অধ্যায়:৫, ‍হুজুর বৃত্তান্ত

 2,472 total views

৫. হুজুর বৃত্তান্ত

ক্লাশ থ্রি থেকে ফোর,ফাইভ,সিক্স অনায়াসেই অতিক্রম করে গিয়েছিলাম আমি। দিন যাচ্ছিল, আর ক্ষিতিশ,লক্ষণ- এ দুজন সহপাঠির সাথে আমার বন্ধুত্ব আস্তে আস্তে বাড়ছিল। ঐরকম নিঃসঙ্গ অবস্থাতে ক্ষিতিশ ও লক্ষণকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে আমি বেশ খুশি ছিলাম। তবে এই  বন্ধুত্ব বেশিদিন থাকল না। কিছুদিন পরে তাদের আচরণের মধ্যেও কেমন যেন একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল । বলা নেই কয়া নেই, হঠাৎ করেই অন্যরকম ভাব । আমার সাথে মিশতে চায় না । দুরে দূরে থাকে। অবশ্য  মুসলমান ধর্মীয় কারো সাথেই  মিশছিল না ওরা। কেমন যেন একটা ভীতি লক্ষ্য করা যাচ্ছিল ওদের মধ্যে। সহপাঠিদের মধ্যে কেউ কেউ বলছিল যে, ওরা ইন্ডিয়ায় চলে যাবে কয়েকদিনের মধ্যেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম একদিন, “এই তোরা কি আসলেই ইন্ডিয়ায় চলে যাবি?”  লক্ষণ কিছু বলল না । তবে ক্ষিতিশ বলল, “আমরা কখনও যাবে নারে। ওখানে গিয়ে খুব যে একটা শান্তি আছে, তা লয়। কামাই রোজগার করা খুব কঠিন। বাড়ি করার জমি কিনতে পারা যায় না। অনেক কষ্ট।” আমি তখন বললাম, “তাহলে গ্রামের অনেক হিন্দুই যে চলে গেছে? কিকামে  গেছে? ক’তো? ”

“ভয়ে গেছে।”

“কিসের ভয়। ভূত আছে নাকি তোদের পাড়ায়?”

 “ভূত হলি তো ভালোই ছিলে। ওরা ভূতের চেয়েও খারাপ।”

“কী করে ওরা? ক’তো!”

“ থাক , তোর শুনার কাম  নাই। তুই আবার কয়া দিবুনি।”

“আরে ক’না বাল!”

“কালকেও গীতাক জানলার মধ্যি দিয়ে ছুরি দেখায়ছে । ও এহন পর্যন্ত কিছুই খায় নাই। খালি কাঁদতেছে।”

 বলে রাখি ,গীতা ছিল ওর বড়দি।

“কারা ইডা করে রে?”

“তুই এদের সবাইক চিনিস। লোকজন মনে করে ওরা খুব ভালো। ওরা আসলে ভালো লয়।আমাদের বাড়ি দখল করবের চায়। খালি ভয় দেহায়।”

আমার মুখে তখন ভাষা নেই।

একটু পরে সে বিড় বিড় করে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,

“ভয়  লাগে বুচ্ছিস। না খায়া থাহা যায়। ভয়ের মদ্যি থাহা যায় না।”

আমি ওর কথার গভীরতা না তলিয়ে একদম সহজভাবেই বললাম,

“তালি কি তোরা চলেই যাবু?”

“মা তো যাবের চায়। বাবা চায় না। বাবা কয়, মরলি মরবে,তবুও যাবি না।”

“আচ্ছা, তোরা যদি চলেই যাস, থাকপু কোনে। ওহানে কি তোদের জমি আছে?”

 “জ্যাঠার ওহানে থাকপো কিছুদিন। তারপর আস্তে আস্তে ব্যবস্থা হয়া যাবি। ভগবান যা করে।”

“আচ্ছা যারা গেছে, তারা কোনে আছে? ক্যাবা আছে, জানিস?”

