একাত্তরে আগস্টের এক দুপুরে এক দল পাকিস্তানি আর্মি আতাইকুলা দাখিল মাদরাসার সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেবকে জোর করে তাদের নৌকায় তুলে নেয়। শমসের খাঁ সেদিন আতাইকুলা হাটে তার দোকানের জন্য লবণ আনতে যাচ্ছিল। লবণ দুষ্প্রাপ্য  হয়ে যাওয়ায় এবং লবণের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় সেদিন হাটে রেশনে কম দামে লবণ বিক্রি হচ্ছিল। যা হোক, শমসের খাঁ নদীর পাড়ের কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে তখন হাটে যাচ্ছে। হঠাৎ সে দেখতে পায়, বলরাম হালদারের বড় মাছ ধরার নৌকায় বিশ-বাইশ জন পাকিস্তানি সৈন্য রহমতপুরের দিকে যাচ্ছে। অন্যান্য জেলেরা দাঁড় বাইছে আর বলরাম হালদার নৌকার হাল ধরে বসে আছে।  কিন্তু বলরাম হালদারের মুখটা মলিন। বলরাম এরকম নয়  তো মোটেও। নৌকার হাল ধরেই সে ভাটিয়ালি গান শুরু করে দেয়।  শমসের খাঁ দেখে, বলরাম তার দিকে দিকে তাকাচ্ছে বারে বারে । ভীত চোখ তার। নৌকার সামনের গলুইয়ের দিকে টুপি মাথায় বসে আছে মাদ্রাসার সুপার সাহেব। শমসের খাঁর বুঝতে বাকি থাকে না যে কী  ঘটতে চলছে। সে তৎক্ষণাৎ পেছন ফিরে রহমতপুরের দিকে দৌড় দেয়। (শমসের খাঁ সেদিনের ঘটনা বলার সময় আমাদেরকে বলেছিল যে, কর্দমাক্ত পিচ্ছিল রাস্তায় দৌড়াতে গিয়ে সে কয়েকবার আছাড় খেয়ে পড়ে গিয়েছিল। আমরা ছোটরা তার আছাড় খাওয়ার কথা শুনে হে হে করে হেসে উঠেছিলাম আর সে আমাদেরকে ধমক দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য গল্প বলা বন্ধ করে দিয়েছিল।)

রহমতপুরে যাওয়ার ঘাটে গিয়ে সে দেখতে পায় যে, পারাপারের নৌকাটি আর নেই। সে বুঝতে পারে ,ঘাটের মাঝি রেশনের লবণ আনতে হাটে চলে গিয়েছে। নিরুপায় হয়ে তখন শমসের খাঁ ভরা বর্ষার প্রমত্তা ইছামতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ততক্ষণে সৈন্যদের নৌকা প্রায় হিন্দুপাড়ার কাছাকাছি এসে গিয়েছে। নদীর পাশেই কালিবাড়ি। তার পাশে একটা বড় পানের বরজ। পানের বরজের ভেতর হিন্দু-মুসলমান আট-দশ জন শ্রমিক তখন পান ভাঙছে। বরজের ভেতর বর্ষার উটকো পানি ঢোকাতে পান-পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছিল। নিশ্চিন্ত মনে কাজ করছে তারা। শমসের খাঁ পানের বরজের ভেতরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে । বরজের পাটখড়ির বেড়া ভেঙে সয়লাব হয়। সবাইকে জানিয়ে দেয় যে পাক-বাহিনী ঢুকছে। শ্রমিকেরা যে যার মত ভেঙেচুড়ে এদিক-ওদিক পালিয়ে যায়। সে,তারপর , দৌড়ে গিয়ে ঢোকে  মূল হিন্দুপাড়ায় । ঢুকে চিৎকার করে হানাদার সৈন্যদের আক্রমনের কথা জানিয়ে দেয়। সবাই পালাতে থাকে। কেউ যায় চতরা বিলের দিকে, কেউ যায় গোরস্তানের  ভেতরকার গভীর জঙ্গলের দিকে। গোরস্তানেই ঢোকে বেশি।

 দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে শমসের খাঁ । আধা ঘন্টার মতো পার হয়। এত বড় হিন্দু পাড়ার সবকটা রাস্তায় সে দৌড়িয়েছে। হঠাৎ সে গুলির শব্দ শুনতে পায়। ভয়ঙ্কর গুলির শব্দ। ঠাটা পড়ার শব্দের চেয়েও ভয়ঙ্কর। অতঃপর রাস্তার ধারের বনকলাগাছের ঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে সে । ওখান থেকে সে দেখে, রাজাকার  গেঁটে আহমদ পাঁচ-ছয়জন সৈন্য সাথে নিয়ে ঢুকছে চাটুজ্যে বাড়িতে ।  তার কিছুক্ষণ পর দেখে, চাটুজ্যে বাড়ির নববিবাহিতা এক বধূকে এক সৈন্য চুল ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে,আর তিন জন সৈন্য নীলম চাটুজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া দুই ছেলেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কালিবাড়ির দিকে। সৈন্যরা যখন চলে যায় দূরে, তখন সে কলাগাছের ঝাড় থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর সে ছুটতে থাকে স্বরদের বাড়ির দিকে। গিয়ে দেখে বাড়িতে কেউ নেই। উঠানে শুধু তাদের মোটাসোটা কালো কুকুরটি শুয়ে ঘেউ ঘেউ করছে। কুকুরটির পিঠে বড় একটি ক্ষত। ক্ষত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

 সে ফিরে আসতে চায় উঠান থেকেই। তারপর হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে  সে একটা আওয়াজ শুনতে পায়।  এগিয়ে গিয়ে দেখে ,বাড়ির বৃদ্ধা, তিথির  ঠাকুমা একটা গহনার বাক্স সামনে নিয়ে  নিথর বসে আছে। এ ঠাকুমার উপর শমসের খাঁর পূর্বতন একটা রাগ ছিল। কয়েক বছর আগে এ বাড়িতে কীর্তন গাইতে এলে ঠাকুমা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। ঠাকুমা তারপর থেকে বেশ কয়েক মাস যাবৎ অসুস্থ, বিষয়টা তখন সে জানে। সে দেখে যে, একদম কঙ্কালসার দেহ ঠাকুমার । প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। মুখ বাঁকা। একহাত ও এক পা শুকনো হয়ে গাছের মরা ডালের মতো হয়ে গেছে। তবুও সৈন্যরা তার হাতে ও পিঠে বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়েছে। বেওনেটের আঘাতে জায়গায় জায়গায় গভীর ক্ষত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু রক্তপাত হয়নি একদম । ক্ষতের ভেতর দিয়ে সাদা সাদা হাড় দেখা যাচ্ছে শুধু। ঠাকুমা শমসের খাঁকে দেখে চিনতে পারেন। “এই বাক্সোডা নেও বাপু। যদি উত্তম ফিরে আসে ,তালি ফেরত দিও। তুমাক অনেক বিশ্বাস করি বাপু।” একথা বলেই বৃদ্ধা একপাশে কাত হয়ে গড়িয়ে পড়ে। বৃদ্ধাকে কয়েকবার ডাক দেয় শমসের খাঁ । কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। বৃদ্ধার হাতটি সোজা করতে গিয়েই সে অনুভব করে হাতখানা বরফের মত ঠাণ্ডা।

উত্তম স্বর ছিলেন ঠাকুরমার ছোট সন্তান। তাঁর আরও দুটি সন্তান ছিল, তারা বিয়ে-থা করে বেশ প্রতিষ্ঠিত ছিল তখনই। এই ছোট সন্তানটি লেখাপড়া তেমন করেনি বলে ঠাকুমার হয়তো চিন্তা ছিল। তাই ধারণা করা যায় যে,তিনি গহনার বাক্সটি শুধুমাত্র তাকেই দিতে বলেছিলেন। অথবা হয়তো তিনি ধারণা করেছিলেন,তার বড় দুই সন্তানকে হানাদার বাহিনী ততক্ষণে হত্যা করে ফেলেছে।

