আমার মুরিদজীবন।। সেকশন-5, মেডিক্যাল কলেজ

 4,915 total views

আমার মুরিদজীবন; সেকশন-5

তিথি নাটকটি শুরু হওয়ার আধা-ঘণ্টা আগে পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, আমি যেন তাকে দোয়া করি। তারপর এক ঝটকায় আমার ডান হাতটা তার মাথার উপর নিয়ে বলল,“দোয়া করো!” আমি  তখন ভাবলাম, সে তো হিন্দু, আমি তাকে কী দোয়া করব!  বড় জোর  সে আর্শীবাদ চাইতে পারে। আজব তো!  কিন্তু সে আমার হাতটি তার মাথার উপর ধরেই রাখল।  ছাড়ল না। অগত্যা একটি সুরা পড়ে তাকে দোয়া করে দিলাম। তারপর সে আব্দার করল, আমি যেন তার কপালে একটা চুমু দিই। বললাম,  “মেকাপ নষ্ট হয়ে যাবেতো !” সে তবুও নাছোড় হয়ে চোখ বুজে কপালটা আমার সামনে ধরে রাখল। আমি  খুব সাবধানে আলতো করে তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালাম। কিন্তু তিথি তখন আমার ঘাড় জাপ্টে ধরে ফেলেছে। সে চাচ্ছে না যে আমি তার কপাল থেকে আমার ঠোঁট তুলে ফেলি। আমি কিছুটা চেষ্টা করলাম বটে কিন্তু পারলাম না। তার বাহুতে অসম্ভব শক্তি। এদিকে আমিও আমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি। তার শরীর দিয়ে পাগল করা একটা সুগন্ধ ভেসে আসছে। হঠাৎ আমার কী হলো জানি না ।

আমি দেখলাম, হাজার হাজার বানরজাতীয় প্রাণী আমাকে ধাওয়া করছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে পাথরের চাঙর। আমি ভয়ে একটা সমুদ্রের পাশ দিয়ে দৌড়াচ্ছি। কয়েকটা বানর আমাকে প্রায় ধরে ফেলেছে। তারা পাথর দিয়ে আমার মাথা থেৎলে দেবে। এমন সময় সাদা জোব্বা পরা একজন মুরুব্বী বানরদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে  গেল। বানররা কিছুক্ষণ মুখব্যাদান করে, বিভিন্ন আক্রমনাত্মক ভঙ্গি করে, কিচকিচ শব্দ করে পালিয়ে  গেল তারপর।

তারপর দেখলাম তিথি বলছে,“এই তুমি এতো কাঁপতেছো কেন? কী হয়েছে তোমার!” আমি তাকে কিছু না বলে ইশারা করে ঘড়ি দেখালাম। বোঝালাম যে, তার দেরি হয়ে যাচ্ছে। সে তখনও বিষ্মিত। চোখে জিজ্ঞাসা। আমি তাকে মঞ্চে যেতে ইশারা করলাম। সে মঞ্চের পেছনে পাত্র-পাত্রীদের বসার  নির্দিষ্ট স্থানে চলে  গেল।

অভিনয় শুরু হয়েছে। একের পর এক অঙ্ক পার হয়ে যাচ্ছে।  মনে হচ্ছে,আমার লেখা ডায়ালোগগুলি যেন প্রাণ ফিরে  পেয়েছে। এটা দেখা অনেক আনন্দের কিন্তু আমার ভেতরে তখন ভাংচুর চলছে। আমি শুধু ভাবছি, তিথি কেমন করে মুসলমানদের সব কালচারকে রপ্ত করে ফেলেছে– সে আমার কাছে এসে কিভাবে বলল যে আমি যেন তাকে দোয়া করি, তারপর সে আবার আমার হাত তার মাথার উপরে তুলে নিল। এটা আবার হিন্দুয়ানী আর্শীবাদ পদ্ধতি। সে কিভাবে দুটো ধর্মকে এক করে মানিয়ে চলছে। আবার সে আমাকে ভালবেসেছে। হ্যাঁ,ভালোই বেসেছে বলব আমি। এখানে অন্য কিছু ভাবার সুযোগ নেই। ভালবেসেছে বলেই সে তার জীবনের  প্রথম অভিনয়ের শক্তি আমার কাছ থেকে নিতে চেয়েছে। এ মেয়েটির কাছ থেকে দূরে সরে থাকার সাধ্য আমার নেই।  সে যেন এই সামান্য সময়ের মধ্যে আমার স্নায়ুতন্ত্রের সাথে মিশে গিয়েছে। কিন্তু তাকে স্পর্শ করলেই আমার কেন এমন হয়? আমি কেন হেলুসিনেশনে ঢুকে পড়ি?  আমার কানে কেন গায়েবী আওয়াজ  ভেসে আসে? বানররা কেন আমাকে আক্রমন করে?

তিথি মঞ্চে। সে এখন স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করছে, সেই জর্জেট শাড়ি পরিহিত। প্যালপিটেশন বেড়ে যাচ্ছে আমার ।  ভাবছি, কিছুদিন আগেও সে আমার ছিল না, আর  এ তিথি এখন আমার তিথি। আমি চাচ্ছি সে আরো সুন্দর করে অভিনয় করুক। আরো সাবলীল করে। তার প্রশংসা মানে আমার প্রশংসা, তার ভালো মানে আমার ভালো, তার কষ্ট মানে আমার কষ্ট। সে জর্জেট শাড়িটা পরে মঞ্চে  হাঁটছে আর ডায়ালোগ আওড়াচ্ছে। হাঁটার তালে তালে মঞ্চটা যেন ঢেউয়ের মতো দুলছে। আমি তার কপালের দিকে তাকালাম। সেখানে আমার চুমুর দাগ দেখা যাচ্ছে কি? না, দেখা যাচ্ছে না। সে বোধ হয় আবার সেখানে মেকাপ লাগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আমার ঠোঁট এখনও তার মেকাপে চটচট করছে।  ভাবছি ,করুক,এতে সমস্যা নেই। আমার মনে হচ্ছে,চুমু খাওয়ার অনুভুতিটা মেকাপ লেগে থাকলে আরো বেশিক্ষণ সাসটেইন করবে। প্রিয়তমার  ঠোঁটে চুমু খাওয়ার চেয়ে কপালে চুমু খাওয়ার ফিলিংসটা যেন আরো বেশি গভীর, এখানে চুমু খাওয়ার সাথে সাথে যেন হৃদয়ের একটা সম্পর্ক তাৎক্ষণিকভাবে স্থাপন হয়ে যায়।

তিথি মঞ্চে  তার স্বামীর সামনে। স্ত্রীর অভিনয় করছে সে। স্বামীকে সোহাগ করে কথা বলছে সে । কী যে তার ঢঙ ।  দেখে হিংসা হচ্ছে আমার। তার কণ্ঠের এই অভিব্যক্তি যেন আমার অনেককালের পরিচিত। আহ্লাদী, জড়ানো টাইপের। সাধারণত ঘুম থেকে ওঠার পর পর কণ্ঠে এমন ভাব আসে । ঘুমের মধ্যে যুবতীরা যেন অনেক আদর পায়, আর ঘুম ভাঙার পর পরই কন্ঠে এমন মধুমাখানো জড়তা আসে।

তিথি কি আমাকে মঞ্চ থেকে দেখছে? দেখলে হয়তো স্ত্রীর অভিনয় করতে গিয়ে লজ্জা পেতে পারে। আমি কি তাহলে সামনের সারি থেকে পেছনে গিয়ে বসব? না থাক ,দরকার নেই। এর উল্টোটাও হতে পারে। এমন হতে পারে যে,সে আমাকে দেখাতে চায় যে, আমার জীবনে এসে সে স্ত্রী হিসেবে কতটা যোগ্য হবে। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। আশ্চর্যজনকভাবে সে আমার দিকে একবারও তাকাল না।