“ কোনে আর থাকপি। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে কেউ কেউ লুকিয়ে আছে। কেউ রাস্তার পাশে , বাঁধের ’পরে আছে। ওপারের লোক এপারের লোকেক দাম দিবের চায় নারে। কাজকাম করবের দেয় না।”

 আমাদের কথোপকথন ওদিন এটুকুই ছিল।

 যা হোক,গ্রামে তখন প্রচুর জালছা হয়। বিশেষ করে শীতকালে । আগে শুধু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হতো। এরপর অবস্থাপন্ন গৃহস্থবাড়ির উঠানেও শুরু হয়েছিল। আমি নিয়মিত জালছা শুনতাম তখন। জালছার  প্রভাব, ওয়াজিয়ানদের বয়ানের প্রভাব  গ্রামের মানুষের আচরণে লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। দেখা যাচ্ছিল, জালছা শুনে সাধারণ চায়ের দোকানদাররা,গাড়োয়ানরা, মাটিকাটা শ্রমিকরা,যাত্রাপালায় অশ্লীল নাচ দেখে হুল্লোড় দেয়া কৃষাণ যুবকেরাও বড় বড় হাদিস বাতে। শিক্ষিত লোক কোনো ধর্মীয় কথা, হাদিস, এটা-সেটা বলতে গেলে তারা ভুল ধরার চেষ্টা করে। গ্রামে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে শুরু করেছে তখন।  এতে, অর্থাৎ,দিনে পাঁচবার ওযু করার কারণে জেল্লা ফুটে তাদের মুখে। মুখের ব্রন-ট্রন,ছুলি-হাজা, সব উধাও । রোদের তাতে(তাপ) পুড়ে যাওয়া ত্বকের উপরিভাগ মুছে গিয়ে তার উপরে তেল তেল চিকনাই জেগেছে। ময়লার পরত পরা দাঁতে দিনে পাঁচবার মেছওয়াক পড়ছে বলে দাঁতগুলি ঝকঝক করে। তাদের বিবি ,মেয়েরা বোরখা পরতে শুরু করেছে। গ্রামের যুবকেরা দাড়ি কাটা বন্ধ করেছে, আর বাজারে গৌতমদার বাপের সেলুনের রোজগার কমতে বসেছে। অনেকের মুখের দাড়ি তখন লম্বা প্রলম্বিত হয়েছে ।

 জালছার স্পষ্ট প্রভাব ছিল এটা । যুবকেরা নিয়মিত নামাজ পড়ত এবং যে সকল ছায়াছবির  গান তারা জানত, আগে মুখস্থ ছিল এবং স্কুলগামী মেয়েদের দেখলেই ছুঁড়ে দিত যে গান, তখন সেই সব গানের সুর দিয়ে ইসলামী গান তৈরি করে ফেলেছিল। এদিকে গ্রামে তখন পীর সাহেবের মুরিদের সংখ্যাও দ্রæত বাড়ছিল। গ্রামের দর্জির দোকানে কলারবিহীন জোব্বা-পানজাবি বানানোর অর্ডার বেড়ে গিয়েছিল। কোনো মুরিদই আর কলারযুক্ত পাঞ্জাবি পরছিল না। কলারযুক্ত পাঞ্জাবি পরত শুধু মাদ্রাসার হুজুর তালবেলেমরা । তারা ছিল জামায়াত ইসলামপন্থী। পীরপন্থীরা কলারবিহীন পানজাবি পরাতে কে পীরপন্থী আর কে জামায়াত ইসলামপন্থী তা স্পষ্ট সনাক্ত করা  যেত। তবে  জামায়াপন্থীর তুলনায় পীরপন্থী লোকজনের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল  গ্রামে। পীরপন্থীর লোকজন ছিল বেশিরভাগই মুরুব্বী। অশিক্ষিত। যেসব যুবকেরা গানের সাথে সুর মিলিয়ে ইসলামী গজল গাইত, জালছায় গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিত,তারা ছিল জামায়াত ইসলামপন্থী। প্রকৃতপক্ষে দুই পন্থীর লোকজনই কমবেশি  বেড়ে যাচ্ছিল । মধ্যপন্থী বা এ দুইয়ের কোনো পন্থীই নয়, এমন লোক গ্রাম থেকে নিশ্চিহ্ন হচ্ছিল। গ্রামে সুস্পষ্ট একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।

