আমার মুরিদজীবন।। তৃতীয় খণ্ড।। মেডিক্যাল কলেজে

 3,443 total views

তৃতীয় খণ্ড

. মেডিক্যাল কলেজে

 সাদিয়া! সাদিয়া! আমি সাদিয়াকে ডাকছি। সাদিয়া ইদানিং বই পড়তে শুরু করেছে। সে  বিভূতিভূষণের আরণ্যক বইটা নিয়ে  ব্যস্ত আছে কয়েকদিন  ধরে।  সে তিথির মতই প্রকৃতি ভালবাসে। সে বলে,যে উপন্যাসে মেঘ, বৃষ্টি, পাখি, ফুল এগুলোর কথা নেই, সেগুলো তার পছন্দের না।  উপন্যাসের নায়িকা ছাদে উঠে বৃষ্টিতে ভিজবে, ছাদে উঠে না ভিজলেও অন্ততঃপক্ষে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ধরবে, নায়ক-নায়িকা একই ছাতার তলে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটবে অথবা খুব বৃষ্টি হচ্ছে, আশেপাশে কেউ নেই, নায়ক নায়িকাকে জড়িয়ে ধরে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকবে—- এসব প্রসঙ্গ তার খুব পছন্দ। অথবা এসব না হলেও একটা কিশোরী  ভোরবেলায় একাকী  ঘাসফুলের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে যাব, তার কানে গোঁজা  থাকবে নাম-না-জানা বুনো হলুদ ফুল, তার হাতের মুঠোতেও থাকবে অনেক ফুল। মেয়েটি মালা গাঁথবে। এ জাতীয় বর্ণনা বা দৃশ্যকল্প তার খুব প্রিয়।

 যা হোক,সাদিয়া আমার ডাক শুনে পাশের ঘর থেকে উঠে এলো।

বললাম, “ আরণ্যক রাখো এখন। আমার লেখা পড়ো।”

“  কী বলো তুমি! আরণ্যক বাদ দিয়ে তোমার লেখা পড়ব।তুমি কি জানো, এই উপন্যাসটা যদি ইংরেজিতে অনুবাদ করা হতো, তাহলে এটা নোবেল পুরষ্কার পেত।”

 “ আরে বাবা, তুমি তাঁর লেখার সাথে আমার লেখার তুলনা করছো কেন! আর আমি কি উপন্যাস লিখছি?”

 “ আমি তোমার এইসব ছাইপাশ পড়তে পারব না। কফি খাবে কিনা বলো। খেতে চাইলে বানিয়ে দিই।”

 “ আরে কফি-টফি না। তুমি বলছিলে, তুমি তোমার নিজের ও তিথির কথা পড়তে চাও। এজন্যই তোমাকে ডেকেছি।”

“  পড়তে চেয়েছিলাম। এখন আর ইচ্ছা নেই। এখন আরণ্যক পড়ছি।”

 সাদিয়া চুল দুলিয়ে চঞ্চলা বালিকার মতো চলে গেল।  সে আমার লেখা পড়ল না বলে আমার খারাপ লাগলো না। বরং আমার ভালো লাগলো এটা ভেবে যে, সে আগের মতো আবার সাহিত্য পড়ায় মন দিয়েছে। সাদিয়ার সাথে একসময় আমার  সাহিত্য আলোচনা করে সময় কেটে যেত। বিশ্বসাহিত্যে তার এত গভীর জ্ঞান ছিল যে, আমি আমার জানার অপ্রতুলতা ঢাকতে সুফিবাদ নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিতাম।

১৯৯৯ সাল। কোচিং ক্লাশে  গিয়ে দেখি আমার কলেজের সহপাঠি তিথি চৌধুরী ক্লাশরুমে বসে আছে। এ সেই তিথি যার সাথে কলেজে  ক্লাশ করার সময়ে  রোল কোলিং নিয়ে সমস্যা হতো। সে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় প্রথমবারে চান্স পায়নি বলে এবার দ্বিতীয়বারের মতো কোচিং করছে। আমার মতোই দ্বিতীয়বার।  সে আমাকে  ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল একবার । কথা বলল না। আগে সে আমার সাথে কখনও কথা বলেনি, স্বচ্ছন্দ্য ছিল না মোটেও ,তাই এবারেও সে বলল না। এটা  তেমন কোনো ব্যাপার ছিল না, আশ্চর্য বা অপমানিত হলাম না আমি। তবে একটা ব্যাপারে আশ্চর্য হলাম,তার মতো মেধাবী ছাত্রী কেন গতবারে মেডিক্যাল চান্স পায়নি। তাই ইচ্ছা হলো,ব্যাপারটা তাকে জিজ্ঞাসা করি ।

পরের ক্লাশে বসলাম পাশাপাশি। সাহস সঞ্চয় করে বিষয়টা জিজ্ঞাসা করে ফেললাম। সে উত্তর দিল এবং তাকে বরাবরের মতো অহমিকাপূর্ণ বলে মনে হলো না। সে বলল, সেও গতবারে ফেল করেছিল এবং পরীক্ষার হলে তার কী হয়েছিল তা সে বলতে পারে না। আমি তার ঘটনার সাথে আমারটার মিল খুঁজে  পেলাম। বিস্মিত হলাম।  দুজনের ক্ষেত্রে ঘটনাটা একই হলো কিভাবে?  তবে আমি আর কোনো প্রশ্ন করলাম না। দুই জনের একইরকম সমস্যা, এটা কী নির্দেশ করে!  মনে মনে ভাবতে থাকলাম আমি। ঠিক তখন সে হতাশার সাথে হঠাৎ বলে উঠল, “ভগবানের যা ইচ্ছে।”  এটা শুনে আমি ততোধিক বিষ্মিত হলাম। বিষ্মিত হওয়ার কারণ হলো আমি তাকে বরাবরই মুসলমান ভেবে এসেছি। তিথি চেীধুরী নামটা  সবসময় ওরকমই মনে হয়েছে আমার কাছে । এছাড়া তার চলাফেরা ও কথা-বার্তায় কখনও বোঝা যায়নি যে, সে মুসলমান নয়।

 কোচিং ক্লাশ যথারীতি চলতে থাকে। কোনো এক অজানা কারণে( এর কারণ হতে পারে তার প্রাক্তন ইয়ারমেট হিসেবে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না তখন)  ক্লাশে আমার পাশে বসতে সংকোচ করে না সে । উল্টো আমারই অস্বস্তি হয় । এত স্মার্ট আর সুন্দরী একটা মেয়ে আমার পাশে বসেছে! অস্বস্তি বোধ করছে নাতো? আমার শরীরের ঘামের গন্ধ পাচ্ছে নাতো? ইত্যাদি।  এসব ভেবে আমারই বরং সরে বসতে ইচ্ছা হয়।তবে শেষমেষ সরে বসা হয় না। মাঝে মাঝে আমার সাথে সে বিভিন্ন লেসন নিয়ে আলোচনা করে। তার আলোচনাটা ভালো হয়। বোঝানোর পদ্ধতি ভালো। পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক সমস্যাগুলিতে তার স্পষ্ট ধারণা রয়েছে, এবং মূল গণিতেও। হাইস্কুলের জব্বার স্যার যেমন বলেছিলেন, হিন্দুরা জেনেটিক্যালি গণিতে পাকা হয়,ব্যাপারটা আসলে তা-ই দেখছিলাম।আমার স্কুলের সহপাঠি ক্ষিতিশ ও লক্ষণও গণিতে পাকা ছিল। যা হোক, আমি আমার গণিতের দূর্বলতা তার সাহায্য নিয়ে অনেকটা কাটিয়ে উঠতে থাকলাম। তবে, খেয়াল করলাম,ক্যামেস্ট্রিতে তার খানিকটা অস্বস্তি আছে,বিশেষ করে অজৈব রসায়নে। সে বিভিন্ন রাসায়নিক সংকেতের সমতাবিধান করতে পারে না, এছাড়া আরও কিছু টপিকে। আমি তাকে ক্যামেস্ট্রিতে সাহায্য করতে থাকলাম।

 এভাবে আমরা একটানা চারমাস কোচিং করলাম এবং একে অপরের বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে গেলাম। কোচিং ক্লাশ শেষ করে আমি দুপুরে শহরের মসজিদে ঢুকতাম আর সে আমার সাথে স্টাডি করবে বলে অপেক্ষা করতে থাকত। আমি যোহর নামাজ শেষ করে আধাঘন্টার মতো অস্ফুট স্বরে জিকির করতাম। প্রতিদিনই এটা করতাম। সে দেখত যে, সকলেই নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসে, শুধু আমি আসি না। এতে সে একদিন আমাকে প্রশ্ন করল,

“সবাই নামাজ সেরে একসঙ্গে  বেরিয়ে আসে,তুমি আসো না কেন?”