তার অভিনয় দক্ষতায় হাততালি পড়ছে। প্রথমে সামনের সারি থেকে কে যেন একবার হাততালি দিল আর তার পরেই একযোগে অনেকে। আমার অসীম ভাল লাগলো। এ ভাল লাগাটা আমার লেখা নাটক অভিনীত হচ্ছিল বলে নয়, তিথিকে সবাই বাহবা দিচ্ছিল এ কারণে।

তিথির অভিনয় দেখে মনে হচ্ছে না যে এটা তার জীবনের প্রথম অভিনয়। সে ঠিকই বলেছিল যে, তার রক্তেই অভিনয় মিশে আছে। তার মা একজন যাত্রাপালার অভিনেত্রী। অধিকন্তু তার মায়ের নানি চিন্তারানী চৌধুরী ছিলেন নামকরা নর্তকী। জাত অভিনেতা না হলে কখনও এমন করে অভিনয় করা সম্ভব নয়।

তবে তার মা যাত্রাপালার অভিনেত্রী এটা মানতে আমার কেন যেন সংকোচ হচ্ছে। এর কারণ যাত্রাপালা সম্পর্কে আমার ছোটবেলা থেকে একটা নেগেটিভ ধারণা আছে । ছলিমের সাথে আমাদের গ্রামে যেদিন আমি যাত্রাপালা দেখেছিলাম, সেদিন থেকে মূলত এ ঘৃণাটার শুরু হয়েছিল। সেদিন মহিলাগুলি এমন নির্লজ্জতার সাথে, এমন বেহায়াপনার সাথে নেচেছিল যে, সেটা মনে হলে এখনও আমার বমি আসে। প্রকৃতপক্ষে ওটার ট্রুমাটিক ইফেক্ট আমার মধ্যে অনেকদিন যাবৎ ছিল। স্কুল লাইফের পুরোটা জুড়েই ছিল। আমি যে কোনো মহিলাকে দেখলেই ভাবতাম এ মহিলারা যতই পর্দা করুক, যতই ভদ্রতা দেখাক, তারা চুড়ান্ত রকমের বেহায়া হওয়ার ক্ষমতা রাখে। আর তারা হয়তো সবসময় এ ক্ষমতা প্রদর্শন করে না শুধুমাত্র সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে। অর্থাৎ আমি মনে করে নিয়েছিলাম যে, বেহায়াগিরি, ব্যভিচারবৃত্তি, পতিতাবৃত্তি তাদের  জন্য স্বাভাবিক প্রবৃত্তি কিন্তু পুরুষের তৈরিকৃত বিধিনিষেধের কারণে তারা সেই স্বাধীনতাটা পায় না। আমার এ ধারণাটা দীর্ঘদিন স্থায়ী হওয়ার পেছনে কিছু মেয়েলী ঘটনাও দায়ী ছিল। আমি তখন দেখতাম যে , মেয়েরা নিজেদের মধ্যে অনেক অশ্লীল কথাবার্তা বলে। কে চাচি, কে মা, কে সিনিয়র, কে জুনিয়র এগুলো তারা মানে না। সমানে অশ্লীল কথা বলে যায় তারা, হো হো করে হাসে কিংবা অশ্লীল বাক্য বলতে তারা কিছুই মনে করে না।

নাটক শেষ হয়ে গিয়েছে। সকল পাত্র-পাত্রী  বিদায় নেবার জন্য আবার মঞ্চে এসেছে। তারা দর্শকদের কাছ থেকে হাত নেড়ে নেড়ে বিদায় নিচ্ছে। তিথিও নিচ্ছে। ঠিক ঐ মুহূর্তে তিথি মঞ্চ থেকে আমার দিকে তাকাল।  দেখলাম, সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। এরপর সে আমাকে তার সাথে দেখা করার জন্য ইশারা দিল। এ ধরনের ইশারা গলায় বাধা লাগামের হ্যাঁচকা টানের মতো। এক মুহূর্ত স্থির থাকা যায় না। ছুটে  গেলাম উর্ধ্বশ্বাসে।

তিথি আমার সামনে। মঞ্চের সব আলো নিভে গেছে। আধো অন্ধকারের ভেতর দিয়ে সকল দর্শক অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। তিথি আমার হাত ধরে অডিটরিয়ামের বাইরে একটা গাছের নিচে নিয়ে গেল। কেন সে নিয়ে এসেছে এখানে!এই মুহূর্তে তো এখানে থাকা ঠিক হবে না। রায়হান স্যার, নির্দেশক, মেকাপম্যান সবার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে হবে। তাদেরকে ধন্যবাদ জানাতে হবে। প্রিন্সিপ্যাল স্যারও আমার সাথে দেখা করতে চাইতে পারেন। আমি তিথিকে বিষয়টি বললাম। কিন্তু তিথি  ততক্ষণে আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলেছে । সে আমার বুকের মধ্যে মাথা রেখে শিশুর মতো করে কাঁদছে। আমি বুঝতে পারছি তার মুখের মেকাপ, চোখের কাজল, মাশকারা সব চোখের পানিতে ধুয়ে আমার পাঞ্জাবিতে লাগছে। আমি পাঞ্জাবিটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু পারছি না। সে তার নরম মুখখানা আমার বুকের ’পর চেপে ধরে বলছে,  “বলো, তুমি আমার অভিনয়ে খুশি হয়েছো কিনা?” আমি তাকে বললাম যে, আমি অনেক খুশি হয়েছি। এটা শুনে সে তার খোঁপা, যেটা  সাজসজ্জাকারী  মহিলা অভিনয়ের পূর্বে বানিয়ে দিয়েছিল সুন্দর করে, টান দিয়ে খুলে ফেলল এক ঝটকায় । তার লম্বা ঝিরঝিরে চুল দোকানের সাটারের মতো সটান ঝপ করে নেমে গেল তার নিতম্ব পর্যন্ত। তারপর সে আমাকে জোর করে বসিয়ে দিল।

 উত্তর দিক থেকে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে তখন। সেই বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছে আর উড়ন্ত চুলগুলো আমার ঘাড়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আমার গায়ে শুধুমাত্র একটা পাতলা সুতিকাপড়ের পাঞ্জাবি। ঠাণ্ডা লাগছে আমার। এই মুহূর্তে তিথি যেন আমার ঠাণ্ডা লাগাটা বুঝতে পারল। সে তার সব শরীর দিয়ে আমাকে প্রায় দখল করে ফেলল। তার শরীরে অসামান্য ওম। আমি সে ওমে আস্তে আস্তে জারিত হতে থাকলাম। ঠোঁটে তার লিপস্টিকের ঘ্রাণ, জিহবায় চাইনিজ স্যুপের মতো একধরনের স্বাদ। চাইনিজ স্যুপের স্বাদ আমার আগে থেকেই পছন্দের।

