অধ্যায়: ৬, জালছা তত্ত্ব

 3,799 total views

৮. জালছা তত্ত্ব

মাদ্রাসার সাথে খানকা শরীফের দ্বন্দ্ব যতই থাকুক না কেন, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কিন্তু আমাদের পীরহুজুরকে  মাদ্রাসার জালছায় প্রধান ওয়াজিয়েন হিসেবে ঠিকই রাখত। কেন রাখত সেটা অনেকের কাছে রহস্যময় লাগলেও আমি ঠিকই বুঝতে পারতাম। দিনে দিনে পীর সাহেবের মুরিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল বিধায় কেরামত  শেখের  মনে ভোট খোয়ানোর ভয় ধরে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। পাশাপাশি তাঁর ছেলে ছিল ইউপি চেয়ারম্যান। তখন চেয়ারম্যানশিপের মেয়াদ ছিল আবার শেষের দিকে । সামনেই ছিল নির্বাচন। তিনি মুরিদ ভোটারদেরকে অসন্তুষ্ট রাখতে পারছিলেন না। তাই মাদ্রাসার শিক্ষকদেরকে নাখোষ করে হলেও এ সম্পর্কটা  তিনি ধরে রেখেছিলেন। তাঁর সিদ্ধান্তে বাধা দেওয়ার মতো মাদ্রাসাতে তো নয়ই, গ্রামেও কেউ ছিল না । কিন্তু মাদ্রাসাপন্থী লোকজনও হাল ছাড়ার পাত্র ছিল না। তারা যে কোনোপ্রকারে  গ্রাম থেকে পীরবাদিতার শিকড় উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল। এটা সফল করতে তারা  পীরহুজুরের ভুল ধরার চেষ্টা  বা বদনাম করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল নিদারুণভাবে । এটা-ওটা বলে বেড়াত দেদার। তাদের কিছু লোক ওয়াজ শুনতেই যেত যেন হুজুরের ভুল ধরার জন্য। এদেরকে আমার কাছে জাত-হিংসুক বলে মনে হতো। এদের  কেউ কেউ তখন বলত,ওয়াজের সময় অমুক জায়গায় হুজুর মেকি কান্না করেছে, এই ভুল করেছে, সেই ভুল করেছে ইত্যাদি।  এ রকম বললে আমি তাদের সাথে তখন তর্ক করতাম। বলতাম, “খালি তো দোষ ধরবের পারেন, তাইনে? একটু কেঁদে দেহান তো।” কিন্তু তারা এটা করে দেখাত না, বা দেখাতে পারতো না, বরং তারা আমার এ ধরনের ছেলেমানুষি কথায় হো হো করে হাসতো। এ ধরনের দোষ বা ভুল যারা ধরত, তারা খুব একটা নামাজ-কালাম পড়ত না, কোরান-হাদিসের জ্ঞানও তাদের ছিল না, অথচ ওয়াজের ভুল ধরার চেষ্টা করত খামাখাই। বলত,  “হুজুর এ কথা কোথায়  পেল, কোরান হাদিসে এটা কোন্ জায়গায় উল্লেখ আছে?” অথবা বলত, “হুজুর মনগড়া ফতোয়া দেছে, বেদাত সব কথাবার্তা বলছে।” এগুলো বলে তারা কোরান-হাদিসের জ্ঞানের জাহির করত।  শিক্ষিতদের মধ্যে ড. ইমতিয়াজ সাহেব এ ধরনের ভুল বেশি ধরতেন। তিনি সরাসরি মাহফিলে গিয়ে ওয়াজ শুনতেন না, তবে ওয়াজের ক্যাসেট সংগ্রহ করতেন। তারপর সেখান থেকে তিনি ভুল-ভ্রান্তি ধরে নোট করে রাখতেন। তারপর বইপত্র পড়তেন। অনেক গবেষণার পর একসময় তিনি মহামূল্যবান বাণী ছড়াতেন লোকজনের মাঝে। বলতেন, “হুজুর এটা মনগড়া কথা বলেছে, এটা সহী হাদীস-সম্মত নয়”, “হুজুর জয়ীফ হাদীস থেকে এ কথা বলেছে”,ইত্যাদি। এদিকে এই ড. সাহেবও কিন্তু নামাজ-কালাম পড়তেন না। কিন্তু শুধুমাত্র ভুল ধরার জন্য, সর্বোপরি কোরআন-হাদীসের ভুল ধরার জন্য প্রচুর পড়াশোনা করতেন তিনি। তিনি এমন যুক্তি দিয়ে ভুলগুলো( আপাত) তুলে ধরতেন যে, গ্রামের সাধারণ খেটে-খাওয়া অশিক্ষিত লোকজন এগুলোর তাৎক্ষণিক প্রতি-উত্তর দিতে পারত না। এসব কথা  তিনি সাধারণত তার বাড়ির বাউল গানের আসরে জনসমাগমে বলতেন। তবে  পীরপন্থী লোকজনের পক্ষে  তখন ড. সাহেবের কথাগুলো মেনে নেওয়া কষ্টকর হতো।  এরা তাঁর সামনাসামনি কিছু না বললেও পেছনে বলত। ঘৃণা উগড়ে দিত । বলত যে,লোকটা একদম কাফের হয়ে গিয়েছে।  তবে কেউ তাঁর সম্পর্কে এটাও মনে করত যে, তিনি  খ্রিষ্টানদের দেশে থেকে খ্রিষ্টান হয়ে গিয়েছে।  এটা বলা স্বাভাবিক ছিল কারণ তাঁর জীবনাচরণও ছিল অনেকটা  খ্রিষ্টানদের মতো। তিনি তাঁর বাড়িতে অনেকগুলি কুকুর পুষতেন এবং কুকুরদেরকে ডেকে নিয়ে মুখে চুমু দিতেন। কালো রঙের কুকুর ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় । আমাদের নবী (সাঃ) নাকি  কোন্ হাদিসে কালো কুকুরকে দেখবামাত্র মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন, এ কারণে কালো কুকুরের প্রতি তাঁর ছিল অসীম সহমর্মিতা। উল্লেখ্য যে, তিনি বছরের আট মাস পশ্চিম অষ্ট্রেলিয়ায় পরিবারসমেত বসবাস করতেন।

