আমার মুরিদজীবন অধ্যায়:৭ অশ্লীল নাচের যাত্রাপালা

 3,664 total views

 গ্রামে অশ্লীল নাচের যাত্রাপালা

  মাদ্রাসা বিষয়ক কাহিনী সাদিয়ার ভালো লাগছে না। সে চাচ্ছে, হয় আমি  গোরস্তানের কথা বলি, আর নয়তো তিথির কথা বলি । কিন্তু আমি ওদিকে যাচ্ছি না বলে তার মন খারাপ। কিন্তু আমার তো কিছু করার নেই, ইচ্ছা থাকলেও যেতে পারছি না আসলে। সবকিছুরই তো একটা জো লাগে, উপলক্ষ্য লাগে। মানুষের জীবনের প্রত্যেকটা ঘটনা আসলে একটা আরেকটার সাথে প্যাঁচ লাগানো থাকে। মাঝখানের ঘটনা হুট করে বলা যায় না। বললে পারম্পর্য হারায় । তাই আমি ক্রমানুযায়ী লিখছি।  যেমন এখন লিখছি রহমতপুর গ্রামের  উল্লেখযোগ্য একটা  অনুষঙ্গ সম্পর্কে। ভাবছি, সাদিয়া আপাতত এটা পড়–ক। সাদিয়া যদি এটা পড়ে, তাহলে তিথির পিতৃপুরুষ সম্পর্কে জানতে পারবে। তিথির পিতৃপুরুষের বাড়ি তো এই রহমতপুর গ্রামেই ছিল, আর আমি এই গ্রামেরই হালচাল বর্ণনা করছি। সুতরাং সমস্যা কোথায়? সরাসরি তো আর তিথির প্রসঙ্গে যাওয়া যায় না। তিথির কথা বা তার নিজের কথা বলতে গেলে তো এখন আমাকে মেডিক্যাল কলেজের জীবন নিয়ে লিখতে হবে। কিন্তু মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি হওয়ার পূর্বে আমার যে একটি রহস্যময় কিশোর জীবন ছিল, সেগুলো তো লিখতে হবে। তাকে এটা আমি কিভাবে বোঝাবো।

 যা হোক, আমি এখন আমার গ্রামে আয়োজিত যাত্রাপালার কথা বলব, যে যাত্রাপালাতে তিথির মা বীনা চৌধুরী নাচতে এসেছিল।  তবে আমি ঐ সময়ে তিথি বা তিথির মা কাউকেই চিনতাম না। এমনকি গ্রামবাসীরাও কেউ জানত  না যে, এই নর্তকী বীনা চৌধুরী এ গ্রামের বনেদী হিন্দু স্বর পরিবারের ছোট ছেলের বউ। জানার কোনো কারণও ছিল না, কারণ স্বর পরিবারের সব সদস্য পাড়া-প্রতিবেশির অত্যাচারে সেই ১৯৭৪ সালেই গ্রাম ছেড়ে গিয়েছিল।  কোথায় গিয়েছিল তারা , ইন্ডিয়ায় নাকি দেশের ভেতরেই অন্য কোনো জায়গায়, সেই খবরও রাখেনি গ্রামের লোকজন ।

 আশির দশকের পুরোটা এবং নব্বই দশকের প্রথম দিককার কথা। আমি তখন পীরের দরবারে যাইনি। দরবারের কলেবর তখন এতবড় ছিল না। টিনের চালার একটা ঘর ছিল মাত্র। প্রতি বৃহস্পতিবারে ২০/৩০ জন মুরুব্বীর জিকিরের আসর বসত। সেই জিকিরের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতো আশেপাশে। গুরুগম্বীর পবিত্র সেই প্রতিধ্বনি। শীতের মৃদুমন্দ বাতাসে  যেন সারা গ্রামে সেই পবিত্রতা মিশে যেত। কিন্তু  তখন আবার এর বিপরীত দৃশ্যও ছিল। এশার নামাজের পরবর্তী জিকিরের পাশাপাশি  মাইকে ভেসে আসা অশ্লীল গানের শব্দও তখন সারাগ্রামের বাতাসে তরঙ্গায়িত হতো। এটা প্রতিবছর এই শীতকালেই ঘটতো। শীতকালই উপযুক্ত সময়। শীতকাল না হলে যাত্রা জমে না।  বায়ুচলাচলহীন আবদ্ধ প্যান্ডেলে হাজার হাজার দর্শকসমেত যাত্রাপালা হয়, মঞ্চে নর্তকীরা নাচে, গরমকালে কিভাবে নাচবে, মেকাপ তো মুছে যাবে ঘামে। অন্যান্য জনসমাগমের ক্ষেত্রে এই গরমই ছিল সমস্যা । ফলে জালছা, জিকির আর যাত্রাপালা এই গ্রামে প্রায়ই যুগপৎ অনুষ্ঠিত হতো। এই গ্রামের উত্তরে অবস্থিত কাঁটাখালির মাঠে প্যান্ডেল বানিয়ে যাত্রাপালা হতো। যাত্রাপালার মেয়াদ থাকত প্রায় তিন সপ্তাহ। প্রায় সারারাত ধরে যাত্রাপালা চলত। রাতের প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হতো রাজা-রানীর কাহিনী সম্বলিত বিভিন্ন পালা । আমরা ছোটরা, যাদের দাড়িগোঁফ তখনও গজায়নি, তারাসহ কিছু মুরুব্বী এগুলো দেখতাম। দর্শক খুব বেশি একটা হতো না। কিন্তু রাতের দ্বিতীয়ার্ধে হিন্দি-বাংলা গানের সাথে মেয়েদের যে নাচের অনুষ্ঠান হতো, সেখানে দর্শক হতো প্রচুর। টিকেট নিমিষেই শেষ হতো। কিন্তু  ঐ শো আমাদের ছোটদের দেখা বারণ ছিল ।  উপায় না পেয়ে আমি তখন ঘরে শুয়ে থেকে আমার দেখা সিনেমার বিভিন্ন প্রিয় গানের বাজনা শুনতে থাকতাম।‘নরম-গরম’ সিনেমায় শিল্পী রুনা লায়লার গাওয়া  “তোমাকে চাই আমি আরো কাছে / তোমাকে বলার আরো কথাও আছে /বলতে পারি না আমি তওবা ,তওবা/ দিলে জখম হলো উহু আহা”- এ গানটি প্রতি রাতেই বাজতে থাকত। এছাড়া “মোকাবেলা , মোকাবেলা ও লায়লা” হিন্দী গানটা শেষ রাত্রির দিকে চলতো। আমার তখন খুব ইচ্ছা হতো আমার প্রিয় এইসব গানের সাথে বাস্তবে মেয়েরা কেমন করে নাচে তা একবার হলেও দেখা।

আমাদের বাড়ির রাখাল, ছলিম, রাতের দ্বিতীয়ার্ধে এসব নাচগান নিয়মিত দেখতে  যেত । আমি একদিন ছলিমকে আমার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলাম।

 সে বলল, “ তোমার বয়াস কম, ঢুকপের দিবি ননে।”