“আমি নামাজের পর কিছুক্ষণ জিকির করি,তাই।”

“জিকির কী?”

“এক বা একাধিক আয়াত বা ধর্মীয়বাক্য বারে বারে উচ্চারণসহ বলা এবং এমনভাবে বলা যাতে করে হার্টে বা হৃদয়ে চাপ পড়ে।”

একটু হাসল সে। তারপর বলল,“এভাবে বারে বারে একই বাক্য মুখস্থ বললে কী উপকার হয়?”

আমি বললাম,“মানে কী?”

 সে বলল, ”তোমার কি বাক্যটি ভুলে যাওয়ার বাতিক আছে যে একই বাক্য বারে বারে বলো?”

আমি বললাম, “না, ভুলব কেন! আমি বার বার একই শব্দকে গভীরভাবে উচ্চারণ করি এবং এতটা চাপ দিয়ে উচ্চারণ করি যাতে সেটা আমার হৃদয়কে স্পর্শ করে।”

 সে আবারও হাসল। বলল,“তুমি যত চাপ দিয়েই উচ্চারণ কর না কেন,তা তো কেবলমাত্র ফুসফুসকে  আঘাত করবে। হৃদয়কে তা আঘাত করবে কিভাবে?”

আমি বললাম, “ তোমার তো এটা জানার কথা। ফুসফুসে আঘাত করলে সেটা হৃদয়েই পৌঁছায়। শব্দ তো শ্বাসাঘাত ছাড়া কিছু নয়। আল্লাহর পবিত্র নামমিশ্রিত শব্দ যদি বাতাসের সাথে মিশে যায় আর তা যদি ফুসফুসের এ্যালভিউলি দ্বারা অক্সিজেনের মতো শোষিত হয়, তাহলে  তো তা রক্তের মাধ্যমে হার্টে গিয়েই পৌঁছাবে।”

 সে তখন বলল, “অক্সিজেন না হয় রক্তে মেশে কিন্তু শব্দ কিভাবে মেশে? শব্দ তো একটা তরঙ্গ মাত্র।”

আমি বললাম, “মিশতে পারে। হার্টে তো ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক তরঙ্গ আছে। আর ইলেকট্রিক ইমপাল্সের মাধ্যমেই  তো হার্ট সচল থাকে।”

 সে তবুও হাসল। তারপর সে অন্যদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। এরপর বলল,“ শোনো, ধরো,তুমি একটা  মেয়েকে ভালবাস এবং সেও তোমাকে ভালোবাসে ।তো,তাকে যদি তুমি একনাগাড়ে ’আই লাভ ইউ’ বলতেই থাক, তাহলে কিন্তু একসময়ে সে বিরক্ত বোধ করবে।  করবে কিনা বলো? তুমি যে একনাগাড়ে একইবাক্য হাজারবার বলো, এতে যার উদ্দ্যেশ্যে তুমি বলছ সে বিরক্ত হয়ে যাবে তো । এটা আসলে ন্যাগিং এর মত লাগে এবং এটা স্যানেটির পর্যায়েও পড়ে না।”

আমি বললাম, “না, আমি যার উদ্দেশ্যে বলি তিনিই তো বলে দিয়েছেন আমরা  যেন সর্বদা তার স্মরণ করি। এতে তিনি খুশি হন। বিরক্ত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।”

তারপর সে বলল, “ এটা তো তুমি মনে মনে করতে পারো, স্মরণ তো মনে মনেও করা যায়। তুমি মসজিদে দেরি করলে আমার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যায়। তোমার সাথে একটু স্টাডি করলে পড়াটা একটু ক্লিয়ার হয়,তাই তোমার জন্য ওয়েট করি।”

 খারাপ কিছুই বলেনি সে, তারপরেও তার কথা শুনে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে  গেল। এই একটা  কঠিন সমস্যা  ছিল আমার । কারো সাথে বন্ধুত্ব হতো না। হলেও আবার বেশিদিন বেশিদিন টিকত না। আমার কাছে মনে হয়েছে, সে আমার জিকির করাটাকে তুচ্ছ করে দেখেছে, আসলে সে তা করেনি।  নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে সে সঠিক কথাই বলেছে,  জেনে হোক বা না জেনে হোক,বলেছে যে, আমি যেন মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করি।  করা যায় তো এমন। তবুও তার সাথে আমার সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছা করল না।  আমি সিদ্ধান্ত নিলাম তার সাথে আর কখনও কথা বলব না।

  ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ হলো। সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হলাম। গ্রামে এটা প্রচার হলো বটে কিন্তু কারো কাছ থেকে কোনো বাহবা  পেলাম না। একবার ফেল করা ছাত্র পরে যত ভাল রেজাল্টই করুক, তেমন প্রশংসা পায় না। কেউ একবার জিজ্ঞাসাও করল না যে রেজাল্ট কেমন হয়েছে। খ্যাতির স্কেল যার একবার নিচে নেমে যায়, মানুষ তাকে সহজে উপরে উঠাতে চায় না।  বরং নামানো অবস্থাতেই দেখতে চায়। ভাল ছাত্র হিসেবে আমার যে খ্যাতি ছিল , তা চিরজীবনের মতো যেন অবনমিত হয়ে গেছে। বাবা-মা বা বোনের কাছ থেকেও তেমন কোনো বাহবা  পেলাম  না। তারা শুধুমাত্র আমার রেজাল্টটি  শুনল। চোখেমুখে খুশির কোনো অভিব্যক্তি দেখাল না তারা ।  যা হোক,তারাই বোধ হয় ঠিক ছিল। হারিয়ে যাওয়া জিনিস অনেক খুঁজাখুঁজির পর সেটা পেলে মালিকের যেমন আনন্দ হয়, দর্শনার্থীদের তেমন আনন্দ হয় না। তাই তাদের এখানে আনন্দ করার কী আছে? আমার তো এভাবেই পাশ করার কথা ছিল।

কিন্তু আমার পরিবারের লোকজন কেন খুশী হয়নি আমি তারও কারণ খুঁজে পেলাম। কারণটা হলো, তারা হয়ত রেজাল্ট শুনেই ভেবেছিল, হায় হায়, ছেলেটাকে উঠতে বসতে কতই না গালি দিয়েছি, কত অপমান করেছি, আর এখন সে কী মনে করছে?  বোনটা হয়ত তার স্বামীর কাছে বলেইনি যে,আমি পাশ করছি। যে খবর শুনলে তার স্বামীর মন খারাপ হবে,সেটা কেন  তার স্বামীকে বলবে? আমার বোন তার অর্ধশিক্ষিত দেবরদের কথা আমার মায়ের কাছে বলত। বলত যে, তারা ঢাকায় গিয়ে চাকরি করে কত টাকা কামাই করছে, সাভারে জমি কিনেছে, পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের বাড়ি বানাচ্ছে ইত্যাদি। মা এইগুলো আবার আমাকে ঠেলা দিয়ে বলত।  বলত যে, তোর পেছনে খালি টাকাই ঢালতেছি, আর দেখ্ ওরা ঢাকা শহরে বাড়িগাড়ি করে ফেলতেছে।  আমার আর রফিকের দুজনেরই ছিল এই এক জ্বালা। রফিককেও কাকার কাছ থেকে এরকম কথা শুনতে হতো।

 মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা কয়েকদিন পরেই হবে। কিন্তু কেন যেন তিথির কথা বার বার মনে পড়ছিল । মনে হচ্ছিলো যে, এ সময়ে যদি আমরা এক সাথে একটু পড়তে পারতাম, তাহলে পদার্থবিজ্ঞানটা ভালো করে ঝালাই করে নিতে পারতাম। এভাবে পরীক্ষার দিন চলে এলো। পরীক্ষার দিন হলে ঢুকে আমি তিথিকে এদিক-ওদিক তালাশ করলাম।  পেলাম না।  ভাবলাম,অন্য ভবনে হয়ত তার সিট পড়েছে।  তাকে দেখতে না পেয়ে মনটা কেন যেন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল।

