আমার মুরিদজীবন।। তৃতীয় খণ্ড।। সেকশন- 4, মেডিক্যাল কলেজ অংশ

 3,985 total views

আমার মুরিদজীবন, তৃতীয় খণ্ড, সেকশন -4 , মেডিক্যাল কলেজে।

তিথি বলল, “ জানো, রহমতপুরে যেতে খুব ইচ্ছা করে আমার । বাবার কাছ থেকে বাড়ির পুকুরের গল্প শুনেছি, পুকুরটা নাকি বিশাল। বাবার ঠাকুরদার রাজকীয় পাকা বাড়ির গল্পও শুনেছি। আচ্ছা এখনও কি এগুলো আছে? আমার না খুব দেখতে ইচ্ছা করে।”

 বললাম, “সামনেই তো শীতকালীন ছুটি। তুমি  ইচ্ছা করলেই ঘুরে আসতে পারো।  আমার সাথে যেতে পারো।”

এটা বলার পরই সে আবার বলল, “ নাহ্,যাবো না। যে বাড়িটা এখন অন্যের হয়ে গেছে, সেটা দেখে আর কী লাভ?”

আমি জানালাম, “ বিল্ডিংবাড়িটা ভেঙে ফেলা হয়েছে, কিন্তু বিশাল পুকুরটা এখনও আগের মতো আছে। চৈত্র মাসে খাল-বিল নদী-নালা সবখানের পানি শুকিয়ে গেলেও পুকুরটার পানি শুকায় না। তখন গ্রামের সবাই এ পুকুরে গোসল করে। অবশ্য ভয়ে কেউ পুকুরের মাঝখানে যায় না। কারণ মাঝে মাঝেই পুকুরের মাঝখান থেকে ভলকা দিয়ে পানি ওঠে। লোকে বলে পুকুরের মাঝখানে দেবী আছে। তবে কেউ বলে বিশাল এক দানবকে যাদুমন্ত্রের দ্বারা পুকুরের মাঝখানে পুঁতে রাখা হয়েছে। হিন্দু জমিদারের পোষা দানব নাকি এটা। আর এ দানবটি যখনই নড়াচড়া করে ,তখনই ভলকা দিয়ে পানি ওঠে।”

 আমার এ বর্ণনা শুনে সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকল।

তারপর আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “ পুকুরটির বয়স সম্পর্কে তোমার বাবা তোমাকে কিছু বলেছে?”

 সে বলল, “বাবার ঠাকুরদা শরৎস্বর, তার বাবা উমাচরণ স্বর এ পুকুরটি কেটেছিল।”

উমাচরণ স্বর। মনে পড়ল নামটা । হ্যাঁ, এখনও লোকে  উমেচরণ বলে। উমাচরণ স্বরের নাম ও দস্তখত আমি আমাদের জমির দলিল-দস্তাবেজে দেখেছি। আমি সে কথা তাকে বলি। তার চোখ তখন খুশিতে ঝিকমিক করে ওঠে। সে  অনুরোধের ভঙ্গিতে বলল, আমি বাড়িতে গেলে যেন উমাচরণ স্বরের দস্তখতটা ফটোকপি করে নিয়ে আসি। আমি বললাম, “দস্তখতটা কেমন তা আমার মনে আছে, সেটা অনেকটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দস্তখতের মতো। অনেক সুন্দর। অবশ্যই তোমাকে দেখাবো।”

রহমতপুর গ্রামের স্বর পরিবার এবং চাটুজ্যে পরিবার পাড়া-প্রতিবেশিদের অত্যাচারে স্বাধীনতা পরবর্তী কয়েকবছরের মধ্যেই শহরে চলে  গিয়েছিল। তারপরও বৃদ্ধ তারকনাথ স্বর গোঁ ধরে বসবাস করছিল বাড়িতে । “ আমি যাবো না! আমি মরলে এই বাড়িতেই মরবো।” জিদ করে বলত সে।অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে মাঠের ফসলী জমি সব আস্তে আস্তে বিক্রি করে দিলেও বাড়িটা সে কোনোমতে ধরে রেখেছিল তখনও । প্রতিবেশিরা তার বাড়িতে ঢিল ছুঁড়তো,কখনো কখনো শরৎস্বরের পরিত্যক্ত ঘরের বারান্দায় মলত্যাগ করে রাখত, তবুও তার সরার ইচ্ছা হতো না। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সে বাড়ি থেকে নড়েনি। “আমি আমার নিজের লাগানো তুলসী-তলাতেই মরব।”– বাজারে গিয়ে বলত সে। সেদিন একদিকে যখন এই তারকনাথ স্বরের চিতা জ্বলছিল, অন্যদিকে তিথির বাবা তার পিতা সম্পর্কে একথাগুলো দুঃখভরে বলছিল। তিথির বাবাসহ তার অন্যান্য ভাইয়েরা তার  তের-চৌদ্দ বছর আগেই লোকজনের অত্যাচারে বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে গিয়েছিল। তারা সেখানে গিয়ে  বিয়ে করে সংসার পেতেছিল। তবে তারা কোথায় গেছে, কী করছে,  কে কাকে বিয়ে করেছে,কার বাচ্চা-কাচ্চা কয়টা হয়েছে এসব খবর গ্রামবাসীরা কেউ জানতো না। কারণ  তারপর থেকে তারা আর কেউ গ্রামে আসেনি। কিন্তু বছর দুয়েক আগে তিথির বাবা কেন রহমতপুরে এসেছিল, সে ব্যাপারে কিছু জানতে পারিনি । আমি তিথিকে তার বাবার কথা জিজ্ঞাসা করলাম।  সে বলল যে, সে নিজেও তার বাবাকে তিন বছর ধরে দেখে না। তার বাবা নরসিংদীতে থাকে, আরেকটা বিয়ে করেছে। সেখানে তার একটা মেয়ে হয়েছে। সে বলল, সে শুধু জানে এটুকুই।

আমরা ক্যাম্পাসের এক কোণে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। তিথির যে ক্লাশটা করার কথা ছিল সেটা তখন শেষ হয়ে গিয়েছে। আমার সেকশনের ক্লাশও শেষ হয়েছে । স্যারকে  বেরিয়ে আসতে দেখলাম।  ভাবলাম,একটু পরেই তো অন্য একটা ক্লাশ শুরু হবে, তিথি  নিশ্চয়ই এখনি চলে যাবে, হায়, এত সুন্দর মুহূর্তের এখনি অবসান হয়ে যাবে। তা-ই হলো। তিথি তার ক্লাশের দিকে দ্রæত পায়ে চলে  গেল। যাবার আগে শুধু বলে  গেল,পরে কথা হবে।  আমার নাটকের নায়িকা যে আমি তাকে বানাব, এটা আর তাকে বলা হলো না।

তিথি চলে যাবার পর আমার কেমন যেন লাগতে শুরু করল। সে আমার গ্রামেরই মেয়ে,যার পিতাকে অত্যাচার করে গ্রাম থেকে বিশ বছর আগে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তিথির ফুফুকে লোকমান মোল্লার ছেলে তুলে নেয়ার চেষ্টা করেছিল।  শুনেছি সেসময় ভয়ে তারা মামলাও করতে পারেনি। অথচ আগে উমাচরণ স্বর এবং তার পরে শরৎস্বরই এ গ্রাম শাসন করতেন। আমার দরবেশ কাকার মুখে শুনেছি, কাকা যখন যুবক ছিলেন, তখন শরৎ স্বরকে রোজ দুধ দিতে যেতেন। কাকাকে নাকি তখন বস্তা বা চটের উপর বসতে দেয়া হতো। এমনই জাত্যাভিমান ছিল তাদের।