“ উহু,যেবা করেই হোক আমাক দেহানেই লাগবি, আমি দেখপো।” আমি নাছোড় হয়ে বললাম।

 সে বলল, “ আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার কাছে যাত্রাদলের একটা পুরেন পরচুলা আছে। গোঁফও আছে।তোমাক পরায়ে ঢুকানের চেষ্টা করবোনে। ”

 এখানে আপনাদেরকে বলে রাখি, সে এসব পরচুলা ও গোঁফ ডাকাতির কাজে ব্যবহার করত,  যা আমি বছরখানেক পরে জানতে পেরেছিলাম ।

 যা হোক,আমি খুশি হয়ে তাকে টিকেট কাটার টাকা কিছু বকশিসসহ তখনই দিয়ে দিলাম। রাতের প্রথমার্ধ আমার নির্ঘুমই কাটলো। কারণ আমি তখন আমার জন্য নিষিদ্ধ যাত্রাপালা দেখার উত্তেজনায় ছটফট করছিলাম। অতঃপর ঠিক মধ্যরাতে ছলিম এলো। সে আমার মাথায় পরচুলা লাগিয়ে দিল,গোঁফটা ছোট করে কেটে উপরের ঠোঁটে পরিয়ে দিল। তারপর আমি শাল চাদর দিয়ে যথাসম্ভব শরীর-মাথা ঢেকে-ঢুকে যাত্রাপালার প্যান্ডেলের ভেতরে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি প্রচুর দর্শক। তিলধারণের জায়গা নেই। আমি আমার আশেপাশের লোকজনকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে থাকলাম।  দেখি যে পাড়ারই কয়েকজন মধ্যবয়স পার হওয়া লোক তাদের মুখের দাড়ি মাফলার দিয়ে পেঁচিয়ে ঢেকে বসে আছে।  এখানে বলে রাখি যে,এরা আবার প্রায় প্রত্যেকেই নিয়মিত জালছা শুনতো। জালছার ওয়াজ শুনে তাদেরকে কত কাঁদতে দেখতাম। আমার অনেক পরিচিত ছিল তারা। পাড়ার রিক্সাওয়ালা শুকুরকেও দেখছিলাম। সে তখন নিয়মিত নামাজ পড়ে। নামাজ পড়ার চিহ্নস্বরূপ তার কপালে বড় আকৃতির কালো দাগ ।  নিয়মিত জালছাও শোনে সে। কয়েকদিন আগে মক্তবের জালছায় সে একশত টাকা দানও করেছে। একজন গরীব রিকসাওয়ালা একশত টাকা দান করেছে দেখে বক্তা হুজুর গদফাটা হয়ে কেঁদে-কেটে  কীযে দোয়া  করল তার জন্য । যা হোক,ভাবছি যে ,হুজুরের দোয়া নেয়ার পর এই কাণ্ড শুকুর আলীর!  মনে পড়ল, এই জালছার ঠিক পরের দিন শুকুরের বউ আমার মায়ের কাছে আধা কেজি চাল চাইতে এসেছিল।

“ চাচিমা,ঘরে এক ছটাক চাল নেই। মেয়ে দুডে সকালেত্তেন না খেয়ে আছে।” সেদিন শুকুরের বউ মুখটা মলিন করে বলল।

“ ইস, তাই নাকি! আহারে বাচ্চা  মেয়েগুলান সব।” আমার মা আফসোস করে বলল।

“ চাচিমা, আমার পরনের শাড়িহান ইকটু দেহেন, সারা জাগায় সেলাই আর সেলাই। এক্কেরে পচে গেছে। সেলাই আর ধরে না। আমাক একটা পুরেন শাড়ি দিবেন চাচিমা?”

আমি দেখলাম তার শাড়িটাতে আসলেই বিভিন্ন জায়গায় সেলাই করা। তবে তা দেখে আমার করুণার পরিবর্তে বেশ রাগ হলো। আমি তখন বললাম,

“ তুমার স্বামীক তো দেখলেম সেদিন জালছায় ১০০ টাহা দান করলে। ১০০ টাহা দিয়ে সুন্দর একখান টাঙ্গাইলের শাড়ি কেনা যায়।”

“ হ, ওর দয়ার শরীল। সেদিন যা কামাই করছিলে সব দিয়ে দিছিলে।”

 সে তার স্বামীর দানশীলতার কথা ও আরও কী কী সব মুখ ভরে বলছিল আর তার চোখে-মুখে গর্বের ছাপ ফুটে উঠছিল। আর আমার নিজেকে তখন বড় কৃপন ও নির্মম মনে হচ্ছিলো । যেখানে তার স্বামী রিক্সাওয়ালা হয়েও জালছায় সারাদিনের রোজগারের পুরোটা দান করেছে, সেখানে আমরা তাকে সাধারণ আধাকেজি চাল দিতে গড়িমসি করছি, উপরন্তু এটা ওটা জিজ্ঞেস করছি! এই ফিলিংসটা তখন আমাকে একদম ডাউন করে দিচ্ছিলো।

 যা হোক, দেখছিলাম যে, যাত্রার প্যান্ডেলের একদম সামনের সারিতে শুকুর আলী বসে আছে । আমি শুকুর আলীকে কয়েকবার করে দেখলাম। আমার  এমন করে দেখার উদ্দেশ্য ছিলো তার আগ্রহ ও অভিব্যক্তি দেখা। সে খুব আগ্রহ নিয়ে নিমগ্ন হয়ে বসে ছিল।  এরপর কিছুক্ষণের মধ্যে গানবাজনা শুরু হয়ে গেল  আর তার কিছুক্ষণ পরেই মাইকে ঘোষণা করা হলো: “এবারে দেখবেন এক ঝাঁক উড়ন্ত বলাকা, ডানাকাটা পরিরিরিরিরি….”। এছাড়া এ জাতীয় আরো কিছু কথা । এরপর একে একে আট জন যুবতী মেয়ে হেলেদুলে স্টেজে  এলো আর  সঙ্গে সঙ্গে দর্শক সারিতে বিপুল কলরব উঠল। মেয়েগুলিকে পরিচয় করিয়ে দিতে থাকলো যাত্রা দলের নেত্রী বীনা চৌধুরী। দেখলাম, বীনা চৌধুরী নিজেও বেশ সুন্দরী এবং সে যে মেয়েগুলোর পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে তাদের দৈহিক বর্ণনা সে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করছে। কোন্ যুবতীর দেহের কোন অংশ লোভনীয়, কে কী বেশি করতে পারে- এই সব বলে যেতে থাকল সে । এছাড়া খেয়াল করলাম, একেকজন মেয়ের নামের সামনে একটা করে টাইটেল লাগানো আছে। ডক্টরেট ডিগ্রিধারী মানুষের নামের সামনে যেমন ড. লাগানো হয় অনেকটা সেই রকম করে। একটা মেয়ের নামের সামনে লাগানো হয়েছে কুসুম-নটি বিশেষণটি। দেখলাম মেয়েটি কুসুম বা ফুলের মতোই সুন্দর এবং নরম স্বভাবের। মুখমণ্ডল গোলাকার , গোলাপী রঙের এবং মুখটা ভারী,ভরা ভরা। কিন্তু নটি শব্দটি গ্রাম-সমাজে তখন পতিতা শব্দটির সমার্থক । প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকটি মেয়ের নামের সামনে এ রকম পতিতা ইঙ্গিতবাহী একটা করে টাইটেল বলা হচ্ছিল  আর  মেয়েগুলি তখন বিশ্রী ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি দিয়ে একে একে কালো পর্দার আড়ালে চলে যাচ্ছিল।