 পরীক্ষা ভাল হলো। রেজাল্ট দিল কিছুদিনের মধ্যেই। ঢাকা  মেডিক্যালে চান্স হলো আমার । এবার আব্বা-মা অনেক খুশি হলো। কিন্তু আমার ভগ্নিপতি খুশি হলো না। সে আমাকে কোনো কিছুতেই গুরুত্ব দিতে চাইত না । শ্যালক যত যোগ্যতাসম্পন্নই হোক না কেন,পৃথিবীর সকল দুলাভাইরা  কেন যেন শ্যালকদেরকে পাত্তা দিতে চায় না। এখানে শ্যালকের বলার কিছু থাকে না। কারণ শ্যালকরা দুলাভাইয়ের প্রতি একটু অসম্মান দেখালেই দুলাভায়ের হাতের কাছে রাগ খাটানোর জায়গা থাকে। তবে  সকল দুলাভাই  ঢালাওভাবে এরকম নাও হতে পারে।

 ২০০০ সালের ৩ জানুয়ারি  মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হলাম। ওরিয়েন্টেশন ক্লাশ পরদিনই ছিল,৪ জানুয়ারি। ক্লাশে ঢুকেই দেখি তিথি বসে আছে । তাকে দেখে বেশ ভাল লাগল আমার । সে তো চান্স পাবেই, সন্দেহ ছিল না কোনো। ক্লাশ করা অবস্থায় আমি তাকে কয়েকবার লুকিয়ে দেখলাম। আহা কতদিন কথা বলি না তার সাথে! কিন্তু সে আমার দিকে তাকাল না। এই কয়েকদিন আগেও তো এত সখ্যতা ছিল আমাদের, আর এখন সে আমার দিকে তাকাচ্ছে না। ভাবলাম , সে মনে হয় আমাকে দেখতে পায়নি। তারপর আমি এই আশায় অপেক্ষা করতে থাকলাম যে, সে আমার সাথে আগে কথা বলবে । কিন্তু এক এক করে এক সপ্তাহ চলে গেল, সে আমার সাথে কথা বলল না। তাকাল না পর্যন্ত! তারপর আমাদের ক্লাশটাকে দুই সেকশনে ভাগ করা হলো। সে অন্য সেকশনে চলে গেল।

  সে অন্য সেকশনে চলে গেল এবং যাবার পরপরই আমি বুঝতে পারলাম যে,তার  প্রতি আমার হৃদয়ের কোথায়  যেন একটা টান আছে, এবং সেই টানকে অস্বীকার করতে গেলেই আমার ভেতরটা কেমন করে যেন করে ওঠে। ক্যাম্পাসে তাকে বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে দেখতাম। অবশ্য ছেলে-বন্ধুদের সাথে দেখতাম না খুব একটা। তবে এটা করলে যে আমার খারাপ লাগবে, এটা আমি বুঝতে পারতাম। আমি আশঙ্কা করতাম, আমি যে তার সাথে কথা বলি না এটাকে সে আমার পক্ষ থেকে অবহেলা মনে করে অন্য কোনো ছেলের সাথে আবার জড়িয়ে না পড়ে। এভাবেই দিন পার হতে থাকল এবং  একদিন দেখলাম যে, সে ক্যাম্পাসে ঘাসের উপর বসে বাদাম খাচ্ছে । মাঝে মাঝে খিল খিল করে হাসছে। হাসিটা অনেক কর্কশ। একটা কাক যদি তার সর্বোচ্চ ভদ্রতা দিয়ে হাসে, তাহলে হয়ত এমন শুনাবে। তার এমন হাসি আমি কখনও শুনিনি। কিন্তু কেন যেন হাসিটাকে খুব পরিচিত মনে হলো।  পরে মনে পড়ল, দরবেশ কাকার  সাথে পাথারে মাছ শিকার করতে গিয়ে নদীর মাঝে নৌকায় থাকা অবস্থায় আমি এ ধরনের একটা হাসির শব্দ শুনেছিলাম। এবং, এটাও মনে পড়ল যে,  হেলুসিনেশনে দেখেছিলাম যে,এই কর্কশ স্বরবিশিষ্ট নারীই আমার স্ত্রী ছিল, যার সাথে নিয়ে আমি একটি গরীব পরিবারে মোরগ মাংসের লাল ঝোল দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম।

এগুলো মনে পড়তেই আমার হাসি  পেল। তিথি আমার বৌ হতে যাবে কেন? সে তো হিন্দু। আমার মতো একজন পাঞ্জেগানা নামাজ পড়া এবং জিকির করা মানুষ তাকে বিয়ে করতে যাবে কেন? আমার দেখা খেয়াল বা হেলুসিনেশনের সাথে বাস্তবতার কোনো সমন্বয় করতে পারলাম না আমি । আমি নিশ্চিতভাবে মনে করলাম যে, আমার ব্রেনের কোনো একটা অংশে সমস্যা আছে, যে কারণে এইসব গায়েবি আওয়াজ শুনে এসেছি এতদিন। এর সাথে আরও ভাবলাম যে,  এতদিন তো মনে করেছি ভুত-প্রেত আমার পিছে লেগে আছে, এখন থেকে আর এটা মনে করবো না। আমি যেহেতু এখন ডাক্তারি পড়ি, তাই আমাকে অন্যরকম ভাবতে হবে । আমাকে সবকিছু ভাবতে হবে মেডিক্যালি, সায়েনটিফিক্যালি। ভাবতে হবে যে, আমার মাথায় কুকুরের কামড়ের ফলে যে নার্ভটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল এবং যার কোনো চিকিৎসা তখন করা হয়নি, সেটা এখন চিকিৎসা করে ঠিক করতে হবে।  সেই নার্ভটি জোড়া লাগাতে হবে। চিকিৎসা করা তো এখন সহজ,কারণ, ডাক্তার আমার হাতের কাছেই আছে।

কলেজের সবচেয়ে বিজ্ঞ নিউরোলজিস্টের কাছে  গেলাম আমি । ছিটি স্ক্যান ও এমআরআই সবই করলেন তিনি, কিন্তু কোনো সমস্যা খুঁজে  পেলেন না। এটা আমার জন্য হতাশার ছিল। কিছু একটা ধরা পড়া উচিত ছিল। তারপর থেকে আমি  নিজে থেকে নিউরোলজি বিষয়ক বইগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়লাম এবং যে বইগুলো আমার ঐ বছরের সিলেবাসে নেই সেগুলোও পড়তে শুরু করলাম। মনে জিদ চাপল, যেভাবেই হোক আমার এ-ই  সমস্যাটা সমাধান করতে হবে। এছাড়া আমি স্বপ্ন বিষয়ক বইপত্রও পড়তে শুরু করলাম।

 কিন্তু  কোনো কিছুই খুঁজে  পেলাম  না। হতাশ হয়ে পড়তে থাকলাম দিনে দিনে। “আমার ব্রেনে একটা সমস্যা আছে”- এ বোধটা আস্তে আস্তে আমার ব্রেনকে যেন আরো সমস্যাগ্রস্থ করে ফেলল। তারপর এক ধরনের ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগতে শুরু করলাম আমি  । আমার মনে হতে থাকল যে, কেউ না  কেউ একসময়ে আমার এ সমস্যাটা ধরে ফেলবে।  তারপর আমি আমার আরেকটা সমস্যা আবিষ্কার করলাম। সমস্যাটা হলো, কেউ যখন কিছু বলে আমি তাতে মনোসংযোগ করতে পারি না। ক্লাশে স্যার যখন লেকচার দেয় আমার সহপাঠি বন্ধুরা তাদের নোটখাতায় তখন দ্রæত লেকচার তুলে ফেলে কিন্তু আমি এক ঠিকমত লিখতে পারি না। এক লাইন ভালো মতো লিখতে গেলে পরের লাইনে স্যার কী বলে তা ধরতে পারি না। তখন পাশের জনের খাতার দিকে তাকাতে হয়। যে আমি মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করে কলেজে ভর্তি হয়েছি  সেই আমি অন্যান্যদের সাথে তাল মেলাতে পারি না, এটা আমার জন্য ছিল একটা হতাশার বিষয়। আমার মনে হতে থাকল যে, আমার স্মরণশক্তি এবং মনোসংযোগ করার ক্ষমতা দিনে দিনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