গ্রামে  পীরহুজুরের  ওয়াজের এরকম সমালোচনা হওয়ার কারণে পীরবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা ছিল সবসময়েই।  ফলে গ্রামের অন্যসব জালছাগুলিতে আমাদের পীর সাহেবকে দাওয়াত দেয়া হতো না। পীরসাহেবের পরিবর্তে তারা দাওয়াত দিত জামায়াতপন্থী হুজুরদেরকে। ফলে দরবারের বেশিরভাগ মুরিদ গোস্বা করে ঐসব জালছাগুলিতে অংশগ্রহণ করত না।  প্রকৃতপক্ষে ঐসব জালছাগুলোর নিয়্যত থাকত ব্যবসায়িক। উদ্দেশ্য থাকত দান-হাদিয়া সংগ্রহ করা। ওয়াজিয়েনগণ বড় অংকের সম্মাণী নিয়ে চলে যেতেন। ঐসব হুজুরদের সাথে আমাদের পীরহুজুরের এখানেই  ছিল বড় পার্থক্য। আমাদের হুজুর ওয়াজ করে কোনো টাকা নিতেন না। ফলে হুজুর কোনোদিন আমাদেরকে মানা না করলেও ঐ জালছাগুলিতে আমরা মুরিদরা কখনও যেতাম না। তবে না যেতে পেরে ব্যক্তিগতভাবে  আমার খারাপ লাগত। কারণ আমার কাছে ওয়াজ শোনা ছিল নেশার মতো।

প্রকৃতপক্ষে ঐ কিশোর বয়সেই আমি প্রচুর ওয়াজ শুনেছিলাম। ওয়াজ শুনে আমার আত্মিক পরিশুদ্ধি কতটা হয়েছিল তা বলতে পারব না, তবে আমি যে ঐ বয়সেই ওয়াজ-বিশেষজ্ঞ হয়ে  উঠেছিলাম এটা নিশ্চিত বলতে পারি। ততোদিনে জালছার গঠন-কাঠামো, উদ্দেশ্য, কারণ ও কার্যাবলী আমার সবিশদ জানা হয়ে গিয়েছিল।  যেমন,জালছাগুলিতে প্রধান ওয়াজিয়ানের ওয়াজ সবার শেষে অধিক রাতে কেন রাখা হতো আমি সেটা আমি বুঝতে পারতাম সহজেই। বুঝতে পারতাম যে এখানে কৌশল আছে, টেকনিক্যালিটি আছে।

 আপনাদেরকে এখানে এইসব জালছার জালছাতত্ত্ব বিষয়ে কিছু বলতে চাই:

জালছাতে আমন্ত্রিত প্রধান ওয়াজিয়েনই হলো জালছার প্রাণ,আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। দর্শক-শ্রোতা যাতে অধিকক্ষণ মাহফিলে উপস্থিত থাকে সে জন্যই তাঁর ওয়াজ রাখা হয় একদম শেষে। এর আগে শিক্ষানবিশ ওয়াজিয়েন ও স্থানীয় ওয়াজিয়েনগণ তাদের সাধ্যমত সুর করে, কেঁদে, হেসে ওয়াজ করতে থাকেন। তাঁরা কোরান-হাদিস ও বিভিন্ন কেতাব থেকে বাছাইকৃত দুঃখজনক কাহিনীর বর্ণনা করে এবং বিভিন্ন রকম আবেগ সৃষ্টি করে দান-হাদিয়া সংগ্রহ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন।  তারপর সবশেষে,  সাধারণত মাঝরাত্রির পরে, যখন প্রধান ওয়াজিয়েন সাহেব আসেন, তখন মুহুর্মুহু তকবির ধ্বনিতে মাহফিল কেঁপে ওঠে। সাধারণত বড় মাপের এ হুজুরগণ বক্তার আসনে বসেই চার-পাঁচ মিনিট একটানা আরবি বা ফারসি বয়ান সুর করে বলতে থাকেন। গ্রামের শ্রোতারা তার বিন্দু-বিসর্গ বুঝতে পারে না। না বুঝতে পারার কারণে বরং শ্রোতাদের মনে হুজুরের প্রতি আরো বেশি সমীহ জাগে। তবে বালাগাল উলাবি কামালেহি,কাসাফাদ দোজাবি জামালিহি ,এটা সব বড় বড় হুজুরই সুর করে বলেন। হুজুরদের সুর করে বলা এ সুন্দর নাতে-রাসূল  শ্রোতাদের কাছে বেশ পরিচিত লাগে। কারণ বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত জালছায় দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত এ স্তবক তারা শুনে এসেছে । বেশিরভাগ শ্রোতা— শিক্ষিত, অশিক্ষিত, জোয়ান-বৃদ্ধ সবাই হুজুরের সাথে তখন এ স্তবকটি গলা মিলিয়ে আবৃত্তি করে ।

 দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের জালছাগুলির প্যাটার্ন,স্টাইল ও কার্যক্রম একই রকমের হয়। কারণ এদের উদ্দেশ্য থাকে একই ধরনের। শ্রোতাদের মাঝে একই ধরনের উত্তেজনা জারি রাখা, শ্রোতাদের মধ্যে আবেগ তৈরি করে  দ্বীনি-প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য দান-হাদিয়া সংগ্রহ করা—-এগুলিই মূলত উদ্দেশ্য।এটা করার জন্য বিভিন্ন কৌশল করা হয়। তন্মধ্যে একটি কৌশল হলো,জালছা চলাকালীন দর্শক-শ্রোতাদের যাতে ক্লান্তি না পায় বা ঘুম না আসে তজ্জন্য মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে ইসলামি জাগরণমূলক  স্লোগান দেয়া । ওয়াজের মাঝে মাঝে স্লোগান দেয়ার জন্য এক বা একাধিক যুবক-তালবেলেমকে আগে থেকেই দায়িত্ব দেয়া থাকে। সে ওয়াজের উত্তেজনা বা ক্লাইমেক্স বুঝে সুযোগ মত স্লোগান দেয়। তারপর  শ্রোতারা গলা ফাটিয়ে তার সাথে স্লোগানের প্রত্যুত্তর দেয়। শ্লোগানের আওয়াজ হুজুরের মনের মত না হলে আবার দিতে হয়। তবে এসময় দায়িত্বপ্রাপ্ত তালবেলেমের পরিবর্তে হুজুর নিজেই শ্লোগান ধরে। হুজুর তার বাম কান বাম হাতের পাঞ্জা দিয়ে চেপে ধরে মুখটা মাইক্রোফোনের খুব কাছে টেনে নেন, তারপর যথাসম্ভব জোরে চিৎকার করে স্লোগানের জো ধরে। শ্রোতারা তাঁর সাথে স্লোগানের পরবর্তী মূল অংশ উচ্চস্বরে বলে। বলা শেষ হলে হুজুর খুশি হন এবং তারপর তিনি নড়েচড়ে আরাম করে বসেন। হুজুর খুশি হলে ভাল লাগে মুমিন শ্রোতার। বেজাড় হলে গণ্ড-মূর্খ অন্য গাফেল শ্রোতাদের প্রতি বিরক্তি জাগে মুমিন শ্রোতার । বিরক্তি জাগে কারণ তাদের গলা চড়েনি,তারা ওয়াজের শান বুঝতে পারেনি । যা হোক, তারপর হুজুর ওয়াজের পরবর্তী বাক্যটা সুর করে মোলায়েম ভঙ্গিতে বলা আরম্ভ করেন।

জালছায় বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে জালছার নির্বাহী কমিটি কিন্তু বেশ পরিকল্পনা করে এবং গবেষণা করে বক্তা নির্বাচন করে। প্রতিষ্ঠানের উন্নতিকল্পে আয়োজিত জালছাগুলিতে এটা সতর্কতার সাথে দেখা হয়। প্রতিষ্ঠানের উন্নতি মানেই হলো জালছার মাধ্যমে  লোকজনের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা। যত ভাল ওয়াজ ,তত বেশি টাকা। যত বেশি আবেগ,তত বেশি দান-হাদিয়া। জালছার উদ্দেশ্য যে প্রধানত টাকা সংগ্রহ করা-এটা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জালছার প্রচার-প্রচারণার লিফলেট বা পোষ্টারে স্পষ্ট উল্লেখ থাকে। এখানে গোপনীয়তার কিছু থাকে না। পোস্টার বা লিফলেটে লেখা থাকে “দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের উন্নতিকল্পে জালছায়ে আজীমুচ্ছ্বান।” দর্শক-শ্রোতারা এগুলো জেনে-বুঝেই দান করে। দর্শক উপস্থিতি বৃদ্ধির জন্য মাঝে মাঝে জন্মান্ধ হাফেজ-হুজুর, বামন হুজুর, শিশু-হুজুর, হাত-পাবিহীন হুজুর,মহিলা থেকে রাতারাতি পুরুষ হয়ে যাওয়া হুজুর-এরকম বিভিন্ন ধরনের হুজুরকে নিয়ে আসা হয়। এ ধরনের হুজুরের ওয়াজ করার কথা শুনলে আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন দলে দলে ছুটে আসে। মাহফিলে তখন তিল ধারণের জায়গা থাকে না।

 কোন্ হুজুরকে দিয়ে কখন ওয়াজ করানো হবে তা জালছা কমিটি চিন্তা-ভাবনা করে ও আলোচনা করে ঠিক করে। মাগরিবের পর পর স্থানীয় মক্তব মাদ্রাসার সাধারণ মানের বক্তা দিয়ে ওয়াজ করানো হয়। কারণ এ সময় মাহফিলে উপস্থিতি কম থাকে। এদিকে এশার নামাজের পর পর মাহফিলে মহিলা শ্রোতাদের উপস্থিতি বেশি থাকে। মহিলাদের জন্য থাকে পৃথক ব্যবস্থা। পর্দা দ্বারা আবৃত সংরক্ষিত জায়গায়  তাদের বসার নিরাপদ ব্যবস্থা থাকে । এ সময়টাতে সাধারণত আইয়ামে জাহেলিয়া যুগে কন্যাশিশু হত্যার কাহিনী, সারা বিবির কাহিনী এবং জাহান্নামের  লোমহর্ষক শাস্তি বিষয়ক ওয়াজ করানো হয়। এ কাহিনীগুলি অধিক কান্নাভরে ও অধিক আবেগের সাথে যে হুজুর বলতে পারেন বলে পরিচিতি আছে, নিয়োগ করা হয় তাঁকেই । মহিলাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা,অলংকার ইত্যাদি দান-হাদিয়া হিসেবে সংগ্রহ করার জন্য কোনো মুরুব্বী-মুসুল্লী বা মাদ্রাসার ছাত্রীকে মহিলা শ্রোতাদের সংরক্ষিত অংশে নিয়োগ করা থাকে।