আমার দরবেশ কাকা তখন ছিলেন পীরের খাস মুরিদ। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি আগের তুলনায় আরো বেশি করে জিকির করেন । সপ্তাহে একটা দিন খানকা শরীফে জিকিরের আয়োজন থাকে বলে, এটা নিয়ে তাঁর বেজায় আফসোস । তিনি বলেন, এতে তাঁর খায়েশ মেটে না। বুকের মধ্যে নাকি অস্বস্তি থেকেই যায়, গলার কাছে কেমন যেন আটকা আটকা ভাব লাগে তাঁর। তাঁর আবদার , খানকা শরীফে এ আয়োজনটা কমপক্ষে দুইদিন করলে ভালো হয়। বিশেষ করে শীতকালের তিনমাস, যখন পীর সাহেব  একনাগাড়ে খানকা শরীফে থাকেন । সপ্তাহের মাত্র একদিন জিকির করে তাঁর দিলের খোরাক হয় না। নফ্স জাগ্রত হয় না।

 এদিকে শমসের খাঁ  মাগরিবের ও ফজরের নামাজ গোরস্তানের ঈদগাহ মাঠেই আদায় করে। আমার পড়ার ঘরের জানালা খুললে তার জিকিরের শব্দ বেশ শুনতে পাওয়া যায়। যদি পড়ার ঘরের ঠিক সামনের ঘন জঙ্গলটি না থাকতো তাহলে হয়তো শব্দগুলো আরো জোরে শোনা যেত। জঙ্গলটি থেকে তখন ভালোই হয়েছিল আমার। আমার দাদির কবর  ছিল জঙ্গলটির ঐ পারে,  এতে কবরটি দেখা  যেত না, ফলে দাদির কথা  ভেবে আমার মন খারাপ হতো না। দাদি তখন দেড় বছর হলো মারা গিয়েছিল। একই ঘরে আমার সাথেই থাকতো সে। দাদির স্মৃতি ঐ ঘরে আমি তখন তেমন কিছুই রাখিনি । শুধু তার পান খাওয়ার ঘটিটা ছিল। রাখার কারণ ছিল, চুনের ঘটি মাটির হলেও আছড়িয়ে ভাঙা যায় না। চুনের সাথে মাটির খনিজের বিক্রিয়ায় পুরো ঘটিটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায় । রাখার সময় ভেবেছিলাম যে, আমি যদি শত বছর বাঁচি তাহলেও ঘটিটার কিছু হবে না, স্মৃতি হিসেবে থাকবে অনেকদিন। বাদ-বাকি সবকিছু রাখা  ছিল দাদার পুরাতন ঘরে। ঘরটা তখন পরিত্যক্ত ছিল।  কোনো এক কালবৈশাখীর ঝড়ের রাতে দাদা ঐ ঘরেই মারা গিয়েছিল ।