তিথির সাথে কি আমার প্রেমের সম্পর্ক হওয়া সম্ভব? আমি ভাবতে থাকলাম। আমি যদি তাকে বিয়ে করি তাহলে তো গ্রামময় প্রচার হয়ে যাবে যে আমি স্বর বংশে বিয়ে করেছি। আচ্ছা আমি যে বিয়ের কথা ভাবছি, এটাওবা কিভাবে সম্ভব? তিথি কি ধর্মান্তরিত হতে রাজী হবে? আমার তো মনে হয় না এটা। আর সে মুসলমানকে বিয়ে করতে যাবে কেন? যে মুসলমানরা তার বংশের সকল লোককে  গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, ভিটে-মাটি জলের দরে কিনে নিয়েছে, সে কেন মুসলমানকে বিয়ে করবে? তারপরে আবার আমি তার গ্রামেরই এক মুসলমানের ছেলে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস জাগল যে, সে কখনও আমার সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াবে না।

ভগ্ন মন নিয়ে আমি আমার ক্লাশরুমের দিকে এগিয়ে  গেলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি সাদিয়াকেই ভালবাসবো এবং আমি সেটা এখনই সাদিয়াকে জানিয়ে দেব। এই সিদ্ধান্ত আমি নিলাম অনেকটা জিদ করে। আমার সামনে সাদিয়া ছাড়া আর কোনো অপশন ছিল না। তাই  অগত্যা তাকে ভালবাসার কথা বলতে যাচ্ছিলাম। আসলে সাদিয়ার প্রতি আমার ভালবাসা জাগেনি কখনও। মানুষ মাঝে মাঝে ঝোঁকের বশে ভালবাসার কথা বলে ফেলে। ভালবাসতে হয় তাই ভালবাসে। অনেকটা শূন্যস্থান পূরণের মতো।

যা-ই হোক, সাদিয়া ক্লাশেই  ছিল। আমি  ক্লাশের দিকে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকলাম, এমন সময় একটা শোরগোল আমার কানে এলো। মনে হলো, শোরগোলটা আমার ক্লাশরুম থেকেই আসছে। ভাবলাম, বামপন্থী ছেলে-মেয়েরা বোধ হয় শোরগোল বাধিয়েছে। এরা একটা কিছু হলেই মিছিল করত, চেঁচামেচি করত। কিন্তু আমি ক্লাশে ঢুকে দেখলাম যে, সাদিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে। কপাল থেকে রক্ত বের হচ্ছে।

 তাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালের ভর্তি করা হলো। জানা  গেল তার স্কালে চিড় ধরেছে।  ব্রেনে কী হয়েছে তা  জানা  গেল  না। তবে বাঁচা যে,অপারেশনের প্রয়োজন হলো না,ব্রেনে রক্ত জমাট বাধেনি ।

আমার ধারণা হলো যে, সে আমাকে আর তিথিকে একসঙ্গে তার ক্লাশরুম থেকে দেখে ফেলেছে। ফলে তার এই প্রতিক্রিয়া। সাদিয়ার প্রতি আমার তখন খুব মায়া হলো।

 আমার মন খুব ভারাক্রান্ত। কিন্তু কী করার আছে আমার ? তার প্রতি যে আমার ভেতর থেকে কোনো ডাক আসে না। আমি যে তাকে ভালবাসার কথা বলতে যাচ্ছিলাম এটাকে তো প্রকৃতপক্ষে ভালবাসা বলে না। এটাকে বলা যায়  দরদ দেখানো বা হয়তো দরদ দেখানোর চাইতে আরেকটু বেশি কিছু। ভালবাসা নয় কিন্তু ভালবাসার কাছাকাছি। যে একসিডেন্টটা সাদিয়া করেছে, এটা যদি তিথি করতো তাহলে আমি হয়তো আমি এতক্ষণে পাগল হয়ে যেতাম। এটাকেই বলে ভালবাসা। সাদিয়াও হয়তো আমাকে এমন করেই ভালোবাসে, যেমন করে আমি ভালবাসি তিথিকে। কিন্তু সাদিয়ার এ ভালবাসার মূল্য  এখন আমি কিভাবে দেব?

জানা  গেল,সাদিয়া শীঘ্র সুস্থ হবে না। স্কালে যে চিড় ধরেছে তা সহজে জোড়া লাগবে না। আমি মাঝে মাঝে সাদিয়াকে দেখতে যেতাম। অন্যান্য সহপাঠিরাও যেত। ডাক্তাররা বলছিলেন যে, সব ঠিক আছে, কিছুদিনের মধ্যে সে সুস্থ হয়ে যাবে। অবশেষে ১৩তম দিনে তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করা হলো। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য একটা জায়গায়, তার মানসিক অবস্থা স্থিতিশীল নয়। ডাক্তাররা কিছুদিন পরে আবার বললেন,সাদিয়াকে যেন শেরেবাংলানগর মানসিক হাসপাতালে কিছুদিন চিকিৎসা করা হয়। এতে সহপাঠিরা সবাই ধরে নিল যে তার স্কালে প্রাপ্ত আঘাতের কারণে তার ব্রেনে সমস্যা হয়ে গিয়েছে। কিন্ত সিটি স্ক্যানে দেখা গিয়েছিল যে স্কালে চিড় ধরলেও তা মগজকে স্পর্শ করেনি। সহপাঠিরা বেশ কনফিউশনে পড়ে  গেল । নেতৃস্থানীয় কয়েকজন বামপন্থী সহপাঠি, যারা ভুল চিকিৎসা করা হয়েছে বলে সন্দেহ করছিল—- তারা এটা-ওটা বলতে থাকল, স্যারদের দোষ দিতে থাকল। তাদেরকে তখন আমি বললাম যে,সাদিয়ার  ভুল চিকিৎসা হয়নি। তার মানসিক সমস্যার লক্ষণ আগে থেকেই আমি দেখতে পেয়েছি, সে পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারে ভুগছিল । তারা আমার কথা বিশ্বাস করল কারণ তারা সাদিয়ার সাথে আমার গভীর বন্ধুত্বের বিষয়টি জানত ।

 সাদিয়া মানসিক হাসপাতালে গেল না। কেন গেল না ,জানি না। হয়তো আমি এটা বলার পরই সহপাঠিরা তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করতে নিরুৎসাহিত করেছিল। মানসিক রোগি হওয়া একটা লজ্জার বিষয় বটে। এরপর হলেই থাকছিল সে।  তবে ক্লাশে আসছিল না। ফোনও দিচ্ছিল না আমাকে। তার রুমমেট ছিল ৪র্থ বর্ষের এক সিনিয়র আপা।তাকে একদিন আমি সাদিয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি তখন মুখে বিরক্তি নিয়ে বললেন যে, তিনি সাদিয়ার সাথে আর থাকবেন না, এবং রুম পরিবর্তনের জন্য ইতোমধ্যে দরখাস্ত করেছেন। কিন্তু তিনি কেন রুম পরিবর্তনের জন্য দরখাস্ত করেছেন সে বিষয়ে আমাকে সরাসরি কিছু বললেন না। উল্টো জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা বলো তো, শিশির কার নাম? তোমাদের ক্লাশের?”  আমি এ প্রশ্নটা শুনে কেঁপে উঠলাম। শিশির তো আমি! তাৎক্ষণিকভাবে ভাবলাম, সর্বনাশ, এখানে নিশ্চয়ই একটা গোলমাল আছে। তাই শিশির যে আমি, তা আমি তাঁকে বললাম না। আমি মুখে কিছু না বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে এমন একটা অভিব্যক্তি দিলাম যাতে তিনি বুঝে নিলেন যে,শিশির নামে আমি কাউকে চিনি না।  “বেচারী মেয়েটা!”  একটা দীর্ঘশ্বাস রেখে তিনি চলে গেলেন।