  তারপর আমার অনীহা চলে এলো আমার সবচেয়ে প্রিয় এবাদত জিকির এবং নামাজের প্রতিও। যে আমি এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা করলে আত্মপীড়নে ভুগতাম, সেই আমি একের পর এক নামাজ বাদ দিতে থাকলাম। যোহর পড়লে আসর পড়ি না, মাগরিব পড়লে আবার এশা পড়ি না- এভাবে চলতে থাকল। জিকির না করলে আর আমার বুকের  ভেতর আর মোচড়ায় না। অস্থির হয়ে উঠি না। আমি যেন একদম সাধারণ হয়ে গেলাম। একই সাথে সাথে যেন একাও হয়ে  গেলাম খানিকটা। তিথি আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু আমার সাথে কথা বলে না । এ সময় আমি একাকীত্ব ও হতাশা ঘুচাতে সাহিত্যের  বই পড়তে শুরু করলাম। লিখতেও থাকলাম। প্রেমের কবিতা লিখি। ছোট গল্প লিখি। কলেজের দেয়ালিকাতে এগুলো সাঁটাই। এতে সহপাঠিরা আমাকে কবি ভাবতে শুরু করল। মাথার ক্ষতচিহ্ন লুকাতে যে বাবরি চুল রেখেছিলাম, এই বাবড়ি চুল আমার কবি বৈশিষ্ট্যের সাথে যোগ হয়ে আমার চেহারায় কবি-ভাব আরও ফুটিয়ে  তোলে। আমি প্রেমের কবিতা লিখি তিথিকে ভেবে ভেবে। তিথি এ কবিতাগুলো পড়ে কিনা বুঝতে পারি না। তাকে কখনও আমি দেয়ালিকার সামনে দাঁড়াতে দেখি না। কিন্তু আমি চাই সে দেয়ালিকার সামনে একটু দাঁড়াক, আমার কবিতাগুলো পড়–ক। এরকমভাবে এক বছর পার হতে চলে। তিথি আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে আমার বুকের ভেতরে কেমন যেন করে ওঠে। জিকির করতে না পারলে আগে যেমন হতো আমার ।

 এক বছর পার হয়ে গিয়েছে।  কলেজে নতুন বর্ষে নতুন ব্যাচ এসেছে। মেডিক্যাল কলেজের বেশ কয়েকজন সাহিত্য-প্রেমী  জুনিয়র আমার লেখা পড়ে আমার ভক্ত হয়ে গেল।  এমন ভক্ত কয়েকজনের উৎসাহে আমি একটা সাহিত্য সংগঠন করলাম। সংগঠনের নাম দিলাম  “ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ লিটারেচার ইউনিট ”। প্রাথমিকভাবে একটা দাবী নিয়ে সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করল। দাবীটা হলো- এমবিবিএস কোর্সের যে কোনো দুই বর্ষে সাহিত্যকে ইন্ট্রিগেটেড কোর্স হিসেবে রাখতে হবে। ১০০ মার্কের হবে বাংলা সাহিত্য এবং বাকী ১০০ মার্কের হবে ইংরেজি সাহিত্য। দেয়ালে দেয়ালে এইসব দাবী সংবলিত পোস্টার লাগানো হলো। ব্যাপক সাড়া আসলো এতে। যারা সাহিত্যপ্রেমী নয়, জীবনে টেক্সট বইয়ের বাইরে কোনো গল্প-কবিতা বা উপন্যাস পড়েনি, তারাও এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হলো। তবে তাদের এ সম্পৃক্ততার কারণ ছিল ভিন্ন। তারা দেখেছিল যে বিসিএস পরীক্ষায় নিয়মিতভাবে বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য থেকে প্রশ্ন হয়। তাই তারা চাচ্ছিল, এই ২০০ মার্কস যুক্ত হলে তাদের বিসিএসের পড়াটা হয়ে যাবে। এই দাবী নিয়ে অবশেষে বেশ বড় একটা মিছিল হলো।  প্রিন্সিপ্যাল স্যার আমাকে ডাকলেন। প্রমাদ গুণলাম আমি। আমি এই আশঙ্কাই করছিলাম।

প্রথমেই প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি এই বিসিএসের জন্যই মেডিক্যালের সিলেবাসে সাহিত্য ঢুকাতে চাও?”

 “না স্যার, আমার উদ্দেশ্য ভিন্ন। সাহিত্য মানুষকে মানবিক করে। মানব-মনের গতি-প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে। আমি তাই চাই, স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা কিছুটা সাহিত্য পড়–ক। কারণ ডাক্তারকে মানুষের সাথেই ইন্টারএকশনটা বেশি করতে হয়। ডাক্তারকেই সবচেয়ে বেশি মানবিকতা প্রদর্শন করতে হয়।”

“ এটার জন্য মিছিল করতে হবে কেন? পত্রিকার হেডিং তো হয়েছে সিলেবাসে সাহিত্য ঢুকানোর আন্দোলন হয়েছে বিসিএসের জন্য ।  ছিঃ ছিঃ ছিঃ। মান-সম্মান কিছু আর থাকলো  না। জনগণের সেবার জন্য ডাক্তার হচ্ছো তোমরা, নাকি একটা সরকারি চাকরির জন্য? লোকজন তো এখন হাসাহাসি করছে। এটাও বলছে, ডাক্তাররা এখন নাকি কবিতা শুনিয়ে শুনিয়ে রোগিকে সুস্থ করবে। কী উপহাস !”

“স্যার , আমার উদ্দেশ্য তো আমি আপনাকে বললাম ।”

“হ্যাঁ,তুমি যেটা বলছো, সেটা ভালো,একটা স্মারকলিপি দিলেই তো হতো। মিছিল করলে কেন!”

“ব্যাপারটা  নিয়ে যে এরকম মিছিল হবে, বুঝতে পারিনি স্যার।দলে দলে সবাই যোগ দিয়ে ফেলল!”

“মিছিলের আগে আগে তো তুমিই ছিলে!”

স্যার নরম-গরম এরকম আরও কিছু কথা শুনালেন আমাকে। এর পরদিন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতারা আমাকে নিদারুণভাবে অপমান করল। আমি সংগঠনের পাততারি গুটালাম। ভক্ত জুনিয়রদের বললাম, সংগঠনের দরকার নেই। চলো, আমরা এমনিতেই সাহিত্য-চর্চা করি। কিন্তু সংগঠনের জুনিয়ররা আমাকে আর ভরসা করতে পারল না। তারা ধারণা করে নিল, আমার নেতৃত্ব-গুণ একদম নেই। এরপর ভক্তি করা তো দূরের কথা, তারা আমাকে অবহেলা করতে শুরু করল। আমি আগের মতো আবার একা হয়ে গেলাম।

এদিকে তখন মাত্র কয়েকদিন হয়েছে একজন মেয়ে-সহপাঠির সাথে আমার খাতির হয়েছে। নাম সাদিয়া। আস্তে আস্তে জানতে পারি, সে সাহিত্য পছন্দ করে।  সাধারণ মানের সাহিত্য নয়। বিশ্বমানের । বিশ্বসাহিত্যের বড় বড় লেখা তার পড়া । বদলেয়ার, কাফকা, মার্কেজ, তারাশঙ্কর,বিভূতি, কিপলিং, ফকনার, মানিক সব তার পড়া। এতটাই তার জ্ঞান যে, সাহিত্যের আলোচনা করতে গিয়ে তার সামনে আমি চুপসে থাকি। আমার তো সাহিত্য অতটা পড়া নেই। আমাকে  কিছু যদি বলতে হয়, তাহলে সুফিজমের কথা বলি। জালালুদ্দিন রুমি,ইমাম গাজ্জালী –ইনাদের কথা বলি। সুফিজমের সাথে লালন ফকিরকে ইচ্ছাকৃত মিশিয়ে দিই। যদিও মেশে না তবুও মিশাই। উদ্দেশ্য , নিজেকে একটু রহস্যময় করা। এতে কাজ হচ্ছিল। সে আমাকে অন্যভাবে মূল্যায়ন করছিল।  তবে আমি বুঝতে পারছিলাম এই রহস্যময় হওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। সন্দেহ হচ্ছিল, সে আমাকে এক্সট্রা অরডিনারি ভেবে কিংবা ব্যতিক্রম ভেবে আমার দিকে আবার  ঝুঁকে না পড়ে। এই ঝুঁকে পড়াটা আমি চাচ্ছিলাম না। আমি চাচ্ছিলাম সে শুধুমাত্র আমার বন্ধু হয়েই থাকুক। কিন্তু সে ঝুঁকে পড়তে থাকল। মেয়েরা তো আবার ব্যতিক্রমদের পছন্দ করে। ক্লাশের সবাই ভাল ছাত্র, ভবিষ্যতে ডাক্তার হবে, টাকা কামাবে, সন্দেহ নাই। কিন্তু সবাই কেমন যেন এভারেজ। আমিই শুধু ব্যতিক্রম। কেমন যেন খেয়ালী আমি। লেখালেখি করি। গল্প-কবিতা লিখি। সুফী সাধক কিংবা বাউলদের মতো নিজের ভেতর ডুবে থাকি। সে হয়ত আমার এ  বৈশিষ্ট্যগুলি খেয়াল করেছিল। হয়তো মনে করেছিল, ডাক্তারী পড়ার এত চাপের মধ্যেও তো দেখি ছেলেটা লেখালেখি করে, টিউটোরিয়ালেও আবার ভালো করে, কিভাবে সম্ভব। তবে আমার একটা জিনিস নিশ্চিত মনে হয়েছিলো যে, সে আমার সাথে মিশবে মাত্র কিছুদিনের জন্য । তারপর যখন বুঝতে পারবে যে, আমার মধ্যে স্পেশাল কিছু নেই, একদম সাধারণ আমি,এমনকি সাধারণের থেকেও সাধারণ, তখন আস্তে করে দূরে সরে যাবে।