১৯৮৮ সালের চৈত্র মাসের কোনো এক ঘোর কালিসন্ধ্যার কথা বলব এখন । সেই সন্ধ্যায় নাছিমা আপা হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে খুঁজে পাওয়া  গিয়েছিল গোরস্তানের পার্শ্ববর্তী একটা জংলা পাগারের মধ্যে। রফিক আর আমি তখনই আবিষ্কার করেছিলাম যে, নাছিমা আপাকে নদীর মধ্যে নিয়ে গিয়ে কাদা পানিতে চুবানো হয়েছে। কাকা এ ঘটনার পরদিন কয়েকবার করে পীর সাহেবের কাছে  গিয়েছিলেন। আপাকে পানি পড়া এটা-ওটা খাওয়াতে খাওয়াচ্ছিলেন রীতিমত। কাকার ধারণা ছিল যে, শমসের খাঁর বাবা, সফদার খাঁ নাছিমা আপাকে কুফরিকালামের বান মেরেছে । কিন্তু আমরা তখন ভাবছিলাম অন্যরকম। সফদার খাঁ যেহেতু ঘর থেকে বেরই হয় না, তাই সে কিভাবে নাছিমা আপাকে বান মারবে? কাকা অবশ্য শমসের খাঁকেও কিছুটা সন্দেহ করছিলেন। তিনি মনে করছিলেন, শমসের খাঁ পীরের মুরিদ হলেও হয়তোবা তার বাপের কাছ থেকে কুফরিকালাম শিখে নিয়ে নাছিমার উপরে প্রয়োগ করেছে। কাকা পীর সাহেবকে বিষয়টা বলেও ফেলেছিলেন । তিনি বলেছিলেন যে, শমসের খাঁ এবং শমসের খাঁর বাপ সফদার খাঁ ,এ দুজনকেই তাঁর সন্দেহ হয়। তিনি তখন এ সুপারিশও করেছিলেন যে, শমসের খাঁর মুরিদান যেন কেড়ে নেয়া হয়। দরবার থেকে বের করে দেয়া হয়। যা হোক, কাকার তখন সন্দেহটা  এ কারণে  হয়েছিল যে, নাছিমা আপা জ্ঞান ফিরে বলেছিল সে নাকি কাকার মতো টুপি পরা একজন মানুষকে দেখেছিল ফিট হওয়ার আগে। কাকার   এতে সন্দেহ জেগেছিল যে,এ টুপি পরা মানুষটি স্বয়ং কাকা নয়, বরং শমসের খাঁ । তবে শুধু নাছিমা আপার এই ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হলে কাকা  সফদার খাঁ আর শমসের খাঁকেই সন্দেহ করতেন। প্রতিবছর কাকার গরু মারা যেত মড়কে কিংবা বর্ষাকালে অত্যধিক পরিমাণে কলাগাছ খাওয়ানোর কারণে, কিন্তু কাকা সন্দেহ করতেন এ দুজনকেই।

নাছিমা আপা তখন কলেজে পড়ত। এলাকার মধ্যে বেশ সুন্দরী ছিল সে। তাকে গরীবের ভাঙা ঘরের এক টুকরা চাঁদ বলত মানুষজন। কেরামত শেখের ছেলেগুলো আপার উপর যে লোলুপ দৃষ্টি দিত,এটা রফিক আর আমি দুজনেই তখন বুঝতাম।  সন্দেহটা আরও বেশি পাকা হয়েছিল সেদিন, যেদিন ছলিম জানিয়েছিল যে, আনোয়ার কুরবানির গরু জবেহ করার ছুরি হাতে নাছিমা আপার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল গভীর রাতে । ছলিম সেদিন গোয়াল ঘরে গরু দেখতে বের হয়েছিল। ছলিম  এভাবে বলেছিল, “ শুয়ে রইছি।শুনলেম গরুটা খালি ডাকতিছে। আমি কই, ক্যারে গরু তো এত রাত্রি কোনোদিন ডাকে না। না বিশু মুচি বিষ খাওয়াবের আয়চে?  তো বারালেম। বারায়াই দেহি আনোয়ার শালা দাঁড়া রয়ছে। হাতে একখান তরবারি। আমি কলেম, কিডা রে? ও আমাক দেহে তো মারলে একটা দৌড়। হে হে হে।”