 এর দুই দিন পর সেকশনের করিডরে আপার সাথে আবার আমার দেখা হলো। সালাম দিলাম। তিনি হয়ত সাথে সাথে বুঝতে পারলেন যে, আমি তাকে আবার সাদিয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করব। তাই আমার কথা জিজ্ঞাসা করার আগেই তিনি হাসিমুখে জানিয়ে দিলেন যে, তার রুম পরিবর্তনের দরকার হয়নি,সাদিয়ার অভিভাবকরা এসে সাদিয়াকে নিয়ে গিয়েছে।

 গতকালেই ঘটেছে এটা । কিন্তু কিভাবে কী হয়েছে আমি কিছুই জানতে পারিনি। সন্ধ্যাবেলায় প্রভোষ্ট ম্যাডামের কাছে বিষয়টা জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন সাদিয়ার রুমমেট, মানে ঐ  সিনিয়র আপাটি,প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কাছে সাদিয়ার বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক,আপত্তিকর ও লজ্জাজনক আচরণের অভিযোগ তুলেছিল এবং  ম্যাডাম সেটা সুপারিশসহ প্রিন্সিপ্যাল স্যার বরাবর ফরোয়াড করেছিলেন । অবশ্য , ম্যাডাম জানালেন, এর আগে তিনি সাদিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তারপর কী ঘটেছে তা বুঝতে আর বাকি থাকল না আমার।

সাদিয়ার এমন অবস্থার জন্য আমার নিজেকে পুরোটা দায়ী মনে হচ্ছিল। খুব অপরাধবোধ হচ্ছিল আমার। ওর শেষ পরিণতি কী হবে? এত ব্রিলিয়ান্ট একটা মেয়ে। ওকে তখন খুব ভালবাসতে ইচ্ছা করছিল আমার । খুব। একদম ভেতর থেকে ভালবাসার ডাক আসছিল । বুকের গহীন থেকে একদম। যেখান থেকে আগে আমার জিকির বের হতো আর আমি অসামান্য আনন্দে ভাসতে থাকতাম,ঠিক সেখান থেকে। ইচ্ছা করছিল সাদিয়াকে বুকের মধ্যে জোরে চেপে ধরে অনন্তকাল পড়ে থাকি। আমি আমার দুই হাতের তালুর দিকে তাকালাম। এই দুই হাত দিয়েই তো আমি তার সুন্দর পবিত্র মুখখানা তুলে ধরেছিলাম। আহা, সে তখন চোখ বুজে ছিল। সে কি তখন আমার একটা চুমুর জন্য অপেক্ষা করছিল? তখন তার ঠোঁট তিরতির করে অমনভাবে কাঁপছিল কেন? সে হয়ত তখন কতই না খুশি হয়েছিল, হয়তো ভেবেছিল আমি তাকে অনেক ভালবাসি। কী কষ্ট দিয়েছি আমি তাকে। আহ!

আমি সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলাম, তার সাথে দেখা করব,আমি আমার ভালবাসার কথা তাকে জানাব। এটা জানাতে না পারলে যে আমি কোনোদিন নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। কিন্তু আমি তার বাড়ির ঠিকানা জানতাম না। ভাবলাম,সাদিয়ার স্থায়ী ঠিকানাটা হলের রেজিষ্টার-বুকে অবশ্যই আছে। রাতটা কোনোমতে কাটালাম। পরদিন আবারও প্রভোষ্ট ম্যাডামের কাছে  গেলাম। স্থায়ী ঠিকানা নেই, লোকাল গার্ডিয়ানের ঠিকানা ও ফোন নাম্বার আছে। লোকাল গার্ডিয়ান লোকটা তার চাচা হয়। হয়ত দূর সম্পর্কীয় চাচা হবে। বংশ-পদবী আলাদা। নিউমার্কেটের এক মুদি দোকানদার তিনি।

 ফোন দিলাম। লোকটা ফোন ধরে আমার পরিচয়, এটা-সেটা, কী কারণে সাদিয়ার সাথে দেখা করব, গ্রামে গেলে লোকে আমাকে দেখে কী ভাববে ইত্যাদি প্রশ্ন করে জেরবার করে ছাড়ল।  অধিকন্তু,আমার কাকুতি-মিনতি দেখে  সে আমাকে আরো সন্দেহ করে বসল। সে বারে বারে আমার নাম জিজ্ঞাসা করতে থাকল। কিন্তু আমি আমার ’শিশির’ নামটা তাকে বললাম না। ভুয়া একটা নাম বললাম। কারণ আমার ধারণা  হচ্ছিলো যে, শিশির নামটা এতদিনে সাদিয়ার পরিবারে বহুলভাবে প্রচার পেয়ে গেছে। লোকটা সাদিয়ার বাবাকে ফোন দিয়ে আমার বলা ভুয়া নামটা বলল। সাদিয়া এই নামে কাউকে চিনতে পারল না।  ফলে সাদিয়ার ঠিকানা দিল না সে। বুঝলাম, ঘাগু লোক। নিউমার্কেটের মুদিখানার দোকানদার সে। মানুষ চেনায় সে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী। উপরন্তু, সে আমাকে শাসিয়ে বলল যে, আমি যদি তার অনুমতি ছাড়া সাদিয়ার গ্রামের বাড়িতে যাই, তাহলে আমার পিটুনি খাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বিষয়টার বাস্তবতা অনুধাবন করলাম আমি ।  ভাবলাম,সাদিয়া বোধ হয় ঘুমের মাঝে শিশির নামটা বারে বারে বলতে থাকে,  আর এভাবে সবাই নামটা জেনে গিয়েছে। এখন যদি আমি তার গ্রামে যাই তাহলে আমার বিপদ হতে পারে। গ্রামের লোকজন যাদুটোনা,তাবিজ-কবজ, বানমারা ইত্যাদিতে বিশ্বাস করে বলে তারা ধরে নিতে পারে যে আমি সাদিয়াকে তাবিজ করে তার এ অবস্থা করেছি। ফলে,সাদিয়ার সাথে  দেখা করার আমার আর কোনো উপায় থাকল না।

কয়েকদিনের মধ্যে ক্লাশের সবাই সাদিয়াকে ভুলে  গেল। একটা মেয়ে যে মেডিক্যাল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছিল, সে আর ক্লাশে আসে না, হয়ত আর কখনও আসবে না, এ বিষয়টা নিয়ে  যেন কারও আক্ষেপ নেই। যেন কিছুই হয়নি, এমন একটা অভিব্যক্তি নিয়ে সবার দিন চলে যাচ্ছিল। শুধু আমিই তার শূন্যতা অনুভব করতাম। আমার মনে পড়ত, সে বেঞ্চের কোন্ কোন্ স্থানে বসত, কেমন করে হাসত,  কেমন করে কথা বলত,সে আমার সাথে কেমন করে গা ঘেঁষে বসত। দুপুরে লাঞ্চ করতে গেলেও তার কথা মনে পড়ত। সে আমাকে ফোন দিয়ে লাঞ্চের কথা মনে করিয়ে দিত, তার পাত থেকে খাবার তুলে আমার পাতে দিত, মনে পড়ে সব।

এরপর আস্তে আস্তে আমিও সাদিয়াকে ভুলে  গেলাম। বলতে গেলে আমি তাকে অনেকটা জোর করেই ভুলে  গেলাম। আমি তখন তিথিকেও অনেকটা ভুলে গিয়েছি। তিথির সাথে আমার কালেভদ্রে দেখা হয়।  টুকরো কথাবার্তা হয়।  তবে সে ব্যস্ততা দেখায় । এমন ব্যস্ততা দেখায় যে আমার সামনে থেকে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হতে পারলে বাঁচে। তার এমন ব্যস্ততা দেখানোর কারণ বুঝি। সমস্যাটা তখন এটা যে, আমরা একই গ্রামের ছিলাম। দুজনেরই অরিজিন একই জায়গা এবং আমরা একে অপরের সম্পর্কে  এক দেখাতেই অনেক জেনে ফেলেছি তখন। অনেক সময় একে অপরকে  বেশি জানাটা কাছে না টেনে দূরে সরিয়ে দেয়। তিথির সম্পর্কে অধিক জানাটা আমাদের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছিল।

