আমার মুরিদজীবন।। অধ্যায়:৮।। পাপীর মৃত্যুস্বপ্ন

 3,627 total views

১১. পাপীর মৃত্যুস্বপ্ন

 “তুমি পাক, তুমি পাক!

তুমি কখনো ফেলো না তোমার অশ্রু এ ভূপৃষ্ঠে  

 তোমার পবিত্র অশ্রুতে করো আমার ছিনাছাক

ধুয়ে  ফেলো আমার নফসে আম্মারা

পবিত্র করো আমার সমস্ত লতিফা

তোমার মোনাজাতের তালুতে আমায় বসিয়ে রাখো

আমি  তোমার পবিত্রতায় করতে চাই অবগাহন

 তুমি নূর !

তোমার মৌন সৌন্দর্য এত দীপ্তিময়

তুমি হেসো না অমন হাসি

তোমার জেল্লায় যে আমি জ্ঞান হারাবো!

আমার ভয় হয়

তোমার এশকে দিওয়ানা হয়ে

আমার ক্বলবে যদি একবার ওঠে তোমার নামের জিকির

 আমি কিভাবে থামাবো সে জিকির?”

                                       -পীরজাদা

  মঞ্চের পেছনে সাটানো বড় ব্যানারে লেখা ছিল বার্ষিক ইছালে ছওয়াব/১৯৯৪। তারিখ ০২ জানুয়ারি। স্থান: রহমতপুর ফাজিল মাদ্রাসা।  সভাপতি : কেরামত আলী শেখ, সভাপতি ম্যানেজিং কমিটি, অত্র মাদ্রাসা। বিশেষ অতিথি: ড. ইমতিয়াজ আলী, আজীবন দাতা সদস্য, অত্র মাদ্রাসা। প্রধান বক্তা: মাওলানা হযরত মো:…………… ২য় বক্তা: মাওলানা হযরত………. ৩য় বক্তা: মাওলানা হযরত……… পীর সাহেব, রহমতপুর খানকা শরীফ,……… সিলসিলা, ৪র্থ বক্তা: মাওলানা হযরত……….

২৩ ডিসেম্বর/১৯৯৩ খ্রি.তারিখের মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেকই বক্তাদের ক্রম লেখা হয়েছিল।  ড. সাহেবের নাম জালছার ব্যানারে উঠেছিল সেবার প্রথমবারের মতো ।  মনে মনে ভাবছিলাম , নাস্তিক লোকও দেখি জালছার ব্যানারে, হায়রে স্বার্থ, টাকা থাকলে দেখি সবই করা যায়। ড. ইমতিয়াজ আলী ,মানে আমাদের ড. সাহেব, এ মাদ্রাসায় কিছুদিন আগে তিনটি আলমারি, ২২ টি গদি-চেয়ার, পাঁচটি টেবিল এবং আরো কিছু আসবাবপত্র উপহার দিয়েছিলেন । এছাড়া, তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, প্রতি ক্লাশের মেধা তালিকার প্রথম তিনজনকে তিনি আর্থিক পুরষ্কার দিবেন।দিয়েছিলেনও কিছু ।ফলে তাঁকে জালছায় আজীবন দাতা সদস্য হিসেবে বিশেষ অতিথির পদ দেয়া হয়েছিল।  তাঁকে এই বিশেষ অতিথি বানানোর আরো একটা কারণ ছিল। কারণটা হলো, তিনি ছিলেন কট্টর পীরবিরোধী লোক। পীরসাহেবের ওয়াজের ভুল তিনিই একমাত্র যুক্তিসহকারে তুলে ধরতে পারতেন পীরবিরোধীদের কাছে। যদিও তিনি নামাজ কালাম পড়তেন না এবং রোজার দিনেও তাঁর বাড়িতে  নিয়ম করে বাউল গানের আসর বসত, গাঁজা চলত ধুমছে। কুষ্টিয়া থেকে মহিলা শিল্পীদেরকে বেছে বেছে এই রোজার দিনেই নিয়ে  আসতেন পালাগান গাওয়ানোর জন্য।  তখন সারারাত ধরে চলত সেই পালাগান। চলতে থাকত শয়তান আর আল্লাহ্র মধ্যে নিদারুণ অকথ্য তর্কাতর্কি,বাহাস।

 যা হোক, ওয়াজ শুরু হয়ে গিয়েছিলো। ড. ইমতিয়াজ সাহেব জালছায় তখন পর্যন্ত আসেননি। রাত্রি নয়টা বেজে চলছিল।  চতুর্থ বক্তা হিসেবে ওয়াজ করার কথা  ছিল আমাদের পীরসাহেবের । তিনিও তখন আসেননি।  অবশ্য সমস্যা হচ্ছিল না এতে। খুব মনোযোগ দিয়ে ওয়াজ করে চলছিলেন স্থানীয় একজন বক্তা। তিনি এই মাদ্রাসারই ফাজিল ক্লাশের তালবেলেম। ভালোই ওয়াজ করছিলেন। মহিলা শ্রোতাদের মধ্য থেকে ক্ষণে ক্ষণে দান-হাদিয়া আসছিল।  দান পাওয়ার সাথে সাথে তিনি চিৎকার দিয়ে ফেটে পড়ছিলেন, দানকারীর জন্য যারপরনাই  দোয়া করছিলেন। আমি ভাবছিলাম, এনার ওয়াজে যেভাবে দান-খয়রাত আসছে, তাতে আগামী বছরের জালছায় নিশ্চিত তালিকাভুক্ত ওয়াজিয়েন হবেন তিনি। ব্যানারেও তখন তাঁর নাম শোভা পাবে।

 আমি জালছার ছামিয়ানার নিচে তখনও ঢুকিনি। ভাবছিলাম, পীরহুজুর এলেই ঢুকবো। আমি তখন বাইরে দাঁড়িয়ে। রাস্তায়। জালছা উপলক্ষ্যে রাস্তার পাশে কয়েকজন হিন্দু লোক  জিলাপির দোকান বসিয়েছিল,  দাঁড়িয়ে বেচা-বিক্রি দেখছিলাম তাদের । চিনির তৈরি মূর্তির আকারবিশিষ্ট মিষ্টান্ন বিক্রি করছিল তারা। হাতি, ঘোড়া, হনুমান, রাজহাঁস, পেঁচা,  শকুন ,ইঁদুর, সাপ, ষাঁড় প্রভৃতির মিষ্টি-মূর্তি।  ছেলে-মেয়েরা ভীড় জমিয়ে কিনছিল সেগুলো। কড়মড় করে খাচ্ছিল পাশে দাঁড়িয়ে। ছোট একটা বাচ্চা অবিরত চেটে যাচ্ছিল গণেশ মূর্তির হাতির শুঁড় । প্রিন্সিপ্যাল সাহেব যাচ্ছিলেন ওদিক দিয়েই । তিনি হিন্দু লোকটাকে এসব প্রতিকৃতির মিষ্টান্ন বেচতে দেখে থেমে গেলেন। “এই মিয়া এসব কী বেচতেছো তুমি! যাও! সরো এখান থেকে!”— দোকানদার লোকটিকে ধমকিয়ে তুলে দিলেন তিনি ।  শমসের খাঁ কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে এটা দেখে দোকানদারকে আবার বসিয়ে দিল।  বলল সে, “ওদের  নদী বিল মাটেল সবই তো দহল হরে লিছে আপনের মাদ্রাসার সভাপতি, এহন কি ইডা-উডা বেচেও খাবের দেবেন না! উরা কী খায়া বাঁচপি!” বিষয়টা নিয়ে শমসের খাঁর সাথে প্রিন্সিপ্যাল সাহেবের বচসা শুরু হয়ে গেল। তালবেলেম ছাত্রটি মাইকে তখনও কেঁদে কেঁদে ওয়াজ করে চলছিল বলে এ দুজনের ঝগড়ার উত্তপ্ত ফেনিল বাক্যগুলি আমি ভালোমতো বুঝতে পারছিলাম না।