 এখানে বলে রাখি যে, এই যাত্রাদলের নেত্রী বীনা চৌধুরী যে হিন্দু  ছিল তা কেউ জানতো না, তার আচরণ ও কথাবার্তায় ধর্মের  কোনো বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠেনি সেদিন। একটু-আধটু উঠলেও সেটা মুসলমান ধর্মীয় বলেই মনে হচ্ছিল। এমনকি সে যে এ গ্রামেরই বনেদী হিন্দু  স্বর পরিবারের বউ, তা কেউ বুঝতে পারেনি। না বুঝতে পারার কারণ হলো, স্বর পরিবারের  একজন বাদে সব সদস্য তখন গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কে কোথায় গিয়েছিল, কী করতো, সে খবরও কেউ জানতো না। জানার প্রয়োজনও মনে করেনি।  ঐ সময়কালে প্রায় শখানেক হিন্দু  পরিবার  গ্রাম থেকে রাতের আঁধারে পালিয়ে গিয়েছিল। বেশিরভাগই গিয়েছিল ভারতে, কেউ কেউ বসতি গড়েছিল এদেশেরই হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে অথবা বর্ডার অঞ্চলে, যাতে সুযোগ পেলেই বর্ডার পেরিয়ে ওপারে পাড়ি দেওয়া যায়।

গ্রামের লোকজন  অবশ্য এই বীনা চৌধুরীর পরিচয় জানতে পেরেছিল এই যাত্রানুষ্ঠান হওয়ার চৌদ্দ বছর পরে, যখন আমি বীনা চৌধুরীর মেয়ে ডা. তিথি চৌধুরীকে বিয়ে করেছিলাম। তারা জানতে পেরেছিল, তিথি রহমতপুর গ্রামের বনেদী হিন্দু পরিবারের  ছোট সন্তান উত্তম স্বরের মেয়ে। তবে আমি একজন মুসলমান হয়েও হিন্দু পরিবারে বিয়ে করায় গ্রামের লোকজন  যতটা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল যাত্রাদলের নর্তকীর মেয়েকে বিয়ে করার কারণে।

 যা হোক, ও প্রসঙ্গ এখন থাক। এগুলো বলা এ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

 দেখছিলাম,যাত্রাদলের সবচেয়ে কমবয়সী সুন্দরী একটা মেয়ে একটা কুরুচিপূর্ণ গানের সাথে বেদম নেচে চলছে। নাচতে নাচতে সে দর্শকের একদম কাছে চলে আসছে। দর্শকরা, যারা সামনের সারিতে আসীন, তারা হাত দিয়ে মেয়েটিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করছে।  মেয়েটি তাতে মজা পেয়ে ঘাসফড়িঙের মতো পেছন দিকে লাফ দিয়ে তৎক্ষণাৎ দূরে সরে গিয়ে আরো উদ্দামতার সাথে নাচছে। আমাদের পাড়ার মাতবর কেরামত শেখ, যিনি মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে পদাধিকার বলে জালছারও সভাপতি থাকেন, তার দুই ছেলে আনোয়ার ও মনোয়ার দর্শকসারির একদম সামনের দিকে বসে ছিল। তারা দুই ভাই বসেছিল পাশাপাশি দুটি চেয়ারে । দুই ভাই-ই তাদের হাত প্রসারিত করে মেয়েটির অঙ্গ স্পর্শ করার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছিল।  একসময়ে তারা দর্শকের চেয়ারে আর বসে থাকতে পারল না। সোজাসুজি স্টেজে উঠে গিয়ে মেয়েটির সাথে বুক মিলিয়ে কুরুচিপূর্ণভাবে উদ্দাম নাচ নাচতে থাকল। স্টেজে উঠে গিয়ে মেয়েদের সাথে নাচার নিয়ম ছিল না । কেউ এরূপ চেষ্টা করলে যাত্রাপালা কমিটির কিছু বদকার ষন্ডামার্কা  লোক,যারা বাঁশের লাঠি হাতে মঞ্চের চারপাশে সার্বক্ষণিক দাঁড়িয়ে ছিল, তারা সোজা পিটিয়ে বসিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু মনোয়ার আনোয়ার দুই ভাই  গ্রামের প্রভাবশালী কেরামত শেখের সন্তান হওয়ায় এবং তারাই মূলত যাত্রা অনুষ্ঠানের আয়োজক হওয়ায় বিনা বাধায় স্টেজে উঠে গিয়ে নেচে ঘেমে নিচে নেমে আসল। নিচে নামার আগে তারা মেয়েটির হাতে পাঁচশত টাকার একটা  নোট গুঁজে দিল। দর্শকসারিতে তখন বিপুল হাততালি পড়ল।

আমি এ দুই ভাইয়ের পরস্পরের মধ্যে অভূতপূর্ব বোঝাপড়া দেখে আশ্চর্য হচ্ছিলাম। আমি ভাবছিলাম, এ দুই ভাইয়ের একজন আনোয়ার হোসেন, কিছুদিন আগেও তো  মসজিদের জালছায় দশ হাজার টাকা নগদ দান করেছে। হুজুর তার জন্য হাত তুলে প্রায় পাঁচ মিনিট একটানা মোনাজাত করেছিল। পাঁচ মিনিট একটানা হাত তুলে ধরে মোনাজাত করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। আমার দুহাত ব্যথায় একদম টেনে ধরেছিল তখন। হাত নামাইনি তবু । হাত নামালে আবার কী গোস্তাকি হয় সেই ভয়ে আমি কষ্ট করে হলেও মোনাজাত ধরে ছিলাম ঠায়। জোরে জোরে ‘আমিন’ ‘আমিন’ বলছিলাম মুখে । আমি সাধারণত মাহফিলের একদম সামনের দিকটায় বসতাম। সেখানে বসে মোনাজাত ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছা থাকলেও সম্ভব ছিল না।

  মেয়েটির নাচ তখনও চলছে। দর্শকসারি থেকে বিভিন্ন রকম অকথ্য কুরুচিপূর্ণ কথা মেয়েটির দিকে ছুঁড়ে দেয়া হচ্ছে। মেয়েটি সেসব শুনে বেজায় খুশি হয়ে আরো কুরুচিপূর্ণভাবে অঙ্গভঙ্গি করছে। এরপর পঞ্চাশোর্ধ বয়সী কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা গাট্টাগোট্টা বেঁটে সাইজের কমল শেখ, যিনি কেরামত শেখের  ছোট ভাই, তিনি স্টেজে দৌড়ে উঠে গেলেন।  মরিয়মের বাবা তিনি । লোকটি মাফলার দিয়ে দাড়ি-মুখ পেঁচিয়ে রেখেছিল বলে প্রথমদিকে চিনতে পারিনি। সে নৃত্যরতা মেয়েটিকে পাঁজাকোল করে ধরে নাচতে থাকল। কিছুক্ষণ নাচার পর মেয়েটির হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে দর্শক সারিতে নেমে আসেলো সে।  তারপর আমার ডানপাশ থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে বসল সে । দেখলাম, বেদম হাঁপাচ্ছে সে, দম বন্ধ হয়ে গিয়ে যেন মারা যাবে এখনি। উত্তেজনায় তার রক্তচাপ হয়তো নিদারুণভাবে বেড়ে গিয়েছে।আহা।