 দিন চলে যায়। গা সিন সিন শীত চলে আসে ক্যাম্পাসে । শীতকালীন ছুটির আগেই কলেজে নাটক মঞ্চস্থ হবে, কোনো অন্যথা হবে না, অধ্যক্ষ স্যার জানিয়ে দেন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদককে। কলেজের সাহিত্য ও সংষ্কৃতি সম্পাদকের সাথে তখন আমার বেশ খাতির । আমি কবিতা-টবিতা লিখি, সেও লেখে। তবে সে আমার কবিতা বোঝে না। আমি লিখি সুফী কবিতা। তার মতো প্রেম-পিরিতির কবিতা নয়। তবে একদিন  আমি তাকে বলেছিলাম যে, কমিউনিটি মেডিসিন বিষয়ক একটা নাটকের খসড়া আমার রেডি আছে। নাটিকাটি আমি এমনি এমনি লিখেছিলাম। অনেকটা শখের বশে। সে অবশ্য আমার এই নাটক লেখাতে আশ্চর্য হয়েছিল।  “ডাক্তারী পড়ার হাঙ্গামায় এগুলো কে করতে চায়?”–এটা বলে সে তখন ভ্রু কুচকিয়েছিল ।

এবার সে নাটকটি চাইল। আমি বেশ কয়েকদিন খেটেখুটে আরও যতœ করে নাটকটি দাঁড় করালাম। ঢাকা ভার্সিটির এক বড় ভাই নির্দেশক হিসেবে আসলেন। তিনি কয়েকদিন রিহার্সেল করাবেন। প্রধান নারী-চরিত্রে কাকে কাষ্ট করা যায় তিনি তা আমার কাছে জানতে চাইলেন। আমি বিনাচিন্তায় তিথির নাম প্রস্তাব করলাম।

 কলেজের কনফারেন্স রুম। তিথিকে আনা হয়েছে। সম্পাদক,নির্দেশক এবং কমিটির সেক্রেটারি রায়হান স্যার- তিনজন তিথিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। তিথি মিটি মিটি হাসছে।  সে জানে না তাকে কী জন্য ডাকা হয়েছে। আমার দিকে তাকাচ্ছে না সে। তার কাছে আমি কোনো ফ্যাক্টর না, গুরুত্বপূর্ণও না। তার নজর স্যারের দিকে। স্যার তাকে প্রস্তাবটি দিয়ে বললেন যে, রিহার্সেল মাত্র তিনদিন হবে। এ তিনদিনের মধ্যে তাকে তার অংশের ডায়ালোগগুলি পুরো মুখস্থ করতে হবে। জানতে চাইলেন,  তিথি পারবে কিনা। তিথি বলল যে, সে পারবে। এরপর নির্দেশক তাকে প্রশ্ন করলেন,

“আপনার অভিনয়ে কোনো অভিজ্ঞতা আছে?”

“ নেই, তবে আমি সংষ্কৃতিমনা পরিবারে  বেড়ে উঠেছি।”

“আপনার পরিবারে  কেউ কি অভিনয় করে?”

“ করে। আমার মা একসময় যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন। এখনও তিনি মাঝে মাঝে মঞ্চনাটক করেন। পাবনার বনমালী মঞ্চে তিনি মাঝে মাঝে নাটক করেন। ফ্রিল্যান্স নাচের কোরিওগ্রাফিও করেন।”

“খুব ভালো । তাহলে আপনি পারবেন। আপনার রক্তেই তো অভিনয় মিশে আছে।”

“ জি,তা বলতে পারেন। বৃটিশ আমল থেকে আমার পরিবার অভিনয়ের সাথে সম্পৃক্ত। আমার মায়ের নানির নাম বিখ্যাত নর্তকী চিন্তারানী চৌধুরী। তিনি কত্থক নৃত্যে নতুন মুদ্রার প্রবর্তক।”

এরপর রায়হান স্যার তিথির হাতে নাটকের পাÐুলিপিটা দিয়ে বললেন, “আজকেই পুরোটা পড়ে ফেলো।” পাÐুলিপির মলাটের দিকে তিথি তাকাল একবার। তারপর নাটকের রচয়িতার জায়গায় আমার নাম দেখে ভ্রæ কুঁচকাল সে। জানতাম যে, সে আমার নাম দেখে চমকে উঠবে। যা হোক, সে সবার সামনেই আমাকে জিজ্ঞেস করল, “নাটকটি  তোমার লেখা?”  কথাটি এমনভাবে সে জিজ্ঞাসা করল যে, যেহেতু নাটকটি আমি লিখেছি তাই এটা কখনও ভালো হবে না। তাচ্ছিল্য আর বিষ্ময়ের যুগল অভিব্যক্তি আমি তার চোখেমুখে খেয়াল করলাম।

তিথি চলে গেল। রায়হান স্যার তার নাম চুড়ান্তভাবে কাষ্টিং তালিকায় লিখলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি দেখলাম, তিথির বাবার নামের পদবী ‘স্বর’ হলেও তিথি তার নামের শেষে চৌধুরী পদবি ব্যবহার করেছে। কিন্তু মানুষ সাধারণত বাপের নামের পদবিই ব্যবহার করে। ব্যাপারটি নিয়ে আমার একটু খটকা লাগল তখন।

 অতঃপর সন্ধ্যার সময়, অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে, তিথি আমাকে হলের ইন্টারকম থেকে ফোন দিল। বলল যে, সে আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমার হার্টবিট বেড়ে গেল। ভাবছি তখন, আমার এমন হচ্ছে কেন? আমার তো এরকম অস্থির হওয়ার কথা নয়। আমি তো বলতে গেলে তাকে ভুলে গিয়েছি।  তাহলে আমার হার্টবিট কেন এমন বেড়ে যাচ্ছে। অস্থির কেন হচ্ছি। আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার মস্তিষ্ক তাকে ভুলে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার হৃদয়টা তার কণ্ঠস্বর ঠিকই চিনে নিয়েছে। প্রিয় মানুষের কন্ঠস্বর বুঝতে পেরেছে এই হৃদয়টা।  তাই তড়পাচ্ছে এমন করে। আহা,হৃদয় আমার। এদিকে আমি ছোটাছুটি করে দিয়েছি কোন্ শার্টটা পরব, কোন জুতাটা, পাঞ্জাবি না টি-শার্ট পরব, জুতা না স্যান্ডেল  পরব,ইত্যাদি নিয়ে।  তারপর বিপুল পরিমাণ বডি স্প্রে গায়ে দেব, এমন ভাবনা নিয়ে স্প্রের মুখ খুলতেই মনে পড়ে গেল যে তিথি বডি-স্প্রে নেয়া পছন্দ করে না।

 ছাতিম গাছের নিচে আমাদের দেখা হলো,ওর  নিজের হলের পেছনে । আমরা দাঁড়িয়ে আছি। সন্ধ্যার পাতলা অন্ধকারের মধ্যে ছাতিম গাছের ছায়াটা ঘনান্ধকার তৈরি করেছে। তিথি আমার সামনে। সন্ধ্যার ছাই-ছাই অন্ধকারে আমি দেখছি যে, সে একটা সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ পরেছে। শীত প্রকৃতিতে তেমনভাবে আসেনি এখনও, তবুও চারদিকে ঠাÐা একটা আমেজ। মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসছে। আশেপাশে কি কোনো ফুলের গাছ আছে?  চারপাশে তাকিয়ে দেখি, নেই। কিছু দূরে কয়েকটা পাতাবাহারের গাছ আছে শুধু । হালকা বাতাসে পাতাগুলি নড়ছে । পাতাবাহারের শুধু বাহার আছে, গন্ধ  নেই । গন্ধটা তাহলে তিথির। তিথিরই হবে।  ভাবছি,এই তিথি নিজেইতো একটা সুগন্ধির আগার।

চারদিকে হালকা কুয়াশা। তিথি সামনে বসে কথা বলছে। কুয়াশা ভেঙে তার বলা শব্দগুলো আমার মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে। সে বলল, 

“ আমার পাঠটাকে আরেকটু বাড়িয়ে দাও, মাত্র ৭ টা সিনে আমি আছি। আরও দুটো বাড়িয়ে দাও।”

“ ঠিক আছে বাড়িয়ে দিবো। ডায়লোগগুলিকে কি বেশি লেংদি লাগে? কলোকুইয়াল মনে হয় তো?”