 ছলিম সেদিন হেসেছিল কিন্তু আমি সেদিন রাগে-ক্রোধে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। রফিকের অবস্থাও তা-ই হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম আমরা কি ক্ষিতিশদের মতো? আমরা কি হিন্দু,সংখ্যালঘু যে ইচ্ছা করলেই আমাদের বোনকে তরবারি দেখিয়ে ভয় দেখানো যায়। গীতাদিকে যেভাবে ভয় দেখানো হয়েছে,তেমনি দেখানো যায় নাছিমা আপাকেও? কিন্তু আমাদের ক্রোধ আমাদের মনের মধ্যেই আটকে ছিল এবং এখনও আছে।

 যা হোক, ক্ষিতিশকে আমি তার পরদিনই বলতে চেয়েছিলাম, দেখছিস, তোর দিদিক ছুরি দেখায়ছে বলে তোরা ইন্ডিয়ায় পলায়ে যাবের চাচ্ছিস, কিন্তু আমরা এহন কোনে পলাবো? আমরা তো মুসলমান। আমাদের পলানের জায়গা নাই। তোরা তো খালি মনে করিস তোদেরই জ্বালায় এসব লোক, আমাদেরও যে জ্বালায় সিডা কার কাছে কবো? খারাপ লোক সবাকই জ্বালায়। ওরা ধর্ম দেহে নারে। ওরা দ্যাহে দূর্বল কিডা।

আমি ক্ষিতিশকে কথাগুলো বলিনি। আমি চেয়েছিলাম এর প্রতিশোধ নেব।প্রতিশোধস্পৃহা মনে থাকলে সেটা কারও সাথে শেয়ার করতে হয় না।এমনটাই ভাবতাম আমি।কিন্তু প্রতিশোধ নেয়া আর কখনও হয়নি।রফিকও নিতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে আনোয়াররা দিনে দিনে আরও শক্তিশালী হচ্ছিল আর আমাদের প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছাটাও ফিকে হয়ে আসছিল।। তখন বরং উল্টো রাগ হতো নাছিমা আপার উপরই। ভাবতাম, এই নাছিমা আপারই চলাফেরার ছিরি ভাল না। কেমন যেন হেসে হেসে কথা বলে, স্বাধীনচেতা ঢেমনি টাইপের, গ্রামের অন্যান্য মেয়েদের মতো নয়। বোরখা পরে কলেজে যায় না।  দরজা বন্ধ করে প্রেম-বিরহের উপন্যাস পড়ে। কাঁদে। এদিকে আপা দিনে দিনে যত সুন্দরী হচ্ছিল, আমাদের রাগ, দুঃশ্চিন্তা তত বেড়ে যাচ্ছিল। দরবেশ কাকা ও চাচির কপালেও দেখতাম কেমন চিন্তার ভাঁজ। হয়তো আপার বিয়ে নিয়ে চিন্তা করত তাঁরা।তবে  দেখতাম যে,তারা আপার চুল খুলে বাগানে হেঁটে বেড়ানো, হো হো করে হাসা, তীর থেকে নদীতে ফাল দিয়ে লাফিয়ে পড়া, এসব বিষয়কে দৃষ্টিকটু মনে করে না । কিন্তু আমাদের চোখে আপার এইরকম করে চলাফেরা বেজায় অশ্লীল লাগত। রফিক তো আপার সাথে অহরহ তর্কে লিপ্ত হতো। মারামারি, হাতাহাতি পর্যন্ত হতো। আমাদের দুজনেরই মনোভাব তখন এটা ছিল যে, আপা যদি একটু রয়ে-সয়ে চলাফেরা করে তাহলেই তো কেরামত শেখের লম্পট ছেলেরা আপার সাথে ভাব জমাতে আসে না। কিন্তু আপার ওদিকে কোনো খেয়ালই ছিল না।

