আমার মুরিদজীবন।। সেকশন -৬।। বীনা চৌধুরীর যাত্রাপালা

 4,191 total views

ড. সাহেবের যাত্রাপালার স্ক্রিপ্ট লিখে দিতে পারিনি আমি । তিনি কুষ্টিয়ার একজন ব্যক্তির কাছ থেকে স্ক্রিপ্টটি লিখে নিয়েছেন। নির্ধারিত দিন-ক্ষণে যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হবে। স্ক্রিপটি একবার পড়লাম। যাত্রাপালার মধ্যে গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাওয়া লাঠি খেলা, বিয়ে বাড়িতে গীত গাওয়া, হিন্দু জেলেদের নিজস্ব কিছু উৎসব ও তাদের বর্তমান দুর্দশা, রাস্তার পাশে কলাগাছ,গাবগাছ, সোনালুগাছ ইত্যাদি লাগানোর প্রয়োজনীয়তা, চতরা বিলের ভুতুড়ে জলাশয়ের কাহিনী, কালী বাড়ির পাশের বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা প্রভৃতি বিষয়কে সংযুক্ত করা হয়েছে। স্ক্রিপ্টটিতে কাহিনীর গাঁথুনিতে একটুখানি শিথিলতা থাকলেও , মনে হলো যে, ভালো মানেরই হয়েছে।

 ঘুনারচকের মাঠে কাঁঠালবাগানের মধ্যে কেরোসিনের মশাল জ্বালিয়ে কয়েকদিন ধরে রিহার্সেল চলল। রিহার্সেল দেখার জন্য মনের ভেতর সুপ্ত ইচ্ছা থাকলেও  গেলাম না। ভাবলাম, আমি কিছুদিন পরেই ডাক্তার হতে চলেছি, অশিক্ষিত লোকদের এইসব দেখা আমার মানায় না। তবে খোঁজ-খবর নিচ্ছিলাম  বিভিন্নভাবে। শুনলাম, ড. সাহেব ইকরামকে পছন্দ না করলেও তাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দিয়েছেন। হারেছও একটা চরিত্র পেয়েছে। শুকুর আলী যাত্রায় পাঠ নেয়ার জন্য আবদার করেছিল, কিন্তু সে ডায়লোগ বলতে গিয়ে ভুলে যায় বলে ড. সাহেব তাকে নেননি।

চারদিন একটানা রিহার্সেলের পর ৫ম দিনে যাত্রাপালা প্রথম শো অনুষ্ঠিত হলো। পর পর তিনরাত যাত্রাপালাটি হওয়ার কথা ছিল । কিন্তু ষষ্ঠদিনেই যাত্রাপালা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হলো। গ্রাম-বাংলার বিয়েবাড়ির অঙ্কে মেয়েদের ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি পরে নাচ ও গীত ছিল। এটা নিয়ে গ্রামের মুরিদরা ব্যাপক সমালোচনা করতে শুরু করলো। তাদের কথা,বর্তমানে গ্রামে সব মেয়েরাই যেহেতু ব্লাউজ পরেই শাড়ি পরে, তাই এভাবে মেয়েদের বেপর্দাভাবে উপস্থাপন করা ঠিক হয়নি, ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি পরা কিভাবে টেকসই উন্নয়নের অংশ হতে পারে তা তাদের বুঝে আসছে না,ইত্যাদি। তবে মুরিদরা স্বীকার করল যে, একসময় এ রহমতপুর গ্রামের প্রায় সব মহিলাই ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি পরত, তবে পীরসাহেবের উদ্যোগের কারণেই এটা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

এদিকে গ্রামের যুবক সম্প্রদায় বিষয়টাকে আরেকটু জটিল করে তুলল। ইচ্ছাকৃতই জটিল করল। তারা চাইলো, যেহেতু গ্রামে একবার যাত্রাপালা শুরু হয়েছে, তাহলে আগের সেই নাচগানের যাত্রা শুরু করতে দোষ কী? তারা মনোয়ার চেয়ারম্যানের কাছে গিয়ে বলল, “ড. সাহেবের যাত্রাপালায় নাচ-গান হলে কোনো দোষ নেই, শুধু আমাগোর যাত্রাপালায় নাচ-গান হলে  দোষ, তাইনে ?” তারা আবদার করে বসল যে, এবার তারা গ্রামে আগের মতো যাত্রাপালার আয়োজন করবে । সাথে এটাও বলল,এখানে যদি গ্রামের মুরিদরা বাধা দেয় তাহলে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যাবে।

     শোনা  গেল, মনোয়ার চেয়ারম্যান  তাদেরকে বলেছেন  যে, প্রশাসনের অনুমতি পেলেই শুধুমাত্র তিনি অনুমতি দিতে পারবেন। কিন্তু তিনি ভয় পাচ্ছেন এটা ভেবে যে, প্রশাসন বোধ হয় অনুমতি দেবে না, কারণ নয় বছর আগে এ গ্রামে যাত্রাপালার মঞ্চে যে হত্যা এবং গুমকাণ্ড ঘটেছিল, এটা নিশ্চয়ই থানা-পুলিশের খাতায় রেকর্ড  আছে। সেবার চেয়ারম্যান নিজেসহ তাঁর পিতা ও  তিন ভাই আসামী হয়েছিল। ঘটনাটি তখন জাতীয় পত্রিকায় কয়েকদিন ধরে প্রকাশ পেয়েছিল। তবে যুবকরা নাকি মনোয়ার চেয়ারম্যানকে অভয় দিয়ে বলেছে যে, এ ব্যাপারে তাঁর টেনশন করার কোনো দরকার নেই, কারণ, প্রশাসনের লিখিত অনুমতি আনা তাদের কাছে  কোনো ব্যাপারই না। এলাকার এমপি তাদের হাতে। তাদের কাছে মূল সমস্যা বরং এই জোব্বাধারী মুরিদরা।  গ্রামের মুরিদদেরকে চেয়ারম্যান সাহেব ঠেকিয়ে দিলেই আর কোনো সমস্যা নেই। এইটুকু করলেই চলবে তাদের।

 চেয়ারম্যান কী করবে তা বুঝে উঠতে পারল না। মুরিদদের পক্ষে যাবেন নাকি বিপক্ষে যাবেন, এই নিয়ে দোটানা তার। জানা  গেল, তিনি কয়েকটা দিন সময় চেয়েছেন। আমি সব শুনে ভাবলাম , সময় চাওয়ার আর কী আছে, চেয়ারম্যান তো যুবকদের পক্ষেই যাবে কারণ যুবকদেরকে নিয়েই তার চলতে হয়। এই সব মুরুব্বী মুরিদদের তার আর কী এত প্রয়োজন।  ভোটকেন্দ্র দখল করে নিয়ে তিনি চেয়ারম্যান হয়েছেন, মুরুব্বীদের তাঁর কী এত দরকার, মুরুব্বীরা কি  ভোটকেন্দ্র দখল করতে পারে? যাদের কাছ ঠেকা নেই, তাদের কথা শুনতে হবে কেন। যা ভাবলাম তাই হলো। দুইদিন পরেই শুনলাম,প্রশাসনের অনুমতি মিলেছে এবং চেয়ারম্যান মুরিদদেরকে বলেছে যে, তার নিজের এক্ষেত্রে কিছুই এখন করার নেই,কারণ যুবকরা নিজেরাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এসেছে। অতএব যাত্রাপালা হবে। তিনি জানিয়ে  দিলেন, কোনো মুরিদ যেন সেখানে বিরোধ করতে না যায় কারণ যাত্রাপালার অনুষ্ঠানে পর্যাপ্ত পুলিশ-পাহারা থাকবে, পুলিশ গুলি ছুঁড়লে তিনি কোনো দায় নিবেন না।