 তৃতীয় বক্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয় কুরআন হাদীস ফিকাহ শাস্ত্রে মোটামুটি ভাল জ্ঞান রাখে এবং প্রধান বক্তা না আসা অবধি ওয়াজের মাধ্যমে শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারে এমন কাউকে। তবে ওয়াজের মাধ্যমে  শ্রোতাদের ব্যাপক হাস্যরসের যোগান দিতে পারে, পাশাপাশি আবার কাঁদাতেও পারে, এমন বক্তাকে এ জায়গায় নিয়োগের সবোর্চ্চ চেষ্টা করা হয়। যুবক শ্রোতারা সাধারণত ওয়াজে হাস্যরস পছন্দ করে। তাই হাস্যরসের ওয়াজ সাধারণত  বেশিরভাগ মেয়েদের পর্দা না-করা, সমসাময়িক সিনেমার  পোস্টার ও গানের কথাগুলিতে অশ্লীলতা, দেবর-ভাবী সম্পর্ক, শ্যালিকা-দুলাভাই সম্পর্ক, বিয়ে করে বউ রেখে স্বামীদের বিদেশে শ্রমিক হিসেবে গমন এবং বউদের তৎপরবর্তী পরকীয়া প্রেম ইত্যাদি সামাজিক অনাচার ও অপসংষ্কৃতি সম্পর্কীত হয়। এ ধরনের ওয়াজ আবার অশ্লীল মনে হয় না। কারণ এমন একটা উপলব্ধি  তৈরি করা হয় যে, এ ধরনের ওয়াজে করার খুব দরকার আছে সমাজে । কারণ এ ধরনের ওয়াজ সমাজ সংষ্কারে ভালো কাজ দেয়। গ্রামে-গঞ্জে ক্যাসেটে কী সব অশ্লীল গান শোনার যে প্রচলন হয়েছে ! সমাজটা তো গোল্লায় গেছে। অশিক্ষিত শ্রমিকশ্রেণির লোকজন অশ্লীল আঞ্চলিক ভাষার গান উচ্চস্বরে বাজিয়ে চলে যায় রাস্তা দিয়ে। “পাগল করিলো ভাগ্নেরে”, “আমার মাটির গাছে দুটো ডালিম ধইরাছে/হাত দিয়ো না ওগো বন্ধু কাঁচা রইয়াছে” নারী কন্ঠে গাওয়া এ দুটি গান বিভিন্ন জায়গায় বাজে ।  কী অশ্লীল গান। জালছায় রসিক হুজুর  তখন এ গানগুলি সুন্দর সুর করে গাইতে থাকেন। গাওয়ার পর তরজমাও করেন।  শ্রোতাদের হয়ত তখন ঘোর কাটে না, হুজুর কেন এই অশ্লীল গান গাচ্ছেন? ছিঃ! কিন্তু ধারণা পাল্টে যায় কিছুক্ষণ পরেই। কারণ ঠিক এরপরই এসব গান শোনা ও গাওয়া যে কত বড় কঠিন গোনাহর কাজ তা তিনি ব্যাখ্যা করে বোঝান। এছাড়া গানের কথার মধ্যে ‘মাটির গাছ’ আর ‘ডালিম’ বলতে যে নারীশরীরকে নির্দেশ করা হয়েছে , বস্তুত ,নারীজাতি বা মা-জাতিকে যে অসম্মান করা হয়েছে, ভাগ্নে বলতে যে আসলে হিন্দুদের দেবতা কৃষ্ণকে বোঝানো হয়েছে, এসব কথা হাস্যরস সহকারে হুজুর সুন্দর করে উপমাসহ তরজমা করে দেন। তরজমা করার স্টাইলটা একইসাথে হাস্যরসাত্মক এবং শ্লেষাত্মক হয়।  শ্রোতারা এ তরজমা শুনে হো হো করে হাসে। তারপর একসময় হুজুর জোরে চিৎকার করে বলে ওঠেন, “নাউজুবিল্লাহ!”  শ্রোতারা নাউজুবিল্লাহ শুনে থতমত খেয়ে হাসি থামিয়ে দেয় সহসা। হাস্যরত  শিশুকে ধমক দিলে শিশু যেমন আঁৎকা হাসি থামিয়ে দেয়, দমবন্ধ অবস্থা হয়, শ্রোতাদেরও তখন এ অবস্থা হয়। শ্রোতাদের মনে তখন ক্যাথারসিস চলে। মাহফিলে শুনসান নীরবতা বিরাজ করে। হঠাৎ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা কায়েম হয়। হুজুরও কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকেন। এমন নীরবতা দেখেন চারদিকে তাকিয়ে ।  মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেন। তারপর এমন গান শুনলে কী কী শাস্তি হতে পারে সে সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা অধিকতর ধিক্কার আর শ্লেষের সাথে বর্ণনা করতে থাকেন। শ্রোতারা এ ধিক্কার শুনে কেঁদে ফেলেন। কিছুক্ষণ আগেই যে শ্রোতা হো হো কাঁদছিল, সেই শ্রোতা তখন গামছা চাদরে লুঙ্গিতে চটে নাকের পানি মোছে আর কাঁদে।