রাত ৯:৩০টা বাজলে পীর সাহেব আসলেন এবং ওয়াজ শুরু করলেন। শেষ করলেন ১০:৩০ টায়। এরপর প্রধান ওয়াজিয়েন ওয়াজ শুরু করলেন। কারণ তৃতীয় ওয়াজিয়েন আসেননি তখনও। আসতে পারছিলেন না তিনি, তিনি অন্য  একটা দূরের গ্রামে মাহফিল করতে গিয়ে রাস্তায় আটকা পড়েছিলেন। দ্বিতীয় ওয়াজিয়েনের পেটে সমস্যা হয়েছিল বলে মঞ্চে উঠতে পারছিলেন না।  যা হোক , প্রধান ওয়াজিয়েন একটি  উর্দু শায়ের সুর করে গাচ্ছিলেন।  আল্লামা ইকবালের শায়ের। তিনি গাচ্ছিলেন চোখ বুজে ,একনিষ্ঠভাবে । ভালো লাগছিল শুনতে। ভরাট গলা। ইনি যদি হুজুর না হয়ে ছায়াছবির গানের শিল্পী হতেন, তাহলে এন্ড্রুকেশর নিশ্চিত ফেল মারত। মোহময় তাঁর কণ্ঠস্বর, সুর। আমি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। কিন্তু অন্যান্য দর্শকের মনে বিষ্ময় ও রীতিমত বিরক্তি জাগিয়ে মাহফিল থেকে একে একে  বের হয়ে যাচ্ছিলো মুরিদরা । প্রধান বক্তার ওয়াজ শুনতে ইচ্ছুক নয় তারা । কারণ এই প্রধান বক্তা জামায়াত ইসলামের বড় নেতা, পীরবিরোধী লোক। মুরিদরা জানে  যে,তিনি প্রথমত রাজনৈতিক ওয়াজ করবেন, তারপর পীরবিরোধী ওয়াজ শুরু করবেন। সুতরাং তাঁর ওয়াজ না শোনাই ভাল  তাদের জন্য। প্রধান ওয়াজিয়েন অবশ্য এতগুলো লোকের চলে যাওয়া খেয়াল করছিলেন না। তিনি চোখ বুজে  উর্দু শায়ের তখনও গেয়েই যাচ্ছিলেন ।

পীর সাহেব তাঁর  ওয়াজ রাত সাড়ে দশটায় শেষ করেছিলেন বটে কিন্তু তখনও মঞ্চে বসে ছিলেন।  মুরিদরা তাঁর সামনেই বের হয়ে  যাচ্ছে। যাওয়ার দৃশ্যটা খুবই দৃষ্টিকটু লাগছে। চারপাশে কেমন যেন বিশৃঙ্খলা। জটলা। এরপর পীর সাহেবকে অস্থির দেখা গেল। হঠাৎ তিনি প্রধান বক্তার কাছ থেকে মাইক্রোফোন নিয়ে ঘোষণা দিলেন, “ আমি তোমাদের মাহফিল ছেড়ে যাওয়াটা পছন্দ করছি না,এটা বেয়াদবি। বেয়াদবি করা ইবলিসের কাজ।” পীরের কথা শুনে তখন মুরিদরা দাঁড়িয়ে গেল বটে কিন্তু তারা বসতে তখনও কেমন যেন গড়িমসি করতে থাকল ।  এরপর শমসের খাঁ উপস্থিত সকল মুরিদকে অনুরোধ করে বললেন, তারা যেন সুস্থির হয়ে বসে, এবং ওয়াজ ঠিকমতো  শোনে। সকল মুরিদ বসে পড়ল তারপর ।

 প্রধান বক্তা ওয়াজ আরম্ভ করেছেন আবার । কিন্তু ওয়াজে যেন জুৎ পাচ্ছেন না তিনি। ওয়াজের তাল কেটে গেছে তাঁর। শব্দগুলো কেমন জড়িয়ে যাচ্ছে। তোতলাচ্ছেন । সাধারণ কথায়ও কান্না কান্না ভাব। মনের গভীর দিয়ে কান্নার স্রোত যেন বয়ে যাচ্ছে ধীরে, আর সেই কান্নার স্রোতে হাবুডুবু খাচ্ছে তার শব্দগুলো।  এ ভাবেই চললেন কিছুক্ষণ। তবে কিছুক্ষণ পরই হাল ছেড়ে দিলেন। পারলেন না আর। বললেন যে, পীর সাহেবের আচরণে তিনি খুব সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তিনি পীর সাহেবের  কাছে দোয়া চান। তারপর তিনি একপ্রকার কেঁদে ফেলে বললেন, তিনি তার মাথার পাগড়ি পীর সাহেবকে উপহার দিতে চান এবং তাঁর হাতে বাইয়্যেত হতে চান। মুরিদরা  তখন যারপরনাই খুশি হয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিতে লাগলো। ইমরান হুজুরকে বেশ প্রফুল্ল দেখা গেল। কিন্তু মাদ্রাসার অন্যান্য হুজুরগণের তখন মন-মরা ভাব। অবশ্য  মাদ্রাসাপন্থী হলেও কেরামত শেখকে হাসতে দেখা গেল। তিনি সভাপতির চেয়ারে বসার পর  থেকেই বিমর্ষ মুখে বসে ছিলেন। হয়ত ভাবছিলেন, মুরিদগণ হয়ত তাঁর এই লোককে প্রধান অতিথি করার অপরাধ কখনও ক্ষমা করবে না, এবং তার ছেলেকে বোধ হয় তারা আর  ভোট দেবে না। একজন মুরিদ মানে হলো মুরিদ-পরিবারের স্ত্রীপুত্রসমেত কমপক্ষে তিন-চারটি ভোট। আহা। তিনশত মুরিদ মানে  বউছেলেপুলেসহ ১০০০ থেকে ১২০০ ভোট। এতগুলো ভোট হারানোর আশঙ্কায় বিমর্ষ মুখে বসে ছিলেন তিনি। অবশেষে সবকিছু ভালোয় ভালোয় সমাপ্ত হওয়ায় তিনি বেশ খুশি হয়েছেন।

 প্রধান ওয়াজিয়েন ওয়াজ করে চলছেন। এদিকে,জালছায় সাধারণ জনগন গোপনে দান করে চলছে। বোঝা যাচ্ছে যে, পীর সাহেব গত বছর প্রকাশ্যে দান করতে নিষেধ করেছিলেন বলে জনগন  গোপনে দান করছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ অবশ্য তাদের অভ্যাসমত খোলাখুলি প্রকাশ্যেই দান করছে। ওসব নিষেধ-টিষেধ মানছে না তারা । মানবে কেন?তারা তাদের বিষয়টা ভাল বোঝে।  ভালো বোঝে বলেই তারা পলিটিশিয়ান।পলিটিশিয়ানরা এমনই। জনগনকে দেখাতে না পারলে তাদের চলে না। কিন্তু বিষ্ময়করভাবে দেখা  গেল যে, খোলাখুলিভাবে দান করাতে দর্শক শ্রোতাদের মুখ থেকে তেমন মাত্রার মারহাবা শব্দ শোনা যাচ্ছে না। প্রধান বক্তা তার সাধ্যমত চিৎকার করে মারহাবা মারহাবা বললেও দর্শক-শ্রোতাদের পক্ষ থেকে তেমন একটা সাড়া আসছিল না।

প্রচণ্ড শীত।  প্রধান ওয়াজিয়েনের পুর্বে,রাতের প্রথমভাগে যখন পীরহুজুর ওয়াজ করছিলেন, তখনও অবশ্য শীত কম ছিল না। ৯:৩০ টার দিকে পীরসাহেব যখন ওয়াজ  আরম্ভ করেছিলেন টপ টপ করে আমার গায়ে শিশির ঝরে পড়ছিল ছামিয়ানা চুঁইয়ে । কিন্তু আমি তখন একটু কম শীত অনুভব করছিলাম কারণ আমি ভেতরে ভেতরে দুশ্চিন্তা আর ভয়ে ঘামতে শুরু করেছিলাম। পীরহুজুরের ওয়াজ তখন আমার মনটাকে এতটাই আন্দোলিত ও অস্থির করে তুলেছিল যে, তিনি যদি তখন দানের কথা বলতেন তাহলে আমার পকেটে যা ছিল তা-ই দান করে দিতাম পটাপট। তিনি আমার দূর্বলতার জায়গা ধরে ধরে যেন ওয়াজ করে চলছিলেন। পয়েন্ট টু পয়েন্ট। মূলত রোজার ফজিলত নিয়ে আলোচনা করছিলেন তিনি। ঐ জায়গাটাতেই আমার দূর্বলতা ছিল, কারণ আমি একটা রোজাও করিনি সেবার । মনে মনে ভাবছিলাম, “হায়!আমি তো এবার একটা রোজাও করিনি। দুই দিন পরেই তো ঈদ! এখন কী হবে আমার,আর তো মাত্র একটা রোজা বাকি আছে।” সত্যিই রোজা না থাকার জন্য অসামান্য পাপবোধে আমি তখন আঁতকে আঁতকে উঠছিলাম। আমি খেয়াল করছিলাম যে, কনকনে ঠাণ্ডার ভেতরেও আমি ঘেমে একদম নেয়ে উঠছি।