 অতঃপর এইসব ডামাডোলে পড়ে ড. সাহেবের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক যাত্রাপালা বন্ধ হয়ে  গেল। অনেক চেষ্টা করেও তিনি এটা চালু করতে পারলেন না। কারণ যাত্রাপাত্রার পাত্রপাত্রীরা তখন নিরাশ হয়ে গেছে।

 এদিকে পরদিনই শুনলাম, যুবকদের আয়োজিত নাচ-গানের যাত্রাপালা অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। এখন একটা উদ্বোধন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটা শুরু করা হবে। কিন্তু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কারা থাকবে তা নিয়ে বিপত্তি দেখা দিয়েছে। মনোয়ার চেয়ারম্যান  নাকি আগেই বলে দিয়েছে যে, তিনি এ অনুষ্ঠানে থাকতে পারবেন না, কারণ, মুরিদ সমাজে তাঁর বাবাকে এজন্য কথা শুনতে হতে পারে। ইতোমধ্যেই তার বাবা এইসব অশ্লীল যাত্রাপালা হওয়াটাতে পরোক্ষভাবে নারাজী দিয়েছে। বলে দিয়েছে, এসবের মধ্যে তিনি নেই। যেহেতু গ্রামের প্রায় সব মুরুব্বী পীরজাদার মুরিদ,  এমনকি নেতৃস্থানীয় সকলেই পীরজাদার মুরিদ,তাই যাত্রাপালা অনুষ্ঠান উদ্বোধনের জন্য মুরুব্বী বা মাতবর জাতীয় অন্য কাউকে যুবকরা খুঁজে  পেল  না।

 অবশেষে তারা আমার কাছে এলো।  যদিও তারা জানত যে, আমি মুরিদ, তারপরও এলো। তারা আমার কাছে এসেছে কারণ তাদের  কাছে মনে হয়েছে যে,যাত্রাপালা উদ্বোধনের জন্য আমিই উপযুক্ত ব্যক্তি। কারণ তারা শুনেছে আমার লেখা একটি নাটক  আমার মেডিক্যাল কলেজে মঞ্চস্থ হয়েছে। এটা তারা শুনেছে ড. সাহেবের বাড়িতে বাউল গান শুনতে গিয়ে। এমনকি ড. সাহেবের কম্পিউটার থেকে কয়েকজন নাটকটি দেখেও ফেলেছে। তিথিরও রূপ-সৌন্দর্য দেখেছে তারা। ফলে তারা ধরে নিয়েছে আমি পীর সাহেবের মুরিদ হলেও পাঁড়-মুরিদ নই এবং  আমি একজন উদারমনা সাংষ্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

যা হোক, তারা আমাকে প্রধান অতিথি হওয়ার প্রস্তাব দিল।

একজন এভাবে বলল,

– ভাই , আপনের কিন্তু প্রধান অতিথি হওয়া লাগবি। আমরা সব আশা করে আইছি, ফিরায়ে দিয়েন না।

 – তোমরা কি ড. সাহেবের কাছে যাওনি? উনি থাকতে আমি প্রধান অতিথি কেমনে হই? আমি তাকে প্রশ্ন করলাম।

– ভাই, উনাক ভাল্লাগে না। ওনার কথা কইয়েন না তো!

– আচ্ছা, ঠিক আছে, আর কারা কারা অতিথি আছে, বলো ?

-যাত্রাদলের পরিচালক বীনা চৌধুরী, বিশিষ্ট গায়ক ও লেখক গফুর বিশ্বাসের ছেলে একরাম বিশ্বাস এবং আফসার বাউল ।

 আফসার বাউলের নামটা শুনে আমার শরীর ঘিন ঘিন করে উঠল। সে নোংরা, অপরিচ্ছন্ন থাকে। তদুপরি, কুকুর থাকার ঘরে ঘুমায় সে । গা দিয়ে অদ্ভুত গন্ধ বের হয় । কিন্তু আমার মাথায় একই সাথে আরেকটা ভাবনা চলে আসলো। ড. সাহেব যখন শুনবে যে আফসার বাউল যাত্রাপালা অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হয়েছে তখন তাঁর কেমন লাগবে। আমার মনে হলো, যদি সত্যি সত্যি এমন ঘটে তাহলে ড. সাহেব তাকে এবার চিরদিনের মতো বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবেন।

 জিজ্ঞাসা করলাম,

-আফসার বাউল রাজী হলো ?

ওয়াদুদ জানালো ,

– প্রথমে রাজী হয়নি, পরে ড. সাহেব অনুমতি দেয়ার পরে রাজী হয়েছে।

 “ অনুমতি দিলো ড. সাহেব?” আমি প্রশ্ন করলাম।

 তারা কয়েকজন সমস্বরে বলে উঠল, “অনুমতি দিবি লয় মানে,ওর বাপে দিবো।” তাদের কথা বলার ধরনে এগ্রেসিভ ভাব । মনে হলো যে, তারা ড. সাহেবকে বিন্দুমাত্র সম্মান করে না।

 ড. সাহেবকে বাদ দিয়ে আমাকে প্রধান অতিথি করা হচ্ছে, ব্যাপারটা ভেবে আমার অসম্ভব ভালো লাগছে। আমি ড. সাহেবকে সামনে কল্পনা করে মনে মনে বললাম, ড. সাহেব , আপনি বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হতে পারেন, ডাবল ডক্টরেট হতে পারেন,কিন্তু দেখেন গ্রামে আপনার কোনো পাত্তা নেই। গ্রামের লোক আমাকেই চায়। এভাবে আমার মনের মধ্যে তখন  ড. সাহেবের প্রতি এক ধরনের প্রতিশোধমূলক ভাব সৃষ্টি হচ্ছে। এ ভাব কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। তার প্রতি আমার মনের গভীরে বোধ হয় রাগ আছে যেটা আমি নিজেও জানি না অথবা  এটাই বোধ হয় মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। অধিক যোগ্যদেরকে কম যোগ্যরা হয়তো এভাবেই শত্রু মনে করে। সুযোগ পেলেই প্রতিশোধ নিতে চায়। হিংসা করে। টপকাতে চায় বাইপাস লাইন দিয়ে। কারো শত্রু হওয়ার জন্য আসলে কারো ক্ষতি করতে হয় না। ভালো খেলে,ভালো পরলে, ভালো চললে অটোমেটিক্যালি শত্রু হয়ে যায়।

যা হোক,আমি প্রধান অতিথি হতে আমি রাজী হয়ে  গেলাম। পরদিন সকালে শুনতে পেলাম, রহমতপুর বাজারের বিভিন্ন  দোকানে, প্রাইমারি স্কুলের দেয়ালে, হাইস্কুলের গেটে, পুলিশ ক্যাম্পের দেয়ালে, রাস্তার পাশের গাছের কাণ্ডে পোষ্টার লটকানো হয়েছে। সেখানে আমার নাম বড় বড় অক্ষরে শোভা পাচ্ছে। মুরিদরা নাকি আমার নাম দেখে বিভিন্ন মন্তব্য করছে। আমাকে বেঈমান ঘোষণা দিয়েছে তারা। পীরজাদাকেও বিষয়টা বলেছে তারা।  কিন্তু পীরজাদা কী মন্তব্য করেছেন তা জানতে পারলাম না।