 মেয়েদের পর্দা বিষয়ক ওয়াজ করতে গিয়ে হুজুরগণ পোশাকের ধরন নিয়েই বেশি বলেন। গৃহবধূ বা যুবতীদের টাইট-ফিট বোরখা পরা,মহিলাদের পাতলা জর্জেট শাড়ি পরে এবং পেট-পিঠ বের করা বøাউজ পরে বাইরে যাওয়া অথবা বৃদ্ধা মা খুব পর্দা করে-তার চোখ বা পায়ের পাতা পর্যন্ত ঢাকা থাকে-কী তার পর্দা! কী তার লেহাজ ,মাশাল্লাহ, কিন্তু তার অবিবাহিতা,উদ্ভিন্ন যৌবনা কন্যা টাইট-ফিট সালোয়ার-কামিজ পরে,বুকের একপাশে ওড়না দিয়ে আরেকপাশে না দিয়ে তার সাথেই যখন কেনাকাটার জন্য বের হয়–মা মেয়েকে তখন কিছুই বলে না—এমন সব বেহায়াপনা,বেলেল্লাপণা নিয়ে রসিয়ে এবং বিষিয়ে উভয়প্রকারেই তারা ওয়াজ ফরমাইতে থাকেন। সচেতন শ্রোতারা তখন বিড় বিড় করে বলে,আহা কী সুন্দর সমাজ সচেতনতার ওয়াজ!  তারা ওয়াজের বক্তব্যবিষয়ের সাথে বাস্তবতার প্রায় পুরোটাই মিল দ্যাখে, এমন দৃশ্য যে চোখে পড়ে অহরহ! গ্রাম-সমাজে শ্যালিকারা দুলাভাইদের সাথে সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যায়, মেলায় যায়, চারদিকে কী যে বেহায়াপনার ছড়াছড়ি। বিদেশ যাওয়া ছেলের বউ মাঝে মাঝেই টাকা-পয়সা-গহনা নিয়ে বাড়ির রাখাল ছোকরা বা প্রতিবেশি জোয়ান-মর্দ  পোলার লগে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়। হুজুরগণ এ বিষয়গুলো ওয়াজে তুলে ধরেন সুন্দরভাবে। ওয়াজ করার সময় মাঝে মাঝে তাঁরা পত্রিকায় প্রকাশিত এ জাতীয় খবরগুলোর উদাহরণ টানেন। তাঁরা পত্রিকার নাম এবং কোন্ তারিখে ঘটনাটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাও বলেন যাতে শ্রোতাদের মনে কোনো সন্দেহ না থাকে।

তবে এ ধরনের সমাজ-সংষ্কারমূলক ওয়াজগুলির বক্তারা সাধারণত খুব বেশি দান-হাদিয়া সংগ্রহ করার দিকে মনোযোগ দেন না। এটারও একটা ফরমেট থাকে, সিস্টেম থাকে। জালছা কর্তৃপক্ষ জানে যে, শুধুমাত্র দান-হাদিয়া সংগ্রহের ওয়াজ করলে সাধারণ দর্শকরা হতাশ হয় এবং এটা নিয়ে পরবর্তীতে বিরূপ আলোচনা হয়। যারা কোনোদিনও দান করে না, এমন দর্শক-শ্রোতাদেরও মাহফিলের জন্য প্রয়োজন। তারা মারহাবা বলে, গলা চড়ায়। এরা না থাকলে মাহফিল জমে না। মাহফিলে লোক বেশি না থাকলে বিত্তশালীদের এবং রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যক্তিদের মন টলে না। দান করতে চায় না। রাজনীতিবিদরা অধিক সংখ্যক লোকজনের সামনে দাঁড়াতে চায়। ফোকাস পেতে  চায়। তারা চায় যে, জনগন তাদের নিয়ে আলোচনা করুক। জালছা শেষ হওয়ার পর কমপক্ষে তিন দিন সেই ব্যক্তিরা সাধারণত আলোচনায় থাকে যারা দান করে সবচেয়ে বেশি।

 যা হোক, অবশেষে প্রধান বক্তা মঞ্চে এলে শ্রোতাদের সকল উত্তেজনা খারিজ হয়। মূলত তাঁর হাতেই দানের টাকা বা দানসামগ্রী দিয়ে শ্রোতাদের মানসিক উত্তেজনার প্রশমন ঘটে। কারণ প্রধান বক্তা হিসেবে যিনি থাকেন তিনি  ব্যক্তিত্বে, আমলে আর চেহারা মোবারকে এমন মাশাল্লাহ হন যে, মনে করা হয় যে, তিনি যার জন্য হাত তুলে দোয়া করবেন তার বহুত ফায়দা হবে এবং তার ইহকাল-পরকালের প্রভূত মঙ্গল সাধিত হবে। প্রধান বক্তা এরপর প্রখর ব্যক্তিত্ব,পাণ্ডিত্য এবং আউলিয়াসূলভ বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে ওয়াজ করতে থাকেন। মানুষ যে অনরবরত পাপ কাজ করে যাচ্ছে এবং সে তুলনায় মানুষ যে খুব কম পরিমাণে আমল করছে এবং নাদান, গাফেল এইসব মানুষের পারলৌকিক জীবনের ভবিষ্যৎ যে কী হবে এবং তাঁর নিজের পারলৌকিক জীবনের ভবিষ্যৎও যে কী হবে—তা নিয়ে নিদারুণ সংশয় প্রকাশ করে যখন তিনি কেঁদে ভেঙে পড়তে থাকেন,তখন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। এরকম কান্নার অবতারণা বারে বারে হয়।  এইরকম কান্নারত পরিবেশে দেখা যায় যে, দর্শক-শ্রোতাদের মধ্য থেকে একজন দু’জন করে উঠে সোজা চলে যাচ্ছে ওয়াজের মঞ্চের দিকে। তারা হুজুরের পাশে দাঁড়ানো অন্য একজন হুজুরকে চিরকুটসহ টাকা ধরিয়ে দিচ্ছে। তারপর সহকারী হুজুরের হাত যখন চিরকুট আর টাকায় ভরে যাচ্ছে তখন তিনি ওয়াজরত হুজুরের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রধান হুজুরের ওদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করার সময় নেই তখন। তিনি ওয়াজ করেই যান,কান্না করেই যান। তারপর একসময় একটু ধাতস্ত হয়ে চিরকূটগুলো হাতে নেন এবং চিরকুটে লিখিত দানকারী ব্যক্তির নাম, টাকার পরিমাণ এবং যার জন্য ও কারণে দোয়া চেয়ে দান করা হয়েছে তার বর্ণনা করে অনেক কাকুতি-মিনতি সহকারে দোয়া করতে থাকেন। দানের পরিমাণ বেশি হলে তিনি নিজে একহাতে কান চেপে ধরে দানকারীর নাম-ঠিকানা বলে খুব জোরে মারহাবা বলেন। হুজুরের কানে হাত দেয়া দেখে দর্শকরা-শ্রোতারা আগে থেকেই বুঝতে পারে যে, মোটা দান এসেছে। তখন শ্রোতারা জোরে মারহাবা বলার প্রস্তুতি নেয়। কারণ আস্তে মারহাবা বললে নতুন করে আবার মারহাবা বলতে হবে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দর্শকশ্রোতারা দানের মূল্যমাণ বা পরিমাণের দিকে খেয়াল করে গলার স্বর উঁচু বা নিচু করে। দানের পরিমাণ যৎসামান্য হলে তেমন একটা আওয়াজ হয় না। দানকারী ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন বা শুভাকাক্সক্ষী কেউ মাহফিলে উপস্থিত থাকলে শুধুমাত্র তাদের জোর গলা শোনা যায় তখন। অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে দুএকজনের কণ্ঠস্বর চড়ে। বিষয়টা তখন অনেকটা হাস্যকর এবং লজ্জাজনক হয়ে পড়ে। হুজুর তখন দীর্ঘ একটা সুর দিয়ে ওয়াজের মধ্যে ঢুকে পড়েন অথবা অন্য আরেকটি চিরকুট হাতে নেন।