  আমি সাদিয়ার সাথে এরপরে মিশতে থাকি বা প্রচলিত কথায় ডেটিং করতে থাকি। একাকীত্ব নিজের জন্য যতটা না অস্বস্তিকর, সামাজিক কারণে আরও বেশি অস্বস্তিকর। সবারই মেয়েবন্ধু আছে, আমার নেই। ক্যাস্পাসে একটা মেয়েবন্ধু জোটাতে না পারা মানে ছেলে হিসেবে সে আনস্মার্ট, মানুষের সাথে মেশার  তার যোগ্যতা নেই। তাই আমি সাদিয়ার সাথে মিশছিলাম। এটা ভালবাসা ছিল না। পছন্দ করে মেশা ছিল না। আমি তার সাথে মিশছিলাম, আর,এর পাশাপাশি আমি সতর্কভাবে সেই সময়টার জন্য অপেক্ষা করছিলাম  যেদিন সে বুঝতে পারবে যে আমি একটা ভয়েড ও মাথায় সমস্যাগ্রস্থ ,অথবা আমি আছরগ্রস্থ। প্রতিদিনই ভাবতাম যে, সে আজকেই বোধ হয় এটা ধরতে পারবে। কিন্তু দিন চলে যায়, আর আমার ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে  সে আমার সাথে জড়িয়ে পড়তে থাকে । আমরা একসাথে আড়ালে চিপা-চুপায় বসি এবং সুযোগ পাওয়ামাত্রই বসি। সাদিয়া দূরে বসে না। বরং খুব ঘেঁষে বসে। কিন্তু যতবার সে ঘেঁষে বসে ততবার আমি আমার মাথার  পেছন দিকটার কাছে একজন নারীর হাসির শব্দ শুনতে পাই । কাকের স্বরের মতো খ্যাস খ্যাসে সেই হাসির শব্দ। অসহ্য রকমের। তবে আমি সাদিয়াকে বিষয়টা বলি না। কাকার সাথে পাঁথারে অজ্ঞান হওয়ার দিন সেই যে এই হাসির শব্দ শুনেছিলাম, তারপরে দীর্ঘদিন শুনিনি। কিন্তু সাদিয়ার সাথে এক সাথে ঘনিষ্ট হয়ে বসার পর থেকে  ঘন ঘন সেই শব্দ শুনতে থাকি।

 একদিন সাদিয়া আমার  একদম কোল ঘেঁষে বসল। তারপর কয়েক ঘন্টা পার হয়ে গেল। কিন্তু এই কয়েকঘন্টায় আমি কী করেছি, কী বলেছি তার কোনো কিছুই পরবর্তীতে আর মনে পড়ল না আমার ।এটা আমার জন্য অস্বস্তির বিষয় হয়ে দাঁড়াল এবং আমি ভাবতে থাকলাম,না জানি ঐ সময়টুকুর মধ্যে আমি কত কথা বলেছি বা সে কত কথা বলেছে। হয়ত সে কোনো একটা রোমান্টিক গল্প বলেছে যা আমি একদম শুনিনি কিন্তু  সে মনে করেছে যে, আমি খুব মনোযোগ দিয়েই শুনেছি। আমি শুধু মনে করতে পারছিলাম আমাদের সাক্ষাতের প্রথম অংশটুকু।…………. দুপুরের সময় ১:২০ নাগাদ ক্যান্টিনে খাওয়া-দাওয়া করে আমরা একটা নির্জন স্থানে বসেছি এবং সাদিয়া আমার কোল ঘেঁষে বসেছে । ব্যস ,এটুকুই। মাঝখানের কয়েকঘণ্টা সময়, মানে দুপুর থেকে আসর পর্যন্ত –প্রায় ৩ ঘণ্টা সময়কাল , বলতে গেলে অনেক সময়—-  এ সময়কালে কী করেছি, কী বলেছি, কিছুই মনে পড়ছিল না আমার। 

  তবে ঐ তিন ঘণ্টার পরের অংশ আমার বেশ মনে পড়ছিল। সেদিন আমরা যখন যার যার হলে ফিরছিলাম,তাকে তখন বেশ প্রফুল্ল দেখাচ্ছিল। সে আমার হাত ধরে ক্যাম্পাসে হাঁটতে চাচ্ছিল।  ওরকম করে আগে সে আমার হাত ধরতে কখনও চেষ্টা করেনি। পরে আমি বুঝতে পারলাম যে, আমি তাকে আমার ঐ অজ্ঞাত সময়টাতে নিশ্চয়ই এমন কোনো কথা বলেছি যে, সে সেই  কথাতে অনেক খুশি হয়েছে। তার খুশি হওয়ার মতো কী বলেছি বা করেছি আমি? শুধালাম নিজেকে। উত্তর নেই কোনো।  তবে সন্দেহ থেকেই গেল। নিশ্চয়ই তাকে আমি ভালবাসার কথা বলেছি অথবা তাকে নিদারুণভাবে আদর করেছি।  প্রথমবারের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় সময় ঠিক এভাবেই তো আমার মস্তিষ্ক  বø্যাঙ্ক হয়েছিল এবং ঠিক এভাবেই আমি নিজের অজ্ঞাতে শ্মশানে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম এখন থেকে সাত বছর আগে এবং এরও পূর্বে আমি আমার দাদা-দাদির পরিত্যক্ত ঘরে নিজের অজান্তে রাত্রিযাপন করেছিলাম।

পুরো বিষয়টা  আমাকে আবার ভাবনায় ফেলে দিল।  আমি অসংখ্যবার চেষ্টা করলাম ঐ সময়কার কোনো কথা মনে করার , কিন্তু কোনো কিছুই মনে পড়ল না। সব অন্ধকার। যেন ঐ তিন ঘন্টা সময়ে আমি মৃত ছিলাম। অগত্যা  ভাবলাম, সমস্যার কিছু নেই, যা বলেছি বা করেছি তা বোধ হয় ভালোই করেছি, খারাপ বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনোকিছুই করিনি। এমন করলে সাদিয়া নিশ্চয়ই আমাকে এতক্ষণে বলতো। বলতো যে,“তুমি তখন আবোল-তাবোল বলছিলে কেন?  তোমার কি কিছু হয়েছিল তখন?” ইত্যাদি। কিন্তু সাদিয়া আমাকে এগুলো কিছুই বলছিল না। সে শুধু ফূর্তি করছিল। এটা ছিল প্রথম প্রেমের ফূর্তির মতো। এ ফূর্তির তুলনা ছিল না।

 স্পষ্টতই আমার মনে হলো যে,আমি ঐ সময়ে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করিনি বরং তাকে এমন কিছু বলেছি যে, সে অনেক খুশি হয়েছে। কিন্তু আমি ভাবছিলাম, আমি সেগুলো কিভাবে করেছি বা বলেছি।  আমি নিজে তো কিছুই বলিনি। তাহলে তার সাথে তখন কে কথা বলেছে? কে এত স্বাভাবিকভাবে আমার মতো করে তাকে সঙ্গ দিয়েছে? তাহলে কি ওটা আমার সাবকনসাস? কিন্তু মানুষের সাবকনসাস কি এতটা স্পষ্ট হতে পারে। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। স্বপ্নবিষয়ক বইগুলোতে পড়েছিলাম যে মানুষের সাবকনসাস ঘুমের মধ্যে সক্রিয় হলে মানুষ স্বপ্ন দেখে। কিন্তু স্বপ্নও হয় উদ্ভট, ভঙ্গুর, অসংলগ্ন। আমার কথাবার্তা এমন অসংলগ্ন হলে সাদিয়া  তো ঠিকই ধরে ফেলত। সাদিয়া আমাকে বিষয়টা তখন বলত । কিন্তু সে আমাকে এ ধরনের কিছুই বলছিল না। উপরন্তু মনে হচ্ছিল, আমি তাকে যা বলেছি, তাতে সে আসমান বরাবর খুশি হয়েছে।