দুপুর হয়ে গিয়েছে তখন। কিন্তু শীতের রোদের কারণে বিকাল বিকাল লাগছে। গ্রামে আমার নাম ধরে মাইকিং হচ্ছে। “ এই ইৈ হৈ কাণ্ড রৈ রৈ ব্যাপার। আবার ঝুমুরের নৃত্য, কোমর দোলানো, মন ভুলানো নাচ। এক ঝাঁক উড়ন্ত বলাকা…..।  সেই বিখ্যাত লক্ষী অপেরা… প্রধান অতিথি থাকবেন গ্রামের কৃতি সন্তান…..।”

 দরবেশ কাকা আমার নাম শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, “এসব কী শুনছি বাজান!”  কাকার উদ্বেগপূর্ণ প্রশ্ন । আমি কিছু বললাম না। তিনি তৎক্ষণাৎ আমার আব্বার কাছে গেলেন। আব্বা সব  শুনলেন তাঁর কাছ থেকে। কিন্তু আমাকে তেমন কিছু বললেন না। ভয়ে ছিলাম,কী বা কী বলেন আবার। কিন্তু ইন্টারমিডিয়েটে ফেল করার পর তিনি আমাকে ধমক-ধামক গালাগালি খিস্তি-খেউড়,বদনাম যা করার তা একেবারে করে ফেলেছেন বলে হয়তো তিনি আমাকে তেমন কিছু বললেন না।

 তবে মা বলল,

“তোর জন্যি তো মুখ দেহানে মুশকিল হয়্যা যাচ্ছে। তুই ঢাহা চলে যা। তোর ছুটি শেষ হবি কবে?”

আমি বললাম,

“যারা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে তাদের বাপ-চাচারাই তো হুজুরের মুরিদ। তারা তাদের ছেলেদের মানা করলেই তো পারে। আমি তো আর নিজে  এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করতিছিনে।”

মা বলল,

“দ্যাখ, তুই হুজুরের মুরিদ, এলাকার শিক্ষিত ছাওয়াল, তোক দেখে অন্য সব ছাওয়ালপল শিখপি, আর তুই এসবের সাথে থাহিস, তোক কি এসব মানায়?”

 বললাম,

 “ক্যান আব্বা তো হুজুরের কাছে আমার যাওয়া বন্ধ করে দিছেলে , তখন তো তুমি কিছু কও নাই? তখন তো আব্বা বলছিলে হুজুরের কাছে যাওয়ার জন্যিই আমি পরীক্ষায় ফেল করিচি।”

 মা বলল, “ এখন তো বড় হইছিস, একটু দেহেশুনে হুশ করে চলবু লয় তুই? এসপ কি তোক মানায়? আর যতসব অপয়া বিচ্ছিরি কাজকাম অহানে অয়। দেহিসনি তুই, দুডে মেয়ে মানুষ ক্যাবা করে মরে গেল সিবার।  এসব কাম ভালো লয় ,অভিশাপ লাগে বুচ্ছিস, অভিশাপ লাগে। ওসব জাগায় জাসনে তুই, আমি ক’লেম কিন্তু।”

মা বলে  গেল। অমি শুধু শুনে গেলাম। আমি তখন ভাবছি অন্য কথা। যে গ্রামের কোনো লোক কোনোদিন আমাকে  সম্মান দেয়নি, আমাকে সমবসময় কুত্তে-খাওয়া বলে উপহাস করেছে, মাথার পাশের বিশাল ক্ষতচিহ্ন দেখিয়ে মাথা-পাগলা বলে ইঙ্গিত করেছে, পরীক্ষায় ফেল করার পর কত কী যে বলেছে, সেই গ্রামের লোকজন আমাকে  এখন একটা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বানিয়েছে, এটা আমার জন্য বিশাল একটা পাওয়া। এটা ছাড়া যাবে না। হোক সেটা অপবিত্র অশ্লীল যাত্রাপালার অনুষ্ঠান, তাতে কী? আমি তো এখন সবার সামনে দাঁড়াতে পারছি বুক ফুলিয়ে। কয়জন পারে এটা?  তাই মায়ের কথা শুনলে চলবে না।  আমি কোনো উত্তর না দিয়ে মায়ের সামনে থেকে চলে গেলাম।

 দুদিন ধরে ব্যাপক প্রচার প্রচারণার পরে অনুষ্ঠান শুরু হলো।

 সন্ধ্যাবেলা। আলোকোজ্জ্বল প্যাÐেল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি বসে আছি প্রধান অতিথির চেয়ারে। অতিথিবৃন্দ আসন নিয়েছেন।  যাত্রাপালার পরিচালক বীনা চৌধুরি আমার পাশে। তার পাশে আফসার বাউল। আফসার বাউল মাথায় তেল দিয়ে পরিপাটি হয়ে এসেছে। একটা সাদা পাঞ্জাবি পরেছে সে । পাঞ্জাবিটা বোধ হয় তার নিজের নয়। বেশ ঢোলা ঢোলা লাগছে। তবে একপাশে শাল চাদর ভাঁজ করে পেঁচিয়ে রাখায় অতটা বেঢপ বলেও মনে হচ্ছে না। আজ নিশ্চয়ই আফসার বাউলের গা দিয়ে অসহ্য গন্ধ বের হচ্ছে না, হলে তো তার পাশে বসে থাকা ভদ্র মহিলাটির বসে থাকাই মুশকিল হবে, মনে মনে বললাম আমি।   এদিকে  বীনা চৌধুরী মুখে অতিরিক্ত মেকাপ করেছে বলে তার আসল চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। তবে তার ঠোঁটে নেয়া উৎকট লাল লিপিস্টিকের আস্তরণ বেশি করে চোখে লাগছে। কপালেও একটা বিশাল লাল টিপ। মহিলাটির পরনে কেমন যেন একটা উদ্ভট টাইপের ড্রেস। সাদা, চকমকি। নাচের ড্রেস বলে মনে হচ্ছে। এ বয়সেও তিনি নাচবেন নাকি! নাচতেও পারে। হায়, এ বয়সে এমন মোটা শরীরে নাচলে তাকে  কেমন দেখাবে ……মনে মনে ভাবছি এ কথা।

একরাম সাহেব চলে আসলেন এ সময় । সঞ্চালক মূলত তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছিল। মূল অনুষ্ঠানের পূর্বে মাত্র আধাঘণ্টা উদ্বোধনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, তাই তার এতটা দেরি করা ঠিক হয়নি। যা হোক, অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রথমেই কোরআন থেকে তেলাওয়াত!