 কোনো কোনো হুজুর কথার মধ্যে আক্ষেপ আর অনুরোধ মিশিয়ে দানের টার্গেট  ঘোষণা করেন। সাধারণত দানে যখন ভাটা পড়ে তখন এটা করেন। বলেন: কোনো আল্লাহর বান্দা যদি এত পরিমাণ টাকা দান করে,তাহলে তার জন্য তিনি খাছ দিলে দোয়া করবেন। যখন কোন সাড়া আসে না, তখন তিনি ফের বলেন: এ গ্রামে কি এমন কোনো আল্লাহর বান্দা নেই যে, এ পরিমাণ টাকা দান করতে পারে! তখন মাহফিলে হঠাৎ চাপা নীরবতা নেমে আসে। এ নীরবতাটা অসহনীয় লাগে।  সবার চোখে তখন এই প্রত্যাশা থাকে—-বেশি দেরি না করে এখনি  কেউ কেন বলছে না যে, আমি দেবো হুজুর!  এ সময় হুজুরের চোখের দৃষ্টি সারা মাহফিলের একোণা  থেকে ওকোণা পর্যন্ত পরিক্রমন করে। তিনি মুখটা  কেমন যেন বেজাড় করে খুঁজতে থাকেন  তাঁর কাক্সিক্ষত দিলদার ব্যক্তিকে। তাঁকে তখন বড় অসহায়ের মত লাগে। আহা,আল্লাহ্র দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য একজন নামকরা হুজুরের কত আকুতি। তাঁর তো কোনো কিছুর অভাব নেই, তারপরও আল্লাহ্র প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য তিনি কত ছোট হচ্ছেন। তাঁর এমন অসহায় মুখ দেখে শ্রোতাদের অস্থির লাগতে শুরু করে। ঠিক এমন সময় মাশাল্লাহ দেখা যায়, একজন উঠে দাঁড়িয়েছে। সিনা টান তার। স্থানীয় বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা তিনি। তিনি আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হবেন। তিনি দর্শকসারি থেকে বলছেন, “হুজুর,আমি দেব!”। হুজুরের মুখে হাসি ফোটে সাথে সাথে। তিনি জোরে বলে ওঠেন, “মারহাবা”।  কিছুক্ষণ আগে আচানক সৃষ্টি হওয়া মাহফিলের গুমোট নীরবতা খান খান হয়ে ভেঙে যায় ।  শ্রোতারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এরপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি হুজুরের কানের কাছে গিয়ে দণ্ডায়মান  ঐ রাজনৈতিক নেতার নাম ঠিকানা বলেন। হুজুর আবার কান চেপে ধরেন। মুহুর্মুহূ মারহাবা ধ্বনিতে আবার চারপাশ প্রকম্পিত হয়। ঠিক তার কিছুক্ষণ পরেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের বড় নেতার দর্শক সারি থেকে উত্থান ঘটে।  তিনি  পূর্বের ব্যক্তির চেয়ে বেশি পরিমাণ টাকা দেয়ার ঘোষণা দেয় এবং নগদ ক্যাশ হজুরের হাতে সরাসরি দিয়ে আসে। হুজুর আবার কানে হাত দেন,আবার কান্নাভরে দানকারী ব্যক্তির জন্য খাছ দিলে দোয়া করেন। এরপর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার প্রার্থীরাও একে একে দর্শক সারির মধ্য থেকে খাড়া হয় ,দানের পরিমাণ ঘোষণা করে, খাছ দিলে দোয়া নেয়।  আবার স্থানীয় জোতদার উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “হজুর আমি এ পরিমাণ টাকা, এত মন পাট,এত মন ধান, এত মন খেসারি, মাদ্রাসা-মসজিদের প্রস্রাবখানা ও অযুখানা নির্মাণের জন্য এত বস্তা সিমেন্ট, এত সংখ্যক ইট দিব।” হুজুর আবার কানে হাত দেন,আবার কান্নাভরে ও কাকুতি-মিনতি সহকারে দোয়া করতে থাকেন।