রফিক আবার কেরামত শেখের ভাইয়ের মেয়ে মরিয়মকে পছন্দ করত। রফিক দাবি করত যে, তল্লাটের সেরা সুন্দরী তার বোন নাছিমা নয়, বরং এই মরিয়মই । সে মরিয়মকে ডাকত নায়িকা দিব্যাভারতী বলে। আমারও মনে হতো মরিয়মের মুখের আদলের আশি ভাগ দিব্যাভারতীর মতোই। তবে মরিয়মের দেহের একটা সমস্যা ছিল— তার ডান পা ও ডান হাত ছিল একটু শুকনো ও দূর্বল। ছোটবেলায় সাহ্নিক রোগ হওয়ায় নাকি তার এমন হয়েছিল। যা হোক, রফিকের  এই পছন্দ করাটা মরিয়মের চাচাতো ভাই আনোয়ার মনোয়াররা জানতো না। জানলে রফিকের সমস্যা হতে পারতো। কারণ  দাদার আমল থেকে শেখ বংশের সাথে আমাদের পরিবারের বাধাবাধি ছিল। তৎকালে অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে শেখরা এ গ্রামের হিন্দু মহাজনদের সাথে আঁতাত করে আমাদের মতো সাধারণ কৃষকদের শোষণ করতো। শেখরা মূলত দালালী করতো তাদের। চড়া সুদে গরীব কৃষকদের লোন নেওয়াতো। লোন শোধ করতে গিয়ে শেষমেষ জমি বিক্রি করতে হতো কৃষকদের আর সেই জমি ভাগেযোগে কিনতো শেখরা আর হিন্দুরা। আমার দাদা শেখদের এই দালালিতে বাধা দিয়েছিল। এই বাধা দেওয়ার পরিণতি অবশ্য আমাদের জন্য ভালো হয়নি।

 যা হোক, আমি সবসময়েই এই ভয় পেতাম যে, রফিকের মরিয়মকে এই পছন্দ করার ব্যাপারটি  শেখ পরিবার জেনে যায় কিনা।   কারণ রফিক এ ব্যাপারে সবসময়েই বেয়াড়া ছিল। প্রকাশ্যেই বিষয়টা বলতে চাইতো। সুযোগ পেলেই মরিয়মকে নিয়ে তার অসভ্য ও অকথ্য চিন্তাগুলি আমার সাথে শেয়ার করতে চাইতো। মরিয়ম দিনে দিনে যত বড় হচ্ছিলো, দেহায়বব যত আকর্ষণীয় হচ্ছিলো, রফিকের চিন্তাগুলি অসভ্য থেকে অসভ্যতর হচ্ছিলো । সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে, কথাটা অনেকাংশেই ঠিক।  রফিকের সাথে থেকে থেকে আমিও দিনে দিনে অসভ্য হচ্ছিলাম।  যদিও আমি তখন শাহনাজের মুখখানাকে, তার জালি শশার মতো বাড়ন্ত দেহখানাকে ভুলে থাকতে চাইতাম, কিন্তু মরিয়মকে নিয়ে রফিকের অসভ্য ভাবনাগুলি শাহনাজকে নিয়ে আমার সুপ্ত ভাবনাগুলোকে উস্কে দিত। শাহনাজ সাজতে শিখে গিয়েছিল এবং আস্তে আস্তে সুন্দরী হয়ে উঠছিল। টাইটফিট সালোয়ার-কামিজ পরতো সে। লম্বা একহারা লাগত। শরীরের যেখানে যেটুকু থাকা দরকার, ঠিক ততটুকুই ছিল । আমার ক্লাশের রোকেয়ার মতো ঠ্যাং লম্বা ছিল না তার, ফরিদার মতো ঘাড় খাটোও ছিল না, কিংবা  মেরিনার মতো দুপা ছড়িয়েও হাঁটত না সে। শাহনাজ ছিল একদম ঠিকঠাক, অল স্কয়ার। ক্লাশে বসলে শুধু তাকেই দেখতে ইচ্ছা করত আমার । সে কথা বলত অসম্ভব সুন্দর করে। অন্যান্য মেয়েরা স্যারের কাছে পড়া বলতে গিয়ে গোঁঙায়ে বা সুর করে বলত, মনে হতো তেলাওয়াত করছে, কিন্তু সে একদম বিটিভির সংবাদ পাঠিকাদের মতো করে বলত। খুব ভালো লাগত আমার। তাই আমি তার দিকে সুযোগ পেলেই তাকিয়ে থাকতাম। সেও অবশ্য তাকাতো মাঝে মাঝে। তাকিয়ে আবার একটুখানি হাসত। সে হাসলেই ঐ দিনটা আমার মাটি হয়ে যেত, শুরু হয়ে যেত বুকের ভেতরে তোলপাড় । আমার কেন যেন মনে হতো যে, শাহনাজ আমাকে পছন্দ করে, কিন্তু আমি বলতে পারি না বলে বলে সেও বলতে পারে না—- আমি চোখে চোখ রাখতে পারিনা বলে সেও পারে না। বিশেষ করে আমি ভাবতাম ,আমার সেই সুন্নাতে খাৎনা হওয়ার দুই দিন পরের কথা, যেদিন বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ করে সে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হয়েছিল। তাও আবার  হাজির হয়েছিল সরাসরি আমার ঘরে।  কেন এসেছিল সে ? কী মনে করে?—- এটা ভেবে ভেবে আমি তখন বিবশ হতাম। আমার শরীরে কেমন যেন একটা শিহরণ বয়ে যেত।