 যা হোক,শমসের  খাঁ গহনার বাক্সটি হাতে নিয়ে দৌড়ে বাজারে চলে যায়। দোকান ঘরটি এক ঝটকায় খুলে ফেলে। গহনার বাক্সটি দোকানের বাক্সে রেখেই সে তারপর ছুটে যায় কালিবাড়ির দিকে। কালিবাড়ির দিক থেকে তখন চিৎকার, চেঁচামেচি আর কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। সে ভাবে,হয়ত সেখানেই সবাইকে জড়ো করা হয়েছে। ভয়ে আর আগাতে চায় না সে। পাছে তাকেও আবার গুলি খেতে হয়, এই চিন্তা তার। কালিবাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটা বেতের ঝোপের আড়ালে গিয়ে বসে পড়ে সে । অতঃপর বেত ঝোপের অভ্যন্তরে তাকাতেই সে দেখে যে, তার গানের দলের প্রধান গদাধর মিত্রের স্ত্রী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বসে আছে। থর থর করে কাঁপছে । তার কোলে এক মাস বয়সী সন্তান। আরেকটু ভেতরে খেয়াল করতেই সে দেখে আরও কয়েকজন শিশু, কিশোর-কিশোরী,মহিলা। তারা সবাই ভীতসন্ত্রস্ত  চোখে তার দিকে তাকিয়ে। সবাইকে চেনে সে । তারাও চেনে শমসের খাঁকে । কিন্তু তারা তাকে দেখে ভয় পাচ্ছে । ভয় পেয়ে বেতবনের কাঁটার মধ্যে আরো বেশি করে ঢুকে যাচ্ছে। কাঁটার আঘাতকে তারা কিছু মনে করছে না।  কারণ তারা শমসের খাঁকে বিশ্বাস করতে পারছে না । তাদের ধারণা, সে যেহেতু মুসলমান,তাই সে তাদেরকে মিলিটারিদের হাতে ধরিয়ে দেবে।

গদাধরের স্ত্রীর দিকে সে এগিয়ে যায়। গদাধর কোথায় আছে তা সে জিজ্ঞাসা করে। মহিলাটি বলতে চায় না। সন্তান কোলে নিয়ে হামাগুঁড়ি দিয়ে সে বেতঝোপের  আরও গহীনে ঢুকে পড়তে চায়। তারপর হঠাৎ করে মুহূর্মুহূ গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ । বড় কোনো গাছের ডাল ঝড়ের সময় ভেঙে পড়লে যেমন পরাৎ করে শব্দ হয়, তেমন সেই গুলির শব্দ। একটানা গুলি চলতে থাকে। কয়েকটি কমবয়সী মেয়ে আর গদাধরের একমাস বয়সী সন্তান তখন গুলির শব্দে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে। গদাধরের স্ত্রীও অস্ফুট শব্দে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। মহিলাটি হয়তো বুঝতে পারে যে,  এইমাত্র তার স্বামীকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো। ভীত কন্ঠে সে শমসের খাঁকে  তখন বলে , লগাই শেখ গদাধরকে দাবড়িয়ে ধরিয়ে দিয়েছে।

 এই লগাই শেখকে ভাল করে জানে শমসের খাঁ । লগাই শেখ তার দোকান থেকে দুই বছর আগে পঁয়তাল্লিশ টাকা বাকি খেয়েছে। তারপর থেকে সে আর দোকানমুখী হয় না। টাকা চাইলে সে হুমকির স্বরে বলে, “যা,যা তোর মালাউনের টাকা মেরে খেয়ে কি আমি জাহান্নাম খাটবো!” শুধু এটাই নয়,সে লোকজনের কাছে বলে বেড়ায় যে, শমসের খাঁ কাফের হয়ে গিয়েছে, তাই কোনো মুসলমান যেন তার সাথে কথা না বলে এবং তার দোকান থেকে কিছুই না কেনে।