নাচ চলাকালীন শুকুরের ভাবভঙ্গি  খেয়াল করাটা আমার জন্য বেশ সহজ হয়েছিল। কারণ সে তখন ঠিক আমার সামনের চেয়ারেই বসা ছিল ।  খেয়াল করলাম,লোকটির কঙ্কালসার দেহ যেন চেয়ার ছেড়ে বারে বারে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যেন, সে তার  ছোটখাটো পাতলা দেহখান নিয়ে উড়ে গিয়ে এখনি মেয়েটিকে কব্জা করবে।তার মুখের  পাতলা ফিনফিনে দাড়ি ঘামে ভিজে তখন জবজব করছে। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি নাচ শেষ করে ভেতরে চলে  গেলে আমি শুকুরের মুখের অভিব্যক্তি দেখার চেষ্টা করলাম । কিন্তু পারলাম না। কারণ সে তখন মঞ্চের দিকে, মেয়েটির পর্দার আড়ালে অন্তর্হিত হওয়ার দিকে নিমগ্ন হয়ে তাকিয়ে ছিল। তার কিছুক্ষণ পরে অন্য একটি গান বেজে উঠল আর সে নড়েচড়ে বেশ আরাম করে বসল।

পরের গানটা আরো চটুল ছিল। একটা বেশ মোটাসোটা খাট গড়নের কিন্তু পেটা শরীরের একটা মেয়ে মঞ্চে আসল। বাজনার সাথে সাথে বেদম নাচ শুরু করল সে। মেয়েটির  যেন অফুরন্ত দম। অনেকক্ষণ ধরে সে নেচে চলছিল, থামার লক্ষণ ছিল না। সে কয়েক পরত পোষাক পরে এসেছিল। নাচের সাথে সাথে সে শরীরের পোষাক একটা একটা করে খুলে ফেলছিল । এতে দর্শকসারিতে তুমুল উন্মাদনা উঠছিল। কাপড় খোলা প্রায় শেষ হয়ে গেলে সে দর্শক সারির খুব কাছাকাছি গিয়ে ঝুঁকে পড়ে নাচতে থাকল । সারা প্যান্ডেলের লোকজন যেন তখন মঞ্চের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। শুকুর আলী স্থির থাকতে পারল না। সে তার হাত প্রসারিত করে মেয়েটির হাতে একটি একশত টাকার নোট গুঁজে দিল। মেয়েটি তখন খুশি হয়ে শুকুরের সাথে করমর্দন  করল। বাঁশ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রাপালা কমিটির ভলান্টিয়ার কটমট করে তাকাল  শুকুরের দিকে । শুকুর  এটা খেয়াল করে থতমত  খেয়ে একটু কাঁচুমাচু ভাব করে দ্রæত আসনে বসে পড়ল।

হাঁপানি  রোগে আক্রান্ত অস্থিচর্মসার ভিখারি আবেদ  লেংড়াকে দেখলাম। দেখে আফসোস করছিলাম। হায় মানুষের শরীর মরে গেলেও দেখি মন মরে না। কেন এসেছে সে এসব দেখতে?  ভিখারি সে! আমার বাম পাশে সে তখন বসা । বিড়ি খাচ্ছে। বিড়ির ধোঁয়ার গন্ধ আমার একদম ভাল লাগত না ( এখন অবশ্য সিগারেট খাই)। আমি বিরক্তি সহকারে তার দিকে তাকালাম। সে খুক খুক করে কাশছে ,নাকি মেয়েটির ভাব-ভঙ্গি দেখে হাসছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। একটা লাল রঙের গামছা দিয়ে  সে তার মুখটাকে ঢেকে রেখেছে। কিন্তু আধো আলোর ঝলকানিতে ক্ষুদে ইঁদুরের চোখের মত চিকচিক করছে তার চোখ দুটো । কপালের গহীন গর্তে ঢুকে থাকা তার দুচোখে যেন অনেক সুখ। ছোটবেলা থেকে আমি তার  বেদনার্ত মুখটাই দেখে এসেছিলাম। আগে তার মলিন মুখ দেখে মনে হতো সে ভেতরে ভেতরে অনেক অসুস্থ, বেশিদিন বাঁচবে না, মারা যাবে কিছুদিনের মধ্যেই । কিন্তু তখন দেখছিলাম যে,লোকটার  চোখে-মুখে কোনো বেদনা নেই। অনেক খুশি সে,অসুখ-বিসুখ হঠাৎ-ই যেন উধাও হয়ে গিয়েছে তার জীবন থেকে।