 কী অদ্ভুত ব্যাপার। যাত্রাপালার অশ্লীল নাচের অনুষ্ঠানও কোরআন তেলাওয়াত দিয়ে শুরু হচ্ছে! আমার ইচ্ছা করল যে, সঞ্চালককে ঠাটিয়ে একটা ধমক মারি। আমি স্থির থাকতে পারলাম না। সঞ্চালককে কাছে ডাক দিয়ে বললাম যে, তেলাওয়াত বা গীতাপাঠ কোনোটাই করার দরকার নেই, আমার সময় কম, বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। সঞ্চালক আমার কথা রাখল। কেরামত শেখের  ছোট ছেলে ওয়াদুদ সভাপতি হিসেবে আছে, সঞ্চালক তার নাম ঘোষণা করল।

 সে স্বাগত বক্তব্য দিচ্ছে। বক্তব্যের কোনো ছিরি নেই। শুধু শুধু গলাবাজি । সে যেন মনে করেছে এটা একটা  রাজনৈতিক সমাবেশ, তাই সে গলা ফাটিয়ে বক্তব্য রাখছে। প্রকৃতপক্ষে সে ছোটবেলা থেকে তার বাপ-ভাইদের এরকম গলা ফাটানো বক্তব্যই দেখে এসেছে। সে গলা ফাটিয়ে বলছে, যদি কেউ এ যাত্রাপালাকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা করে তাহলে তার হাত কেটে ফেলা হবে, জিহবা টেনে ছিঁড়ে ফেলা হবে, এ গ্রামে রাজাকারের স্থান নেই ইত্যাদি, ইত্যাদি। তবে মুরিদরাও বছর পাঁচেক আগে এমন বক্তব্যই রেখেছিল। যুবক ছেলেপেলেরা গ্রামে টেলিভিশনের জন্য ডিস এন্টেনা চালু করলে তারা শ্লোগান দিয়েছিল যে “মাথার উপরে হয় টুপি থাকবে,না হয় ডিস-এন্টেনা থাকবে।” খুনে মজিদের নির্দেশে কয়েকজন ক্ষীণাঙ্গী মুরিদ সেদিন বাজারের একতলা বিল্ডিঙের ছাদে লাফিয়ে উঠে উল্টানো ছাতার মতো এন্টেনাটি ভেঙে দিয়েছিল ।

 যা হোক, এরপর আফসার বাউলকে বক্তব্য দিতে বলা হলো। আমি তার বক্তব্য শুনতে উৎসুক কিছুটা। কখনও তার বক্তব্য শুনিনি। তাকে শুধু ড. সাহেবের আদেশ পালন করতে দেখেছি, গালি খেতে দেখেছি, ড. সাহেবের ঘরের মেঝেতে দুহাত সামনে রেখে কুকুরের মতো বসে থাকতে দেখেছি, কুকুরকে খাবার দিতে দেখেছি, কুকুরের ঘরে ঘুমাতে দেখেছি, কুকুরের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ঘুরতে দেখেছি, একতারা বাজিয়ে গান গাইতে দেখেছি, কিন্তু তাকে বক্তব্য দিতে শুনিনি কখনও। তাই এতটা আগ্রহ আমার।  ভাবছি, কী না কী বলে আবার। যা হোক, আফসার বাউল বক্তব্য শুরু করে। তার কন্ঠে বিনয়। সে মাউথপিছ দুহাতে বিনয়ের ভঙ্গিতে ধরে বক্তব্য দিচ্ছে। আস্তে আস্তে কথা বলছে সে। সে দেহতাত্তি¡ক কী কী যেন বলে যাচ্ছে, বুঝতে পারছি না খুব একটা। কথাগুলো তার বিনয়ের ভারে হারিয়ে যাচ্ছে । অবশেষে সে লালনের একটি গানের কয়েক কলি গেয়ে তার বক্তব্য শেষ করল।

এরপর একরাম সাহেবের বক্তব্য। তার বক্তব্য আমি কয়েক জায়গায় শুনেছি। সবখানে সে একই বক্তব্য পেশ করে। বিরোধীদলের বিরুদ্ধে বক্তব্য। রাজাকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য।  তাই ভাবছি,নতুন করে শোনার কিছু  নেই। তাই আমি তার বক্তব্যের দিকে মনোযোগ না দিয়ে বিশাল গোলাকৃতি প্যান্ডেলের চারদিকে তাকিয়ে দেখতে থাকলাম।  আমার মনের ভেতর  তখন নয়বছর আগেকার যাত্রাপালা দেখার স্মৃতি ভেসে উঠছে….

 হ্যাঁ, আজ থেকে নয় বছর আগে এখানেই প্যান্ডেল করা হয়েছিল। ভিখারি আবেদ লেংড়া ঠিক ঐখানটাতে বসেছিল। সেদিন আমি বসেছিলাম তার পাশেই। দশ বারোটি  চেয়ার পেরিয়ে বসে ছিল মরিয়মের বাবা কমল শেখ। তিনি সেদিন তার বিশাল ভুঁড়ি সামনে এগিয়ে ধরে নর্তকী মেয়েটির সাথে নেচেছিলেন। শুকুর আলী বসে ছিল আমার সামনেই । সে একখানা একশত টাকার নোট নর্তকীর হাতে গুঁজে দিয়েছিল সেদিন। বামপাশে দূরে ভিআইপি চেয়ারের দিকে বসে ছিল মনোয়ার আর আনোয়ার। তারা দুই ভাই নর্তকী মেয়েটির শরীর স্পর্শ করার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিল।

অবশ্য তার তিনদিন পরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দৃশ্যটি আমি নিজ চোখে দেখিনি। ছলিমের কাছে শুনেছিলাম।

 আমি কল্পনায় দেখছি যে, এ মঞ্চে আমি যেখানটায় এখন বসে আছি তার ঠিক সামনে নয় বছর আগে একজন নর্তকী ভলান্টিয়ারের লাঠির আঘাতে তড়পাতে তড়পাতে মৃত্যুবরণ করছে।  মনে ফ্ল্যাশব্যাক হচ্ছে আমার। আমি দেখছি যে, একটি কালো কুকুর এই মঞ্চে চক্রাকারে ঘুরছে আর ঘুরছে, নর্তকীরা ভয় পাচ্ছে কিন্তু নাচ ছাড়ছে না। এমন সময় একজন ভলান্টিয়ার কুকুরটিকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলো। আঘাতটি কুকুরের গায়ে না লেগে একটা নর্তকীর মাথায় গিয়ে লাগল। এরপর মেয়েটি মঞ্চে লুটিয়ে পড়ল। রক্তে ভেসে গেল সারা মঞ্চ ।  এই সময় আরেকটি মেয়ে রক্ত দেখে ভয়ে দর্শকের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল। তারপর দর্শকেরা উন্মাদের মতো মেয়েটিকে ঘিরে ধরল। আহা, ছলিমের সেই কথাটি  পড়ল আমার। সে বলেছিল, একটি মরা মুরগিকে পুকুরে ফেললে আফ্রিকান মাগুরগুলো যেভাবে মুহূর্তের মধ্যে মুরগিটিকে ছিন্নভিন্ন করে ফ্যালে, মেয়েটির শরীর নিয়ে তেমনই করছিল লোকজন ।

 মাইকে সঞ্চালকের মোটা কন্ঠের আওয়াজে আমার কল্পনায় ছেদ পড়ল হঠাৎ।  শুনছি, সঞ্চালক ঘোষণা করছে- এবারে বক্তব্য রাখবেন বিশিষ্ট নর্তকী, বিশিষ্ট পরিচালক, বিশিষ্ট এটা-সেটা জনাব বীনা চৌধুরী।