পরদিন সকালবেলা কলেজে  গেলাম।  একটা ক্লাশ শেষ হওয়ার পরেই প্রিন্সিপ্যাল স্যার আমাকে ডাকলেন। গিয়ে দেখি,স্যারের সামনে কয়েকজন কনসালটেন্ট অধ্যাপক বসে আছেন। স্যার আমাকে বাহবা দিলেন। বললেন , সুন্দর লিখেছো তুমি। এছাড়া বললেন, তিথি মেয়েটা  কিন্তু দারুণ অভিনয় করেছে, কী বলো? বললাম,জ্বি স্যার। স্যার তিথির প্রশংসা করছিল দেখে আমার ভাল লাগছিল।  ভাবছিলাম,এ কলেজে যারা পড়ে তারা সবাই মেধাবী। তাই সহসা কেউ কারো প্রশংসা করে না। প্রশংসা পেতে হলে এক্সট্রাওরডিনারি কিছু করতে হয়।  নিশ্চয়ই আমি সেরকমই কিছু একটা করেছি। তা না হলে স্যার আমাকে ও তিথিকে  প্রশংসা করতেন না।  এরপর কিছুক্ষণের মধ্যে তিথিও এসে পড়ল স্যারের রুমে  । স্যার তিথিকে কয়েকটি প্রশংসাসূচক কথা বললেন। আমাকে যতটুকু বলেছেন, তার চেয়ে একটু বেশিই বললেন। সুন্দরী মেয়েরা যেখানে যায়,সেখানে চারপাশে একটা অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করে ফেলে। শুনেছি চাকরির ভাইভাতেও সুন্দরী মেয়েরা এ কারণে ফেবার পেয়ে থাকে। যা হোক, স্যারের সামনে তিথি আমার প্রশংসা করে কিছুটা ব্যালান্স করলো। বলল যে, একমাত্র আমার গল্পের গুণেই সে ক্যারেক্টারটিকে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে।

 অনেক ভাললাগা বোধ নিয়ে আমরা স্যারের রুম থেকে বের হয়ে এলাম। পরদিন থেকে একমাসের একটানা ছুটি ছিল। শীতকালীন ছুটি। শোনা যাচ্ছিলো  শৈত্যপ্রবাহ হবে। শৈত্যপ্রবাহ হলে শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি শীত পড়ে। তারপরও ভাবছিলাম, গ্রামে যাবই। অনেকদিন যাইনি বলে মনটা টানছিল খুব। খুন-খারাবি যতই হোক সেখানে, নিজের গ্রামতো।

গ্রামে গিয়ে দেখলাম, শীত একদম জেঁকে ধরেছে। টিভিতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে যে, তীব্র শৈত্যপ্রবাহ আসছে। আবহাওয়ার মতি-গতি দেখেও তাই মনে হচ্ছে। আমি গুলিস্তানের সস্তা মার্কেট থেকে পূর্ব-প্রস্তুতি হিসেবে মোটা উলের সোয়েটার কিনে নিয়েছি। গ্রামে গিয়ে সেটা পরেই ড. সাহেবের বাড়িতে  গেলাম।  আমি গ্রামে যাওয়ার দুইদিন আগেই ড. সাহেব অষ্ট্রেলিয়া থেকে গ্রামে এসেছেন। প্রতিবছরের ন্যায় শীতের প্রারম্ভেই তিনি এসেছিলেন। তাঁর তাড়া ছিল। কারণ তিনি  তাঁর প্রজেক্টের কাজ তখনও শেষ করতে পারেননি।

 আগের মতোই ড. সাহেব তাঁর প্রজেক্ট নিয়ে চিন্তায় আছেন। তিনি বললেন, এই শীতে তিনি গ্রামে টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কীত একটি যাত্রাপালার আয়োজন করতে চান এবং সেজন্য আমি যেন একটি স্ক্রিপ্ট লিখে দিই। ড. সাহেবের কথাটা অদ্ভুত লাগল আমার কাছে। যাত্রাপালার স্ক্রিপ্ট কিভাবে লিখতে হয়, তা তো আমার জানা নেই! কেন তিনি এটা আমাকে বলছেন? তিনি কয়েকটি খনার বচনের পুস্তিকা আমার হাতে দিয়ে বললেন, যাত্রাপালাটিতে যে বাউল ক্যারেক্টারটি থাকবে, সেই ক্যারেক্টারটিই খনার বচনের মেসেজগুলি গানের মাধ্যমে তুলে ধরবে। আরও বললেন,আফসার বাউল এ পাঠটি ঠিকমতো করতে পারবে বলে তাঁর বিশ্বাস। এই বলে তিনি হঠাৎ ’তুউউউ’ বলে লম্বা সুরে একটা ডাক দিলেন। এটা কুকুরকে ডাকার সঙ্কেত। বারান্দায় তখন অনেকগুলো কুকুর শোয়া ছিল। কিন্তু কোনো কুকুর এলো না। এলো আফসার বাউল । আমি তাকে বসার জন্য একটু জায়গা দিলাম। কিন্তু সে আমার পাশে বসল না। বসল মেঝেতে । গুঁটিসুঁটি মেরে দুপায়ে ভর দিয়ে কুকুরের মতো করে সে বসল।  তার আচরণে কুকুরবৃত্তি আরও বেশি করে দেখা যাচ্ছিল আগের চেয়ে।আফসার বাউলের মাথায় টাক কিন্তু কানের পাশ দিয়ে বেশ লম্বা চুল। ধূসর বর্ণের। চুলগুলোকে একটু দূর থেকে দেখলে মনে হয় বৃহৎ আকারের দুটি কান। কুকুরের লম্বা কানের মতো ঝোলানো। তার গায়ে গোখরা সাপের গাত্রবর্ণের একটি চাদর।  যা হোক, সে আমাকে  বোঝাল যে, সে গানে সুর দিতে পারবে,আমাকে শুধু ছন্দ মেনে লিরিকস লিখে দিতে হবে। আমি বললাম, এসব সাহিত্যিকদের কাজ, আমি পারব না। কিন্তু ড. সাহেব বললেন, আমি তো জানি তুই পারিস! পরে জানতে পারলাম যে, আমার কলেজের প্রিন্সিপ্যাল তাঁর ছোট মেয়ের শ্বশুর। কিছুদিন আগে তাঁর ছোট মেয়ের বিয়ে হয়েছে, তখন শুনেছি এটা, কিন্তু আমার কলেজের প্রিন্সিপ্যালের ছেলের সাথে যে বিয়ে হয়েছে তা জানতাম না। যা হোক, তিনি তাঁর কাছ থেকে আমার বিষয়ে শুনেছেন যে,আমি কবিতা-টবিতা লিখি, কলেজের বিভিন্ন সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করি। তিনি আরো শুনেছেন কমিউনিটি মেডিসিন এর উপর  আমার লেখা একটি নাটিকা কলেজ অডিটরিয়ামে মঞ্চস্থ হয়েছে। ড. সাহেব  ইতোমধ্যে প্রিন্সিপ্যালের কাছ থেকে নাটকটির ক্যাসেট সংগ্রহ করেছেন। এবার অষ্ট্রেলিয়া থেকে ফেরার পথে ঢাকার উত্তরায়  প্রিন্সিপ্যাল স্যারের বাড়িতে একদিন থেকেছেন তিনি। তারপর কথাপ্রসঙ্গে আমার নামটা উঠে এসেছে ।  তাঁর গ্রামের একটা ছেলে ঢাকা মেডিক্যালে পড়ে, এই তার নাম, এমন চেহারা, ইত্যাদি  গল্পে গল্পে বলাতে প্রিন্সিপ্যাল স্যার  আমাকে চিনতে  পেরেছেন এবং প্রিন্সিপ্যাল স্যার আমার এইসব গুণের কথা তাঁকে জানিয়েছেন।  এরপর তাঁকে  নাটকের ক্যাসেটটিও দিয়েছেন। যা হোক,  ড. সাহেব তাঁর কম্পিউটার থেকে আমার নাটকটি  আমাকে দেখালেন । ভালো লাগল দেখে।  বুঝলাম যে,মঞ্চে বসে সরাসরি কোনো অনুষ্ঠান দেখার চেয়ে  ভিডিওতে দেখলে বেশি ভালো লাগে। ভিডিওতে তিথিকে আরও সুন্দরী দেখাচ্ছিল। ড. সাহেব তিথিকে দেখে চোখ সরু করে জিজ্ঞাসা করলেন,

“ মেয়েটি কে?”