 ভিখারি আবেদ নেংড়া আল্লাহ-রাসুলের নাম নিয়ে কান্না কান্না স্বরে আমাদের বাড়ির গেটে এসে হাঁক দিত। আমি ছোটবেলা থেকে দেখে  এসেছিলাম  এটা। সাধারণত চাউল চাইত সে। মা তাকে চাউল দিত, অবশ্য খাবারও দিত মাঝে মাঝে । মা ব্যস্ত থাকলে বলতো , “আজকের মতো মাফ করোগো বাপু।” কিন্তু তখন সে না শোনার ভান করত। বোঝাতো চাইত যে, সে কানে কম  শোনে। তারপর সে এক নাগাড়ে আল্লাহ-রসুলের নাম নিয়ে সুর করে একটা গজল গাওয়া শুরু করতো। অথবা,যদি তাকে ভিক্ষা দেয়া হয় তাহলে আমার মায়ের সন্তানদের নেক হায়াত-দারাজ হবে, পরিবারের আয়-রোজগারে বরকত হবে, জীবনের সমস্ত গোনাহ মাফ হবে ইত্যাদি কথা সুর করে জালছার বক্তাদের মত বলতে থাকতো। তার এসব ওয়াজের মত করে বলা কথাগুলো শুনতে আমার বেশ ভাল লাগত। আমি মাঝে মাঝে দৌড়ে গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করতাম : “মা, আমি ভিক্ষে দিয়ে আসি?” মা আমাকে বলত, “যা দিয়ে আস, লোকটা ভিক্ষে না লিয়ে যাবি ননে, ঠ্যাঁটা আছে।” তক্ষুণি আমি তাকে বেতের তৈরি একটা গোল পাত্র, যেটা দিয়ে মা ভাত রান্নার জন্য কতটুকু চাল  নিতে হবে তা পরিমাপ করত, সে পাত্রটি ভরে তাকে চাউল দিয়ে আসতাম। কতটুকু চাউল দিতাম তা মাকে দেখাতাম না । দেখলে নিশ্চিত মায়ের চোখ ছানাবড়া হয়ে যেত এবং অনির্দিষ্টকালের মতো ঐ কাজ থেকে অব্যাহতি দিত আমাকে  ।  যা হোক, তারপর লোকটি তার ঝোলাতে তৎক্ষণাৎ চাউল ঢেলে নিয়ে দ্রæত প্রস্থান করতে চাইত। আমি তাকে আরো একটু ওয়াজ করার জন্য অনুরোধ করতাম। বলতাম যে, সামনে আমার পরীক্ষা,আমার জন্য সে যেন দোয়া করে। সে তখন ঘন ঘন কী সব বলে দ্রুত প্রস্থান করত। আমি ভাবতাম, আমার জন্য সে অনেক দোয়া করেছে। আরও ভাবতাম যে , লোকটি যদি মাদ্রাসায় পড়ত, ফাজিল কামিল পাশ করত,তাহলে  সে অনেক বড় বক্তা হতে পারতো। লেখাপড়া না শিখে শুধুমাত্র হুজুরদের ওয়াজ শুনে সে যদি মানুষের মন গলিয়ে ভিক্ষা আদায় করতে পারে,তাহলে লেখাপড়া শিখলে জালছায় ওয়াজ করে প্রতিষ্ঠানের জন্য সে কাড়ি কাড়ি টাকা দান-হাদিয়া সংগ্রহ করে দিতে পারত। এতদঞ্চলের মধ্যে সে শ্রেষ্ঠ বক্তা হিসেবে পরিচিতি পেত। তখন জালছার প্রচার-প্রচারণার মাইকে তার নাম হয়তো ঘোষিত হতো — কোকিল কন্ঠী বক্তা গাউস কুতুব শাহ সুফি হযরত মাউলানা মোহাম্মদ আবেদ হোসেন রহমতপুরী ছাহেব। তখন হয়তো তার নামের শেষে লেংড়া শব্দটি থাকত না।

 ছোটবেলা থেকে লোকটাকে আমি একইরকম দেখে আসছিলাম। সে তখনও সেই একই রকম বৃদ্ধ ছিল–দাঁতবিহীন,পাকা দাড়ি, মাথায় টাক, চামড়া কুঁচকানো আর সবসময় দুঃখ-দুঃখ মুখ। তারপর থেকে সাত-আট বছর পার হয়ে গিয়েছিল অথচ কোনো পরিবর্তন ছিল না তার দেহে। একইরকম বৃদ্ধ ছিল সে। বৃদ্ধত্বের বোধ হয় একটা মাত্রা আছে, যার চেয়ে অধিক বৃদ্ধ হওয়া যায় না । লোকটিকে দেখে মনে হচ্ছিলো, যতটুকু বৃদ্ধ সে হয়েছে তার চেয়ে অধিক বৃদ্ধ আর কখনও হবে না। অথচ লোকটির বয়স তখন ৭০ পার হয়ে গিয়েছিল। গ্রামে একজন মহিলা ছিল, ছলিমের দাদি ছিল সে, তার বয়সও তখন ১০০ বছরের বেশি হয়ে গিয়েছিল এবং সেও ভিক্ষুক ছিল । ভাবছিলাম, ভিক্ষুকদের বোধ হয় রোগ-শোক কম হয়। কেন কম হয়? আমার দূর সম্পর্কের মামাত ভাই ড. ইমতিয়াজ, যিনি পীরবিরোধী  ছিলেন এবং যার দুইটি ডক্টরেট ডিগ্রি ছিল , যার সম্পর্কে পূর্বেই কিছুটা বলেছি, তিনি বলতেন যে, তিনি গবেষণা করে পেয়েছেন যে, বাংলাদেশে শুধুমাত্র ভিখারিদের গড় আয়ু বাংলাদেশের ধনী মানুষের গড় আয়ুর চেয়ে দেড়গুণ বেশি।  এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন,ধনীরা মাংস খায় বেশি এবং টেনশন করে বেশি। অন্যদিকে ভিক্ষুকেরা মাংস খায় কালেভদ্রে আর দুঃশ্চিন্তা করে না। তিনি আরও বলেছিলেন যে, গ্রামের ভিখারিদের গড় আয়ু শহরের ভিখারিদের গড় আয়ুর চেয়ে আরো প্রায় ১৫ বছর বেশি, কারণ, গ্রামের ভিখারিরা শহরের ভিখারিদের চেয়ে বেশি হাঁটে ।

  লোকটি খুক খুক করে কাশছিল। একই সাথে মঞ্চের উপর নৃত্যরতা মাংসল শরীরের মেয়েটির দিকে পিট পিট করে তাকাচ্ছিল সে। তারপর মঞ্চের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই সে তার পকেটওয়ালা  মোটা উলের সোয়েটার থেকে আরেকটা বিড়ি বের করে নিপুন হাতে আগুন লাগিয়ে শোঁ শোঁ শব্দ করে টানতে শুরু করল। হাড় কাঁপানো শীতের দিনে গ্রামের কামলা-শ্রমিকেরা বিড়িতে এ ধরনের টান দেয়াকে বলে সুখটান। মেয়েটির নাচ দেখে সে নিশ্চয়ই পরম সুখ পাচ্ছে, আমি ভাবছিলাম এটা। যা হোক, মেয়েটি ততক্ষণে নাচতে নাচতে একেবারে আমার সামনে চলে এসেছিল। মেয়েটির ঘামে ভেজা শরীরের গন্ধ আর পারফিউমের গন্ধ মিলে এক অদ্ভুত গন্ধ তখন চারপাশে। সে গন্ধটা দমকা হাওয়ার মতো আমার নাকে এসে লাগল। আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।  তারপর আমার অনিচ্ছা দেখে মেয়েটি ভিখারি লোকটির দিকে ঝুঁকে পড়ে অসম্ভব বিশ্রীভাবে নাচতে  শুরু করল।  তার প্রতি আমি অনিচ্ছা দেখিয়েছি বলে সে বেজায় ক্ষেপে গিয়েছে।  যেন সে  ঐরকম বিশ্রীভাবে নেচে আমার উপেক্ষার প্রতিশোধ নিতে চায়। সারা মঞ্চের লোকজন  যেখানে তার স্পর্শ পাওয়ার জন্য পাগল, আর আমি কিনা তার দিকে থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছি, এ অপমানে সে যেন তখন একেবারে উন্মত্ত হয়ে গিয়েছে। প্রত্যেক মানুষই তার নিজস্ব পেশাতে স্যাটিসফেকশন চায়, সে হয়ত আমার কাছ থেকে এরকম অবহেলা আশা করেনি।  যা হোক,ভিখারি লোকটি তখনও মেয়েটির নাচ দেখে দাঁতবিহীন মুখে হা করে তাকিয়ে আছে আর মেয়েটি তার মুখ থেকে মাত্র এক ফুট দূরত্বে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে তার দেহের উপরিভাগে অবিরাম ঝাঁকুনি দিয়ে যাচ্ছে। এরকম দেখে লোকটি তার মাথা সামনের দিকে আরো একটু এগিয়ে দিল। মেয়েটি  তখন লোকটির দাড়ি টেনে ধরে বার কয়েক ঝাঁকুনি দিয়ে আদর করে পাতি হাঁসের মতো দুলে দুলে চলে গেল কালো পর্দার আড়ালে। অশ্লীল গানটা  অবশ্য তখন থেমে গেছে।