আগের বছরগুলোতে তাও মাসে দশ-বারোটা করে রোজা রাখতাম,  সেবার একটাও রাখিনি। আমার মনে  হাহাকার চলছিল । পীর সাহেবের ওয়াজ রাতের প্রথমার্ধেই শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে আমি তখনই বাড়ি ফিরে আসতে চাইলাম কিন্তু তিনি যখন মুরিদদেরকে মাহফিল ত্যাগ না করার নির্দেশ দিলেন, আমিও তখন অন্যান্য মুরিদদের মতো প্রধান বক্তার ওয়াজ শুনতে বাধ্য হলাম। তারপর রাত দুইটা পর্যন্ত প্রধান বক্তা ওয়াজ করে চললেন।  বলা হলো যে ,ওয়াজ চলবে সেহরির সময় পর্যন্ত। আরও বলা হলো যে ,জালছার তবারক দিয়ে সবাই মিলে একসাথে সেহরি করা হবে এবং সকল ওয়াজিয়েন সেই সেহরিতে সামিল হবেন। অতঃপর সিদ্ধান্ত নিলাম ,আমি আগামীকালের রোজাটা অবশ্যই রাখব এবং মাহফিলে সেহরি না খেয়ে বরং বাড়ি গিয়ে সেহরি করব। আমি আসলে চাচ্ছিলাম যে, আমার পরিবারের লোকগুলোও দেখুক যে, আমি সেহরি খাচ্ছি এবং রোজা রাখছি, বিশেষ করে বাবা এটুকু জানুক যে, আমি নিদেনপক্ষে ড. সাহেবের মতো নাস্তিক টাইপের নই।

বাড়ি যখন ফিরলাম তখন রাতের বেশি বাকি ছিল না। শরীরটা কাহিল লাগছিল। আমি দ্রæত ঘুমিয়ে গেলাম। কিন্তু সেহরির সময় থালাবাসনের শব্দে আমার ঘুম  ভেঙে  গেল। জেগে দেখি, মা বাড়ির সবাইকে সেহরির খাবার  বেড়ে দিচ্ছে। মা  আমাকে জেগে থাকতে দেখে বলল, “শ্যাষ রোজাডা আপাতত রাহেক। এবারেতো একটা রোজাও করলি না!”  মা টানা সুরে করুণভঙ্গিতে  আফসোস সহকারে কথাগুলো বলে  গেল কিন্তু আমি  চুপচাপ শুনেই  গেলাম শুধু ।  গা করলাম না।  আসলে আলসেমি লাগছিল খুব। আগের প্রতিটি সেহরির রাতে মা আমাকে একইভাবে ডেকেছে। কর্ণপাত করিনি। এবারও তা-ই করলাম। পীরসাহেবের ওয়াজ শুনে নিদারুণ পাপবোধে মাহফিলে বসে কাঁদলেও সে পাপবোধের ক্রিয়া আমার মধ্যে আর কাজ করছিল না। প্রকৃতপক্ষে ওয়াজের সময় আমার মনের যে কী অবস্থা হয়েছিল, আমি তখন তা ভুলে  গিয়েছিলাম।

বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারিনি । এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সারা শরীর ঘামে জবজব করছিল। ঘর থেকে বাইরে বের হলাম। বাইরে তখন খুব শীত। তবু একটু ধাতস্ত হওয়ার জন্য কুয়াশাময় অন্ধকারের মধ্যে পায়চারি করতে থাকলাম । দুঃস্বপ্নের রেশ কাটল না তবুও ।  একবার ভাবলাম,মাকে ডাক দিই। পরক্ষণে ভাবলাম, থাক ,এমনিতেই তো তাকে কত কষ্ট দিই, এখন বরং তাকে আর না জাগাই। বেচারা সারাটা রমজান মাস মাঝরাত্রিতে উঠে কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে রান্নাবান্না করেছে, এখন যদি ডাকি, ঘুম থেকে জাগবে, সন্দেহ নেই। জেগে উঠে আমার ভয়ার্ত মুখ দেখে উৎকন্ঠিত হবে, মুখে পানির ছিটা দিবে।তারপর আব্বাকে ডাকবে, তুলকালাম সব কাণ্ড করবে। দরকার নেই এসবের।

আবার উঠানে ফিরে গেলাম। আমাদের কুকুরটা আমাকে দেখে একবার ঘেউ করেই থেমে গেল। আমি তখন মায়ের ঘরের দিকে তাকিয়ে আছি আর দুঃস্বপ্নটির কথা ভাবছি। ওদিকে মা ঘুমাচ্ছে, কোনো সাড়া-শব্দ নেই। সেহরির পরের নিশ্চিন্ত ভাতঘুম দিচ্ছে সে। গোরস্তানের দিকে তাকালাম। গোরস্তানের ভেতরে অসংখ্য জোনাকি মন্থর গতিতে উড়ে বেড়াচ্ছে । কুয়াশায় তাদের পাখা ভিজে গিয়েছে নিশ্চয়ই।  এটা ভাবতেই হঠাৎ আমার মা একটা শব্দ করে উঠল । কী যেন বলে উঠল সে। ভাবলাম, হয়ত আমার মতোই দুঃস্বপ্ন দেখেছে।

শুধু আমার মা নয়,আমার গ্রামের প্রতিটি  গৃহিণীর জন্য রমজান মাসের রাতগুলো ছিল বেশ কষ্টের। শিশুসন্তানবিশিষ্ট একজন মায়ের জন্য এটা আরো বেশি কষ্টের ছিল। রমজান মাসের প্রায় প্রতিটি সকালে আবার তাদেরকে ঘুম থেকে উঠতে হতো,ঘরকন্নার কাজ সারতে হতো। একইভাবে আমার মাকেও রমজান মাসের প্রতিটি ভোরে উঠতে দেখতাম। দেখতাম,  সকালবেলা আমার ছোট বোনকে কোলে নিয়ে বারান্দায় ঝিমুচ্ছে মা । মা তখন আমাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতো, “ ঈদ আসতে আর কয়দিন আছে রে?”  মা  প্রকৃতপক্ষে এটা জিজ্ঞাসা করার ভেতর দিয়ে রোজা কয়টা পার হয়েছে সেটাই জানতে চাইতো। আমি  রোজা থাকতাম না বলে রোজার হিসাবও জানতাম না। আমি মাকে আন্দাজে কিছু একটা বলে দিতাম। মা শুনে সরল বিশ্বাসে মাথা নাড়াত।

 এভাবে কিছুক্ষণ পার হওয়াতে আমার স্বপ্নের ঘোর অনেকটা কেটে গিয়েছিল ততক্ষণে । তবু আমি উদভ্রান্তের মত উঠানে ঘুরছিলাম। কারণ আমার বুকের ভেতর দম বন্ধ হওয়া অনুভুতি তখনও ক্রিয়া করছিল।  এদিকে আস্তে আস্তে চারদিক ফর্সা হয়ে আসছিল আর আমাদের বাড়ির রাখাল ছলিম গোয়াল থেকে হালের গরু বের করতে শুরু করেছিল। ছলিম চেঁচাচ্ছিল খুব।

 আমাদের একটা লাঙ্গল টানা বলদের পেছনের পায়ে ‘টাঁস-লাগা’ রোগ ছিল। শীতকালে এ রোগটা বেশি হতো আর গরুটা ঠিকমতো হাঁটতে পারত না। ছলিম এটা নিয়ে বেশ প্যাঁচাল পারছিল। প্রতি বছরেই শীতের সকালে তার এ প্যাঁচাল শুনতাম। সে কী বলত তা কোনোদিনই মনোযোগ দিয়ে শুনিনি। তবে তখন শুনলাম। কারণ দুঃস্বপ্নের রেশ কাটানোর জন্য আমার তখন একটা-কিছুতে মনোনিবেশ করা জরুরী ছিল । কিন্তু ছলিমের হাঁক-ডাক গালিগালাজে পরিপূর্ণ বলে ঘৃণায় মনোযোগ সরিয়ে নিলাম অন্যদিকে । সে রাখাল, মূর্খ সে, তার কথা শোনার কী দরকার।  আমি বাড়ির বাইরে এসে কাজেম উদ্দীনের ছাপরা ঘরের পাশে মজা ডোবার ধারে দাঁড়ালাম।