 যা হোক,শমসের খাঁ  এরপর একটি হাজারি কাঁঠাল গাছের আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে কালিবাড়ির দিকে ভাল করে দেখার চেষ্টা করে। ঘন গাছপালা আর পানের বরজের কারণে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছিল না। কিছু পাঞ্জাবী কথা আর অনেকগুলো ক্লান্ত গোঙানির শব্দ  শোনা যাচ্ছিলো শুধু। মুরগি জবাই করে ছেড়ে দিলে মুরগির পাখা ঝাপটানোর শব্দ যেমন শোনা যায় , মাঝে মাঝে তেমন শব্দও কানে আসে। কিছুক্ষণ পর আরো কয়েকটি গুলির শব্দ ভেসে আসে। তারপর সে দেখে বর্ষার পানিতে আধা ডোবা রাস্তা দিয়ে ছপ ছপ আওয়াজ তুলে হানাদার সৈন্যরা নৌকায় গিয়ে উঠছে। শমসের খাঁ তবুও অপেক্ষা করে।  এরপর কিছু সময় পার হয়। হয়ত বিশ মিনিট বা তারও একটু বেশি। কোনো শব্দ আর কানে আসে না। তারপর সে গদাধরকে খোঁজার জন্য দৌড়ে কালিবাড়ির দিকে ছুটে যায় । গদাধর তার গানের দলের প্রধান। গদাধরের কিছু হলে তাদের দলের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।

শমসের খাঁ সেখানে গিয়ে দেখে লগাই শেখ লাশগুলো টেনে টেনে ছোট একটা খালের পানিতে ফেলে দিচ্ছে । চাটুজ্যে বাড়ির নববিবাহিতা গৃহবধূ, যাকে সে ধরে নিয়ে আসতে দেখেছে, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। প্রতিবছর ইছামতি নদীর পানিতে বিসর্জিত দূর্গার হাত-পা  যেমন উপর দিকে ভেসে থাকে , গৃহবধূটির দুইহাতও খালের পানির উপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে। হাত দুটোতে  সাদা শাঁখা পরা, পরস্পর দড়ি দিয়ে বাঁধা কব্জিসমেত। নববধুর লাশের নিচে আরও অনেক লাশ। খালের পানি লাল টকটকে সিঁদূর বর্ণ ধারণ করেছে। শমসের খাঁ লাশের স্তুপের মধ্যে গদাধরের লাশ খুঁজতে থাকে। পায় না। অবশেষে কালিঘরের সামনে কালিমূর্তির খণ্ডিত মস্তকের পাশে গদাধরের লাশ  দেখে  সে । গদাধরের গলার নিচ দিয়ে গুলি ঢুকে ঘাড় দিয়ে বেরিয়ে গেছে। একটা বড় গর্ত হয়ে গেছে ঘাড়ের দিকটায় । জিহবার বেশিরভাগ অংশ মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে আর ভেতর থেকে রক্ত আসায় জিহবা লাল টকটকে বর্ণ ধারণ করেছে। বন্ধুপ্রতীম গদাধরের রক্ত দেখে শমসের খাঁর শরীরে যেন তখনি কালী ভর করে। তার মনে হতে থাকে, তাকে অসুর বধ করতেই হবে। তার চোখের সামনে গদাধরের স্ত্রী আর তার এক মাস বয়সী সন্তানের মুখ ভেসে ওঠে তখন। লগাই শেখকে মারতেই হবে তাকে, রক্ত মাথায় উঠে যায় তার। লগাই শেখকে আক্রমন করার জন্য সে সুযোগ খুঁজতে থাকে ।

লগাই শেখ তখনও একের পর এক লাশ টেনে হিঁচড়ে তাচ্ছিল্যভরে খালের পানিতে ছুঁড়ে ফেলছে। শমসের খাঁ শিকারীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। তার মুখে কোনো কথা নেই। মুখমণ্ডল একদম নিরেট, পাথরের মূর্তির মতো । সে  সুযোগ খুঁজছে আঘাত করার । তারপর  যেই না লগাই শেখ গদাধরের হাত ধরে টান দিয়েছে, ঠিক তখন শমসের খাঁ কালিমূর্তির খণ্ডিত মস্তক দুহাতে তুলে নিয়ে তার মাথা বরাবর আঘাত করে। কিন্তু লগাই শেখ দ্রুত সরে যায়। লগাই শেখ পাতলা শরীরের আর ক্ষিপ্রগতির। আঘাতটা তার কপালে খানিকটা লেগে বুকে গিয়ে লাগে। লগাই শেখও তাকে পাল্টা আঘাত করতে যায়। কিন্তু শমসের খাঁর রুদ্রমূর্তি দেখে চিৎকার করে পালিয়ে যায়। তারপর সে পাশের পানের বরজের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যায়।