তারপর আরেকটি মেয়ে আসলো। তবে তাকে মেয়ে না বলে মহিলা বলাই যুক্তিসঙ্গত হবে। সে একটি হিন্দি গানের সাথে নাচ শুরু করল। খুবই বাজে তার অঙ্গভঙ্গি।  কিন্তু দর্শকরা তার অঙ্গভঙ্গিতে যারপরনাই মজা পাচ্ছিল। ছলিম মহিলার দিকে তাকিয়ে  নেশাগ্রস্থের মতো কী যেন আবোলতাবোল বকছিল। ওসব দেখে হঠাৎ আমার বমি  পেল। মঞ্চে বসেই আমি তখন মহিলাটির জায়গায় আমার পরিচিত কয়েকজন মহিলাকে কল্পনা করলাম। আমি কল্পনা করলাম যে, আমার খুব কাছের  প্রতিবেশি কাজেম উদ্দীন এর তিন ছেলের বউয়েরা অথবা পাড়ার দূরন্ত বিধবা মহিলা সালেকা যদি স্টেজে উঠে গিয়ে ঐ মহিলাটির মতো করে নাচে, তাহলে তাদেরকে কেমন দেখাবে, অথবা স্কুল-পড়ুয়া উঠতিবয়সী যুবতী মরিয়ম, কিংবা শাহনাজ ,যাকে আমি মনে মনে ভালবাসি , সে যদি  স্টেজে উঠে কমবয়সী  ঐ মেয়েটির মতো নাচে তাহলে কেমন দেখাবে?  আমি চোখ বুজে দেখতে  পেলাম যে,কাজেম উদ্দীনের ছেলের বউগুলো, সালেকা, মরিয়ম এবং শাহনাজ পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী-ওরা কেউই যেন মানুষ নয় এবং ওদের জন্য কোনো সন্তান,স্বামী,পরিবার, পিতা-মাতা, ভাইবোন কোনোকিছুই নেই। ওরা  কোনো মানবেতর নিকৃষ্ট সত্ত্বা।

 মেয়েগুলি যে এত বড় নির্লজ্জ,  বেহায়া,নিকৃষ্ট হতে পারে তা ভাবতে আমার কষ্ট লাগছিল । আমি ছলিমকে না বলেই রাত্রের অন্ধকারের  ভেতর দিয়ে বাড়ি ফিরে আসলাম। কিন্তু আমার সহসা ঘুম পেল না। ফলে পরদিন বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠলাম। তারপর আমি আমার সামনে যে মেয়েকে বা মহিলাকেই দেখলাম,  ঘৃণা হতে লাগল। আমার নিজের মা, বোন,চাচাতো বোন নাছিমা, সবাইকে দেখে আমার অন্যরকম মনে হতে লাগল। আমি যেন তাদেরকে চিনি না। আমার কাছে মনে হতে থাকল যে, পৃথিবীর সব মেয়েরাই ভেতরে ভেতরে ঐ যাত্রাপালার মেয়েদের মতন ঐ একইরকম নির্লজ্জ ও বেহায়া হওয়ার  গোপন ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রচণ্ড ঘৃণাবোধে আক্রান্ত হয়ে আমি তখন এ ধারণায় পৌঁছে  গেলাম যে ,আসলে প্রকৃতিগতভাবে মেয়েদের  নষ্ট হওয়ার প্রবণতা বেশি; তারা স্বেচ্ছায় এবং খুশীমনে নষ্ট হতে পারে এবং তারা তার জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনাও করে না। অবশ্য আমি এটাও  তখন বুঝতে পারছিলাম যে ,আমি বোধ হয় অতিরঞ্জিত  ভাবছি আর সেজন্যই হয়ত আমার মতো ছোট বয়সীদের জন্য এইসব দেখা নিষিদ্ধ।

  পরদিন বিকেলে শুকুর আলীর সাথে দেখা হলো আমার। দেখি,সে আসরের নামাজের জন্য অযুখানায় বসে অযু করছে। সে অযুতে নিমগ্ন কিন্তু তার মুখ কেমন যেন মলিন। সে তার হাত বেশ যতœসহকারে ধুয়ে পরিষ্কার করছে।  হাত ধোয়াতে সে নিবিষ্ট। যেন বহুকালের পুরাতন ময়লা তার হাতের চামড়ার সাথে যেন আঠার মতো লেগে গিয়েছে আর সেই কালি-ময়লা পরিষ্কার করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। সে কি হাত ধোয়ার সময় গতরাত্রের নর্তকী মেয়েটির হাত স্পর্শ করার কথা ভাবছে? অথবা মেয়েটির হাতের ভেতর টাকা গুঁজে দেয়ার কথা?  আমার মনে আরও প্রশ্ন জাগল, সেদিন শুকুর আলীর জালছায় দেয়া একশত টাকা আর গতরাত্রে যাত্রার প্রায়-উলঙ্গ নর্তকী মেয়েটিকে দেয়া একশত টাকা-এ দুই দেয়ার মধ্যে আদৌ কি কোনো মিল আছে ? শুকুরের মত এত গরীব একজন মানুষ, যে সারাদিনমান খেটে সামান্য কিছু টাকা উপার্জন করে, হুজুরের জালছা শুনে সে সেই টাকার পুরোটাই হুজুরকে দান করে দিয়েছে, আবার একইভাবে সে তার সারাদিনের কষ্টার্জিত টাকা যাত্রাপালার নর্তকীর দেহবল্লরীতে আকৃষ্ট হয়ে দিয়ে দিয়েছে –এ দুই ’দেয়া’র মধ্যে কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে? এই দুই দেয়ার মধ্যে মিল-অমিল কোথায় ? উভয়ক্ষেত্রেই সে তার অভুক্ত সন্তান-সন্ততি,স্ত্রীর কথা কেন একবারও ভাবেনি,  কেন তার ¯ত্রীর শাড়ি কেনার কথা ভাবেনি । সে কি সজ্ঞানে, সুস্থমস্তিষ্কে ও জেনে-বুঝে টাকাগুলি দিয়েছে নাকি উভয়ক্ষেত্রেই সে তাৎক্ষণিকভাবে মোহগ্রস্থ হয়ে টাকাগুলি দিতে বাধ্য হয়েছে ? এরকম অনেক প্রশ্ন আমার মনের মধ্যে ধেয়ে আসছিল। আমি তাৎক্ষণিকভাবে তখন কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