 কাজেম উদ্দীনের ক্ষীণ কণ্ঠের কাশির আওয়াজ শুনতে পেলাম । কাজেম উদ্দীন বেশ আগে থেকে অসুস্থ ছিল । তার কাশির শব্দ মুমূর্ষু মানুষের শেষ ঢোক পানি গেলার মত লাগত। কেমন যেন ভীতি জাগানিয়া। মনে হতো এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে। এদিকে আমার দমবন্ধ অনুভুতি তখন বেড়েই যাচ্ছিল। ভাবছিলাম, খোলা বাতাসে গেলেই বুঝি ভালো লাগবে। চারদিকে অবশ্য আরেকটু ফর্সা হয়ে এসেছিল তখন।আমি কুয়াশার ভেতর দিয়ে বাঁশবাগানে গিয়ে দাঁড়ালাম।

বাঁশবাগানে গিয়ে ভাল বোধ করলাম কিছুটা । অদূরে গোরস্তানের ভেতরকার ঈদগাহর মাঠ থেকে শমসের খাঁর জিকিরের আওয়াজ  শোনা যাচ্ছিল। তার জিকিরের শব্দ আমার কানকে বেশ আরাম দিচ্ছিল বটে কিন্তু গোরস্তানের দিকে তাকাতে  আমার অস্বস্তি ও ভয় দুটোই হচ্ছিল।  কারণ কিছুক্ষণ আগেই আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, বটগাছের ডালের নিচের ফাঁকা জায়গায় আমাকে কবর দেয়া হয়েছে এবং কবরটিতে  আমি রীতিমতভাবে আজাব ভোগ করছি। এ রকম কষ্টকর স্বপ্ন জীবনে কেউ দেখেছে কিনা আমি জানি না। ভাবছিলাম ,আগে তো আমি অনেক দুঃস্বপ্ন দেখেছি, আমাকে কত বোবায় ধরেছে, বোবা আমার বুকের উপর চড়ে বসেছে, গলা টিপে ধরেছে কিন্তু এতটা ভয় ও কষ্ট তো আমি কখনও পাইনি।  হায় হায় নিজের মরে যাওয়ার স্বপ্ন কেউ কি কখনও দেখে?  কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার।

 স্বপ্নের শুরুটা ছিল আকষ্মিক। অনেকটা সাসপেন্সধর্মী সিনেমার প্রলগের মতো। কিন্তু এই স্বপ্নের বর্ণনা লিখতে আমার এখন অস্বস্তি লাগছে। কারণ আমার মনে হচ্ছে যে, সাদিয়া যদি এই বর্ণনাটা পড়ে তাহলে মানসিকভাবে আরও দূর্বল হয়ে পড়বে । সে স্বপ্নের মধ্যে প্রতিদিন অসংখ্য ভীতিকর অভিজ্ঞতা নিচ্ছে। স্বপ্নকে সে বাস্তব মনে করে। ভীতিকর কোনো কিছু তাকে দেখাতে চাই না আমি। তাই আমি চাইলাম এ অংশের লেখাটা সে না দেখুক বা পড়ুক। আমি এ লেখাটাকে পাসওয়ার্ড দিয়ে  হাইড করে রাখলাম।

………  একটা লাশ। অন্য কারও লাশ নয়। আমার লাশ। উঠানের এক কোণায় পড়ে আছে । আব্বা-মা আত্মীয়স্বজন সবাই কাঁদছে। পাড়ার লোকজন দেখতে এসেছে।  আমি সবার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না । ইশারাও করতে পারছি না। তারপর আমার লাশ খাটে তোলা । আমার শীর্ণকায় বাবা খাটের পেছন পেছন যাচ্ছে,তিনি ঠিকমত হাঁটতে পারছেন না। বারবার অবশ হয়ে বসে পড়ছেন। মা একবার কাঁদছে, আরেকবার চোখ বুঁজে নিঝুম হয়ে যাচ্ছে । আমি আমার লাশের কাছ থেকে উঠে মায়ের সামনে বসছি। মায়ের হাত ধরে ডাকছি, মা কিছুই শুনতে পাচ্ছে না,শুধু কাঁদছে…

কাঁধে করে আমার লাশ কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। লাশ কাঁধে নিতে কারা কারা বিরক্ত, তা আমি দেখতে পাচ্ছি । আমি আশ্চর্য হচ্ছি এটা ভেবে যে আমার খুব আপন কয়েকজন ব্যক্তি, যারা আমার রক্ত-সম্পর্কীত, তারা আমার মৃত্যুতে খুশি হয়েছে । এদিকে তারা আবার আমার  বাবা-মাকে স্বান্তনা দিচ্ছে। কী ভণ্ড তারা! এদিকে মনে মনে আমার দূর্ণাম করছে কিছু লোক । আশরাফ হুজুর যিনি আমার জানাজা নামাজ পড়াবেন, তিনি মনের ভেতর চরম বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার পাগলি চাচাতো বোন নাছিমা আমার মৃত্যুতে অনেক কষ্ট  পেয়ে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে। কেরামত শেখের দুই ছেলে আনোয়ার ও মনোয়ার আপার শরীরের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। তারা আমার লাশ দেখে বিন্দুমাত্র দুঃখিত হয়নি। আমার লাশকে সামনে রেখে বিভিন্ন লোক বিভিন্ন কথা ভাবছে। আমি তাদের মনের কথা বুঝতে পারছি । তাদের হৃদয় থেকে তাদের মনের কথা বাইরে বেরিয়ে আসছে, কিন্তু তারা তাদের ঠোঁট নাড়াচ্ছে না । আমি দেখছি কিছু লোক তাদের চোখে-মুখে শোকের চিহ্ন ধরে রেখেছে শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য। 

আমার লাশ কবরের কাছে পৌঁছে গেছে, ছোটবেলায় গোরস্তানের বটগাছের ঝুলে পড়া ডালের নিচে যেখানে আমি বৃষ্টিতে দেবে যাওয়া ভাঙা কবরটি দেখেছিলাম,তারপাশেই আমার কবর কাটা হয়েছে। কবরের অর্ধেকের বেশি অংশ পানিতে ভর্তি । রফিক আমার লাশের জন্য কলাগাছের ভেলা তৈরি করে রেখেছে আগেই । আমার পড়ার ঘরের পাশ থেকে বুনো কলাগাছ কেটে সে ভেলা বানিয়েছে।

( ছোটবেলায় আমিও এখান থেকে কলাগাছ কেটে ভেলা বানাতাম। আমার দাদি নিষেধ করত।  বলত, “কলাগাছ কাটিস না, কলাগাছ গোরস্তানের হাঁফ শুষে নেয়।”  গোরস্তানের হাঁফ কী জিনিস তা আমি তখন জানতাম না।)

আমাকে  ভেলার উপরে শোয়ানো  হলো। আমি অনেক প্রতিবাদ করলাম, কাঁদলাম, কিন্তু কেউ আমার কথা  শুনল না । আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম, তারপর আমি শুনতে  পেলাম লোকজন বলছে….মিনহা খালাকনাকুম,ওয়া মিনহা ………..। কাদা মাটির দলা গোম গোম শব্দ করে আমার উপরের বাঁশের পাটাতনে পড়ছে। মাটি পড়ার শব্দ স্তিমিত হচ্ছে,  সব শব্দই কমে যাচ্ছে ,একে একে সবাই চলে যাচ্ছে । এবার আমি বাবার শরীরের গন্ধ পাচ্ছি, তার ব্যবহৃত পাঞ্জাবির গন্ধ, টুপির গন্ধ । বাবা আমার কবরের পাশ থেকে যেতে চাচ্ছে না। মামা তাঁকে টানছে কবরের পাশ থেকে। আমি বাবাকে ভেতর থেকে বলছি “বাবা তুমি যেও না,আমার ভয় করে।” বাবা চলে যাচ্ছে। বাবার পদশব্দ নিথর। আমি বাবার পদশব্দ গুণছি——-এক,দুই,তিন,চার…বাবার শরীরের গন্ধ মিলিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। আমি ডাকছি ,আব্বা! আব্বা!