 বীনা চৌধুরী বক্তব্য শুরু করলেন। আমি তাঁর বক্তব্য মন দিয়ে শুনছি।  তিনি বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন…. কিন্তু তার কন্ঠস্বর আমার কাছে কেন যেন খুব চেনা মনে হচ্ছে। কন্ঠস্বর ভাঙা-ভাঙা, কাকের স্বরের মতো অথবা গোরস্তানের পাশে আমার ঘরের নিকটবর্তী গাছটিতে বসে থাকা নিঃসঙ্গ কানাকুয়োটির ডাকের মতো। মহিলা হাসছেন আর কথা বলছেন। হাসির কারণে স্বরটা আরও অদ্ভুত লাগছে। তিনি বলছেন যে, নয় বছর আগে তিনি এখানে একবার এসেছিলেন। সেদিনের দুঃখময় ঘটনা তিনি ভুলে গেছেন, ভুলে যেতে তাকে হয়েছে, কারণ এটা তার শ্বশুরের গ্রাম। হতে পারে এটা তার শ্বশুরের গ্রাম,তাতে সমস্যা কী? আমি মনে মনে বললাম এটা। আমি মহিলার বক্তব্যের গভীরে আর প্রবেশ করলাম না। মহিলাটির কন্ঠস্বরটাই মূলত আমার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিল। আমি পীরজাদার কথা ভাবতে থাকলাম। ভাবতে থাকলাম যে ,আজকের এই দিনে আমি এখানে প্রধান অতিথি হয়ে মস্ত বড় অপরাধ করে ফেলেছি। আমার সামনে যারা দর্শক-শ্রোতা হিসেবে বসে আছে, তারা এ গ্রামের ক্ষেতে-খামারে কাজ করে খাওয়া অশিক্ষিত লোকজন। বেশিরভাগই তরুণ বয়সের। এদের সামনে প্রধান অতিথি হয়ে আসা তেমন তাৎপর্য বহন করে না। এরা তেমন কিছু বোঝে না। এছাড়া এদের চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে এরা এই মুহূর্তে আমাদের বক্তব্য দেয়াটা পছন্দ করছে না। আমরা এদের সামনে থেকে যত দ্রæত নিষ্ক্রান্ত হবো তারা তত খুশি হবে।  কারণ এদের মন পড়ে আছে অন্য জায়গায়। এরা এখন স্বল্পবসনা যুবতীদের নাচ দেখতে চায়। তারা নাচ দেখবে, নর্তকীদের শরীর দেখে উত্তেজিত হবে। তাদের মুখের ভেতর দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা খিস্তি,গরল যা কিছু আছে তারা সব ছুঁড়ে দেবে নর্তকীদের দেহের উপর। নর্তকীরা সেই খিস্তি নিজের শরীরে মেখে নেবে। দর্শকরা তাদের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে টিকেট  কেটেছে আমাদের বক্তব্য শোনার জন্য নয়।  দেখলাম, কেউ কেউ অধৈর্য হয়ে বিড়ি  জ্বালিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ  আমার নিজেকে অনেক বেশি তুচ্ছ মনে হতে থাকল।  মনে হতে থাকল,  দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মেডিক্যাল  কলেজের ছাত্র হওয়া সত্তে¡ও আমার মধ্যে কোনো ভ্যালুজ গড়ে ওঠেনি, আমি ভালো-মন্দ বুঝতে শিখিনি। আমি সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে পড়ে আজ এখানে এসেছি। আমার মনে হতে থাকল যে, অশিক্ষিত মূর্খ মানুষদের বাহবার চেয়ে শিক্ষিত মানুষদের তিরষ্কার ভালো।  খুবই নিচু লাগল  নিজেকে। কয়েকদিন আগে গোরস্তানের জালছায় বয়ান দিয়ে যে কনফিডেন্সটুকু অর্জন করেছিলাম, তা যেন একদম ধূলায় মিশে গেল ।

হঠাৎ সঞ্চালক আমার নাম ঘোষণা করল। আমি আগেই যেহেতু বুঝতে পেরেছিলাম যে উপস্থিত দর্শকরা আমাদের বক্তব্য পছন্দ করছে না, তাই আমি দুই তিনটি বাক্য বলেই আমার বক্তব্য শেষ করলাম এবং অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ঘোষণা করলাম। দর্শকদের ভেতর থেকে তখন উল্লাস ধ্বনি ভেসে আসলো। যাত্রাপালা কমিটি আমাদেরকে ভিআইপি সিটে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য মঞ্চের নিচে নিয়ে গেল। যদিও আমি যাত্রাপালা দেখতে অপারগতা ও অনিচ্ছার কথা বললাম, তবুও তাদের অনুরোধে আমাকে ভিআইপি সিটে বসতে হলো। ভিআইপি সিটে বসে তখন নর্তকীদের খুব কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছি এবং জানতে পারলাম যে, ভিআইপি সিটে বসা ব্যক্তি ইচ্ছা করলে নর্তকীদের সাথে মঞ্চে গিয়ে নাচতে পারে।

 আমি ভিআইপি সিটে বসে আছি। আমার পেছনে কয়েকজন পুলিশ কনেষ্টবল । একজন এএসআইও আছেন। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যে সকল নর্তকী মঞ্চে এলো। নর্তকীদের সাথে বীনা চৌধুরীও মঞ্চে। নাচের ড্রেস তার পরনে। আমার ধারণা ঠিক। বীনা চেীধুরী নিজেও নাচবেন।

 এরপর বীনা চৌধুরী খ্যাসখ্যাসে গলায় একটি গান পরিবেশন করলেন। গানটিকে বন্দনাসঙ্গীত বলা যেতে পারে। এরপরে মঞ্চে একটা  মেয়ে এলো। মেয়েটি কমবয়সী, স্বল্পবসনা। স্বল্পবসনা হলেও কমবয়সী হওয়াতে চেহারা তত উৎকট বলে মনে হচ্ছে না। মেয়েটি তার সাধ্যমত নাচল। তার নাচ দেখে মনে হলো যে, নাচ একটি উৎকৃষ্ট ব্যায়াম। দেখলাম, মেয়েটির  চেহারার সাথে তিথির  চেহারার বেশ খানিকটা মিল রয়েছে। বিশেষ করে চোখে ও চুলে।

এরপরেই আসলেন বীনা চৌধুরী। তিনি রীতিমত টাইটফিট একটি ড্রেস পরে এসেছেন। তাঁর  শরীরের মাংস পোশাকে ভাঁজ তুলে বিভিন্নভাবে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। ফলে ঐ জায়গাগুলোকে বেঢপ বলে মনে হচ্ছে। তবে তাকে অতটা মোটা বলেও মনে হচ্ছে না। ইতোমধ্যে  তিনি ‘নরম গরম’ সিনেমার গানের সাথে নাচ শুরু করে দিয়েছেন। দর্শকদের মধ্যে থেকে হর্ষধ্বনি, অশ্লীল ধ্বনি ভেসে আসছে। তবে এসব তিনি গায়ে মাখছেন না। উল্টো মজা পাচ্ছেন। গ্রামের দর্শকরা বোধ হয় মোটা মাংসল চেহারার নারী দেখে বেশি পুলকিত হয়। তা না হলে এমন পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সী মহিলার নাচ দেখে দর্শকরা এত মজা পাবে কেন? এত হুল্লোর দিবে কেন? আমি ভেবে দেখলাম, তাদের পুলকিত হওয়ারই কথা। গ্রামে মোটা শরীরের মেয়েমানুষ আর কই । গৃহস্থালি কাজসহ বিভিন্ন কাজ–যেমন,ধানভানা,ধান সিদ্ধ করা,ধান মাড়াই করা,বিভিন্ন রবি ও খরিপ শস্য পরিষ্কারকরণ, গবাদিপশুকে খাওয়ানো, নিজের সন্তানদেরকে লালন-পালন, তিন বেলা রান্না করা, স্বামীকে সেবা করা, আবার স্বামীর হাতে সময়ে সময়ে গালাগালি-পিটুনি খাওয়া, ইত্যাদি কারণে গ্রামবাংলার নারীদের শরীর মাংসল হয়ে উঠতে পারে না। ফলে দীর্ঘদিন যাবৎ অমাংসল শরীরের স্ত্রীদের সঙ্গ তাদের কাছে একঘেয়ে হয়ে ওঠে। তাই হয়ত গ্রামের পুরুষরা  মনে মনে মাংসল নারীদেরকে কামনা করে।