 এই পরিক্রমা চলে আরও কিছুক্ষণ। গ্রামের লোকজন আগে যারা গরীব ছিল ,কষ্টে দিনাতিপাত করত, তাদের যুবক ছেলেরা মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক হিসেবে গিয়ে  ইদানিং বেশ টাকা-কড়ি পাঠাচ্ছে, বাড়িতে পাকা ঘর দিচ্ছে-যদিও ছেলের বিদেশ গমনের জন্য যে টাকা ধার-কর্জ করা হয়েছিল সেগুলো পুরোপুরি পরিশোধ হয়নি এখনও,এইসব প্রবাসী ছেলেদের বাবাগণ উঠে দাঁড়িয়ে দানের ঘোষণা দেয় এরপর। এরা যেন মাতবর শ্রেণির চেয়েও এককাঠি সরেস। সাধারণত মাহফিলের পেছন-সারির দিক থেকে এ ঘোষণাগুলো আসে। অপেক্ষাকৃত সামনের সারির মাতবর শ্রেণির লোকজন তখন ৯০ ডিগ্রি ঘাড় ঘুরিয়ে দণ্ডায়মান ব্যক্তিকে এক নজর দেখে নেয়।  “কেরে লোকটা ? দেখি তো!”— তাদের উৎসুক চোখে তখন এই জিজ্ঞাসা জাগে। ব্যক্তিটিকে দেখে তখন অনেকের ঘোর কাটে না। কিছুদিন আগেও তো লোকটি বড় গৃহস্থ বা জোতদার বাড়িতে কামলা খাটতো, আজ সে জালছায় মোটা টাকা দান করছে! মান-সম্মান এবার বুঝি গেল! অবস্থাপন্ন বা বড় মাপের গৃহস্থ লোকটি, যে তখনও দান করেনি, কিংবা  দান করেছে কিন্তু তার চেয়ে কম পরিমাণে দান করেছে, সে তার দিকে একবার তাকিয়েই  চাদর দিয়ে ভাল করে নিজের মাথাটা ঢেকে দেয়, যাতে করে ঐ লোকের সাথে তার চোখাচোখি না হয়। 

 যা হোক,এভাবে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দান করার উৎসব শুরু হতো। ভাল কাজে প্রতিযোগিতা করা ভাল, আমি ভাবতাম । হুজুরগণও তা-ই বলতেন। আমি আরও ভাবতাম,এমন দানের প্রতিযোগিতায় আমার পিতা যদি অংশগ্রহণ করতে পারত তাহলে আমার ভাল লাগত। কিন্তু আমাদের আর্থিক অবস্থা অতটা ভাল ছিল না। আমার পাড়ার অনেকেই দান করে মাহফিলের হাজার হাজার  শ্রোতার সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে হেঁটে যেত। দেখে আমি হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। আমি মোনাজাতের সময় আমাদের পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি চেয়ে আল্লাহর কাছে মিনতি করতাম। আয় আল্লাহ, আমাকে দান করার তৌফিক দান করো! কাকুতি মিনতি সহকারে বলতে থাকতাম এটা। অশ্রæতে আমার চোখ ঝাপসা হতো। তবে আমি  দেখতাম, গ্রামের দূর্ণামগ্রস্থ ব্যক্তিরাও এমন দানের প্রতিযোগিতায়  রীতিমত অংশগ্রহণ করছে। জোতদার বাবার যে যুবক ছেলেটি কিছুদিন আগেও একজনের ঘরের বেড়া কেটে গৃহবধূর শ্লীলতাহানি করেছে, তাকেই  দেখতাম টুপি-পাঞ্জাবি পরে চোখে সুরমা মেখে হুজুরের হাতে হাজার টাকা দান করতে। হুজুর অন্য এলাকা থেকে আগত থাকত বলে তাকে চিনতে পারত না। তিনি জানতেন না যে এ যুবকটি একটা লম্পট। অবশ্য জানলেও অবশ্য তাঁর কিছু করার থাকতো না। দান তাঁকে গ্রহণ করতেই হতো। খারাপ লোকের দান নেয়া যাবে না, এমন নজির কোনো হুজুরই দেখাতে পারেননি কখনও । হয়তো হুজুরগণের এমন সাহস হয় না। দুর্নীতিগ্রস্থ বাটপাররা সমাজে সবসময় শক্তিশালী হয়। যা হোক, হুজুর এই লম্পট যুবকের জন্য হাত তুলে কেঁদে কেঁদে দোয়া করেছিলেন। গ্রামের জনগন লম্পট যুবকটির দান করা দেখে  হয়তো  তখন মনে করছিল যে, সে বোধ হয় চিরদিনের জন্য ভাল হয়ে গিয়েছে। তারাও তার দানে গলা চড়িয়ে মারহাবা বলেছিল। কিন্তু না, পরবর্তী  আবার একদিন দেখা গিয়েছিল যে, সে  পাঁচ বছর বয়সী একটা বাচ্চা ছেলেকে বলাৎকার করে ফেলেছে।

 কেউ কেউ ওয়াজের কথার দ্বারা আপ্লুত হয়েই দান করত। কেউ কেউ অনেক আগে থেকেই মা’নত করে রাখত যে,আগামী জালছায় সে এত পরিমাণ টাকা দান করবে বা পালের একটা ছাগল দান করবে। কেউ কেউ আবার বাকিতে দান করত। ওয়াজের কথার দ্বারা তাড়িত হয়ে,অতি আবেগে, ঝোঁকের বশে অথবা নিছক ভরা মজলিসে নিজেদের বড়পনা দেখানোর জন্য তারা বাকিতে দান করার ঘোষণা দিত। এক্ষেত্রে সাধারণত সামাজিকভাবে কম-মর্যাদার অধিকারী কেউ অধিক পরিমাণ দান করলে সমাজের মাতবর বা জোতদার  শ্রেণির লোকজনের আঁতে ঘা লাগত। তারা বিষয়টাকে তাদের মানসম্মান এবং সামাজিক অবস্থানের জন্য আঘাত হিসেবে মনে করত । তখন তারা অনিচ্ছা সত্তে¡ও মাহফিলে সবোর্চ্চ পরিমাণ দানের ঘোষণা দিত আর ভেতরে ভেতরে রাগে-ক্রোধে গজ গজ করতে থাকত । তারা যে মনে মনে রাগান্বিত ও অসন্তুষ্ট হতো, তা তাদের চোখ-মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যেত। অন্যদিকে আমি ভাবতাম “ যাক ,তবুও তো তারা দান করেছে!”