“ তিথি। আমার ক্লাশমেট। ভালো অভিনয় করে।”

“ বেশ সুন্দরীতো!”

আমি তিথি সম্পর্কে আর বেশি কিছু বললাম না। বললাম না যে, সে এই গ্রামেরই মেয়ে, এই গ্রামের স্বর বংশের মেয়ে,তারকনাথ স্বরের নাতনী, উত্তম স্বরের কন্যা, এবং, তার আরেকটি পরিচয় আছে– আমার প্রেমিকা, আমার হৃদয়।

তিনি রিওয়াইন্ড করে বেশ কয়েকবার তিথির চেহারা দেখলেন। পজ করে করে দেখলেন। চোখ দেখলেন, বুক দেখলেন, ফিগার দেখলেন। ভেতরে ভেতরে লালা ঝরালেন কিনা বোঝা গেল না।

 আমি তখন মনে মনে ভাবছি, শালার বুইড়া এটা কী করে! চরম মেজাজ খারাপ হচ্ছিল আমার।

এরপর সে তিথি সম্পর্কে কিছু না বলে আমার নাটক সম্পর্কে কথা তুললেন। হয়তো প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য তুললেন।

বললেন, “তোর নাটকের গল্পটি চমৎকার। এরকম গল্প দিয়ে তুই আমার যাত্রাপালার স্ক্রিপ্ট লিখবি।”

 আমি বললাম, “ যাত্রাপালা আর নাটক তো ভিন্ন জিনিস ভাই!”

তিনি বললেন, “ দুটোর মধ্যেই তো গল্প আছে। গল্প ভালো হলেই হবে। অন্যান্য বিষয় আমি দেখবো।”

 যা হোক,তিনি চাইলেন আমি যেন গ্রামের সকল শ্রেণি-পেশার লোকজনকে যাত্রাপালার স্ক্রিপ্টে নিয়ে আসি। মাতবর কেরামত শেখের ক্যারেক্টার, পীরসাহেবের ক্যারেক্টার,ড. সাহেবের নিজের ক্যারেক্টার এগুলো সেখানে থাকতে হবে।গ্রামের হিন্দু জেলেদের জলমহাল কিভাবে কেড়ে নেয়া হয়েছে তা সেখানে সরাসরি উল্লেখ করা যাবে না, শুধু দেখাতে হবে যে তারাও গ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদেরও খেয়ে-পরে ভালভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।  অর্থাৎ তাদেরকে দেখাতে হবে মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে—-এটা যে তাদের আইনগত অধিকার তা দেখানো যাবে না। তাদের দৈনন্দিন মানবেতর জীবন-যাপন দর্শকের সামনে তুলে ধরতে হবে যাতে সাধারণ লোকজনের তাদের প্রতি সমবেদনা জাগে। এছাড়া গ্রামের ধর্মগুরু, মসজিদের ইমাম এরাও যে সমাজ-সংষ্কারমূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে, সেটা দেখাতে হবে। আমি তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলাম এবং সমাজ সংষ্কারের কথা শুনে বাল্যবিবাহের কুফল অপশনটা জুড়ে দেয়া যাবে কিনা তা জিজ্ঞাসা করলাম। হঠাৎ তিনি তার গলার স্বর পরির্বতন করে ফেললেন। উল্টো প্রশ্ন করলেন,

– রহমতপুরে কি বাল্যবিবাহ হয়?

–হয় তো। এখনও মাঝে মাঝে হয় । কয়দিন আগেই তো মিনাজ প্রামানিকের মেয়ের বিয়ে হলো। মেয়েটির বয়স বারো বা তেরো হবি।

–ওর তো ঠিক বয়সেই বিয়ে হয়চে। সমস্যার কী আছে এহানে। মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হওয়ার পরেই তো তারা বাচ্চা লিবের পারে। আর পিরিয়ড হয় ৯ থেকে ১২ বছরের মধ্যি। তুই তো কমিউনিটি মেডিসিনের উপর নাটক লিখিছিস। কথা ঠিক কিনা ক’?

– ঠিক আছে। তবে ও বয়সে বাচ্চা নিলিতো মেলা সমস্যা হবের পারে।

— ঐ বয়সে সমস্যা হলে তো সৃষ্টিকর্তা ওই বয়সে মেয়েদের শরীরে পিরিয়ড দিতে না। আঠারো বছর পরেই দিতে। শরীর তো সৃষ্টিকর্তারই তৈরি, নাকি? পিরিয়ড হওয়া মানেই তো মেয়েদের ওভারি সন্তান লেওয়ার জন্যি রেডি। ওভারি যহন পুরুষ মাইনষির স্পার্ম পায় না তহনই তো পিরিয়ডের রক্ত সময় মতো বারায়া যায়। যাকে বলে উইপিং অব দ্য অভারি। ঠিক কইছি কিনা ক!

আমি তার কথার কোনো যুৎসই উত্তর দিতে পারলাম না।উল্টো ভাবলাম,তাঁর কথায় যুক্তি আছে। তার পরেও বললাম, বাল্য বয়সে সন্তান ধারণ করলে এক্লামসিয়াসহ বিভিন্ন রোগ হতে পারে। প্রসুতি মারা যেতে পারে।

 তিনি বললেন, এক্লামসিয়া রোগ তো যে কোনো বয়সের প্রসুতির হতে পারে। এর সাথে বয়সের কী সম্পর্ক আছে?

আমি আর কথা বাড়াতে চাইলাম না। আমি জানতাম যে, তার সাথে কথা বলে পারা যাবে না। বাড়ি ফিরে আসলাম। বিছানায় শুয়ে তাঁর কথাগুলো ভাবতে থাকলাম। মনে খটকা সৃষ্টি হলো। আমার দাদিরও বাল্যবিবাহ হয়েছিল। তার বিয়ে হয়েছিল ১০ বছর বয়সে। তার মোট আট সন্তান । আমার বোনের শাশুড়ীর বিয়ে হয়েছিল ১১ বছর বয়সে। তার মোট ১৯ সন্তান। মহিলাটি এখনও বেঁচে আছে । তার বয়স আশির উপরে হবে। এখনও বেশ শক্ত-সামর্থ।

শুয়ে চোখ বুজে যখন এসব ভাবছি ছোটবেলায় দেখা একটি প্রসবের ঘটনা আমার মনে পড়ল।

…… আমাদের ঢেঁকিতে সেদিন ধান ভানতে গিয়ে গর্ভবতী এক মহিলার পেটে প্রসব-ব্যথা উঠেছে। তাই হঠাৎ একটা চাঞ্চল্য। মহিলারা ফিসফিসিয়ে কী যেন বলছে। পাড়ার দাইকে ডাকার জন্য ইতোমধ্যে একজন দৌড়ে চলে গিয়েছে। শুনছি দাই আসতে চাচ্ছে না। দাই নাকি দরকষাকষি করছে। আহা এমন সময় কেউ দরকষাকষি করে? ভাবছি আমি। কী নির্মম। সে নাকি বলছে ,তাকে তিন কেজি আমন ধানের চাল দিতে হবে,একটা সুতি কাপড়ের লাল গামছা কিনে দিতে হবে, ইত্যাদি। অবশেষে ব্যথায় টিকতে না পেরে প্রসুতি রাজী।