(আমি বেশ বড় হওয়ার পরও বিছানায় বাবার পাশে মাঝে মাঝে শুয়ে পড়তাম। যখন আমার বয়স পাঁচ বা ছয় ছিল, তখন বাবা আমাকে কাঁধে করে নদীতে নিয়ে যেত। গোসল করিয়ে দিত,মাথা মুছে দিত। বাবার গামছা থেকে একটা দারুণ সোঁদা গন্ধ  বের হতো। মাথা মুছে দেবার সময় আমি চোখ বুজে বুক ভরে সে গন্ধ নিতাম।)

বাবার শরীরের গন্ধ আর পাচ্ছি না। দূর থেকে  শুধু তার স্থবির পায়ের অস্ফুট আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি । আমি ভাবছি, চল্লিশ কদম পার হলেই  আমার কবরে ফেরেশতা আসবে—  হায়,আমার কী হবে তখন।  আমি কদম গুণছি আব্বার। এক দুই তিন…… হায় হায় চল্লিশ কদম তো এসে যাচ্ছে। আটত্রিশ, ঊনচল্লিশ, চল্লিশ। কিছুক্ষণ নীরবতা…… ।  তারপর তারা দুইজন আসে।  সত্যি সত্যি আসে। কিন্তু আমি তাদের দেখতে পাচ্ছি না, শুধু কথা শুনছি তাদের।  তারা আমাকে কোনো প্রশ্ন করছে না। আমি অপেক্ষা করছি। আরও অপেক্ষা। কেন প্রশ্ন করছে না তারা? আমার মনে অস্থিরতা। তাহলে কি আমি বিনা হিসাবে জান্নাতে যাচ্ছি? কিন্তু কোন্ নেক কাজ করেছি আমি পৃথিবীতে? কোনো নেক্ কাজই তো করিনি আমি। রোজা করিনি, নামাজ পড়িনি,  শাহনাজকে নিয়ে কত আবোল তাবোল ভেবেছি।

 অপেক্ষা চলছে আমার। আমার মনে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে—  যা শুনে এসেছি পৃথিবী থেকে তার সবই কি তাহলে ভুয়া? ভুয়া হলে তো ভালোই হয়। বেহেশত দোযখ কোনোটাতেই যেতে হবে না।—-ভাবছি আমি। আবার ভাবছি, না না ভুয়া হতে পারে না…আমাকে তিনটি প্রশ্ন করার কথা তাদের, এটাই তো শুনে এসেছি আমি সব হুজুরের মুখে। এরকম আরও প্রশ্ন জাগছে মনে,তবে  মনের কোনো এক অংশ দিয়ে বিনা হিসেবে, বিনা বিচারে আমার মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনায় আমি আশাবাদী হচ্ছি। নীরবতা, পিনপতন নীরবতা চলছে। একসময় মনে হয়, তারা চলে গেছে। আমি উপরের দিকে তাকাই । দৃশ্যমান কিছু নেই, সব অন্ধকার।  তারপর হঠাৎ কবরের দুপাশ আমাকে চেপে ধরে । আমি প্রাণপণে এপাশ-ওপাশ করতে চাই। পারি না । আমার কাঁধের হাড় মাঝখান থেকে ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। হাড় ভাঙার শব্দ আমি শুনতে পাই। আমি কঠিন  একটা চিৎকার দিই। মাকে ডাকি, বাবাকে ডাকি।

কবরের ভেতরে একেবারে থেৎলে যাচ্ছি আমি ।  একসময় আমি আমার শরীরকে কবরে ফেলে  রেখে বাতাসে উঠে পড়ি।  উপরের দিকে উঠতে থাকি । উঠি, উঠি, উঠতেই থাকি।  এক আসমান, দুই আসমান। আমার পাশে গ্রহ তারা। দেখি,আরো অনেকে আমার সাথে উপরের দিকে উঠছে। কোথায় যাচ্ছে জানি না। সাথে শরীর নিয়েই উঠছে তারা। তবে তারা হাসছে। তারা অনেক খুশি। তবে কারো কারো শরীর থেকে রক্ত ঝরছে । সেই রক্ত বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে  সহসা । আমার সাথে আমার শরীর নেই। আমি  শুধু উপরের দিকে উঠে যাচ্ছি। এরপর দেখি  ফেরেশতা দুজন আমার পেছনে ধাওয়া করছে । আঘাত করতে চাচ্ছে পেছন  থেকে । আমার শরীর  নেই, তবুও তারা আমাকে আঘাত করতে চাচ্ছে। আঘাত লাগছে বারংবার।

 আঘাতে আমি পড়ে পড়ে যাচ্ছি। আমি তাদের বারে বারে বলছি- আমাকে পৃথিবীতে ফেরত দাও। আমি নামাজ পড়ব, রোজা রাখবো, শাহনাজকে নিয়ে আর ওসব ভাবব না। তারা আমার কথা শুনছে না।  অবশেষে তারা আমাকে পিটিয়ে পৃথিবীর দিকে নামিয়ে নিয়ে আসে। আমি দেখি আমি আবার  আমাদের গোরস্তানের কাছাকাছি চলে এসেছি। সেই বটগাছ, সেই শ্মশান, সেই নদী। আমি সারাটা গোরস্তানের এ ঝোপে ও  ঝোপে পালানোর  চেষ্টা করি। গোরস্তানের একটি  ঝোপ আমার অতি পরিচিত ছিল, সেখানে আমি লুকানোর চেষ্টা করি।

 (ছোটবেলা তখন। পড়াতে গিয়ে বাবা যখন পেটাতে উদ্যত হতেন,তখন আমি পড়া  ফেলে দৌড়ে এ  গোরস্তানে ঢুকে পড়তাম। তারপর একটা ঝোপে চুপচাপ বসে থাকতাম। বাবা  গোরস্তানের ঘন ঝোপের মধ্যে ঢুকতে সাহস পেতেন না। জঙ্গলের বাইরে দাঁড়িয়ে  তখন শুধু হাহাকারসুলভ চেঁচামিচি আর চিৎকার করতেন, “এ শোন্, ভেতরে যাস না,সাপ-বিচ্ছু থাকপের পারেরে, চলে আয় , তোক্ আর মারব ননে”। আমি তবুও বের হতাম না। কারণ গোরস্তানের লাশ অথবা সাপ-বিচ্ছুর চাইতেও আমি বাবাকে  বেশি ভয় পেতাম।

  একদিনের কথা বলি। বাবা  সেদিন আমাকে অংক করাচ্ছেন। গুণ অংক। আমি ‘০’ এর সাথে ‘৭’ গুণ করে ৭ বসিয়েছি। বাবা খাতা দেখেই তো আগুন। বাবার ভাবসাব বুঝতে  পেরে দৌড় দিলাম ঝোপের দিকে।  ঝোপে ঢুকেই দেখি একটি বাগডাশ তার দুটি বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে। বাগডাশটি আমাকে  দেখে গর্জন করে তখন  তেড়ে আসলো। বাচ্চা দুটিও গর্জন করে উঠল। আমি ভয়ে চিৎকার দিলাম। আমার চিৎকার শুনে বাবাও চিৎকার দিলেন। বাবার সে চিৎকারে আকাশ-সমান ভালবাসা।)

 দুটি অদৃশ্য সত্ত্বা তখনও আমাকে ধাওয়া করছে। আমি  গোরস্তানের  ভেতরে এখানে-ওখানে উড়ছি। উড়ছি আর আমি ঝোপের মধ্যে ঢুকতে চেষ্টা করছি । এদিকে আমাকে বার বার আঘাত করা হচ্ছে।  এরপর আমি  একসময় শ্মশান ঘাটের কাছে চলে যাই।  দেখি, আমার মতো আরো অনেকে  সেখানে আছে । কিন্তু ওদের সবারই শরীর আছে আমার শুধু নেই। একজনের শরীরের উপরের দিকে মানুষ আর নিচের দিকে গুইসাপের  লেজ ।  লেজটায় নোংরা থকথকে ঘা। তার পাশে একটা সুন্দর মুখশ্রীর নারী, কিন্তু তার মুখমণ্ডল বাদে বাকি অংশ কুকুরের শরীর।