“ সব ঠিক আছে । তবে শোনো মেকাপম্যানকে বলে দিয়ো আমার ফেস ইমপ্রেসন যেন একটু ট্যান করে দেয়, যাতে বোঝা যায় যে, আমি গ্রামের রোগিদের জন্য উপযুক্ত ডাক্তার।”

“ লেখাটা কি  তোমার ভাল লেগেছে?”

“ অনেক ভাল লিখেছো তুমি, তোমাকে দেখে কিন্তু বোঝা যায় না যে তুমি এসব লিখতে পারো। তোমাকে নিয়ে গর্ব করা যায়। তারপর তুমি আমার গ্রামের ছেলে। গর্ব একটু বেশিই হয়।”

“ ধন্যবাদ তোমাকে । তুমি রহমতপুর গ্রামকে এখনও তোমার নিজের গ্রাম মনে করো বলে আরও ধন্যবাদ।”

 এইবার তিথিকে একটু বিষন্ন দেখাল। গ্রামের কথা বলাতেই সে যেন বিষন্ন হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে সে তার ব্যাগের চেন খুলে কী যেন খুঁজল।  পেল না।  তারপর সে বলল,

“ সত্যি বলতে কী জানো, গ্রাম আমার অনেক ভালো লাগে। পাবনায় গেলে আমার মনে হয় আমার পূর্বপুরুষের গ্রাম থেকে একটু ঘুরে আসি। যেখানে আমার বাবার জন্ম হয়েছিল, যেখানে তার নাড়ি পোঁতা আছে। আমার আরও দেখতে ইচ্ছা করে সেই সব প্রতিবেশিদের যারা আমার বাবা-কাকুদেরকে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছিল। ছোটোবেলায় বাবার মুখে তাদের গল্প শুনেছি। বাবাকে প্রশ্ন করতাম,তারা কি দেখতে ভুতের মতো, কিম্ভুতকিমাকার? অনেক শক্তিশালী, কালো ? আর তারা কি গর্জন করতে করতে মারতে আসত? বাবা বলতো যে,তারা অনেক কালো আর শক্তিশালী। আমার পিসিকে যে লোকটা তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, তার গল্পও বাবা বলেছিল। আমি তখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম লোকটা দেখতে কেমন। বাবা বলেছিলো একটি বিশাল শুকরের মতো। জানো,আমি এখনও ভাবি লোকটা আসলেই বোধ হয় দেখতে শুকরের মতো।”

 তারপর সে ব্যাগের মধ্য থেকে একটা ছোট্ট চিরুণি বের করে চুলটা একটু ঠিক করে নিল। নাটকে অভিনয় করবে বলে সে হয়তো বেশি করে সৌন্দর্য সচেতন হয়েছে। আমি বললাম,

“ তোমার বাবা যে তোমাদের কাছে এখন নেই, তোমার কষ্ট হয় না?”

“ অনেক হয়। বাবাকে খুব মিস করি। বাবার  নৈতিকতা  ছিল খুব উচ্চমানের। বাবা যে উচ্চবংশীয় ঘরের ছেলে , তা তার আচরণে বোঝা যায়।”

“ কিছু মনে কোরো না। তুমি তোমার নামের শেষে বাবার বংশপদবি ব্যবহার করো না কেন?”

“ আমার মা এটা করিয়েছে। তবে এটা আমার ভাল লাগে না। মাকে বলি ,মা শোনে না। মা বলে হিন্দু ঘরে যখন জন্মেছিস, বিয়ের পর তো পদবি চেঞ্জ করতেই হবে। এখন আছে যখন, থাক।”

“ তোমার মা কি তোমার বাবার পদবি নিয়েছে?”

“ নেয়নি। মা আসলে বাবাকে মন থেকে কখনও ভালোবাসতে পারেনি।”

 সে কথাটা খুব আস্তে করে বলল। গভীর মনোযোগ না দিলে হয়ত এ কথাটা আমি বুঝতে পারতাম না। তার কণ্ঠটাকে আড়ষ্ট মনে হলো। আমি আমার স্বরটাও তার মতো নিচু করে জিজ্ঞাসা করলাম,

“ তোমার মা-বাবার কি এ্যাফেয়ার ম্যারেজ ছিল?”

“ হ্যাঁ,কিছুটা ছিল। কুষ্টিয়ার খোকসায় এক যাত্রাপালার অনুষ্ঠানে মাকে দেখে বাবা পছন্দ করে ফেলেছিল। বাবা তখন দুহাতে প্রচুর খরচ করত। মা মনে করেছিল বাবার অনেক টাকা আছে। পরিচয় হওয়ার দশ-বারো দিন পর তাদের বিয়ে হয়েছিল।”

তিথিকে কথা বলায় তখন খুব একটা স্বচ্ছন্দ্য মনে হচ্ছে না। তার কণ্ঠস্বর কেমন যেন ধরা ধরা লাগছে। সব সন্তানই তার বাবা-মার ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করে। তাই প্রসঙ্গ চেঞ্জ করার জন্য আমি বললাম,

“ তোমাকে একটা কথা বলি। তোমার সাথে আমি যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়তাম, তখন আমি  তোমাকে মুসলমান মনে করেছিলাম। তোমার নামটা কিন্তু অনেকটা মুসলমানদের মতো।”

তিথি এবার যেন একটু  প্রাণবন্ত  হয়ে উঠল। হেসে উঠল সে । তারপর স্পষ্টস্বরে বলল,

“ হ্যাঁ, অনেকেই এটা মনে করে। এতে বরং আমাদের সুবিধাই হয়। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় এখন আমরা আমাদের হিন্দু পরিচয়টা আগেভাগে দেই না। দেয়ার দরকার হয় না। আমাদের নাম দেখে সবাই আমাদেরকে মুসলিম ভাবে। হিন্দু পরিচয় দিলে আবার মুসলমানরা বাসাভাড়া দিতে চায় না। তারা মনে করে যে এতে তাদের বাসাবাড়ির পবিত্রতা নষ্ট হবে। মুসলমানের মিলাদ দেওয়া বাসায় পূজা-অর্চনা হবে- এটা তারা মেনে নিতে পারে না। আমরা এখন মুসলিম মালিকের বাসায় ভাড়া থাকি। তারা এখনও মনে করে যে, আমরা মুসলমান। আমাদের ঘরে কোনো ঠাকুরও নেই। কোনো ধর্মীয় বইপুস্তকও নেই। মা ও আমি কথাবার্তায় মুসলিমদের ঢঙ রপ্ত করে ফেলেছি। কথায় কথায় আল্লাহ বলি, সালাম দেই। আমিতো মুসলিমদের চেয়ে আরো শুদ্ধ উচ্চারণে সালাম দিতে পারি, হি হি। তোমরাতো অনেকেই সঠিক উচ্চারণে সালাম দেও না।”