 মহিলা ব্যথায় চাপা চিৎকার করছে। দাই ঘরে ঢুকছে। ঘরের চারপাশে অনেকগুলি মহিলা।  কানাঘুষা চলছে। কেউ বলছে, “ সহজে হবি ননে। আগে ও উয়ের মার কাছ তেন মাফ চাক, তালি হবের পারে। ও উয়ের মাক সেদিন যেবা করে গাল পারেছে, উয়ের কষ্ট তো হবিই।” এদিকে মহিলাটির বৃদ্ধা মা হাত তুলে মেয়ের জন্য দোয়া করে চলছে। বৃদ্ধার চোখে পানি। তার মোনাজাতের হাত থরথর করে কাঁপছে। দাঁতবিহীন মুখে কেঁদে কেঁদে মোনাজাত করছে সে তার  মেয়ের জন্য।এরপর হঠাৎ বাচ্চার কান্নার আওয়াজ । বৃদ্ধা মা মোনাজাত ছেড়ে দিয়ে সোজা দৌড় আঁতুড় ঘরে। তার অশ্রæসিক্ত চোখে তখন হাসি।

 এ ঘটনাটি আশির দশকের শেষ দিকের।  বাচ্চা হওয়ার পর প্রসুতিরা  তখন সাধারণত একটানা সাত-দিন ঘর থেকে বের হতো না। তাকে শুধুমাত্র তেল ছাড়া কাঁচকলা ভর্তা, আলুভর্তা এগুলো খাওয়ান হতো। সে যে ঘরে থাকত তাকে বলা হতো আঁতুর ঘর। যে বাড়িতে রান্নাবান্না করার কেউ থাকত না, সে বাড়িতে প্রসুতি মা সাতদিন একটানা আঁতুড় ঘরে থাকতে পারত না। তাকে তিন-চারদিন পরেই ঘর থেকে বের হতে হতো। বের হয়ে তাকে ঘর-কন্নার কাজ, রান্নাবান্নার কাজ ইত্যাদি করতে হতো। আমার মাও হয়তো আমার জন্মের সময় এরকম করেছিল। সে আমাকে আঁতুর ঘরে রেখে মাঝরাতে লুকিয়ে ধান সিদ্ধ করতে গিয়েছিল, যাতে কেউ না দেখে। ঘরে তো তখন চাউল নাই, ধান সিদ্ধ না করলে খাওয়া হবে কেমন করে? আঁতুর ঘরে থাকলে তো আর মুখে ভাত যাবে না। এছাড়া তার স্বামীর তো মেজাজ-মর্জির ঠিক নেই। তাকে তখন মাদ্রাসায় যেতে হয় সাত-সকালে। সকালেই খাবার রেডি চাই। আমার বড় বোন তখন ছোট। তবুও সে-ই রান্না করে। দাদি অর্থব। শুধু পাশ থেকে দেখিয়ে দেয় কী করতে হবে । যা হোক,এরকম করাতেই হয়তো আমাকে আঁতুর ঘরে একা পেয়ে কুকুরটি টেনে নিয়ে গিয়েছিল গোরস্তানে। আর আমি তখন ছিলাম মাত্র তিন দিন বয়সী।

ঐ সময়ে দেখতাম, যেসব মহিলারা পাতলা গড়নের, শরীরে চর্বির রেশমাত্র নেই, তারা বছরে বছরে সন্তান ধারণ করে। গরীব পরিবারের এসব মহিলারা সারাদিনমান পরিশ্রম করে। পরের ধান ভানার কাজ  ও গৃহস্থালি কাজ  তারা করে দেয়। এসব মহিলারা কোথাও গেলে তাদের বাচ্চারা তাদের পেছনে সারি ধরে হাঁটে। দুটো বাচ্চা আবার কোলে থাকে সর্বদা। একটা নেমে গেলে কিছুদিন পরে আরেকটা কোলে ওঠে। কোনো বছরই কামাই নেই তাদের। যা হোক, কোনো বড় গৃহস্থ-বাড়িতে কাজ করলে তাদের লাভ হয় বেশি । তারা তখন তাদের বাচ্চাদের জন্য বড় পাত্র ভর্তি করে ভাত খাওয়াতে পারে। গৃহস্থের স্ত্রী এ বিষয়ে কিছু বলতে পারে না,কারণ, বিষয়টা মানবিকতার সাথে সম্পর্কিত। বাচ্চাগুলো যথাসাধ্য ভাত খেয়ে রাস্তা দিয়ে পেট উঁচু করে হাঁটে। তবে তাদের পেটে গোলকৃমি থাকার কারণে মাঝে মাঝে অভুক্ত অবস্থাতেও পেট উঁচু দেখায়। এসব পেট-উঁচু পুষ্টিহীন বাচ্চাগুলোর মধ্যে যেগুলো মেয়ে-বাচ্চা থাকে, তারা কয়েক বছরের মধ্যেই আবার বেশ ডাগর হয়ে ওঠে। মেয়েগুলার বয়স ১০ বা ১১ বছর হলেই দেখা যায় তাদের বিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। এর কিছুদিন পরেই দেখা যায় যে, গৃহস্থবাড়িতে মহিলাটি তার মেয়ের বাচ্চাকে কোলে করে কাজ করতে এসেছে। তখন অনেক সময় বোঝা যায় না যে,এটা তার নিজের বাচ্চা, নাকি তার মেয়ের বাচ্চা।

 কমিউনিটি মেডিসিন সম্পর্কিত নাটক  লেখার সময় আমাকে বেশ কিছু  চিকিৎসাবিষয়ক বই এবং কয়েকটি গবেষণামূলক বই পড়তে হয়েছিল। কলেজের লাইব্রেরি থেকে একটি গবেষণা পড়ি যার প্রতিপাদ্য ছিল, যে মহিলারা প্রাণিজ প্রোটিন কম গ্রহণ করে তাদের তুলনামূলকভাবে সন্তান ধারণক্ষমতার হার বেশি এবং গর্ভকালীন সময়ে যে মহিলারা কায়িক পরিশ্রম বেশি করে ,তাদের সিজারিয়ান সেকশন নেয়ার হার নগন্য। কমবয়সে সন্তান ধারণ করলে প্রসুতি মৃত্যুর হার বিষয়ক তথ্যপূর্ণ লেখা তেমন পাইনি তখন। মেডিক্যাল সায়েন্সের অনেক গবেষণার ফলাফল তখন পাওয়া গিয়েছে ইঁদুর,গিনিপিগ,কুকুর,বিড়াল বা শুকরের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। তাই ,অগত্যা,আমি প্রকৃতি-জগতের অন্যান্য প্রাণীদের প্রজননক্ষমতার দিকে খেয়াল করে বাল্যবিবাহ বিষয়ক একটি সিদ্ধান্তে আসতে চাইলাম। আমাদের আশেপাশে মুরগি, বিড়াল,কুকুর প্রত্যেকের ক্ষেত্রে বাল্যপ্রজনন বা অসময়ে প্রজনন বলে কোনো কথা নেই। প্রাকৃতিক নিয়মে সময় হলেই তাদের প্রজনন কাজ শুরু হয়,তাদের শারীরিক কোনো সমস্যা হয় না বা প্রসবজনিত কারণে তাদের মৃত্যু হয় না। একমাত্র মানুষের ক্ষেত্রেই দেখি, প্রসবকালীন মৃত্যুর বিষয়টি আছে, ফলে এর সাথে বাল্যপ্রজনন বা বাল্যবিবাহ কথাটাও ট্যাগ হিসেবে আছে।  তবে এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি,  প্রজননগত সক্ষমতার  দিক থেকে অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানবজাতির এই পিছিয়ে থাকাটা আমাকে ভাবাত।  আমার মনে হতো যে, মানুষ এ পৃথিবীতে প্রবাসী। মানে, মানুষের জন্ম  হয়েছিল আসলে অন্য এক পৃথিবীতে, যেখানে তার এ ধরনের কোনো সমস্যা  ছিল না। কিন্তু পৃথিবীতে আসার পরই যতসব বিপত্তির সৃষ্টি হয়েছে ।গরু ছাগল মুরগি মহিষ- কারো এক্লামসিয়া হয় না, যত সমস্যা হয় মানুষের।