বীনা চৌধুরী নেচে চলছেন। কিন্তু তার নাচ দেখে আমার কেমন গরম লাগছে, ঘামছি আমি। এদিকে দেখছি যে, তিনি ঘামছেন না। আমি  তাঁর এত কাছাকাছি রয়েছি যে, তাঁর শরীরের বিন্দু বিন্দু ঘাম আমার চোখে পড়ার কথা।  কিন্তু ঘাম নেই। এত নাচের পরেও তার না ঘামাটা একটা বিশেষ ব্যাপার বটে। পেশাদার নর্তকীরা বোধ হয় ঘাম সংবরণ করার কৌশলটা জানে । তারা জানে যে ঘামলেই সর্বনাশ। কারণ ঘামের সাথে তাদের মুখের মেকাপও ধুয়ে যাবে। এদিকে শীতের মধ্যেও আমি ঘেমে উঠছি। এত দর্শকের শরীরের গরমে ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। প্যান্ডেলের চারদিকে এমনভাবে আটকানো যে বাতাস ঢোকার বা বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই।

বীনা চৌধুরী আমার খুব কাছে এসে ঠোঁটে বিস্তর হাসি তুলে নেচে চলছে। তিনি আমাকে খুশি করতে চান। হয়ত আমাকে তাঁর মনে ধরেছে। অতিশয় নির্লজ্জ ভঙ্গিতে দুই হাতে ইশারা করে তিনি আমাকে মঞ্চে ডাকছেন। ডাকের মধ্যে অন্যরকম আবেদন। নির্লজ্জতায় ভরপুর চাহনি। এটা দেখে দর্শকদের মধ্য থেকে একটা হুল্লোড় উঠছে। তারা চাচ্ছে আমি  যেন তার সাথে নাচি। পাশে বসা পুলিশ ভাইটি আমাকে  তাগাদা দিচ্ছেন। বলছেন, “যান না ভাই, একটু মাস্তি করে আসেন।” আমি যাচ্ছি না। কারণ আমি ভাবছি যে,তার সাথে নাচলে বকশিস দিতে হবে। আমি যেহেতু এখনও ছাত্র, তাই আমার অর্থাভাব রয়েছে। এখনও বাপের টাকায় পুরা মাস চলতে হয়।

এরপর আমি উঠছি না দেখে বীনা চৌধুরী নাচতে নাচতে মঞ্চের নিচে নেমে আসলেন। দর্শকরা বিপুল পরিমাণে হাততালি দিচ্ছে। প্রথমে তিনি পুলিশের কাছে গেলেন। পুলিশ তাঁকে অতটা পাত্তা দিল না। তারপরে আসলেন আমার কাছে। কিন্তু আমি মাথা নিচু করে ফেলেছি । ভীষণ লজ্জা লাগছে আমার। এদিকে তিনি আমার মাথার কাছে ঝুঁকে নেচে চলেছেন। মাইকে বেজে চলছে ..

  “ তোমাকে চাই আমি আরো কাছে, তোমাকে বলার আরো কথা আছে।” তিনি গানের কথার সাথে সঙ্গতি রেখে তার নাচের মুদ্রা প্রদর্শন করে চলছেন। আমি তার মুখের দিকে একবার ভাল করে তাকালাম। তার চোখ দুটো অনেক বড়। হঠাৎ মনে হলো , তিনি তার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বড় মুখ-গহবর দিয়ে আমাকে গ্রাস করে ফেলবে । তাকে হঠাৎ করে আমার রাক্ষসী টাইপের কিছু মনে হলো। আমি তাকে ঠেলে দিয়ে দ্রæত গতিতে প্যাÐেলের বাইরে চলে আসলাম। আমার পেছনে গান বেজে চলছে, “ বলতে পারি না মুখে তওবা তওবা, দিলে জখম হলো উহুআহা।”

 রাত বোধ হয় নয়টা বেজে গেছে, ভাবছি আমি। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিলাম। ঠাÐা বিশুদ্ধ বাতাস আমার নাকে ঢুকছে। প্রতি মুহূর্তে আমি চাঙ্গা হয়ে উঠছি। এই বাতাসে নর্তকীদের পারফিউমের গন্ধ নেই, দর্শকদের ঘামের গন্ধ, দমবন্ধ করা বিড়ির গন্ধ নেই। আমার শান্তি শান্তি লাগছে।  আকাশে অসংখ্য তারকারাশি আমার মাথার উপরে। পিট পিট করে যেন দেখছে আমাকে । চারপাশে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ। আমি যে জমিটায় দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে খেসারি ডালের চাষ করা হয়েছে। খেসারি ক্ষেত শিশিরে ভেজা। নরম। আমার পায়ের পাতা ভিজে যাচ্ছে। পাশের জমিতে সরিষা ক্ষেত। ফুল ফুটে একাকার হয়ে রয়েছে। ভালো করে দেখা যাচ্ছে না ফুলগুলো, অন্ধকারে আবছা সব। একটু দূরেই বোধ হয় আমাদের জমি। তার পাশে দরবেশ কাকার জমি। না,ভুল হলো, দরবেশ কাকার জমি এখন আর নেই। ওটা কাজেম উদ্দীনের ছেলেরা বেশ আগেই কিনে নিয়েছে।

 আমার মনে পড়ছে, অনেক ছোটবেলায় আমি এ মাঠে ধানক্ষেত দেখতে আসতাম। তখন ছলিম আমাদের রাখাল ছিল না। তখন শীতকালে স্কুল থেকে ফিরে আমাদের সাদা রঙের গাইটাকে মাঝে মাঝে এ মাঠে নিয়ে  আসতাম। মাঠের আইলে বড় বড় লকলকে বিনানো দূর্বাঘাস হতো। গাইটি সেগুলো সুন্দর করে খেত। আমি গাইটাকে বলতাম, “খবরদার গমে কামড় দিবি না।” গাইটা বোধ হয় আমার কথা বুঝতে পারত। সে লকলকে সবুজ ঝোপা ঝোপা গমগাছে একটা কামড়ও দিত না। তারপর যখন একদম সন্ধ্যা হয়ে যেত, তখন গাইটিকে নিয়ে আমি বাড়ি ফিরতাম। সে তখন তার বাছুরের জন্য পাগল হয়ে যেত। তিড়িং-বিড়িং করে লাফাতো। মনে হতো খুশিতে নাচছে সে । রাস্তায় চলতে চলতে তার ওলান ততক্ষণে বেলুনের মতো ফুলে ঢোল।  গাইটি বাড়ির কাছে না পৌঁছাতেই বাছুরটা কিভাবে যেন টের পেয়ে যেত। ডাকাডাকি শুরু করত। তারপর আব্বা এসে গাইটির দুধ দহন করার পর বাছুরটিকে ছেড়ে দিত।  ঠিক তখন গাইয়ের ওলান আবার ফুলে উঠত। আব্বা বলত,  “দেখছিস, গাইডা কী চুন্নী, বাছুরের জন্য ওলানে দুধ চুরি করে রাহিছে।” আমি বলতাম, “ঠিকই করছে, ওযে বাছুরের মা হয়।”