 এরপর শমসের খাঁ দ্যাখে,আরো আট-দশটি লাশ এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। চাটুজ্যে বাড়ির বিশ্ববিদ্যালয়- পড়ুয়া দুই ভাইকে একসাথে বেঁধে গুলি করা হয়েছে। তারা পরিবারসহ শহরে থাকত। যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তার জন্য গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। শমসের খাঁ অন্যান্য লাশগুলোকে উল্টেপাল্টে দেখতে থাকে। হতভাগ্য মানুষগুলোকে চেনার চেষ্টা করে । অনেককেই  চিনতে পারে না।  মৃত্যুর পর চেনা মানুষের মুখও অচেনা লাগে। সে দেখতে পায় পুবপাড়ার গেদু মোল্লা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। তার পেটের দিকটায় বৃহৎ এক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। চারদিকে রক্তের ছোট ছোট প্রস্রবণ। কোনো  কোনো লাশের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত চুঁইয়ে বের হচ্ছে এখনও । চারদিকে এত জমাটবাধা রক্ত যে, লগাই  শেখের জন্য সে রক্তের উপর দিয়ে লাশ পিছলিয়ে টেনে নিয়ে খালে ফেলতে কোনো অসুবিধা হয়নি। শমসের খাঁ রক্তপাত সহ্য করতে পারে না। গা গুলাতে থাকে তার । লাশগুলোর মাঝখানে লেছা খেয়ে বসে পড়ে সে ।

শমসের খাঁ হানাদারদের নৌকা দেখামাত্র সেই যে দৌড় শুরু করেছিল,কাদাময় রাস্তায় বার বার আছাড় খেয়ে পড়েছিল, সাঁতড়িয়ে প্রমত্তা ইছামতি পার হয়েছিল, হিন্দুপাড়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেছিল,তবুও সে ক্লান্ত বোধ করেনি। অথচ সে এখন অসম্ভব ক্লান্তি বোধ করে। প্রগাঢ় ঘুম পায় তার। সে তার মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তার মনে হতে থাকে এতগুলি লাশের মাঝে সে নিজেও যেন একটা লাশ। কতক্ষণ সে এভাবে বসে থাকে তা সে বলতে পারে না। হঠাৎ তার কানে অস্ফুট একটা ডাক ভেসে আসে। কান্নাময়, ক্লান্ত একটি ডাক। সে চোখ খুলে কালিঘরের ভেতরের দিকে তাকায় । কেউ নেই সেখানে। কালিঘরের পাটাতন জুড়ে ছিন্নভিন্ন পড়ে রয়েছে কালি-মূর্তির ভগ্নাবশেষ । এরপর কোথা থেকে হঠাৎ একটি কালো কুকুরের আর্বিভাব ঘটে।  শমসের খাঁ বুঝতে পারে না কুকুরটি কোন্দিক থেকে আসলো কুকুরটি। কুকুরটির পাগুলো খাটো ধরনের। অতীব কালো, চোখ অতিমাত্রায় উজ্জ্বল। কুকুরটি তার পাশে এসে বসে পড়ে নিঃশব্দে ।

কুকুরটি কি লাশ খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে? নাকি শুধু রক্ত খেতে এসেছে?  কিন্তু কী আজব দেখতে কুকুরটা! শমসের খাঁ ভাবতে থাকে। কুকুরটিকে তাড়ানোর জন্য শব্দ করতে চেষ্টা করে সে। কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দই যেন বের হতে চায় না। সে আবারও ডাকটা শুনতে পায়। সে বুঝতে পারে, বাম দিক থেকে আসছে ডাকটা । ওদিকে তাকাতেই সে দেখে, নাপিত হরিহর বিশ্বাস তার দিকে তাকিয়ে ডাকছে। সে তার তলপেট চেপে ধরে রেখেছে।  তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে গলগলিয়ে।