“ তোমাকে দেখে এটা বোঝা যায়। ইদানিং দেখছি তুমি মাথায় মুসলিম নারীদের মতো ওড়না পরো। একদম পেঁচিয়ে।”

“ হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো। আমরা তো সংখ্যালঘিষ্ঠ। সংখ্যালঘিষ্ঠদের উচিত সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতো করে থাকা। ঠিক কিনা বলো। এতে তারা শত্রুভাবাপন্ন হয় না।”

 আমি তখন ভাবছি, তিথি হয়তো ঠিকই বলেছে। কারণ  সংখ্যাগরিষ্ঠদের  সাথে এই মিশে থাকার প্রয়োজনীয়তাটা তারা তাদের জীবন দিয়ে বুঝেছে। এদেশের সংবিধান যদিও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার জন্য বলে, তাদের ধর্ম,সংস্কৃতি,কৃষ্টি ইত্যাদি রক্ষার জন্য বলে, কিন্তু বাস্তবে তা রক্ষিত হয় কতটুকু? সংখ্যাগরিষ্টদের কৃষ্টির ¯্রােতে সংখ্যালঘিষ্টদের কৃষ্টি যেন ভেসে যেতে চায়। এভাবে উপজাতিদের ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে, ধর্ম বিলুপ্ত হচ্ছে। এ রকম হওয়াটা ভালো কথা নয়। তিথির  প্রতি আমার মায়া হলো।

 তিথি উঠে দাঁড়াল। তার হাঁটার ভঙ্গিটা একটু ঢিলেঢালা, ঢঙ্গি টাইপের। তবে হাঁটাতে একটা রিদম আছে।  যেন সে নাচের মুদ্রার সাথে হাঁটছে। দেখতে বেশ লাগছে। মেয়েরা খোশমেজাজে থাকলে এমন করে হাঁটে।  এভাবে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে জিজ্ঞাসা করল,

 “ তোমার নাটকে তুমি আমাকে নিয়েছো ,নাকি স্যার নিয়েছে?”

“ আমি তোমার নাম প্রস্তাব করেছি মাত্র। আরও কয়েকজন অপশনে ছিল। তুমি যোগ্য বলে তোমাকে নিয়েছে।”

“ তোমার নিজের অপসনে কয়জন মেয়ে ছিল?”

তার এ প্রশ্নে আমি খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা  খেলাম।  ভাবলাম, নিশ্চয়ই এটা একটা কৌশলী প্রশ্ন, তাই এ প্রশ্নের উত্তর আমাকে চিন্তাভাবনা করে দিতে হবে।

বললাম,

“ না, আমার মাথায় শুধু তুমি ছিলে। আমি মূলত তোমাকে কল্পনা করেই ক্যারেক্টারটি তৈরি করেছি।”

 সে একটু হাসল। এরপর সে আরও হেলেদুলে হাঁটতে থাকল। অনেকটা আহ্লাদী ভঙ্গির এ হাঁটা।

আমি বললাম,

“ তুমি বেশ সুন্দর করে হাঁটতে পারো। মনে হচ্ছে যে, তুমি নেচে নেচে হাঁটছো।”

“ তোমাকে বুঝতে হবে যে আমি চিন্তারানী চৌধুরীর বংশধর। নাচের মুদ্রা আমার জিনে আছে, বুঝলে?”

 আমি দেখছি,ক্যাম্পাসের নরম ঘাসের উপর দিয়ে সে হেলেদুলে হাঁটছে। পায়ে নূপূর আছে কি? অষ্পষ্ট  অথচ মিষ্টি একটা রিনিঝিনি শব্দ হচ্ছে যে।  তবে ,নূপুরের রিনিঝিনি শব্দের ভেতরে আমার তখন চিন্তারানী শব্দটা কানে বাজছে। চিন্তারানী নামটা কেন যেন আমার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে যে, হয়ত কোথায়ও নামটা পড়েছি,কিংবা কারো কাছ থেকে শুনেছি। পত্রিকার কোনো কলামে তার নাম পড়েছি কি? কোনো ম্যাগাজিনে?  তিনি যেহেতু কত্থক নৃত্যে একটি মুদ্রার প্রবর্তক, পড়ে থাকতে পারি। মনে করতে পারলাম না।  অতঃপর আমার মনে হতে থাকল যে, আমার ঐ সমস্যাটা আবার হচ্ছে। সেই “পরিচিত বোধ হওয়া” সমস্যা।

জিজ্ঞাসা করলাম,

“ চিন্তারানী চৌধুরীর বাড়ি কোথায় ছিল? পাবনাতে নাকি অন্য জেলায়?”

“ না, পাবনাতেই। চাটমোহরের হরিপুরে।”

“ তাহলে লেখক প্রমথ চৌধুরী কি তার বংশধর!”

“ না না, উনি আলাদা চৌধুরী। প্রমথ চৌধুরীর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।”

“ হরিপুরতো আমাদের গ্রাম থেকে বেশি দূরে নয়। তাহলে এমনও হতে পারে তিনি আমাদের গ্রামেও যাত্রাপালা করেছেন।”

“ করতে পারে।”

তিথি হাঁটছে আর কথা বলছে। আমি তার পায়ের নূপুরের শব্দ শুনছি। নুপুরটাকে আমি দেখার চেষ্টা করলাম। দেখা গেল না। এদিকটায় বেশ অন্ধকার । আমি তাকে বললাম, “চলো ঐখানে বসি।”

 সে আলোর মধ্যে  গেল। তিথির মুখটা অনেকক্ষণ যাবৎ ভাল করে দেখতে পারিনি। মুখটাকে এবার দেখা গেল স্পষ্ট। কালো কাজল পরেছে চোখে, সাথে কালো টিপ। ঠোঁটে কফি কালারের লিপস্টিক ।  আমার মনে হতে থাকল,আমি বোধ হয় এই সুন্দর মুখখানার দিকে অনন্তকাল তাকিয়ে থাকতে পারব। চোখের কোনো পেরেশানি হবে না আমার ।

  এরপর সে হঠাৎ দুপা সামনে দিয়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল। এবার তার নূপুর পুরোপুরি দেখা  গেল। এরপর দেখি তার পায়ের  গোড়ালির উপরে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি লোম। এত ঘন লোম কোনো মেয়ের পায়ে যে থাকতে পারে তা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না তখন। অস্বস্তি হচ্ছে খুব। আমি আমার নিজের পায়ের দিকে খেয়াল করলাম। না, আমার পায়ে অত ঘন আর কালো লোম নেই। আমার বুকে শুধু ঘনসন্নিবিষ্ট লোম আছে। শুনেছি, যে পুরুষের বুকে লোম বেশি, তার দিলে রহম বেশি।  এভাবে অস্বস্তিবোধ কাটানোর জন্য আমি আমার মনটাকে ওর পায়ের লোম থেকে অন্য দিকে ডায়ভার্ট করার চেষ্টা করলাম। ওর পায়ের লোম নিয়ে ভাবার কী এত দরকার । আমি ভাবতে থাকলাম পুরুষের বুকের লোম নিয়ে। বুকে লোমবিহীন পুরুষ কি তাহলে নির্মম হয়? আমি কি এমন কাউকে দেখেছি? ইত্যাদি ইত্যাদি….