 যা হোক,পরদিন সন্ধ্যায়, অর্থাৎ আমার শীতকালীন ছুটির ৫ম দিনে, আমি ড. সাহেবের বাড়িতে আবার গেলাম। গতকালের প্রসঙ্গ ফের তুলে ড. সাহেবকে বললাম যে, তাঁর কথার যুক্তি আছে এবং আমি সেটা মানি। তারপরেও ,কম বয়সী মেয়েদের মানসিক পরিপক্কতা ও সন্তান লালনপালনের অদক্ষতার বিষয়টা মাথায় রেখে আঠারো বছর বয়সের পরেই তাদের বিয়ে দেয়া উচিত— বললাম আমি। তিনি রাগত স্বরে বললেন,

–এসময়ে বিয়ে হলে সমস্যা কী? আমার মায়ের বয়স যখন ১২, তখন আমার জন্ম হইছিলে। আমাক কি ঠিকভাবে লালনপালন করা হয় নাই। আমি কি অষ্ট্রেলিয়ার একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হই নাই?

 আমি কিছু বলার আগেই কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,

 –যে মেয়ে সন্তান লিবের পারে সে মেয়ে বালিকা হয় ক্যাবা করে? পিরিয়ড হলেই তো মেয়েরা ইডা পারে। সৃষ্টিকর্তা মেয়েদের পিরিয়ড দেয়ই তো সন্তান লেওয়ার জন্যি, নাকি?

 এরপর তিনি হঠাৎ থেমে  গেলেন। তাঁর মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো যে, তিনি বেজায় রেগে গেছেন।  দেখলাম,তাঁর মুখ নীলচে বর্ণের হয়ে গেছে। মানুষের শরীরের লিভার ফাংশন কমে গেলে রক্তের টক্সিসিটি বেড়ে গিয়ে ত্বক এমন নীলচে বর্ণের হয়। মৃত্যুর সময় তার পিতার মুখও এমন নীলচে বর্ণের হয়ে গিয়েছিল। ড. সাহেবের রাগান্বিত মুখ দেখে আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। কিন্তু আফসার বাউল তড়াক করে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং ত্রস্তে সেখান থেকে সটকে পড়ল। সে হয়তো বুঝতে  পেরেছিল যে, এইবার তার শরীরের উপরে ড. সাহেব তাঁর ঝাল মেটাবে। আমিও চলে আসলাম। তাঁর নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখা নিয়ে আর কোনো কথা বলা হলো না।

 শৈত্যপ্রবাহটা  তখন একটু বেশিই মনে হচ্ছিল। শীত যেন হাড়ে এসে লাগছিল। তবু প্রতি সন্ধ্যাতেই আমি ড. সাহেবের কাছে যাচ্ছিলাম। ফিরে আসার সময় প্রতিবার ভাবতাম এ ত্যাড়া মস্তিষ্কের লোকটির কাছে আর বসব না। কিন্তু  ঘুরেফিরে আবার  যেতাম। আমি কি লজ্জাহীন,ব্যক্তিত্ত্বহীন? না,তা তো নয়। তাহলে যাই কেন? আসলে লোকটির কথাবার্তা উল্টাপাল্টা হলেও প্রত্যেকটি কথার মধ্যে চমক ছিল। চমক ছিল তার কার্যকলাপের মধ্যেও । যেমন, জানতে পারলাম যে, অষ্ট্রেলিয়া থেকে আসার পরপরই আফসার বাউলকে পিটিয়েছে ড. সাহেব।শমসের খাঁর সাথে আফসার বাউল তার পাতের জাও-খিচুড়ি ভাগ করে খেয়েছে বলে তাকে পিটিয়েছেন তিনি। একজন মানুষের সাথে পাতের ভাত শেয়ার করলে কী এমন ক্ষতি হয় কে জানে! তবে আরও জানতে পারলাম, আফসার বাউলকে এ কারণে পেটানোর জন্য  কেরামত শেখসহ গ্রামের অন্যান্যরা খুশি হয়েছে। কারণ তারা চেয়েছে যে, শমসের খাঁ যেন কারও সাথে মিশতে না পারে। শমসের খাঁর প্রতি তারা এজন্য রাগান্বিত যে,তিনি যেদিন পীর সাহেবজাদার কাছে বাইয়্যেত হতে গিয়েছিলেন, সেদিন তিনি পীরজাদাকে তাঁর সামনেই বাইয়্যেত না করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। চরম বেয়াদবি ছিল এটা । মানী লোকজনদের লোকসমক্ষে এভাবে অপমান করা যায় না । তবে শমসের খাঁর ওপর রেগে থাকার আরো কিছু গুরুতর কারণ ছিল কেরামত শেখের নিজের। শমসের খাঁ যদি সফদার খাঁর ছেলে না হয়ে অন্য কোনো সাধারণ লোক হতো তাহলে  হয়তো অনেক আগেই কেরামত শেখ ও তার ছেলেরা তাকে মেরে গুম করে দিত।

 শুনলাম যে,শমসের খাঁ পিটুনি খাওয়ার আগে থেকেই আলখাল্লা পরে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়। পীরজাদার দরবারে যাওয়া বাদ দিয়েছে অনেক আগেই । অবশ্য সে নামাজ পড়া বাদ দেয়নি। আগের মতই গোরস্তানের ভেতরে  জিকির করে। তবে সে কোথায় রাত্রিযাপন করে, কোথায় খায় তা কেউ জানে না । সে কিছুদিন গোরস্তানের ভেতরে নির্মিত আধা-পাকা লাশ রাখার ঘরে রাত্রিযাপন করেছে বলে লোকজন বলে। লোকজন আরও বলে,তার পিতার কুফরি-কালাম চর্চার গজব তার উপরেও পড়েছে।  আরও শুনলাম,তার বৃদ্ধ পিতা সফদার খাঁ এখনও বেঁচে আছে। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত। বারো বছর ধরে একই রকমভাবে বিছানায় শায়িত। চিকিৎসা করতে গিয়ে টাকাপয়সা জমিজমা সব শেষ তাদের।  এখন শুধু বাড়িটাই আছে। শমসের খাঁ ও তার বাপের তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা কিভাবে  হয়, তা লোকজনের কাছে একটা বিষ্ময়। কেউ বলে , ইবলিশ শয়তান গভীর রাতে তাদের বাড়িতে খাবার দিয়ে যায়।

  শীতকালীন ছুটির নবম দিন সেদিন।  সন্ধ্যাবেলা। যথারীতি আমি ড. সাহেবের সামনে। ড. সাহেব সেভাবে কথা বলতে চাচ্ছেন না আমার সাথে । কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে চুপ হয়ে আছেন তিনি। যাত্রাপালার স্ক্রিপ্ট লেখা বিষয়েও তিনি আর কোনো কথা বলছেন না। কিন্তু আমি চাচ্ছি যে তিনি এ বিষয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করুক। কিন্তু তিনি তাঁর  লেখার দিকে মনোযোগ দিয়ে রেখেছেন। তবে তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক তখন এত সহজ হয়ে গিয়েছে যে তিনি রাগ করলেন, না কী করলেন, সেটা তখন গৌণ হয়ে গিয়েছিল।  ফলে আমিও আগ বাড়িয়ে কিছু বলছিলাম না। আমি তার বিছানায় রাখা বালিশটা নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে একটা ম্যাগাজিন পড়ার চেষ্টা করলাম।