নাপিত হরিহর বিশ্বাস। শমসের খাঁর দোকানের এক দোকান পরেই তার দোকান। বহুদিনের খাতির তার সাথে। শমসের খাঁ এগিয়ে যায় তার দিকে । হরিহর তার হাত চেপে ধরে। শমসের খাঁকে সে কেঁদে কেঁদে বলে , “এই শমসের, তুই আমাক ইকটু শ্রীপুরের হাসপাতালে লিয়ে যা।  আমার ছাওয়ালমেয়ে না খায়ে মরবিরে।” শমসের খাঁ আর কী করবে তখন? চারদিকে এত ভয়। সে হানাদার বাহিনীকে  ইছামতি নদী ধরে শ্রীপুরের দিকেই যেতে দেখেছে। আর ঐ শ্রীপুরেই হাসপাতাল। কিভাবে যাবে সে? এটা ভাবতে ভাবতে তার মনে প্রশ্ন জাগে, শ্রীপুরে তো বেশি হিন্দু নেই, তাহলে ওদিকে কাকে মারতে  গেল তারা?  তাহলে কি রাজশাহী বেতার কেন্দ্রের বিখ্যাত গায়ক গফুর বিশ্বাসকে? নাপিত হরিহর বিশ্বাসের মুমূর্ষু  দেহের সামনে বসে  ভাবতে থাকে সে।  আহা, গফুর বিশ্বাসকে যদি তারা মেরে ফেলে তাহলে দেশের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। সে তো শুধু গায়কই নয়, একজন লেখকও। ভালো শ্যামাগানও তিনি গাইতে পারেন, কী দরাজ তাঁর গলা।

  নাপিত হরিহর অনুরোধ করতেই থাকে শমসের খাঁকে। হরিহরের কণ্ঠ স্তিমিত হয়ে গেছে ততক্ষণে। অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে। হরিহর যখন বোঝে তার সময় শেষ, তখন শমসের খাঁকে শুধু অনুরোধ করে কালিঘরের সামনে একটু বসিয়ে দিতে। সে শেষবারের মতো মা-কালীকে প্রণাম করে মারা যেতে চায়। কিন্তু কালিমূর্তি তো নেই। হানাদাররা ভেঙে মিশিয়ে দিয়েছে আগেই। কাকে প্রণাম করবে সে? শমসের খাঁ তাকে বলে এটা। হরিহর তখন বলে, কই মূর্তি ভেঙে ফেলেছে? আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ঐ তো ভগবান, ঐতো দূর্গা, ঐতো মা-কালী। শমসের খাঁ তখন বুঝতে পারে, মানুষের মনের মধ্যেই তাহলে ভগবানের বসবাস। সে হরিহরকে কালীঘরের দিকে মুখ করে বসিয়ে দেয়।  ঠিক তখনই শমসের খাঁ দ্যাখে কালো কুকুরটি তার কাছ থেকে গুটিগুটি পায়ে হরিহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কুকুরটির যেন অনেক কৌতুহল। কুকুরটি কি হরিহরের পোষা? শমসের খাঁ ভাবতে থাকে । কিন্তু কিছুই বুঝতে পারে না সে। সে দেখে যে ,কুকুরটির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে হরিহর । কুকুরটিও জিহবা  বের করে তাকিয়ে আছে হরিহরের দিকে , যেন তাদের মধ্যে অনেক দিনের বোঝাপড়া। কিছুক্ষণ নিঃশব্দ এভাবেই কেটে যায়। দূরের শ্রীপুরের দিক থেকে তখন  মেঘের ডাকের মতো কয়েকটি গুলির শব্দ শুনতে পায় শমসের খাঁ।  সে আন্দাজ করে,গায়ক গফুর বিশ্বাসকেই  বুঝি মেরে ফেলা হলো। এরপর আরো কিছুক্ষণ কেটে যায়। হরিহরের রক্তপাত বন্ধ হয়ে গেছে। মুখটা ফ্যাকাসে পাণ্ডু বর্ণের হয়ে গেলেও তখনও হরিহর তাকিয়ে আছে কুকুরটির দিকে নিষ্পলক।  শমসের খাঁর মনে একটু আশা, হয়তো হরিহর বেঁচে যাবে। চারদিকে তখন নিঃশব্দতা। এমন নিঃশব্দতার মধ্যে কখন যে হরিহর শিথিল হয়ে মাটিতে পুরোপুরি এলিয়ে পড়েছে,শমসের খাঁ তা খেয়াল করে নাই। সে তার হাত ধরে নাড়া দেয়। কিন্তু হরিহরের কোনো সাড়া পাওয়া যায় না।