  আমার জীবনে এরকম চার বার ঘটলো, ধূর! ঘটনাগুলি  মনে করতে থাকলাম মন খারাপ করে। প্রথমবার হয়েছিল শ্মশানে, দ্বিতীয়বার দাদা-দাদির পরিত্যক্ত ঘরে, তৃতীয়বার পরীক্ষার হলে এবং এইবার সাদিয়ার সাথে। আগের সব ঘটনা মনে এলো। শ্মশানে আমি কেন গিয়েছিলাম তা জানি না। কে নিয়ে গিয়েছিল তাও জানি না। জানার চেষ্টা করিনি।  একইভাবে,দাদা-দাদির তালাবদ্ধটি ঘরটির তালা খুলে আমি কিভাবে ভেতরে গিয়ে শুয়েছিলাম, এর কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে ছিল না। চাবি থাকতো আব্বার কাছে। আব্বাও বিষ্মিত হয়েছিল দরজা  খোলা দেখে। তবে তিনি মনে করেছিলেন , মনের ভুলে হয়তো  তিনি খুলে থাকতে পারেন। এটা নিয়ে আর কোনো কথা হয়নি। পরীক্ষার হলের  ঘটনাটিও রহস্যে ঘেরা। আর  শেষবারে সাদিয়ার সাথে কাটানো এই তিন ঘণ্টা। এ ঘটনাগুলির কোনো ব্যাখ্যা ছিল না আমার কাছে।

 ব্যাপারটা কী  তাহলে? আমার শরীরে তাহলে কি জ্বিন আছে? আমি কি এখনও আছরগ্রস্থ? ঐ কালো কুকুরটি  কি আমার ভেতরে স্থায়ীভাবে অবস্থান নিয়েছে? ভাবতে থাকছিলাম নিরুপায় হয়ে। লস্কর মÐলের কথা মনে পড়ছিল আমার। তিনি তো বলেছিলেন,  আগের যুগে মানুষের সাথে জ্বিনের বিয়ে হতো বলে কারো কারো শরীরে বংশগতভাবে জ্বিনের অস্তিত্ব আছে। তাহলে কি আমার মধ্যে জ্বিনের একটা অংশ বংশগতভাবে বিদ্যমান আছে? আর,সাদিয়ার সাথে কি তাহলে তখন আমার শরীরের জ্বিন-অংশটা সঙ্গ দিয়েছে?  ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছিলাম না। তবে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে আবার আমার মাতৃকুলের পূর্বপুরুষদের তথ্য নিতে হবে। আমাকে দেখতে হবে যে, মধ্যপ্রাচ্যের , বিশেষ করে মিশর বা ফিলিস্তিন অঞ্চলের লোকের সাথে আমার পূর্বপুরুষের বিয়ে হয়েছিল কিনা। এটা যদি হয়ে থাকে তাহলে আমি নিশ্চিত হবো যে, ঐ আরবীয়  লোকটির বংশের কেউ জ্বিনকে বিয়ে করেছিল এবং তার মাধ্যমে আমার শরীরে জ্বিনের অংশবিশেষ বংশপরম্পরায় চলে এসেছে।

লস্কর মণ্ডল বলেছিলেন,এ ধরনের মানুষের শরীরের তাপমাত্রা বেশি হয়। মাপার প্রয়োজন অনুভব ভাবলাম।  আগে মাপিনি।হাতের কাছে থার্মোমিটার ছিল না তাই মাপা হয়নি অথবা বিষয়টাকে গুরুত্ব দেইনি। এখন তো থার্মোমিটার এভেইল্যাবল। আমি থার্মোমিটার দিয়ে আমার শরীরের তাপমাত্রা মাপলাম।  যখন মাপছিলাম, তখন ল্যাবে সাদিয়া আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। শরীরের তাপমাত্রা ১০০.৫ ফারেনহাইট। এ তাপমাত্রায় সাধারণত জ্বর আসে। আমার চরমভাবে অস্বস্তি লাগতে  থাকল এটা ভেবে যে আমার দেহে জ্বিনের অংশবিশেষ থাকার প্রমাণ আমি একটু একটু করে পাচ্ছি।  টেনশনে ঘেমে উঠছিলাম  আমি। এদিকে সাদিয়া আমাকে ফিসফিস করে বলল, “তুমি সেদিন যখন আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে আমি তখন তোমার শরীরের উত্তাপে যেন পুড়ে যাচ্ছিলাম। আমি ভাবছিলাম কী বা কী।” এ বলেই সে মুখ টিপে হাসল । আমি তাকে বললাম , “তুমি তখন নিজেকে ছাড়িয়ে নিলে না কেন? তোমার কি কষ্ট হচ্ছিল না?”

 সে বলল, “ওরে বাপরে, সে সাধ্য কি আমার ছিল? তুমি  যেভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে! আমার তো তখন দম বন্ধ হবার যোগাড়।”

তারপর আমি অনেকটাই নিশ্চিত হলাম যে আমার মধ্যে ভৌতিক কিছু-একটা অবশ্যই আছে।

আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। বছর পার হওয়ার পর এমবিবিএস প্রথম বর্ষ পরীক্ষা তখন সামনে। ভাবছিলাম, পরীক্ষার হলে যদি আবার আমি স্মৃতিভ্রষ্ট হই তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে।  এই রকম স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়াতে শিক্ষাজীবন থেকে এক বছর এমনিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এদিকে সাদিয়ার সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার বিষয়টি আমাকে আবার বেশি করে কষ্ট দিচ্ছিল। আমার মনের মধ্যে আমি তখনও বেশি টান অনুভব করতাম তিথির প্রতি। তিথি আমার অস্তিত্বের সাথে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে, মনে হতো,তার সাথে আমার দেখা বা কথা না হতে হতে একশত বছর পেরিয়ে গেলেও তাকে আমি একইরকম ভালবাসতে পারব। এমনকি সে ঘৃণা করলেও পারব। এ টানটা, এ ভালবাসাটা কোত্থেকে এসেছিল , তা আমি বলতে পারব না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি সাদিয়াকে তিথির বিষয়টা বলব। কিন্তু সন্দেহ হলো, সাদিয়া কি বুঝবে? আর বুঝলেও কি সহজে মেনে নিবে? সে কি বুঝবে যে, সেদিন আমি তাকে সজ্ঞানে স্পর্শ করি নাই, এমনকি সেদিনে তার সাথে আমি কী কথা বলেছি, কী করেছি তার আমি কিছুই জানি না। আমি তাহলে কিভাবে তাকে বলব? আমিতো  তাকে বলতে গেলেই ধরা খাব। সাদিয়া তো এটাকে বানোয়াট গল্প বলবে। বলবে আমি তার সাথে প্রতারণা করেছি। আসলে যে কেউ এটাই বলতো।  এ ঘটনার কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম , এক মুরুব্বী টাইপের লোক এক বালিকাকে ধর্ষণ করেছে। পুলিশ তাকে ধরেছে। লোকটি বলেছে, এটা নাকি সে নিজের ইচ্ছায় করেনি, শয়তান তাকে দিয়ে করিয়েছে। আমরা শ্রেণিকক্ষে এটা পড়ে হাসাহাসি করেছিলাম। সাদিয়া লোকটাকে গালাগালি করেছিল। ভাবলাম, এখন তো সে ভাববে আমিও ঐ মুরুব্বী লোকটির মতো লুচ্চা । তাহলে আমি এখন কী করি? আমি চিন্তায় বিপর্যস্থ হয়ে পড়লাম।

 তারপর থেকে আমি কিছুদিন সাদিয়ার কাছ থেকে দূরে সরে থাকার চেষ্টা করতে থাকলাম। কিন্তু সে প্রতিদিনই ফোন দিয়ে যাচ্ছিল। আমি শুধু পরামর্শ দিচ্ছিলাম, সামনে পরীক্ষা, তুমিও পড়, আমিও পড়ি। কিন্তু সে আমার কাছে শুধু এটুকু আবদার করত যে,আমরা যেন দুপুরের খাবারটা একসাথে খাই। আমি তার সাথে তখন বাধ্য হয়ে লাঞ্চ করতাম। সে তার খাবারের ভাল ভাল অংশগুলো আমার পাতে তুলে দিত পরম যতেœ। এটা ছিল ভালবাসার চূড়ান্ত ও তীব্র বহিঃপ্রকাশ । সাধারণত পিতামাতারা তার সন্তানের জন্য এটা করে। আমি নিষেধ করতাম । কিন্তু সে করবেই। এছাড়া সে তার বাড়ি থেকে বিভিন্ন ধরনের আচার নিয়ে আসতো। আমি আমের আচার পছন্দ করি—- এটা একদিন কথাপ্রসঙ্গে  বলার পর থেকেই সে এটা শুরু করেছিল।