 নাটক লিখে প্রশংসা পাওয়ার পর ভাল-লাগা অনুভুতি তখনও আমার মধ্যে ক্রিয়াশীল। জীবনে আমি তো কোনোদিন তেমন কোনো স্বীকৃতি পাইনি । তাই স্বীকৃতির প্রতি এমন কাঙালিপনা। ড. ডেভিড ওয়ার্নারের উপর আমার লেখা নাটিকা যে আমার কলেজের প্রিন্সিপ্যাল স্যার এতটা পছন্দ করবেন তা আমি ভাবিনি। আমাকে ডেকে প্রশংসা করেছেন, আবার তিনি ড. সাহেবের কাছে গল্প করেছেন এবং এটার ক্যাসেটও সরবরাহ করেছেন– এটা আমার জন্য একটা বড় ব্যাপার, কারণ এটাও এক ধরনের রিকগনিশন। আর এভাবে বিষয়টা আমার কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে আমার গ্রাম পর্যন্ত চলে এসেছে,  গ্রামের লোকজন এটা এখন দেখছে, রচয়িতার জায়গায় আমার নাম দেখছে—এটা ভেবে খুশিতে আমার মাথা এখন আকাশে। ড. সাহেবের বাড়িতে বাউল গান শুনতে এসে এ গ্রামের লোকজন এখন আমার নাটক দেখার জন্য ড. সাহেবকে অনুরোধ করে, ড. সাহেব তখন সিডি চালিয়ে দেয়। গ্রামের লোক মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে নাটক। তারা তিথির প্রশংসা করে। এক মুরুব্বী তো একদিন বলে ফেলে, “ ছেরিডার যৌবন আছে গো!” অশিক্ষিত আফাজ, যে আমাদের বাড়িতে কাজ করে, সে বলে, “ জবর চেহারা তো ছেরিডার।”  আমার তখন ইচ্ছা হতো, আমি যদি নিজে এ নাটকটিতে একটা রোলে অভিনয় করতাম তাহলে ভালো হতো। তাহলে গ্রামবাসীরা আমাকে দেখতে পারত। কিন্তু  আমি তো সবসময় আড়ালেই থাকতে চেয়েছি। আমার মাথায় যে বিশাল ক্ষতচিহ্ন আছে, আমি যে দেখতে বেঁটে, আমার মাথার গঠন যে প্রতিসম নয়, বাঁকা একদিকে— এ সমস্ত  প্রতিবন্ধকতা ছাপিয়ে আমি কিভাবে অভিনয় করব?মানুষের সামনে কিভাবে দাঁড়াবো? এর চেয়ে বরং অফ-স্টেজে থাকাই ভালো মনে করেছি।

যা হোক, ড. সাহেবের পাশেই আমি ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে আমার নাটকটির কথা ভাবছি। এমন সময়ে ড. সাহেব মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন।

বললেন “কী খবর? ছুটি কবে শেষ হবে?”

 “এইতো আর পনেরো দিন আছে।”

 “তুই কিন্তু ইচ্ছা করলে আমার যাত্রাপালার স্ক্রীপটি লিখে দিতে পারতি। সামনের এই দশ দিনেই লেখা সম্ভব।”

 “ঠিক আছে ভাই, আমি লিখে দেব।” আমি মুখে এটা বললাম বটে কিন্তু  আমার মন বলছিল এটা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তিনি নিজেও আমার এমন আশ্বাসে খুব একটা আশান্বিত  হলেন না বলে মনে হলো ।

এরপর আমাদের অনেক বিষয়ে কথা হলো। দেশে খাবার সামগ্রীর ভেজাল নিয়ে তিনি যারপরনাই বিরক্ত। তিনি বললেন, যে দেশে এত ফসলাদি হয়, ফল হয়, সে দেশের মানুষেরা খাবারে কেন এত ভেজাল দেয় তা তিনি ভাবতেও পারেন না। মুড়ি ভাজতেও নাকি ইউরিয়া সার ব্যবহার করে মানুষ। এছাড়া খাবারের দোকানগুলোতে রুটি পরোটার মধ্যেও নাকি এমোনিয়াম সালফেট ও ইউরিয়া মেশানো হয়। আমি আরেকটু যোগ করে বললাম, মিষ্টির মধ্যেও সাধারণ চিনির পরিবর্তে সালফেট চিনি বা ঘনচিনি ব্যবহার করা হয়। তিনি শুনে আরো বিষ্ময় প্রকাশ করলেন। বললেন,  “আজ সকালেই তো আমি দুইডে রসগোল্লা খাইছি।” তারপর তিনি অসহায়ের মত করে তাকিয়ে বললেন,“ জানিস, লোকজন কিকামে এসপ করে?”

 “গরীব দ্যাশ তাই বেশি লাভের জন্যি করে।” আমি চট করে উত্তর দিলাম।

 “খালি ইডাই লয়, ইয়ের সাথে মানুষের ক্ষতি করে মজা লেওয়ার ব্যাপারডাও আছে। আমি আফ্রিকার  কয়েকটা গরীব দ্যাশে গিছি । ওরা খাবারে এত ভেজাল দেয় না।”

 “এগুলে বন্ধ করা যায় ক্যাবা করে ভাই কন তো?”

 “শর্টকাট কোনো রাস্তা নাই।”

এরপর তিনি সবিস্তার বর্ণনায় আসলেন। বললেন ,সমাজে যে কোনো খারাপ কাজ দীর্ঘদিন যাবৎ বিদ্যমান থাকার মানে হচ্ছে তার পেছনে সুবিধাভোগী এক বা একাধিক চক্র আছে। তিনি বিষয়টা ব্যাখ্যা করে বললেন, মুরগির খাবারে যে টেনারি শিল্পের ক্রোমিয়ামের ভেজাল দেয়া হয়, তা আধিকারিকরা ভালোমতোই জানে। বোতলজাত সয়াবিন তেল ও সরিষার তেলে যে ক্ষতিকারক কেমিক্যাল দেয়া হয়, গরুর দুধ বৃদ্ধির জন্য যে সিনথেটিক ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, ফসলাদিতে যে কৃত্রিম হরমোন প্রয়োগ করা হয় সবই সবাই জানে। কিন্তু কার্যকরী ব্যবস্থা নেয় না। কারণ এতে আর্থিক লাভটা শুধু ভেজাল মিশ্রনকারীদেরই হয় না, দেখভালের দায়িত্বে থাকা আধিকারিকের হয়,ওষুধ কোম্পানি, ভেষজ তেল কোম্পানি ও এমনকি ডাক্তারদেরও হয়।

ডাক্তারের কথা বললেন বলে আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম,  “এখানে ডাক্তাররা আবার কিভাবে জড়িত?”