 আমার দেখা এরকম বুকে লোমবিহীন পুরুষকে আমি মনে করতে চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, আছে একজন। তার তিনটা মেয়ে । সে মেয়েদেরকে কখনও আদর করেছে কিনা তা জানা যায়নি। একদিন দেখি, সে তার মেজো মেয়েকে পেটাচ্ছে। কেন পেটাচ্ছে জানি না। তবে শিশুসন্তানকে পেটানো কোনোমতেই মেনে নেয়া যায় না। সে তার স্ত্রীকেও পেটাত। তার স্ত্রীও কম ছিল না। ঝগড়াটে ডাঁটাপুর মহিলা ছিল সে । স্ত্রীর উপর রাগ থেকেই সে বোধ হয় তার সন্তানদেরকে পেটাত। যে স্বামী তার স্ত্রীকে ভালবাসে না, সে তার সন্তানকেও ভালবাসতে পারে না। লোকটি হয়তো  তার সন্তানকে পিটিয়ে স্ত্রীর উপর প্রতিশোধ নিত, নিতে চাইত। মাঝে মাঝে সে আবার বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যেত। তখন ছোট ছোট মেয়েদেরকে নিয়ে তার বউয়ের কষ্টের অন্ত থাকত না। দিলে রহম থাকলে লোকটা নিশ্চয়ই এটা করত না।

আমি এগুলো  যখন ভাবছি, ততক্ষণে তিথি কখন যে আমার একদম কাছে ঘেঁষে বসেছে তা বুঝতে পারিনি। সে আমার বামপাশে বসেছে। উত্তর দিক থেকে আসা ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা তার চুলগুলোকে আমার কাঁধে এনে ফেলছে। তার ডান কাঁধ বরাবর উম্মুক্ত বাহু আমার বাহুর সাথে মাঝে মাঝে লেগে যাচ্ছে আর আমি  থেকে থেকে থাউজেÐ ভোল্টের শক খাচ্ছি। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে আমার । হৃদপিণ্ডটা তড়পাচ্ছে ডাঙায় তোলা ইলিশ মাছের মতো? বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে যাবে নাকি হৃৎপিণ্ডটা? আমি আমার বাম হাতটা তার চুলের নিচ দিয়ে তার ঘাড়ে রাখলাম। সে একটুখানি কেঁপে উঠল, কোনো বাধা দিল না। তার ঘাড়ে অনেক ওম।

আমি মনে মনে আবৃত্তি করলাম আমার লেখা আরেকটি কবিতা,

“ তোমার ছড়ানো কেশের অভ্যন্তর হতে                                    

আমার এ হিম হাত যদি ছিনিয়ে নেয় ওম                              

তোমার গ্রীবা কি শিউরে উঠবে চকিতে,                                  

তুমি কী অদম্য সুখে আটকে রাখবে দম?”

তার পরে কী ঘটল তা আমি বলতে পারব না। সে হয়ত তার ঠোঁট আমার দুঠোঁটের গভীরতায় তলিয়ে দিয়েছিল, জানি না  আসলে সে কী কী করেছিল আর আমি কী কী করেছিলাম।  পরে আমার শুধু মনে পড়ল আমি বারংবার একটা কর্কশ কণ্ঠের হাসি শুনেছি। সে হাসির আওয়াজটা কাকের স্বরের মতো অসহনীয়। তবে পরে, আমার খারাপ লাগল এটা ভেবে যে ,আমার  ব্রেন আবারও ব্ল্যাঙ্ক হয়েছে এবং এইবার নিয়ে পঞ্চমবারের মতো।

আমি অনেকটা সম্মোহিতের ন্যায় রুমে ফিরে আসলাম। তিথি তখন চলে গেছে। অবশ্য যখন ফিরছিলাম, তখন সে আমার দিকে লজ্জায় তাকাতে পারছিল না। আমারও কেমন যেন লাগছিল। কিন্তু  বিদায় নেয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা একে অপরের হাত ধরাধরি করে হাঁটলাম।

রুমে ফিরে এসে আমি ভাবছি আমার এটা কী হলো।  শেষমেষ আমি একটা হিন্দু মেয়ের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়লাম? আমার বাবা-মা পাড়া প্রতিবেশি কী ভাববে?  এছাড়া তাকে আমি কীভাবে বিয়ে করব? সে যদিওবা মুসলমান হয়ে আমাকে বিয়ে করে তবুও তো আমাকে শ্বশুর-শাশুড়ী বা শ্বশুরপক্ষের আত্মীয়স্বজন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে। একজন বিবাহিত মানুষের জন্য তো শুধু বউ-ই নয়, বউয়ের পক্ষের আত্মীয়-স্বজনেরওতো দরকার আছে।

কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে আমার মনে যে চিন্তাটি সর্বশেষে স্থিতিশীল হলো, সেটা হলো , তিথির সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার মুহূর্তে আমি কেন একটি নারী কন্ঠের অদ্ভুত হাসি শুনতে  পেয়েছি। তাহলে তিথিই কি সেই নারী যার অসহনীয় হাসি আমি শুনে আসছি এতদিন ধরে? তিথির কণ্ঠস্বরের সাথে আবার সেই গায়েবী কন্ঠস্বরের মিলও পেয়েছি । আমি ভাবলাম, না, তিথির সাথে জড়িয়ে পড়া আমার ঠিক হবে না। তিথিকে ভুলে যেতে হবে। আমি ভুলে যাবো তিথিকে। চিরদিনের মতো। কিন্তু……….. কিন্তু তার মোহনীয় রূপ, তার শরীরের গন্ধ, ঝিরিঝিরি চুল, সর্বোপরি তার সাথে ঘনিষ্ট হয়ে যাওয়া- এ সবকিছুকে কিভাবে ভুলব আমি? নিজেকে আগুনে ঝাঁপ দিতে যাওয়া পতঙ্গের মতো মনে হতে থাকল । পতঙ্গও নাকি আগুনের প্রেমে এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, জেনে-শুনে আত্মাহুতি দেয়। হায়!

 আমার মনে তখন কিছু তুচ্ছ প্রশ্ন জমা হয়েছে। মানুষের মনে অহরহ এরকম অনেক তুচ্ছ প্রশ্নের জন্ম নেয়, যেটা সে প্রকাশ করে না, প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করে না। আমার মনেও তেমনি কিছু প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে: আচ্ছা তিথির পায়ে এত ঘনকালো লোম কেন? এটা কি খারাপ কিছু নির্দেশ করে? তিথি কি মানুষের রূপ ধরে থাকা কোনো ভুত? তার কণ্ঠও কেন সেই গায়েবী নারীর অনুরূপ? লস্কর মÐল যখন জ্বিন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নারীর বর্ণনা দিয়েছিলেন, তখন কি ঘন লোম পা-বিশিষ্ট কোনো নারীর কথা বলেছিলেন? আমি কি এ ধরনের পা-বিশিষ্ট নারীকে কখনও দেখেছি?  মিশরের ফারাও স¤্রাটরা যে জ্বিন নারীদের বিয়ে করেছিল, তাদের বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল? তাদের পায়ে কি ঘন কালো লোম ছিল? জ্বিনরা কি বডি-স্প্রের সেন্ট সহ্য করতে পারে না? তিথি তো পারে না।  বৈদ্যুতিক আলোর রশ্মির মতো জ্বিনরা কি  কেমিক্যাল আয়নও সহ্য করতে পারে না? না কি? ইত্যাদি।