সাদিয়া ধার্মিক  ছিল। নিয়মিত নামাজ পড়ত। ধার্মিক হওয়ার কারণে তার মুখে এক ধরনের নূরানী  জ্যোতি খেলা করত। তার সাথে যখন আমার খাতির হয়েছিল, তখন রমজান মাস ছিল । ক্যাম্পাসের ঘাসের উপরে বসে আমরা ইফতার করতাম।  সারাদিন রোজা রাখার পর যখন সে অযু করে আমার সামনে বসতো, তখন তাকে অসামান্য সুন্দর লাগত। একটা বেহেশতী পবিত্র আভা তার চোখেমুখে  খেলা করত। কিন্তু তার সৌন্দর্যটাকে আমি মনের  ভেতরে সেভাবে নিতে পারতাম না। বাধা আসতো। বাধাটা আসতো মূলত তিথির পক্ষ থেকে।  আমার মনের মধ্যে যে তিথি বসে ছিল, সে অনরবরত বাধা দিত।

 ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৭ তারিখ। পীর সাহেবের দেয়া ডায়েরির পাতাগুলো তখন বিবর্ণ হয়ে গেছে।  তবুও ডায়েরিটাতে লিখি। তবে লিখতে ইচ্ছা করে না। কারণ আমি আমল-আখলাক থেকে তখন দূরে সরে গিয়েছি। নামাজ পড়ি না, জিকির করি না। তাই আমি পীর সাহেবের শিখিয়ে দেয়া বাতেনী সাঙ্কেতিক কোড ছাড়াই লিখি।

আমার প্রথমবর্ষ পরীক্ষার  তখন আর মাত্র মাসখানেক বাকি। পরীক্ষার কয়েকদিন আগে এনাটমি প্র্যাকটিক্যাল হচ্ছিল । প্র্যাকটিক্যালে আমি এমন একটি লাশের স্নায়ুতন্ত্র পরীক্ষা করছিলাম, ব্যক্তিগত জীবনে যে রেলস্টেশনের ভবঘুরে ছিল। তবে ক্লিনিক্যালি তাকে সিজোফ্রেনিয়া রোগি হিসেবে দেখানো ছিল। লাশের হিস্ট্রিতে লেখা ছিল রোগিটি অত্যধিক হ্যালুসিনেশনে ভুগতো। সিজোফ্রেনিক। যা হোক,  এ কাজে আমার সাথে আমার প্রিয় একজন স্যার ছিলেন। তাঁকে আমি এজন্য পছন্দ করতাম যে তিনি ধার্মিক ছিলেন এবং তাবলীগ জামাতের ( এস্তেমাল জামাত নয়) সাথে জড়িত ছিলেন।

পরদিন,মানে ১৮ ডিসেম্বরে, আমি লাশটির খুলি অপেন করলাম। খুলি ওপেন করার সাথে সাথে আমার লস্কর মÐলের কথা মনে পড়ল। কেন যেন তখন কোনো মানুষকে দেখলেই লস্কর মÐলের কথা মনে পড়ত। বংশগতভাবে জ্বিনের বৈশিষ্ট্য বহন করে এমন মানুষের চেহারার বর্ণনা তাঁর কাছ থেকে  শোনার পর থেকেই আমার এটা মনে হতো। কোনো গাট্টাগোট্টা খাটো মানুষকে দেখলেই মনে হতো যে, লোকটির মধ্যে জ্বিন আছে। আবার আমার ওরিয়েন্টেশন ক্লাশে যে কয়জন সহপাঠি মেয়েকে  দেখেছিলাম, সবারই চেহারার সাথে লস্কর মণ্ডলের বর্ণিত  বৈশিষ্ট্যের মিল করে দেখেছিলাম। আশ্চর্যজনকভাবে একজনের সাথে মিলও পেয়েছিলাম। যা হোক, আমি বডিটার খুলি ওপেন করার পর পরই বুঝতে পারলাম যে, খুলিটার বামপাশে বেশ খানিকটা চাপা। মনে হচ্ছিলো, কোনোকিছুতে চাপা খেয়ে খুলিটি দেবে গেছে। খুলিটির মাথায় চুল বড় থাকায় ব্যাপারটি অতটা বোঝা যাচ্ছিল না। বেশিরভাগ মানুষের মাথা  মোটামুটি প্রতিসম থাকে। কিন্তু এর খুলিটি  কেন এমন তা নিয়ে আমি ভাবতে থাকলাম। আমার মনে হলো, এ লোকটি সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে খুলির এ বৈশিষ্ট্যটি দায়ী। তারপর আমি বামপাশের মগজ যেখানটাতে খুলি একটু দেবে যাওয়া সেখানটা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখতে থাকলাম। দেখতে পেলাম যে, একটি নির্দিষ্ট নার্ভের যতখানি পুরুত্ব থাকা উচিত, ততটা নেই। সেখানকার রক্তনালীর পুরুত্বও কম।

স্যারকে বিষয়টা দেখালাম। তিনি বললেন, এমন হতে পারে যে, লোকটি সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পরে এমন হয়েছে। অর্থাৎ তিনি আমার ফাইন্ডিংসকে অতটা গুরুত্ব দিলেন না। এদিকে আমি বিষয়টাকে অধিকতর গুরুত্ব দিলাম আমার ব্যক্তিগত কারণে। কারণ আমার নিজের মাথাও বামদিকে একটু দেবে যাওয়া। অবশ্য আমার মাথা যে বামদিকে দেবে যাওয়া তা আমাকে সর্বপ্রথম বলেছিল গৌতমদা ।  গৌতমদা চুল কাটতে গিয়ে বলেছিল, “সালমান শাহ্র এই কাটিং তোক্ মানাবি ননে। তোর মাথা তো দেহি একদিকে বেঁকা।” আমি তখন বলেছিলাম, “তুমি তো শুনেছো আঁতুর ঘর থেকে আমাকে কুত্তে গোরস্তানে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। কুত্তে কামড় দেওয়াতে ওখানে দেবে গেছে।” সে বলেছিলো , “আরে না, তোর মাথার যেহানে দাগ, সেহানেতো  বেঁকা লয়। বেঁকা ঐপাশে।” আমি তখন কিছু বলিনি।  বলার কিছু ছিল না। সে  এর পরে পরামর্শ দিয়েছিল “সালমান শাহর একটা বাবরি কাটিং আছে, তুই সেটা রাখ্,তাইলে  তোর মাথা  বেঁকা দেখা যাবি ননে।” তারপর থেকে আমি মাথায় বাবরি রাখতে শুরু করেছিলাম। তবে আমার মাথার চুল কোঁকড়ানো হওয়াতে আমাকে দেখতে অনেকটা আফসার বাউলের মতো লাগতো।

 আমার মাথা এমন কেন তা আমি মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। মা বলেছিল, ছোটবেলায় আমি অনেক মোটাসোটা ছিলাম,আর আমাকে যেখানে যেভাবে শুইয়ে রাখা হতো, সেভাবেই শুয়ে থাকতাম। অর্থাৎ আমি এতটাই মোটা ছিলাম যে  একটুখানি পাশ ফেরার ক্ষমতাও আমার ছিল না। তবে আমার নাকি বামপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে শুয়ে থাকার প্রবণতা ছিল। অর্থাৎ, আমার মাথার ক্ষতচিহ্নযুক্ত স্থানকে উন্মুক্ত রাখার প্রবণতা। ঘাড় সোজা করে দিলেও আবার একইভাবে পূর্বের মতো বাঁকা করে রাখতাম। আর এভাবে শুয়ে থাকতে থাকতে আমার মাথার বাঁ পাশটা বেশি চাপে দেবে গিয়েছিল। যেহেতু শিশুবয়সে মাথার খুলি নরম থাকে, তাই একপাশে ক্রমাগত চাপ পড়ার কারণে আমার মাথার এ অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু কেন আমি তখন আমার মাথাটা বামদিকে কাত করে রাখতাম এর কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে ছিল না। আমার মনে হয়েছিল কেউ আমাকে ওরকম করে দিত। হয়তো অশরীরী কেউ।