তিনি উত্তর দিলেন যে, এখানে ডাক্তাররা পরোক্ষভাবে লাভবান হয়। কারণ ভেজালের কারণে মানুষ রোগাক্রান্ত বেশি হয় বলে ডাক্তাররা রোগি বেশি পায়। এই বলে তিনি মুচকি হাসি দিলেন। আগে কখনও আমি তাকে এভাবে হাসতে দেখিনি। আমি ডাক্তারী পড়ি বলে হয়তো আমাকে কটাক্ষ করছিলেন। তারপর তিনি বোঝালেন, কোনো খারাপ জিনিস বেশিদিন সাসটেইন করার মানে হচ্ছে তার একটা সাইকেল বা চক্র আছে।

আমি একটু রেগে বললাম, “তাই বলে ডাক্তাররা এ চক্রের অংশ হতে পারে না।”

তিনি বললেন, “তুই কি জানিস্ ধনী রাষ্ট্রগুলো তাদের উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য ডাম্পিং করে, সমুদ্রে ফেলে দেয়। তারা তো ইচ্ছা করলে খাদ্যশস্যগুলো আফ্রিকার গরীব রাষ্ট্রগুলোকে দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তারা তা করে না। কেন করে না জানিস? তারা চায় পৃথিবীতে চাহিদা আর যোগানের সম্পর্ক টান টান থাকুক। একদিকে কম আর অন্যদিকে বেশি থাকলেই  কেবল গতি থকে,সাইকেল ঠিক থাকে।”

আমি বললাম, “না ভাই, বিষয়গুলা এত অমানবিক নয়। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতো দাতা হিসেবে অনেক রাষ্ট্রকে সাহায্য করে। স্বাস্থ্যখাতের, শিক্ষাখাতের উন্নয়নের জন্য টাকা দেয়।”

 এটা বলে আমি আমার হাতে রাখা ম্যাগাজিনের দিকে আবার চোখ দিলাম। কিন্তু এটা শুনে তিনি আবারও মুচকি একটা হাসি দিলেন।

  ম্যাগাজিনটাতে পড়ছি না কিছুই। চোখের সামনে ধরে রেখেছি মাত্র। ভাবছি ড. সাহেবের কথাটাকে নিয়ে। মেজাজ খারাপ হচ্ছে আমার। মনে মনে বলি ,ধূর!এ লোকটার সাথে তর্ক করে কেউ জিততে পারবে না কোনোদিন । লোকটা এখন আবার আমার ব্রেন ওয়াস করার চেষ্টা করছে অথবা সবকিছু বুঝেও শুধু তর্ক করার জন্য উল্টো কথা বলছে। এটা ইবলিশের স্বভাব। সৃষ্টিকর্তার অসীম ক্ষমতা ও গরিমা সম্পর্কে জানা সত্তে¡ও শুধু বিরোধিতা করার স্বার্থে  এভাবেই উল্টোদিকটা বেছে নিয়েছিল ইবলিশ ।

তিনি  কী-বোর্ডে খটখট করে টাইপ করে চলছেন। মনে হচ্ছে আর কোনো কথা বলবেন না, পুরো মনোযোগ তাঁর লেখার দিকেই। কিন্তু তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,“তুই কী কখনও কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েছিস?” আমি ম্যাগাজিন থেকে চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকালাম। এ ধরনের প্রশ্ন তিনি আগে কখনও করেননি। এত এত কথা বলেছি তাঁর সাথে,এই ধরনের  ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার মতো সম্পর্ক তো এখনও তৈরি হয়নি তাঁর সাথে। এই প্রশ্নের আকষ্মিকতায় আমি তখন হতভম্ব । কিন্তু তিনি নিরুদ্বেগ। তিনি কম্পিউটার কী-বোর্ডে টাইপ করে চলেছেন। প্রবীণ বয়সেও তার আঙুলের গতি ঈর্ষনীয়। আমি কিছুক্ষণ উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। এটা নিতান্তই ব্যক্তিগত একটা প্রশ্ন।  তবুও আমি প্রশ্নের উত্তর  দেয়ার জন্য রেডি হলাম। আমার মনের পর্দায় শাহনাজ, সাদিয়া আর তিথির মুখগুলো তখন প্রতিভাত হচ্ছে । আমি তাঁকে বললাম, “হ্যাঁ,আমি একাধিক মেয়ের প্রেমে পড়েছি।” এটা শুনে তিনি তাঁর মুখমণ্ডলে কোনো প্রকার অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন না। তিনি নিবিষ্ট মনে তার কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে খাল খনন বিষয়ক লেখা লিখতে থাকলেন।

 অতঃপর মিনিট দেড়েক পরে তিনি মুখ খুললেন,

“ তোকে ভগবান রজনীসের দ্য বিলাভেড বইটি পড়বের কইছিলেম, পড়েছিস?”

“পড়েছি।”

“বইটিতে প্রেমের একটা সংজ্ঞা দেয়া আছে। বল্তো?”

“লাভ ইজ চেজিং”

 “তাহলে তো বুঝতে পারছিস, ভালবাসা হলো একটা ধাওয়া।”

“বিষয়টা আমি অতটা বুঝি নাই ভাই। ভালবাসা হলো নারী-পুরুষের পারস্পরিক গভীর সম্পর্ক, এতটুকই তো জানি।”

“সিডা ঠিক আছে। তবে নারী পুরুষ একে অপরের প্রতি মানসিকভাবে ধাওয়া না করলে পারস্পরিক সম্পর্ক হয় না।”

“মানসিকভাবে ধাওয়া জিনিসটা কী ভাই?”

“একে অপরকে জানার আগ্রহ,বোঝার আগ্রহ,তারপর কাছে পাবার আগ্রহ- এগুলোই হলো মানসিকভাবে ধাওয়া। এটা বুঝিস না, তাহলে প্রেম করলি ক্যামনে?” কটাক্ষমূলক প্রশ্ন তাঁর।

লজ্জা  পেলাম। চুপ হয়ে  গেলাম  একদম । তিনি তার লেখাগুলির উপরে চোখ বুলাতে থাকলেন। আমি আমার মনের মধ্যে ভেসে ওঠা শাহনাজ ,সাদিয়া আর তিথির মুখগুলো স্মরণ করতে থাকলাম।

 শাহনাজের জন্য আমি ত্রিশটি  প্রেমপত্র লিখে রেখেছিলাম। সময়মত একটাও তাকে দিতে পারিনি। এটা স্কুল লাইফের কথা। আমি তার বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাতে বিকেলবেলা কয়েকবার করে যাতায়াত করতাম। শাহনাজের  চোখ অদ্ভুত রকমের সুন্দর ছিল, চুলগুলো ছিল কোঁকড়ানো, আমি তাই খুব করে চাইতাম সে তার ঘরের জানালাটা একবার খুলুক, যাতে তার সাদা হাতখানা একটুখানি দেখতে পারি, অথবা সে বালিশে থুতনি রেখে জানালা দিয়ে উদাস নয়নে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকুক, যাতে আমি তার কালো কালো চোখ দুটো দেখতে পারি, তার মাথার কোঁকড়ানো অবাধ্য চুলগুলি তার কপালে এসে পড়ুক, আর আমি শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। তখন আমি খানকা শরীফে প্রতি বৃহস্পতিবারে জিকির করতাম, পীর সাহেবের বয়ান শুনতাম নিয়মিত। কোনো মেয়েকে ভালবাসার কথা বলাকে মনে করতাম পাপ । ভাবতাম  এটা শয়তান দ্বারা তাড়িত কাজ, এ কাজ করলে আব্বাহুজুর পীরকেবলা আমাকে  ছোটবেলায় যে দোয়া দিয়েছিলেন তা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। ফলে আমি তাকে সময়মত বলতে পারিনি যে তাকে আমি ভালবাসি। শেষ যেদিন আমি তাকে বলেছিলাম ভালবাসার কথা, ততদিনে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। শাহনাজের মুখমণ্ডল, চোখ, চুল আমি এখনও স্পষ্ট স্মরণ করতে পারি। তাকে আমি এখনও ভালবাসি। আমার মন যেন এখনও তাকে  দেখতে চায়, তার বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে চায়।

সাদিয়া কথা মনে পড়ল আমার। আহ্, সাদিয়া। ওর কথা ভাবতেই আমার মনটা যেন অবশ হয়ে যায়। একটা অপরাধবোধ গ্রাস করে ফেলে আমাকে। কী পবিত্র তার মুখখান, আহা।  সাদিয়ার কথা আর ভাবতে পারি না আমি। কোথায় যেন একটা জমাট যন্ত্রণা অনুভূত হয়। এ যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেলেই যেন বাঁচি। ( To be continued)

Leave a Reply

Your email address will not be published.