আমি আমার মনের  ভেতর হাতড়াতে থাকলাম। আমার তখন এমন একজন নারীর কথা মনে পড়ল, তবে তার পায়ে  বেশ লোম থাকলেও তা তিথির মতো এতটা ঘনসন্নিবিষ্ট ছিল না।  হ্যাঁ, মহিলাটির কথা আমার বেশ মনে পড়ে। রহমতপুর গ্রামে যে দোতলা দালানবিশিষ্ট অক্সফ্যামের অফিস আছে- অর্থাৎ যেখানে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয়েছিল- সে অফিসে  ফেরদৌসী নামক একজন সুন্দরী মহিলা চাকরি করতেন। তাকে প্রতিদিন পাবনা থেকে এসে অফিস করতে হতো। তখন ইছামতি নদীতে কোনো ব্রিজ ছিল না। বাঁশের সাঁকো ছিল পারাপারের জন্য । হঠাৎ একবছর, সম্ভবত  ১৯৯১ সাল তখন, বর্ষাকালের শুরুর দিকে ইছামতি নদী ফুলে-ফেঁপে উঠল। শোনা গেল চৎরা বিলে যমুনার পানি ঢুকে পড়েছে। কয়েক ঘন্টার মধ্যে পানি বেড়ে গেল তিন ফুট। ফলে সাঁকোটির মূল বাঁশ, যার উপর পা রেখে নদী পার হতো লোকজন, সেটি প্রায় একফুট পানির নিচে চলে গেল। কিন্তু যমুনার পানি যেহেতু স্বচ্ছ ,( অবশ্য পদ্মার পানি ঘোলা থাকে) তাই পানির মধ্যেও বাঁশটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল এবং লোকজন সহজেই সেটার উপর দিয়ে যাতায়াত করতে পারছিল। ঐদিন  ফেরদৌসী ম্যাডামও পার হচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি তার পাজামা ভেজাতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং সে কারণে তিনি তার পাজামা অনেকটা উপরে তুলে ফেললেন। আমি তখন ক্লাশ সিক্সে পড়ি। স্কুলে যাওয়ার জন্য আমি তার পেছন পেছন নদী পার হচ্ছি এবং ঠিক তখন পায়ের লোমের ব্যাপারটি খেয়াল করলাম। মহিলাটি উচ্চতায় খাটো ধরনের ছিলেন। তবে তার সম্পর্কে পরবর্তীতে বিভিন্ন নেতিবাচক কথা শোনা গিয়েছিল। পত্রিকায়ও লেখালেখি হয়েছিল তাকে নিয়ে।

অত্যধিক লোমযুক্ত পা কি তাহলে নারীদের চরিত্রহীনতাকে নির্দেশ করে? হয়ত করে। পুরুষের বুকের লোমহীনতা যদি তাদের হৃদয়ের দয়াহীনতাকে নির্দেশ করে, তাহলে এটাও ঠিক হতে পারে। আবার ভাবলাম, এসব কী আবোল-তাবোল ভাবছি আমি? লোম কম-বেশি হওয়া তো হরমোনের বিষয়। এর সাথে মানুষের বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক খোঁজা আতলামি মাত্র। আর একজন মেডিকেল পড়ুয়া হয়ে এসব কী ভাবছি আমি!

 মনের গহীনে তবুও সন্দেহ, এই-সেই প্রশ্ন । আচ্ছা সাদিয়ার পায়ে কি এ রকমের লোম দেখেছি?  দেখিনি বোধ হয়। আমার তখন সাদিয়ার কথা খুব করে মনে হলো। একটা সুন্দর সম্ভাবনাময় জীবনকে নষ্ট করেছি আমি। সে কি পুরো পাগল হয়ে গেছে? সে এখন কোথায় আছে? তাকে কোন্ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে? শেরেবাংলানগর মানসিক হাসপাতাল, নাকি পাবনা মানসিক হাসপাতাল? তার নিষ্পাপ মুখখানা যেন আমাকে শুধু দ্যাখে, আর আমি তার মুখখানাকে কল্পনায় দেখি। আমি দেখি,সে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন তার অনেক কিছু বলার আছে আমাকে, কিন্তু সে অভিমান করেছে ভেতরে ভেতরে, তাই সে এখন কিছুই বলবে না। ইস! ঐ সাদা-সিধা নূরানী মুখখান যেন আমার ক্বলবের সাথে মিশে আছে একদম।

 ভাবতে থাকি আরও… এ ভাবনার যেন শেষ নেই। সাদিয়া বোধ হয় শুকিয়ে একদম কঙ্কালসার হয়ে গেছে। তার একদম শুকনো চেহারা আমার চোখে ভেসে ওঠে আর তার এ অবস্থা ভাবতেই আমি ঘেমে উঠি। হাহাকার জাগে বুকের ভেতর। আচ্ছা তাকে এমন কষ্ট দেওয়ার কারণে আমার উপর যদি বজ্রপাত হয়, তাহলে কি আমার প্রায়শ্চিত্ত হবে? আমার মনে হয় এতটুকুতে প্রায়শ্চিত্ত হবে না। আমার উপর এক নাগাড়ে সহ¯্রবার বজ্রপাত হওয়া উচিত। আমার  শরীরের সমস্ত কোষ, অণু-পরমাণুকে পুড়িয়ে ভষ্ম করে দেয়া উচিত। এটা কী করেছি আমি! ধিক আমাকে! পীরসাহেব তো বলেছিলেন, যৌবনটাকে ভাল কাজে লাগাও, রিপুকে দমন করো,অদৃশ্যকে দেখার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা সবাইকে দেয় না। কিন্তু  এই মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির পর থেকে আমার আমল-আখলাক সব বরবাদ হয়ে গিয়েছে। আমি এখন আর চাইলেও  পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব না। পারব না নিশ্চয়ই। এখন তো জিকিরও আর আমাকে টানে না। নামাজ পড়ি বটে কিন্তু আগে যে ভালবাসা দিয়ে পড়তাম এখন আর তা পড়ি না। নামাজ পড়তে গেলেও তাড়াহুড়া করি। ভাবি কখন শেষ হবে । আগে তা ভাবতাম না। ভাবতাম নামাজের ওয়াক্ত পাঁচটা কেন, আরো বেশি হলে যেন ভালো হতো।

রাত  তখন গভীর হয়ে গেছে। দেড়টা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি । সন্ধ্যা থেকে তখন  মধ্যরাত পর্যন্ত কিভাবে সময় পেরিয়ে গিয়েছে জানি না।  ভাবছি,আমি কি এখন নাটিকাটি নিয়ে বসব? তিথি যে বলেছে তার জন্য আরো দুটি সিন বাড়িয়ে দিতে হবে। আগামীকালই তো তার সাথে দেখা হবে ক্যাম্পাসে। সে তো তখনই চাইবে, এখন তো আরো অধিকার নিয়ে চাইবে । এখন আমি তার প্রেমিক। আর দেরি করা যাবে না। এখনই লিখে শেষ করতে হবে। আগামী পরশু রিহার্সেল শেষ। এখন না লিখলে আর লিখা হবে না।………

অগত্যা আমি লিখতে বসলাম। প্রকৃতিতে বেশ শীত তখন।

 এরপর তিনদিন পার হয়ে গেল।

সেদিন সন্ধ্যাবেলা। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নাটক শুরু হবে। নির্দেশক শেষ প্রস্তুতি হিসেবে কিছু নির্দেশনা দিয়ে  দিয়েছেন। মেকাপম্যান রেডি।

 এবার তিথিকে মেকাপ দিচ্ছেন মেকাপম্যান। আমি পাশ থেকে তিথিকে দেখছি।অবশ্য সরাসরি দেখছি না,লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছি। আড়চোখে,যাতে মেকাপম্যান বুঝতে না পারে যে তিথিকে আমি কিছুটা হলেও কামুক দৃষ্টি দিয়ে দেখছি। তবে তিথি বিষয়টি বুঝতে পেরে মিটি মিটি হাসছে। এরপর একজন মহিলা তাকে শাড়ি পড়ালো। জর্জেট শাড়ি। শাড়িটা তাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে রেখেছে যেন। খোঁপাটা তার পিঠের সাথে, ঘাড়ের সাথে এত সুন্দর মানিয়ে গেছে যে তার সৌন্দর্য প্রকাশ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। তিথি যে এতটা সুন্দরী তা আগে বুঝিনি। হাইহিল পায়ে দিয়ে সে যখন হাঁটতে থাকল ,আমার তখন মনে হলো আশেপাশের সকলকে সে তার রূপযৌবন দিয়ে খুন করে চলে যাচ্ছে।( To be continued…..)

Leave a Reply

Your email address will not be published.