আমার স্বপ্ন ছিল এটুকুই ।

 এ স্বপ্ন দেখার পর আমি মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছিলাম যে, সেদিনের রোজাটি আমি অবশ্যই করব, এবং যদিও আমি সেহরি করিনি তবুও রোজা করব। সকাল পেরিয়ে দুপুর হলো, আমি যোহরের নামাজ পড়লাম ( যা আমি সেদিনের পূর্বে খুব একটা পড়িনি) এবং আমার ভেতর এ বিশ্বাস জন্ম নিল যে,সৃষ্টিকর্তা আমাকে সংশোধিত হওয়ার জন্য এমন স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এছাড়া আমার মনে হলো যে,আমার এ স্বপ্ন দেখার পেছনে কয়েকবছর আগে পাওয়া পীরসাহেবের  দোয়া বা ফুঁ এর বিশেষ কোনো ক্রিয়া আছে।

   হুজুরের ওয়াজ শুনে এবং স্বপ্নের প্রতিক্রিয়ায় আমি মাসের শেষ রোজাটা করছিলাম। দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার এবং এর পরদিনই ছিল ঈদ। কিন্তু  আমার খারাপ লাগছিল এজন্য যে আগামীকাল শুক্রবারের দিনটাতেই ঈদের দিন কেন হলো। গোরস্তানের কাছে বাড়ি হওয়াতে আমি তখন মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে, শুক্রবারে অর্থাৎ ঈদের দিনেও গোরস্তানে লাশ আসবে। পীরসাহেব এদেশে আসার পর থেকেই শুক্রবারে মৃত্যু বেশি হচ্ছিল। তাই ভাবছিলাম  শুক্রবারেই ঈদ না হলে ভালো হতো।  কারণ কেউ না কেউ তো মারা যাবেই। ঈদের দিনে মানুষের মৃত্যু হওয়াটা খুবই বেদনাদায়ক ছিল। জানাজাও পড়তে ইচ্ছা করত না এদিনে । আনন্দের পাশে দুঃখকে দেখলে বেশি কনট্রাস্ট লাগে, দুঃখটাকে বেশি করে দুঃখময় মনে হয়।

ভাবছিলাম, শেষ রোজার দিনে হলকায়ে জিকিরে  শরীক হবো। তবে, একটা বিষয় বিরক্তির হয়ে পড়েছিল;কেরামত শেখের ছেলে মনোয়ার শেখ এই শেষ রোজার দিনেই ইফতার পার্টির আয়োজন করত। প্রতিবছরই করতো এমন। এসব লোকের ইফতার নিতে ভালো লাগত না আমার।  কারণ এগুলো ছিল নিতান্ত লোক দেখানো । ঈদের আগের দিন ইফতার পার্টি করার উদ্দেশ্য হলো বেশি করে প্রচার পাওয়া ,কারণ ঐদিনই ,গ্রামের সব ছাত্র, চাকরিজীবি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা শহর থেকে গ্রামে আসতো।

   যা হোক, তবুও আমি বিকেলে পীর সাহেবের দরবারে গিয়ে হলকায়ে জিকির মাহফিলে শরীক হলাম। সারা মাস রোজা করিনি, তাই আমি ভয়ে ভয়ে সবার পেছনে বসলাম। কিন্তু পীরহুজুর আমাকে দেখামাত্র কাছে ডাক দিলেন। গেলাম তাঁর কাছে। এরপর তিনি  সবার উদ্দেশ্যে বললেন, যেহেতু আমি গত এক বছরের অধিককাল ধরে নিয়মিত দরবারে আসছি ,তাই আমাকে বাইয়্যেত করা যেতে পারে। আমি তো তখন ভয়ে কম্পমান । গতরাতেই তো আমি তাঁর ওয়াজ শুনে কেঁদেছি, তারপর একটি ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখেছি, তারপর  আজ সারাদিন রোজা থেকে দরবারে এসেছি। তাহলে কি পীর সাহেব তাঁর রুহানী তাকতের মাধ্যমে আমার মনের পরিবর্তন ধরে ফেলেছেন? ঐ দুঃস্বপ্নটা কি তাহলে উনিই দেখিয়েছেন? এমনকি আমি যে রোজা করিনি, সেটাও কি তিনি আগেই জানতে পেরেছিলেন? এসব ভেবে আমি তখন ভয়ে অস্থির ।

 যা হোক,পীরহুজুর আমাকে বাইয়্যেত করতে শুরু করলেন:

 শুরুতেই তিনি চোখ বুজে দোয়া-খায়ের পড়ে গেলেন বেশ কিছুক্ষণ। এরপর কোরান থেকে তেলাওয়াত করলেন।  অবশ্য তেলাওয়াত করছিলেন অনেকক্ষণ ধরে, আগে থেকেই। দরবারে পিনপতন নিরবতা। আমার পেছনে শত শত মুরিদের উৎসুক চোখ, আর আমার সামনে শুধু উজ্জ্বল কান্তিময় নূরানী চেহারার পীরসাহেব। তেলাওয়াত করার মাঝে পীরসাহেব হঠাৎ থামলেন। আমার ডান হাতটি নিজের ডান হাতে নিলেন। তারপর বাম হাত দিয়ে আমার মাথাটা কাছে টেনে নিয়ে ফুঁ দিলেন মাথার মধ্যিখানে,একদম চাঁদিতে। আমি ততক্ষণে চোখ বুঁজে ফেলেছি। তিনি আমার মাথায়, যেখানটাতে শিশু বয়সে নরম অংশ থাকে, সেখানে ঠোঁট ছোঁয়ালেন । ঠাণ্ডা একটা প্রশান্তি বয়ে গেল আমার মস্তিষ্কের মধ্যে। এরপর তিনি আবার পড়া শুরু করলেন।  আমি মাথা নিচু করেই রয়েছি। কিন্তু কেন যেন আমার মনে হচ্ছে যে,আমার মাথার বামপাশে যেখানটাতে বৃহৎ একটা ক্ষতচিহ্ন রয়েছে, সেখানটা  বেশ গরম হয়ে উঠছে। খুব গরম।  দূরবর্তী সেই হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। শব্দটা আস্তে আস্তে স্পষ্ট হচ্ছে যেন। যেন সহস্র মাইল দূর থেকে শব্দটা অতি দ্রুত এগিয়ে আসছে। কানাকুয়া পাখির ডাকের মতো স্বর সেই শব্দের। বয়স্ক মহিলার কণ্ঠ। অসহ্যরকমের হাসিটা একবার স্পষ্ট হয় আবার মিলিয়ে যায়।  পাড়ার দূরন্ত মহিলা সালেকার কণ্ঠস্বর কি এটা? সে কি এই দরবারের আশেপাশে এসেছে? সে তো জ্বালানী কাঠ ইত্যাদি কুড়াতে বিভিন্ন জায়গায় যায়, এদিকেও সে এসেছে কি? আমি ভাবছি এটা। এদিকে পীরসাহেব অনরবরত আয়াত পড়ে যাচ্ছেন। সুরা জ্বীন থেকে পড়ছেন। সুরা জ্বীন থেকে পড়ছেন কেন? প্রশ্ন জাগছে মনে। সুরা জ্বীন পড়া শেষ করে শুরু করলেন সুরা আস-সাবা। তিনি পড়ে চলেছেন সুরা আস-সাবা। বারো নম্বর আয়াত পড়ার পর থামলেন। বারো নম্বর আয়াতে নবী সোলাইমান (আঃ) এর জ্বিন জাতির উপর কর্তৃত্বের কথা বলা হয়েছে। আমি  ভাবছি হুজুর বেছে বেছে এ  জ্বিন বিষয়ক সুরাগুলিই কেন তেলাওয়াত করছেন? এটা যখন ভাবছি, ঠিক  তখনই তিনি আমার গলার পাশে ডানহাত দিয়ে চেপে ধরলেন। ব্যথা  পাচ্ছিলাম একটু। তবে কিছু বললাম না। আমার মনে হলো তিনি আমার গলার পাশের যে মোটা রগটি আছে , সে রগটি চেপে ধরে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে ফেলেছেন। ছেড়ে দিলেন কিছুক্ষণ পর।  এরপর আমার মাথার বামপাশের ক্ষতচিহ্নিত স্থানে গরম অনুভুতি কমে গেল।  খেয়াল করলাম, সেই দূরবর্তী হাসির শব্দও আর নেই।

অতঃপর মোনাজাত করার মধ্য দিয়ে আমার বাইয়্যেত শেষ হলো।  সেদিন তারাবীহ্র নামাজ ছিল না, কারণ পরদিনই ছিল ঈদ। আমি বাড়ি ফিরলাম। সাথে করে নিয়ে ফিরলাম বাইয়্যেত হওয়ার ঐন্দ্রজালিক অনুভুতি।