 যা হোক,মাঠের ভেতর দিয়ে চলছি আমি । শিশিরে ভিজে যাচ্ছে আমার পা । অন্ধকারের মধ্যে পা ঠিক থাকছে না, পিছলে যাচ্ছে। ব্যালেন্স পাচ্ছি না ঠিক মত। মাথা যেন কেমন করছে। এমন হচ্ছে কেন? এসমস্ত জমির সব আইল তো আমার চেনা। আমি গাই চড়িয়েছি তো এসব আইলেই । আমি আইল চিনতে চেষ্টা করছি। কিন্তু এ কী হচ্ছে আমার? আইল আর গাই একসাথে এসে  মিশে যাচ্ছে। ধূর! গাই কেন আসছে?  গাই আসবে কোত্থেকে? কিন্তু আমি দেখছি ,গাইটি আইল দিয়ে ঘাস খেয়ে চলছে নিবিষ্টভাবে। গাইটি বেশ স্বাস্থ্যবান, সাদা। বিকেলের আবীর মেশানো আলোয় তার সাদা শরীর চিকচিক করছে। লকলকে বিনানো দুর্বাঘাসে সে কামড় দিচ্ছে আর আমি দেখছি তার ওলান ফুলে উঠছে সমে-দমে। এক কামড় দুর্বাঘাসে এক ফোটা দুধ। আমি হিসেব করে চলছি।

সূর্য ডুবে যাচ্ছে। গাইটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি। তার পেট টুইটম্বুর। তার ওলান টুইটম্বুর। সে তিড়িং-বিড়িং করে নাচছে। সে নাচছে লেজ উঁচিয়ে, দুপা ছড়িয়ে। হঠাৎ দেখি গাই নেই। উধাও। গাইয়ের জায়গায় তিড়িং বিড়িং নাচছে বীনা চৌধুরী । সাদা গাই নয়,সাদা চকমকি পোশাকের বীনা চৌধুরী। কিছুক্ষণ আগে দেখা গাইটির দোদুল্যমান লেজ নয়, বীনা চৌধুরীর পরিপাটি বিনুনি করা চুল।  গাইয়ের ফুলে ওঠা ওলান নয়, বীনা চৌধুরীর উন্নত সুডৌল স্তন। আমার সেই গাইয়ের বাছুর নয়, বীনা চৌধুরীর একটি পুষ্টিহীন সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত মেয়ে।

সম্বিৎ  ফেরে আমার । আমি দেখি, আমি খোলা আকাশের নিচে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছি। বীনা চৌধুরীকে আমি আমার গাই কল্পনা করছি কেন? ইজ সি রিয়েলি আ কাউ?  হাউ কাম? কিভাবে এটা আমার মাথায় আসলো? তবে বীনা চৌধুরীকে গাই ভাবাতে কেন যেন তার উপর আমার একটা মায়া পড়ল। মনে হলো, আমার গাইয়ের পুষ্টিহীন বাছুরটির মতো তারও হয়তো একটি পুষ্টিহীন সন্তান আছে যার ভরণপোষণের জন্য তাকে নাচতে হয়।

আমি যাত্রাপালার প্যাÐেল থেকে তখন বেশ দূরে চলে এসেছি।  পেছনে গান বেজে চলছে। বীনা চৌধুরী কি এখনও ওরকম বেহায়া ভঙ্গিতে  নেচে চলছে? গানটা এতক্ষণ ধরে চলছে কেন? তিনি এখন কার দিকে তাকিয়ে ভ্রু বাঁকিয়ে নাচ করছেন? ভিআইপি চেয়ারে বসা কেউ কি তার সাথে বুক মিলিয়ে এখন নাচছে? আমি এসব ভাবছি আর হেঁটে চলছি। মেঠো রাস্তা দিয়ে এখনও অনেক লোক প্যাÐেলের দিকে আসছে। কেউ দৌড়াচ্ছে। তাদের অস্থিরতা এজন্য যে, আহা নাচ বুঝি শেষ হয়ে গেল। অনেক মুরুব্বী টাইপের লোকও যাচ্ছে। হয়তো গোপনে গোপনে কোনো মুরিদও যাবে। তারা তাদের মুখের দাড়ি গামছা দিয়ে ঢেকে-ঢুকে  প্যাণ্ডেলে প্রবেশ করবে।

আমি গ্রামের ধুলিময় নরম রাস্তা দিয়ে হাঁটছি বটে কিন্তু আমার ভাল লাগছে না। আমার ভয় হচ্ছে এটা ভেবে যে,আমার বাড়িতে হয়ত ইতোমধ্যে গোটাদশেক মুরিদ এসে জড়ো হয়েছে।  ভাবছি,তারা নিশ্চয়ই আব্বার কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছে, আর আব্বা যদি এইসব মুরিদদের সামনে আমাকে এখন জবাবদিহির জন্য ডাকে, তাহলে আমার মাথা চিরকালের জন্য হেট হয়ে যাবে। আমি আব্বার সামনাসামনি হতে চাইলাম না। তাই আমি অতি সর্ন্তপণে বাড়ির পেছন দিয়ে ঢুকে আমার ঘরে প্রবেশ করলাম। বাড়ির ভেতর থেকে আমি তখন কয়েকজন লোকের গলার আওয়াজ পাচ্ছি। খুনে মজিদের গলার আওয়াজ স্পষ্ট। উচ্চকণ্ঠ সে। বেশ উত্তেজিত । সে বেশ জোরে জোরে আব্বার সাথে কথা বলছে। কথাটা আব্বার শোবার ঘর থেকে আসছে। ও ঘরে কতজন মুরিদ এসেছে তা আমি আন্দাজ করতে পারছি না। আমি লাইট না জ্বালিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়লাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, রাতের খাবার আজ আর খাব না।  যদিও ক্ষুধা অনেক ।  রাতে ঘুম হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ হলো। তারপর ভাবলাম, ব্যাপার না, এক রাত না খেয়ে থাকলে তেমন কিছু হবে না।

 ঘুম একদম আসছে না। শরীরে  মেটাবোলিজম ঠিকমত না হলে ঘুম আসে না। অগত্যা আমি তিথির কথা মনে আনতে চেষ্টা করলাম। আগে আমি তিথির কথা মনে করে অনেক রাত ঘুমিয়েছি। তিথির শরীরের স্পর্শ মনে পড়ল আমার । ইস, এ মুহূর্তে তিথি পাশে থাকলে গল্প করে সময় পার করা যেত। অথবা….।  ফোন দিব কি? কিন্তু এত টাকা লাগে ফোন দিতে, বিরক্তিকর। তিথির সাথে ফোনে কথা বলে একদম স্বস্তি পাই না। প্রতি মিনিট সাত টাকা করে খরচ। ফোন কোম্পানি একটা ডাকাত। সাত টাকা করে  প্রতি মিনিট। মানা যায়?  সাত টাকা মানে হলের ডাইনিং এর একটা মিলের সমান খরচ। তিথি আবার খুব একটা ফোন দেয় না। মিস কল দেয়। আমাকেই  ফোন ব্যাক করতে হয়।