ওয়াজের দ্বারা তাৎক্ষণিকভাবে আপ্লুত হয়ে সবচেয়ে বেশি দান করত মহিলারা। তারা তাদের প্রিয় অলংকার খুলে দণ্ডায়মাণ বাহক মারফত হুজুরের কাছে পাঠিয়ে দিত। মহিলাদের কেউ কেউ বলে দিত যে, মাইক্রোফোনে তাদের নাম বলার দরকার নেই, প্রচারের দরকার নেই। হয়তো তারা স্বামী-শাশুড়ীর অজান্তেই দান করত বলে এমন গোপনীয়তা ছিল তাদের। তারা নাম প্রকাশ করতে চাইত না। স্বামী-শাশুড়ী জেনে গেলে সংসারে অশান্তি করবে,তাদের উপর রাগ করবে, এমনকি তাদেরকে মারপিটও করতে পারে- এ আতঙ্কগুলিকে উপেক্ষা করে তারা দান করত। আহা, কত নরম মন তাদের, ভাবতাম আমি। আমাদের পাড়ার মরিয়মের মা গলা থেকে সোনার চেইন খুলে একবার দান করে ফেলেছিল । মরিয়মের  ছোটবেলা থেকে কী যেন একটা রোগ ছিল– ডান হাতে আর ডান পা চিকন ছিল, শক্তি পেত না। মরিয়মের মা হুজুরের কাছে মেয়ের  রোগমুক্তির জন্য এটা করেছিল।  কিন্তু জালছার পরের দিন দেখা গিয়েছিল যে, মরিয়মের বাপ মরিয়মের মাকে রাখালী লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করেছে। প্রহার করার কারণ অবশ্য তখন কেউ জানতে পারেনি। মানুষের আগ্রহও ছিল না জানার । পাড়ায় তখন স্বামীপ্রবরগণ অহরহই বউ পেটাত। দেখা যেত, এর-ওর বউ স্বামীর মারের হাত থেকে পালিয়ে অন্যের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, কিংবা দেখা যেত যে,বিবস্ত্র হয়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে পোয়াতি বৌ। দৌড়াতে পারছে না ঠিকমত। যেন বিশাল তিমি মাছ কোনো এক নিঃসঙ্গ পেঙ্গুইনকে ধাওয়া করেছে। ভারী পেট নিয়ে দৌড়াতে পারছে না । খালি চিৎকার করছে। পেছনে লাঠি হাতে ধাওয়ারত  তিমিসম বিশালদেহী পালোয়ান স্বামী।  যা হোক,তাই কে কার বউকে পেটালো এটা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। তবে শুনেছিলাম, মরিয়মের মাকে সেবার একটু বেশিই পেটান হয়েছিল । মরিয়ম আমার বাবার কাছে প্রাইভেট পড়তে এসে ঘটনাটা খুলে বলেছিল। সে বলেছিল যে, সোনার চেইনটি দান করার জন্য তার মাকে এমনভাবে প্রহার করেছে তার বাবা । মরিয়ম স্বভাবে ছিল খোলামেলা স্বভাবের। বাড়ির গোপন কথা বলতে তার বাধেনি।

 আমি নিজে এসব জালছার মাহফিলে দান করতে পারতাম না। আমার নিজের কোনো উপার্জন ছিল না, ছোট ছিলাম আমি, কিভাবে দান করব? আমি তখন শুধু ওয়াজ শুনতাম আর মানুষের দান করা দেখতাম। মাহফিলে বসে গলা চড়িয়ে মারহাবা মারহাবা বলতাম। মারহাবা বলার সময় বরং সবার চেয়ে আমার গলার স্বর  উঁচু হতো।  ভাবতাম এতেই যদি আমার কিছুটা সওয়াব হয়, গরীব আমি, দান করার তো ক্ষমতা নেই আমার । আমি তখন  ছিলাম উঠতি বয়সের কিশোর। অনেক পাপ ছিল আমার।  এক শাহনাজকে ঘিরেই তখন আমার আমলনামায় পর্বতসমান পাপ । কীসব যে ভাবতাম আমি ওকে নিয়ে! শয়তান যেন আমার পেছন এক মুহূর্তের জন্য ছাড়ত না । এত জিকির করি তবুও ক্বলব পরিষ্কার হয় না ক্যান! নারীরা যে কেন পুরুষের এত আগ্রহের জিনিস কে জানে?—-এসব কথা  মরিয়া হয়ে ভাবতাম  আমি। আমি তখন পীরসাহেবের খানকায় গিয়ে সবার পেছনে বসে জিকির করতাম,  এদিকে আবার শহরতলির সিনেমা হলে গিয়ে নায়িকা মৌসুমীর সিনেমা দেখতাম। নায়িকা মৌসুমীর হাসি একদম শাহনাজের মতো ছিল । কপালের উপরে ঝুলে পড়া গুচ্ছ গুচ্ছ  চুলগুলোও ছিল আবার শাহনাজের মতো ।  তবে আমি  কোনো এক অজানা নেশায় গ্রামের যাত্রাপালা দেখতাম। ওয়াজ শোনা এবং পীরের দরবারে গিয়ে বেদম জিকির করাটা যেমন  আমার নেশা ছিল, তেমনিভাবে একজন নারীকে ভেবে সেল্ফ এবিউজ করারও নেশা ছিল আমার। এতসব বৈপরীত্য নিয়ে আমি তখন নিজেই নিজের সম্পর্কে সন্দিহান ছিলাম ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.