ঈদের দিন। সকালে মসজিদের মাইকে তিনটা  ঘোষণা এক যোগে হলো। প্রথমটা, কয়টায় ঈদের জামাত হবে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয়টা দুইজন মুরিদের মৃত্যুর খবর এবং কয়টায় জানাজা হবে তার ঘোষণা।  অনুমান ঠিক। শুধু একজন নয়, দুজন মানুষ মারা গেছে। যথারীতি জানাজা নামাজে শরীক হলাম।

এরপর থেকে আমি নিয়মিত খানকা শরীফে যাওয়া শুরু করলাম। আমার চাল-চলনে অনেক পরিবর্তন এলো। শাহনাজকে নিয়ে তখন আর অসভ্য কিছু ভাবতাম না। শাহনাজ তখন কেন যেন পরীক্ষায় খুব খারাপ করছিল। মাঝে মাঝে শাড়ি পরে স্কুলে আসছিল সে। তবে তার কী হয়েছিল তা আমি  ঠিক জানতে পারছিলাম না। তবে  দেখছিলাম যে,আগের চেয়ে সে আরো বেশি করে সুন্দরী হচ্ছে।  শরীরটা, শরীরের আনাচ-কানাচ, সামনে-পিছনে, দ্রুত ভরে যাচ্ছে তার। নিতম্ব ভারি হচ্ছে। দুটো হাত যেন ইচ্ছামতো পেলব আর মোলায়েম হয়ে গেছে। গলার ত্বক এবং কপালের ত্বকে চকমকি আভা। এদিকে নিয়মিত পাঁচবার অযু করার কারণে আমার মুখের জেল্লা বেড়ে গিয়েছে তখন । মুখের ব্রন-ট্রন, কালো দাগ নেই। আমার মনে ভাবনা আসতো,শাহনাজ হয়তো আমার পরিবর্তিত চেহারার দিকে তাকায় । তবে আমি আবার তার দিকে তাকানো ততদিনে বাদ দিয়েছিলাম। বাইয়্যেত হওয়ার কারণে তাকাতাম না তার দিকে। এভাবে দিন চলে যেতে থাকল এবং একদিন হঠাৎ আমি জানতে পারলাম যে, পারিবারিকভাবে তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বিয়ে হয়েছে আগেই। মাস তিনেক হয়ে গেছে। শুনে কষ্ট  পেলাম খুব।

 পীরের হাতে বাইয়্যেত হওয়াতে আমার সিনেমা দেখা, যাত্রাপালা দেখা বন্ধ হয়ে গেল। তবে কেন যেন আমি ড. সাহেবের বাড়িতে বাউল গান শুনতে যাওয়া বন্ধ করতে পারলাম না। সবাই তাঁকে পীরবিরোধী বলত, কেউ আবার সরাসরি ইসলাম বিরোধী নাস্তিক বলত । তবুও যেতাম আমি। লোকটার কথাবার্তা, কার্যকলাপ  অদ্ভুত টাইপের হলেও সেটাতে একটা সৌন্দর্য  ছিল, একটা ঘোর লাগা অনুভুতি ছিল। এগুলো টানতো আমাকে । তবে তাঁর সাথে মেশাতে মুরিদরা আমাকে সন্দেহ করত না। বরং তারা উল্টো মনে করতো যে, নাস্তিক টাইপের ড. ইমতিয়াজকে আমি বোঝানোর জন্য  বা হেদায়েত করানোর জন্য যাই।

 আমি এরপর ইবাদত-বন্দেগী জিকির-আজগার আরও বাড়িয়ে দিলাম। আমাকে তখন খুব একটা বোবায় ধরত না। পাড়ার সমবয়সীরা  আমার সাথে মিশুক বা না মিশুক এতে আমি তেমন মন খারাপ করতাম না।  গ্রাহ্যই করতাম না বিষয়টা। আমি মাথায় বড় একটা টুপি পরতাম। ফলে টুপির অন্তরালে আমার মাথার চুলবিহীন ক্ষতচিহ্নটা ঢাকা পড়ে যেত। পারতপক্ষে এই টুপি খুলতাম না আমি; বাইরে বের হলে তো একদমই না খুলতাম না। বাইরে বের হওয়া বলতে  স্কুলে যাওয়া, খানকায় যাওয়া আর জানাজা পড়তে গোরস্তানে যাওয়া- এগুলোই ছিল ।

 তখন গোরস্তানে লাশ আসা বেড়ে গিয়েছিল।  কারণ স্বাভাবিক মৃত্যুর পাশাপাশি এলাকায় গুম খুনও বেড়ে গিয়েছিল। বেড়ে গিয়েছিল ক্রসফায়ারও। আমাদের বাড়ির রাখাল ছলিম ক্রসফায়ারের কথা শুনলেই মন খারাপ করে থাকত সারাদিন। সে চরমপন্থী পার্টিতে যোগ  দিয়েছিল তার কিছুদিন আগে থেকে । আমি ছাড়া গ্রামের আর কেউ ব্যাপারটা জানত না । এ কারণে মানসিকভাবে আমি বেশ চাপে ছিলাম । কারণ সে আমাকে সন্দেহ করছিল লাগাতার। সে মনে করছিল যে, আমি তার বিষয়টা মানুষকে বলে দেবো।  মানুষকে বলে দেওয়া আর পুলিশকে বলে দেওয়া ছিল একই কথা । পুলিশ ক্যাম্পে খবর চলে যেত সাথে সাথেই।  তাই সবদিক থেকে আমার মনে শান্তি থাকলেও  একমাত্র তার কারণে আমি ভয়ে থাকতাম সবসময়। আমাকে যাতে সে সন্দেহ না করে এ জন্য আমি তার সামনে খুব ধার্মিক ভাব দেখাতাম, ঘন ঘন তসবি টিপতাম, এবং প্রত্যেকটি জানাজা নামাজে শরীক হওয়ার চেষ্টা করতাম,সেটা ক্রসফায়ারে চরমপন্থী সন্ত্রাসীর মৃত্যু হলেও। অথচ আগে গোরস্তানে লাশ এলে জানাজায় না গিয়ে আমি ঘরের মধ্যে পালিয়ে থাকার চেষ্টা করতাম। অবশ্য এমন করতাম তখন, যখন আমি বাইয়্যেত হইনি।

 আগে গোরস্তানে লাশ আসলে আমি পালিয়ে থাকতাম এ কারণে যে, জানাজাগামী  কিংবা জানাজা-ফেরত  লোকজন যাতে আমাকে  দেখতে না পারে। আমার ভয় ছিল, তারা আমাকে দেখতে পেলে জানাজায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে পারে অথবা অনুরোধ না করলেও আমি যে বাড়িতে উপস্থিত থাকা সত্তে¡ও জানাজায় অংশ নিইনি এটা মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনের কাছে বলে দিতে পারে । মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনের কাছে বলে দেওয়াটা সবচেয়ে লজ্জার ছিল । তবে ক্রসফায়ারে মৃত চরমপন্থীর লাশের জানাজায় না যাওয়াটা শুধুমাত্র লজ্জারই ছিল না, ছিল বিপদেরও ।আমার পাড়ার বেশ কিছু চরমপন্থী-বিরোধী সন্ত্রাসীর আত্মীয়-স্বজনরাও ছিল সন্ত্রাসী । তারা যদি জানতে পারত যে, আমি ইচ্ছাকৃতভাবে জানাজায় যাইনি, তাহলে তারা মনে করতে পারত  যে, আমি তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করি বলেই জানাজায় যাইনি। এতে তারা আমার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হতে পারত। বলা বাহুল্য যে, চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে  গ্রামে তখন যে একটা সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠেছিল, তারাও চরমপন্থীদের তুলনায় কম খারাপ ছিল না। তারাও রীতিমত ডাকাতি, চাঁদাবাজি করত।  ফলে পুলিশের ক্রসফায়ারে উভয়পক্ষের লোকই  মারা পড়ত।