 মাদ্রাসার বার্ষিক ইছালে ছওয়াব অনুষ্ঠানে ওয়াজ করা পীর সাহেবের বয়ানের কথা মনে পড়ল আমার।   তিনি কোনো একটা বয়ানে বলেছিলেন যে, কোনো কোনো মানুষের নফস ভাল ও মন্দ দুটো কাজই একসাথে করে । পীর সাহেবের এ কথাটাকে আমি শুকুর আলীর সাথে মেলালাম।  মেলাতে গিয়ে দেখলাম যে,শুকুর আলী যাত্রাপালায় মেয়েদের নাচ দেখে আবার জালছাও শোনে।  দ্বিত্ত্ব স্বভাব তার। সে নর্তকীর নাচ দেখে আপ্লুত  হয়ে তার হাতে টাকা গুঁজে দেয়, আবার জালছা শুনে কেঁদে-কেটে হুজুরের হাতেও টাকা দেয়।  এইবার আমি আমার নিজের দিকে তাকালাম। দেখলাম,  শুকুর আলী আর আমার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তার  মতো আমিও জালছা শুনি,আবার সিনেমা দেখি। তার মতো আমারও দ্বিত্ব স্বভাব আছে।  এই সমাজে ,এমনকি  এই পৃথিবীতে, শুকুর আলীর মত লোক বা আমার মতো দিত্ব স্বভাবের লোকই বেশি। আমি আমার পাড়ায় পাঞ্জেগানা নামাজ পড়া কৃষককে জমির আইল ঠেলতে দেখেছি। হজ্জ্ব করে আসা ব্যক্তিকেও নিদারুণভাবে গীবত করতে দেখেছি। যদিও তারা জানতো যে, জমির আইল ঠেলা বা গীবত করা শক্ত গুনাহের কাজ। তবুও তারা এগুলো করতো। জেনে-বুঝেই করতো। তাদের ভুল দেখিয়ে দিতে গেলে তারা বলতো যে, তারা মূর্খ বা অশিক্ষিত,তাই না বুঝে করেছে। তারা বুঝাতে চাইতো যে, না বুঝে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে  গুনাহ করলে কোন পাপ নেই। একজন মানুষ আরেকজনের জমির আইল ঠেলবে আর যখন  সে বলবে যে, সে না বুঝে করেছে-বিষয়টা তখন মেনে নেওয়া যায় না। আমার বিশ্বাস এমন ছিল যে, অপরাধ করার প্রাক্কালে মূর্খ ও শিক্ষিতের একইরকম উপলব্ধি হয়। সৃষ্টিকর্তা কমপক্ষে এ বোধটুকু দিয়ে মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।

 যাত্রাপালার কাহিনী এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু না, এ কাহিনীর সাথে একটি মর্মন্তুদ ঘটনা ছিল। আমার যাত্রা দেখার চার-পাঁচদিন পরের ঘটনা ছিল এটা। সেদিন সকালে দেখলাম, দরবেশ কাকা,কাজেম উদ্দীন,শমসের খাঁ,খুনে মজিদসহ আরো কয়েকজন খুব চিৎকার করছে। গ্রামে যাত্রাপালা বন্ধ করার কথা বলছে তারা । কেরামত  শেখের বাড়ির সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে তারা কথাগুলো বলছে যাতে কেরামত শেখ ও তার ছেলেগুলির কানে কথাগুলো ঢোকে। চেঁচামেচি শুনে আনোয়ার মনোয়ারসহ কেরামত শেখের চার ছেলে একযোগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো । তাদের ভঙ্গি আক্রমনাত্মক। কার এত স্পর্ধা চেয়ারম্যান বাড়ির বাড়ির সামনে এসে উল্টাপাল্টা বলছে! দেখলাম, মনোয়ারের হাতে লাঠি। তারা ধমক দিয়ে বাড়ির সামনের রাস্তা থেকে  সবাইকে সরে যেতে বলল। এ চার ছেলেকে গ্রামের সবাই তখন ভয় পেত। এলাকার এম.পি তাদের বাড়িতে এসে  দাওয়াত খেত। ফলে এ চার ছেলের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস  পেত না। কেউ কিছু বললে তার নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হতো।

দরবেশ কাকা ছেলেগুলোর কাছে গিয়ে বিষয়টা আপোষে বুঝানোর চেষ্টা করলেন। কাকা বললেন, “ইডা পীর-মাশায়েখের গিরাম। এহানে এসব চলবি লয়। খারাপ মেয়েমানুষ নিয়ে এসে নর্তন-কুর্দন বেহায়াগিরি চলবি লয়, যুবক পোলাপান সব নষ্ট হয়া যাতেছে, এসব তাম্শা বন্ধ করতি হবি।” ছেলেগুলো কাকার কথা শুনে গেল কিন্তু কিছুই বলল না। অতঃপর শমসের খাঁ যেই না কিছু একটা বলতে গেছে, ঠিক তখনি তারা শমসের খাঁর দিকে একযোগে তেড়ে গেল। তাদের তেড়ে যাবার কারণ হলো, শমসের খাঁকে তারা তাদের মতই ভাবে বা তাদের নিজেদের চেয়ে আরো বেশি খারাপ ভাবে। হিন্দুপাড়ায় সারাজীবন গান-বাজনা করে এসে মাত্র দুইদিনের মুসুল্লী হয়ে সে যাত্রাপালা বন্ধ করতে এসেছে, বিষয়টি তারা মেনে নিতে পারছিল না। তারা সবার কথা শুনতে পারে কিন্তু শমসের খাঁর কোনো উপদেশ বা কথা শুনতে একদম নারাজ। শমসের খাঁকে পেটাতে উদ্যত হলো তারা । ঠিক এসময় খুনে মজিদ তাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে  গেল। সে হুংকার দিয়ে বলল, “খবরদার ,একপাও এগুবি না,যদি আগাস সবগুলানরে খুন করে ফেলাবো”। খুনে মজিদের এমন ভাব দেখে চার ভাই পিছিয়ে গেল। তারা যত প্রভাবশালীই হোক,তাদের চার ভাইয়ের কারোরই তো খুন করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। মজিদের আছে। বেশ কয়েক বছর আগে সে হিন্দুপাড়ায় বিশ্বজিৎ দাস নামক এক ব্যক্তিকে ছুরি মেরে হত্যা করেছে। পাঁচবছর জেলও খেটেছে।  বছর দুয়েক আগে মাত্র ছাড়া পেয়েছে সে। তারা খুনে মজিদের চোখরাঙানিতে ভয়  পেয়ে লেজগুটিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল।ভাবলাম, যাক,খুন করার ফলে সমাজ মজিদকে যে সার্টিফিকেটটি দিয়েছে, তাকে যে ‘খুনে মজিদ’ উপাধি দিয়েছে, তা আজ বেশ কার্যকর হলো বটে।

 তারপর আরও কয়েকদিন ধরে একটানা যাত্রানুষ্ঠান চলল। পীরসাহেবের মুরিদদেরকে বা শমসের খাঁকে যাত্রাপালা বন্ধ করার আর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখলাম না।  এ সময়কালের মধ্যে শমসের খাঁকে যথারীতি গোরস্তানের ভেতরে জিকির করতে দেখতাম  শুধু। খুব ভোরে ঘুম ভাঙলে যাত্রাপালার মাইকে গান-বাজনার শব্দ শোনা যেত , একই সঙ্গে আবার গোরস্তান থেকে শমসের খাঁর জিকিরের আওয়াজও শোনা যেত। এদিকে আমাদের রাখাল ছলিম তখন কোনো রাত্রেই যাত্রাপালায় মেয়েদের নাচের  শো দেখা বাদ দিত না। সারারাত ধরে সে যাত্রা দেখত আর সারাদিন ধরে ঝিমাত।