 তারপরও তিথিকে ফোন দিলাম। তার জন্য ফতুর হতে আমি রাজী । এখন তার কন্ঠস্বর শুনলেও ভাল লাগবে। সে কেমন আছে, কী করছে  এসব শুনব। এসব ছাড়াও আরো বেশ কিছু কথা এক মিনিটে বলা যাবে। শেষে দুএকটা চুমুও দেয়া যাবে। তবে সাত টাকা খরচের তুলনায় এসব চুমুটুমু নগন্য।  তিথি যতই ওপাশ থেকে আদর করুক, চুমু দিক তা সাত টাকার মূল্যমানের হয় না। বেকারদের কাছে সাত টাকা ম্যালা টাকা।

তিথি ফোন ধরছে না। হয়ত ফোনটা অন্য কোথায়ও রেখেছে।  তবে আমি অনুভবে তার খোঁজাটা উপভোগ করছি— ফোনে রিংটোন বাজছে কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না সে। সে অস্থির হয়ে খুঁজছে। সে একটা কফি কালারের কামিজের ওপরে নরম কার্ডিগান পরেছে। রিংটোনের শব্দ ধরে দ্রæত পায়ে হাঁটছে সে । তার শরীরের সব যৌবন তার অস্থির হাঁটার তালে থরথর করে কাঁপছে।

আমি আবারও ফোন দিলাম। এবার সে ধরল। বললাম,

– কেমন আছো সোনা?

-তুমি দুইদিন যাবৎ ফোন দাওনি। আমি কিন্তু রাগ করেছি। (তার কণ্ঠে কপট রাগ।  অবশ্য এরকম রাগ দেখালে তার কণ্ঠের খ্যাসখ্যাসানি বেশ কম লাগে।)

– খুব ব্যস্ত ছিলাম, জান। রাগ কোরো না।

– তোমাকে অনেক মিস করছি।

– আমিও।

– সমস্যা নেই। আর তো মাত্র তিনদিন। তারপর তো ক্যাম্পাসে দেখা হবে।

–  তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। তুমি  কাল পাবনা আসতে পারবা?

– পারব, বাট, তোমার বান্ধবীর বাসায় কিন্তু যাবো না।

– আরে না।  যেতে হবে না। এবার তুমি তোমার শ্বশুরবাড়িতে আসবা।

– কী যে বলো তুমি, মজা করো, তাই না?

– আরে না,সত্যি বলছি। বাসায় তো মা নেই। মা তিনদিনের জন্য বাইরে গেছে। ছোটকুকে রেখে গেছে। ও সকালে স্কুলে চলে যাবে।

– তোমার মা গেছে কোথায়?

– যাত্রাপালার একটা প্রোগ্রাম পেয়েছে। মেজোটাকে নিয়ে গেছে। মেজোও নাচবে।

 এরপর আর কথা বলতে পারলাম না। মোবাইলের ব্যালান্স শেষ। একটা চুমু দেয়ার ইচ্ছা ছিল। পারলাম না। ঠোঁটের গোড়ায় কেমন যেন অস্বস্তি থেকেই গেল। এছাড়া আরো একটা কথা বলার ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করতে চাচ্ছিলাম তার মায়ের নাম বীনা চৌধুরী কিনা।

 তিথি শেষের কথাটা যেন কী বলল! তার বোনকে তার মা সাথে নিয়ে গিয়েছে? তাহলে আমি যে মেয়েটিকে স্টেজে নাচতে দেখেছি এ মেয়েটি কি তাহলে তিথির বোন ! মেয়েটির চোখ ও চুলের সাথে তিথির মিলও তো রয়েছে। আমার খুব অস্থির লাগছে। ভাবছি, আমার সন্দেহ যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে সর্বনাশ। কারণ আমার পক্ষে এমন একজন নর্তকীর মেয়ের সাথে সম্পর্ক রাখা কোনোক্রমেই সম্ভব হবে না। আমি বীনা চৌধুরীকে একবার শাশুড়ী হিসেবে কল্পনা করলাম। উহ! অসহ্য। এটা সম্ভব নয় কখনও। তিনি কিছুক্ষণ আগে আমার একদম মুখের সামনে এসে বুক দুলিয়ে নেচে গেছে। আবার সে আমাকে বাজে ইঙ্গিত দিয়ে কয়েকবার ইশারা করেছে। এ মহিলা কখনও আমার শাশুড়ী হতে পারে না,এ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও না। আবার তিথির বোনটাও দেখি নর্তকী হয়েছে। হায় হায়! এখন আমার কী হবে? আমি মনে মনে সহস্রবার দোয়া পড়লাম, যাতে আমি যেটা সন্দেহ করছি  সেটা যেন সত্যি না হয়। কিন্তু আমার মনে হতে থাকল যে, আমার সন্দেহ মিথ্যা না হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯৯%। হঠাৎ আমার মনে পড়ল, বীনা  চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেছেন যে, এই রহমতপুর গ্রামই তার শ্বশুর বাড়ি। তাহলে সবকিছুই তো মিলে যাচ্ছে। সর্বনাশ!

আমার ঘুম আসছে না একদম । মাঝখানে মা একবার এসে খাওয়ার জন্য ডেকেছে । আমি বলে দিয়েছি আমার ক্ষুধা নেই। মুরিদরা চলে যাওয়ার পর আব্বা একচোট বেশ গালাগাল পেড়েছে। বহুদিন পর আব্বার মুখ ছুটেছে। আব্বার মুখ ছুটলে সহজে থামে না। তিনি থেমে থেমে চেঁচিয়ে যান। দম নিয়ে নিয়ে চেঁচান।  যা হোক,বাবা একই কথা বার বার বলে চেঁচাচ্ছেন।  তিনি চেঁচাক সমস্যা নেই।আমি ভাবছি যে, সকাল হলে সবার আগে মোবাইলে রিচার্জ করে তিথিকে ফোন দেব। তারপর আমার প্রথম জিজ্ঞাসা হবে, তার মায়ের নাম বীনা চৌধুরী কিনা।

বিছানায় শুয়ে আমি অনেকবার ভাবলাম কোনো অনিবার্য পরিস্থিতি আসলে তিথিকে আমার পক্ষে ভুলে থাকা সম্ভব হবে কিনা। আমি নিজের সাথে যুদ্ধ করলাম এবং হেরে  গেলাম। বারে বারে হারলাম। বুঝতে পারলাম যে, তিথি আর আমার সম্পর্ক এমন হয়ে গেছে যে, আমি নিজেই যেন তিথি হয়ে গেছি। আমরা ইউনিফাইড হয়ে গেছি, পরস্পর এক দেহ হয়ে গেছি। এখন সে এবং আমার মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তার ভেতরে আমি ফানা হয়ে গেছি । তিথিকে ভুলে যাওয়া মানে আমার নিজেকে ভুলে যাওয়া, আমার নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.