ক্রসফায়ারে মৃত লোকের জানাজায়  গ্রামের বেশিরভাগ লোকজনই  যেত না।  তবে  বিষয়টা এমন ছিল না যে, ভয়ে যেত না , যেত না অবশ্য ঘৃণায় । তবে যারা যেত ,তারা এ বোধ থেকে যেত যে, মৃত ব্যক্তির কোনো পাপ থাকে না আর মৃত ব্যক্তির দোষের কথা মনে রাখতে নেই। এমনকি  ক্রসফায়ারকৃত ব্যক্তিটি তার জীবদ্দশায় যার ছেলেকে হত্যা করেছে, সেই ছেলের পিতাকেও তার জানাজায় অংশগ্রহণ করতে দেখেছি । তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে জানাজায় যেতাম মূলত ছলিমের ভয়ে।  ছলিমের ভয় না থাকলে আমি আসলে কোনো চরমপন্থীর জানাজায়ই অংশগ্রহণ করতাম না। গোরস্তানের সাথে বাড়ি হওয়ায় মৃত্যু নিয়ে বা লাশ নিয়ে আমার কোনো ভয়-ভীতি বা ভক্তি  ছিল না। প্রকৃতপক্ষে কারও  মৃত্যু বা কোনো মৃত্যুই আমাকে বিচলিত করতো না।  হোক সেটা ক্রসফায়ারে মৃত্যু বা স্বাভাবিক মৃত্যু।  এমনকি আমার আত্মীয়- স্বজনের মৃত্যুও আমাকে তেমন নাড়া দিত না।  মানুষের মৃত্যুতে অন্য মানুষের মতো আমি বিলাপ করে কাঁদিনি কখনও । চোখে পানিও আসেনি। যেমন আমার দাদির মৃত্যু আমাকে বিচলিত করেনি,  এমনকি অতটা বিচলিত করেনি আমার বোনের মৃত্যুও। আমি মানুষের মৃত্যুকে দেখতাম অন্যান্য সাধারণ জীবের মৃত্যুর মতো ।  গোরস্তানের কাছে বাড়ি হওয়ায় অনেক মানুষের মৃত্যু দেখা হয়ে গিয়েছিল আমার।  সংখ্যায় তা হাজার খানেক হবেই। মানুষ মারা গেলে  মানুষজন কাফনের কাপড় সরিয়ে মুখ দেখত, আমি কখনো চেষ্টা করিনি। মরা মানুষের মুখ দেখে কী লাভ? মরা মুখ দেখলে বরং শেষমেষ স্মৃতিতে ঐ ফ্যাকাশে নির্মীলিত অসহায় মুখটাই স্থায়ী হয়ে যায়। এর চেয়ে ঐ মানুষটার জীবিতকালের  হো হো করে হাসির দৃশ্য মনে ধরা রাখা ভালো বলে মনে করতাম।

 যা হোক,  গোরস্তানের নিকটবর্তী বাড়ি হওয়াতে আমি অনেক মৃত্যু দেখেছিলাম বলে মৃত্যু নিয়ে আমার মনে সমীহ জাগার কথা ছিল। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে হয়েছিল উল্টো। বেশি মৃত্যু দেখতে দেখতে আমার কাছে মৃত্যু একেবারে স্বাভাবিক হয়ে পড়েছিল। এমনই স্বাভাবিক হয়ে পড়েছিল যে, আমি মানুষের মৃত্যুকে অন্যান্য ইতর প্রাণীর মৃত্যুর সমতূল্য ভাবতে শুরু করেছিলাম। মানুষের মৃত্যু এবং অন্যান্য সকল জীবের মৃত্যুর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য চোখে পড়ত না আমার । কেন এমন হয়েছিল জানি না। বছর বছর কোরবানীর সময় গলা কাটা ছাগল, মহিষ বা গরুর কষ্টকর মৃত্যুদৃশ্য আমি যেমন দেখতাম, তেমনিভাবে দেখতাম ঘুনারচকের হলুদ ক্ষেত বা সরিষাক্ষেতের মধ্যে অথবা চৎরা বিলের মধ্যে মানুষের গলাকাটা লাশও। মানুষের গলাকাটা লাশ আর কোরবানীর সময়ে বিভিন্ন প্রাণীর গলাকাটা লাশের একটা তুলনামূলক চিত্র আমার চোখে ভেসে উঠত। পার্থক্য লাগতো না কোনো কিছুতেই। আমি ভাবতাম ,অন্যান্য সাধারণ প্রাণীর মৃত্যু যেমন,মানুষের মৃত্যুও ঠিক তেমন,সুতরাং মানুষের মৃত্যুতে আলাদা করে ব্যস্ত-সমস্ত  হওয়ার কী দরকার, কষ্ট পাওয়ার কী দরকার, এমনকি জানাজা পড়ার কী দরকার? অন্যান্য প্রাণীর  ক্ষেত্রে তো লাগে না! প্রকৃতপক্ষে ভাবনাটা ছিল নিতান্ত ছেলেমানুষী ।

তবে পীরের হাতে বাইয়্যেৎ হবার পর মানুষের মৃত্যু নিয়ে আমার অন্যরকম একটা বোধের সৃষ্টি হয়েছিল। বোধটা  ছিল গভীর এবং অনেকটা যন্ত্রণাময় টাইপের । তবুও উল্টো কেমন যেন এক ধরনের তৃপ্তি বোধ করতাম। আমার একটা নিজস্ব প্রসেস ছিল এ তৃপ্তিকর যন্ত্রণা নেয়ার । আমি মৃত ব্যক্তির লাশের জায়গায় নিজের লাশকে কল্পনা করতাম । প্রকৃতপক্ষে স্বপ্নের মধ্যে আমার লাশ খাটিয়াতে  তোলার পর যে অনুভুতি হয়েছিল আমার আমি সেই অনুভূতি আনয়ন করার চেষ্টা করতাম। আর, তখন আমার এই উপলব্ধি হতো যে, আমার এই জীবিত শরীর আর ঐ মৃত শরীরের মধ্যে খুব বেশি একটা পার্থক্য নেই। পার্থক্য আছে শুধুমাত্র একটা বিষয়ের- আর সেটা হলো ’সময়’। একমাত্র  এই ’সময়’ ব্যতিত ,আমি গরীব লোকটি ধনী ,আমি অশিক্ষিত লোকটি ডক্টরেট ডিগ্রিধারী, আমি সাধারণ লোকটি খ্যাতিমান — সমাজ সাধারণত যে যে সূচকে  মানুষের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে ,ওরকম কোনো পার্থক্য  নেই । তাই আমার মনে এ বোধ জন্মাত যে,পৃথিবীতে জীবিত মানুষগুলোর পরস্পরের মধ্যেও এ পার্থক্যগুলি করার আসলে কোনো মানে হয় না । মানুষ এ পৃথিবীতে অক্সিজেন বা খাবার গ্রহণ করে যে বেড়ে ওঠে , এ বিষয়টা আসলে গৌণ। অনুল্লেখযোগ্য। মানুষ আসলে ‘সময়’ গ্রহণ করে বেড়ে ওঠে আর ‘সময়’ গ্রহণের সাথে সাথে নিজের জীবন থেকে একটু একটু করে আয়ু পরিত্যাগ করতে থাকে। আমি যখন কোনো বৃদ্ধের লাশের জানাজা পড়তাম তখন আমার যে অনুভুতি হতো, একজন যুবক বা তরুণের লাশের জানাজা নামাজ পড়ার পড়ার সময়ও ঠিক একই অনুভুতি হতো। আমার মনে হতো ,একজন অশীতিপর বৃদ্ধের কাছে জীবনের বা সময়ের অভিজ্ঞতা যেমন, একজন যুবকের কাছেও জীবনের অভিজ্ঞতা ঠিক তেমনই। একজন শতবর্ষী বৃদ্ধ যেভাবে তার সমস্ত জীবনের অভিজ্ঞতা মাত্র কয়েক মিনিটে ভেবে শেষ করে  ফেলতে পারে, ঠিক তেমনি একজন যুবক, যে দুরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যুশয্যায় শায়িত, সেও তার সমস্ত জীবনের কথা মাত্র কয়েক মিনিটে ভেবে শেষ করে ফেলতে পারে। মানুষের বয়স কম হোক বা বেশি  হোক, মৃত্যুর আগ-মুহূর্তে  নিজের জীবনকে তার কাছে সংক্ষিপ্ত বলেই মনে হয়। ফলে আমার মনে তখন এই বোধ সৃষ্টি হতো যে, একজন মৃত্যুপথযাত্রী পঁচিশ বছরের যুবক ও একজন শতবর্ষী বৃদ্ধ মানুষ দুজনে গাণিতিকভাবে বিষম আয়ুর হলেও তারা দুজনেই পৃথিবীতে অল্প সময়ে থাকার সমান বেদনা নিয়ে মৃত্যুবরণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.