এভাবেই যাত্রানুষ্ঠান চলছিল।  তদসঙ্গে ব্যাপকভাবে চলছিল  চর্কা জুয়া এবং গাঁজা সেবন। কিন্তু একদিন যাত্রাপালায় নাচের অনুষ্ঠানে বড় একটা দূর্ঘটনা ঘটে গেল। ঘটনার পরের দিন সকালে ছলিমের কাছ থেকে আমি সেই ঘটনার বিবরণ জানতে পারলাম। যেন বিশেষ কিছু হয়নি এমনভাবে ছলিম সে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিল আমার কাছে:

“ সালার কুত্তেডা যে ক্যাবা করে প্যান্ডেলের মধ্যি ঢুহে পড়েছিলে, কেউ এহনও বুঝবের পারতেছে না, বুচ্ছেও। আর সে কি যেবা-সেবা কুত্তে নাকি , ওরে বাপরে কালা মিচমিচে!  আমার তো মনে হয় কুত্তে লয়, ওডা একটা আযরাইল।  মেয়েডা ফাল পারতি পারতি ক্যাবা করে  যে মরে গেল, ইস!” ছলিম বলেই চলছিল।  কিন্তু আমি তখন ভাবছিলাম কালো কুকুরটির কথা। ভাবছিলাম যে,এ কালো কুকুরটি কি সেই কুকুর যে আমাকে আঁতুর ঘর থেকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল গোরস্তানে? তবে ভাবছিলাম, আমার বয়স তো বারো-তোরো হয়ে গেছে, এতদিন তো সেই কুকরের বাঁচার কথা না। একটা কুকুর কি এতদিন বাঁচে?

ছলিম বলেই চলল ঘটনাটা:

 মেয়েদের দলগত খেমটা নাচের এক পর্যায়ে হঠাৎ করে কালো মতন একটি কুকুর যাত্রার প্যান্ডেলে ঢুকে পড়ল। তারপর কুকুরটিকে একজন ভলান্টিয়ার তাড়া দিলে সেটি দিশা না পেয়ে  দৌড়ে মঞ্চে উঠে পড়ল এবং এটি মেয়েদের দলগত নাচের মাঝখানে পড়ে  গেল। কুকরটিকে দেখে তখন মেয়েগুলি ভয়ে বেদম চিৎকার দিয়ে মঞ্চের উপর এলোপাথাড়ি দৌড়াতে থাকল। কুকুরটিও পথ না পেয়ে চক্রাকারে এলোপাথাড়ি ঘুরতে থাকল। মেয়েগুলির এমন বেগতিক অবস্থা দেখে দর্শকরা তখন মজা পেয়ে হো হো করে হাসতে থাকল। তারা কেউ এগিয়ে আসলো না সাহায্য করতে। আসলে তারা বুঝতে পারেনি যে এমন একটি সাংঘাতিক ঘটনা ঘটবে। এমন সময় একটি মেয়ে ভয় পেয়ে মঞ্চ থেকে লাফিয়ে দর্শকের মধ্যে পড়ে গেল আর চরম উত্তেজনায় থাকা দর্শকেরা তখন মেয়েটিকে হাতের নাগালে পেয়ে মেয়েটির উপর হামলে পড়ল। পুকুরে মরা মুরগি  ফেললে ক্ষুধার্ত আফ্রিকান মাগুরগুলো  যেমন করে মুহূর্তের মধ্যে মুরগিটিকে ছিন্নভিন্ন করে ফ্যালে, মেয়েটির অবস্থাও প্রায় সেই মুরগির মতো হয়ে গেল। তখন তুমুল হৈ-হুল্লোড়, হূলস্থূল আর চেঁচামেচির মাঝে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভলান্টিয়ার চক্রাকারে ঘুরতে থাকা কুকুরটিকে লাঠি দিয়ে সপাটে আঘাত করল। কিন্তু সে আঘাত কুকুরটির গায়ে না লেগে সরাসরি একজন নর্তকীর মাথায়  গিয়ে লাগল। তুমুল শব্দের মাঝেও আঘাতের ভোঁতা একটি শব্দ শোনা  গেল। মেয়েটি ‘ও মাগো’ বলে মঞ্চের উপর ঢলে পড়ল। সারা মঞ্চ রক্তে  ভেসে  গেল এবং মেয়েটি মঞ্চের উপরই মৃত্যুবরণ করল। কুকুরটি কোন্ ফাঁক দিয়ে যে পালিয়ে গেল তা কেউ দেখল না। মেয়েটির লাশকে ঘিরে তারপর যাত্রাদলের সমস্ত লোক হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। সমস্ত দর্শক তখন ভয় পেয়ে যাত্রার প্যান্ডেল ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু সবার অগোচরে আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল: যাত্রাদলের যে মেয়েটি দর্শকদের মধ্যে লাফিয়ে পড়েছিল তাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না।

ছলিমকে তখন  জিজ্ঞাসা করলাম, এখন তো কেবল সকাল, খোঁজাখুঁজি করলে মেয়েটিকে পাওয়া যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে আমার তখন নাছিমা আপার হারিয়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিলো যে,এখানে ভৌতিক কিছু একটা আছে।

 ছলিম বলল,  অনেক খোঁজা হয়েছে,পাওয়া যায় নাই।

 যা হোক,তারপর দুপুরের দিকে শুনতে পেলাম যে, কেরামত শেখ ও তার চার ছেলেকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।তাদের বিরুদ্ধে  অভিযোগ হয়েছে যে, তারা প্রশাসনের অনুমতি ব্যতিরেকেই যাত্রাপালার নামে অশ্লীল নাচ-গান ও জুয়ার আসর বসিয়েছিল। কেরামত শেখকে গ্রেফতার করা হয়েছে এ অভিযোগে যে, সে তার  লোকজন দিয়ে মেয়েটির লাশ যাত্রাদলের লোকজনের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গায়েব করতে  চেয়েছিল । তাদের  গ্রেফতারের খবর শুনে ভাল লাগলো কিন্তু এটা জেনে দুঃখ লাগল যে, যাত্রাদলের যে মেয়েটি হারিয়ে গিয়েছে, তাকে নাকি ‘যাত্রাদল থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে পালিয়ে গেছে’ বলে পুলিশের খাতায় নথিভুক্ত করা হয়েছে।

 তারপর কেরামত শেখ ও তার চার ছেলে মাত্র দুই মাস জেল-হাজত  খেটেছিলো। এরপর কোনো এক অদৃশ্য শক্তির বলে জামিনে বেরিয়ে এসেছিল তারা। তার কিছুদিন পরেই শোনা গিয়েছিল যে,বাদী পক্ষের সাক্ষী না থাকায় কেস ডিসমিস হয়ে গিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.