শমসের খাঁ ক্লান্তি ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পুরোহিত নিমাই ভট্টাচার্য্যের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা সে তখনও কিছু জানে না। সে টলতে টলতে তার বাড়িতে যায়। সেখানে কারও কোনো  সাড়াশব্দ নেই। সারা বাড়ি খাঁ খাঁ করছে যেন, যেন শ্মশান। পূজার ঘরে যায় সে । গিয়ে দেখে পুরোহিত মশায় পূজার ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে আছে।  “ কাকা, কাকা! ” ডাক দেয় সে, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। তারপর সে গায়ে হাত দিয়ে দেখে। গা গরম আছে। মারা যায়নি। শীর্ণ পুরোহিতকে সে পাঁজাকোল করে তুলতে চায়। কিন্তু পারে না। তার শরীরে তখন অত শক্তি নেই, এতক্ষণে সব নিঃশেষ হয়ে গেছে।

শমসের খাঁ ঘটনাটি এটুকু বলেই থেমে গিয়েছিল সেদিন। স্বরদের বাড়ির ঠাকুমার কাছ থেকে পাওয়া গহনার বাক্স সে পরবর্তীতে কী করেছিল, এ বিষয়ে আমার চাচাতো ভাই রফিক, যে তার বয়সের চেয়ে একটু বেশি পাকনা ছিল, প্রশ্ন করলে সে রেগে উঠে চলে গিয়েছিল। তবে সে রাগলো নাকি হাসলো- এ বিষয়ে আমাদের তখন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। বড়রা তাকে তেমন গুরুত্ব দিত না বলে আমরাও তাকে অতটা গুরুত্ব দিতাম না। আমরা তারপর আবার বটগাছের ডালে উঠে  ছোঁয়াছুয়ি খেলায় মত্ত হয়েছিলাম।

পাড়া-সমাজে শমসের খাঁ সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক কথা প্রচলিত ছিল তখন । আমরা ছোটরা, বাবা,চাচা,পাড়াতো বড় ভাই বা মুরুব্বীদের কাছ থেকে তার সম্পর্কে সবসময় বাজে কথাই শুনতাম। কেউ কেউ বলত যে, তার কাছ থেকে আমরা যেন গল্প-টল্প না শুনি, ধারে-কাছে না বসি। গেঁটে আহমেদ, যে তখন মার্কামারা রাজাকার ছিল, তার ছেলেরা এবং তার আত্মীয়স্বজন-শরীকেরা শমসের খাঁকে দুচোখে সহ্য করতে পারত না। লগাই শেখের ছেলেরা মাঝে মাঝেই শমসের খাঁর গোষ্ঠীর লোকজনের সাথে হাটে-বাজারে,রাস্তাঘাটে ঠুনকো অজুহাতে বচসায় লিপ্ত হতো। এ ধরনের ঝগড়াঝাটি হলে তা মুখে মুখে চারদিকে  ছড়িয়ে পড়ত এবং লোকজন তখন একাত্তরের কাহিনী আবার একটু একটু করে বলা শুরু করত। আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে তখন সে কাহিনীগুলো নতুন করে ব্যাপিত হতে থাকত আর আমাদের মনের ভেতর শমসের খাঁ সম্পর্কে এক ধরনের ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য জমা হতো। তবে সেগুলোর বেশিরভাগই  যে মিথ্যা আর ভুলে ভরা ছিল, সেটা আমরা পরে বুঝতাম। কেউ কেউ বলত যে,শমসের খাঁ স্বর-বাড়ি থেকে গহনা-সামগ্রী  পেয়েছিল সেগুলো, তাকে আসলে ঠাকুমা দেয়নি, সে চুরি করে এনেছিলো। কেউ বলত যে, তার বাবার কাছ থেকে শেখা কুফরিমন্ত্রের শক্তিতে সে কালীর রূপ ধরে লগাই শেখকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। কেউ সরাসরি বলত যে, সে মুসলমানই নয়। তবে শমসের খাঁর কাছ থেকে আমরা ঘটনাটি শোনার পর থেকে কেউ-ই আর তাকে অতটা তাচ্ছিল্যভরে দেখতাম না। বরং তারপর থেকে তার সম্পর্কে কেউ খারাপ কথা বললে আমরা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করতাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.