এটা আসলে আমাকে জ্বিনই করে দিত-আমার  কাছে এটাই মনে হচ্ছিলো ল্যাবে বসে।  গোরস্তানের সাথে একদম লাগানো ঘরটিতেই যে কেন আমাকে জন্মদান করার প্রয়োজন হয়েছিল? এটা ভেবে আমার আফসোস লাগছিল। আমার জন্মস্থানের একদম সাথেই ছিল কয়েকটি নতুন কবর। তখন বিষ খেয়ে মরা বা ফাঁসি নিয়ে মরা লাশের কবর পৃথক জায়গায় দেয়া হতো না। হয়তো এ নতুন কবরগুলির কোনো একটাতে অপঘাতে মৃত্যুবরণ করা লাশ ছিল। আর সেই লাশের ভূত আমাকে দেখভাল  করতে শুরু করেছিল আঁতুর ঘর থেকেই।  ভূত হয়তো একপাশে কাত করে সবসময় শুইয়ে রাখতো। সালেকাকে  ধরা ভূতের কথা মনে হলো আমার। সালেকার ধরা ভুতটি (ভুতের নাম চিন্তারানী) ওয়াদুদের  মৃত জারজ সন্তানকে শ্মশানে পেলে-পুষে বড় করেছিল।

 যা হোক, আমি আবার ডেড বডিটির কথা ভাবতে থাকলাম। ভুতের কথা বা জ্বিনের কথা মাথায় এলেও একজন মেডিক্যাল সায়েন্সের ছাত্র হিসেবে এসব মানতে মন সায় দিচ্ছিল না। নিউরোলজিক্যাল ডিজওর্ডার বিষয়ক চ্যাপ্টারগুলি যতই পড়ছিলাম,ততই আমার  সমস্যাগুলি বা সিম্পটমগুলির সাথে মিলে যাচ্ছিল। আমি তখন চরম মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বে । লৌকিক , না অলৌকিক? কোন্ দিকে যাবো আমি? আমার ক্ষেত্রে দুটোই ঠিক। কারণ খোলা চোখে মানুষ যা দেখে আমি তার চেয়ে বেশি  দেখি। অন্যান্য মানুষ অশরীরী কুকুর দেখে না, কোনো মহিলা কণ্ঠের আওয়াজ  শোনে না, এগুলো শুধু আমি দেখি, আমি শুনি । অন্য সবার ক্ষেত্রে বাস্তবতা যেমন,আমার ক্ষেত্রে তেমন নয়। আমার বাস্তবতার অপর পিঠে আছে অলৌকিকতা । আমি সেই অলৌকিকতাকে অস্বীকার করতে পারি না। আমার মন আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে সেই অলৌকিকতাকে স¦ীকার করে নেয় খুব সহজেই।

যা হোক,  আমাকে মেডিক্যালিই আগাতে হচ্ছিলো । আমার জিজ্ঞাস্য ছিল—এ রোগিটি যে  সিজোফ্রেনিক হেলুসিনেশনে ভুগত ,তার কারণ কি তাহলে তার এ অপ্রতিসাম্য মাথার গঠন? আমার মাথা আর তার মাথার মধ্যে তো মিল রয়েছে। তাহলে আমি যে কালো কুকুরকে দেখি, একজন নারীর তী² স্বরের হাসি শুনি, আমার মন যে মাঝে মাঝে অন্ধকারে ডুবে যায়, অপরিচিত জায়গা বা অপরিচিত মানুষকে যে আমার কাছে পরিচিত লাগে,সবই কি তাহলে আমার অপরিণত মস্তিষ্কের হেলুসিনেশন? সিজোফ্রেনিক কি এটা?  এছাড়া জিকির করতে গিয়ে সময়ে সময়ে আমি যে দেখেছি,আমি পীরের পেছনে পেছনে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র পার হচ্ছি, সেটাও কি তাহলে হেলুসিনেশন ছিল? হয়তো ছিল। মনে পড়ছিল, ড. ইমতিয়াজ একবার বলেছিলেন যে জিকির করার এক পর্যায়ে গিয়ে মানুষ হেলুসিনেশন দেখতে পারে। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, মানুষ যখন মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে জিকির করে তখন ফুসফুসের উপর অব্যাহতভাবে একই শব্দের চাপ পড়ার কারণে  ব্রেনে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায়। ব্রেনে তখন এক ধরনের তাড়না তৈরি হয় ।  আর এই তাড়না থেকেই তখন অনিবার্যভাবে তৈরি হয় প্রচ্ছায়া। মানুষ তখনই  হেলুসিনেশন বা  প্রচ্ছায়া দেখে। ড. সাহেব পীরের কারামতিকে অস্বীকার করার জন্য, প্রকৃতপক্ষে পীরের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য এটা বলেছিলেন। তিনি পীরবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। তাই  তখন মনে করেছিলাম যে, তিনি  তাঁর মিথ্যা কথাটাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটা সায়েনটিফিক ব্যাখ্যা দিতে চাইছেন। অবশ্য আমি তখন তাঁর কথা ভুয়া প্রমাণ করার জন্য বলেছিলাম, আমি কোনো প্রচ্ছায়া দেখি না, যা  দেখি স্পষ্টই দেখি।   “প্রচ্ছায়া তো অস্পষ্ট হয়”, বলেছিলাম আমি। আমি তাঁকে ব্যাখ্যা করে বলেছিলাম যে,আমি দেখি যে ,আমরা সকল জেকেরান এক সাথে কোনো পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে হেঁটে চলছি। পাহাড়টা দুলছে। পাহাড়ের নিচেই বিশাল উত্তাল সমুদ্র। সে সমুদ্রের মাঝে অসংখ্য পাপী লোক হাবুডুবু খাচ্ছে। তারা পাহাড়ের গা ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিশাল ঢেউ এসে তাদেরকে আবার ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অসংখ্য নারীর চিৎকার ভেসে আসছে ঢেউয়ের শব্দের সাথে।  ডুবে থাকা নারীদের চুল ঢেউয়ের উচ্ছ¡াসে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। আমি আমার পীরের জোব্বার কোণা ধরে কিংবা  তাঁর হাত ধরে দোলায়মান পাহাড় ঘেঁষে সমুদ্র পার হয়ে যাচ্ছি। আমরা ধুমায়িত সমুদ্রের উপর দিয়ে হেঁটে চলছি, আমাদের চারপাশে অসংখ্য মানুষের গগনবিদারী চিৎকার আর আহাজারি— সবই সিকুয়েন্সমতো এবং স্পষ্ঠ। কোনো অসামঞ্জস্যতা, অসংলগ্নতা নেই। এটা হেলুসিনেশন হতে পারে না। এটা সত্যি। এটা অদৃশ্য জগতের একটি সত্যিকার ঘটনা।

 যা হোক, মাথার অপ্রতিসাম্য গঠনের সাথে মানুষের  সিজোফ্রেনিক আচরণের সম্পর্ক আছে, এ ফাইন্ডিংসটা যদিও আমি ল্যাব-পরীক্ষার টেস্টে লিখলাম না , কিন্তু আমি মনে মনে এটা সত্যি বলে ধরে নিলাম। এরপর মানুষের মাথা আর কী কী কারণে অপ্রতিসাম্য হতে পারে তা জানার জন্য আমি এ সম্পর্কীত বইপত্র পড়া শুরু করলাম। বিষয়টি নিয়ে আমি এটাই অস্থির হয়ে পড়লাম যে,আমি পরীক্ষার কথাই ভুলে  গেলাম। আমি সিলেবাসের পড়া বাদ দিয়ে লাইব্রেরি থেকে স্কাল, ফেটাস,এমব্রায়োলজি, ক্র্যানিওসাইনোসটোসিস,স্কাল ডিফরমেশন এ্যান্ড পসিবল সাইকোলোজিক্যাল প্রবলেম বিষয়ক লেখা পড়তে থাকলাম। আমার মনে একপ্রকার জিদ চেপে বসল যে, মস্তিষ্কের আকার ছোট বা বড় বা অপ্রতিসাম্য হওয়ার সাথে সিজোফ্রেনিয়ার ( এ রোগের একিউট পর্যায়ে হেলুসিনেশন হয়) কোনো লক্ষণ আছে কিনা সেটা আমাকে জানতেই হবে। (To be continued…… )

Leave a Reply

Your email address will not be published.