  এভাবেই দিনকাল চলছিল । এর মধ্যে তখন একদিন হাইস্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হলো। এক হাজার মিটার দৌড়ের ইভেন্টে আগেরবারে  অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণিতে আমি প্রথম হয়েছিলাম। সেবারও প্রথম হবো ভাবছিলাম। দৌড় শুরু হলো। শাহনাজ দর্শক। আমি ভাবছি একমাত্র শাহনাজের জন্য হলেও আমাকে প্রথম হতে হবে। মানে, যে করেই হোক তার সামনে আমাকে হিরো হতে হবে। কিন্তু আমি কিছুক্ষণ দৌড়ানোর পরই দূর্বল বোধ করলাম। আমার দূর্বল বোধ করার কী কারণ ছিল তা অবশ্য আমি বুঝতে পারছিলাম তখনই । বুঝতে পারছিলাম যে, শাহনাজকে নিয়ে ভাবার পর পর গোপনে গোপনে করা ঐ অতীব আনন্দদায়ক কাজটি আমাকে দূর্বল করে দিয়েছে। যদিও আমি  তখন বুঝতে পারতাম না যে, ঐ গোপন কাজটা আনন্দদায়ক  হলেও ওটা ছিল একটা বদ-অভ্যাস। আমি মনে করেছিলাম যে, পৃথিবীতে আমার বয়সী সকল  ছেলের মধ্যে একমাত্র আমিই শুধু ঐ বিষ্ময়কর আনন্দদায়ক কাজটা জানি এবং এইরকম দূর্বলতা বোধ করা ক্ষণিকের ব্যাপার।  যা হোক, সেদিন আমি আমি দৌড়ে হেরে গিয়েছিলাম এবং শাহনাজকে তজ্জন্য খুবই মনমরা দেখেছিলাম।

 এরপরতো আমি ক্লাশ সিক্স অতিক্রম করলাম এবং আমার ঐ আনন্দদায়ক বদ অভ্যাসটা অব্যাহত থাকলো। এদিকে শারীরিক দূর্বলতার কারণে বার্ষিক পরীক্ষাতে আমার এভারেজ নম্বর কমে  যেতে থাকল। অবশ্য প্রথম স্থান কেউ ছিনিয়ে নিতে পারল না। তবে আমি ঠিকই বুঝতে পারছিলাম যে পড়াশুনায় আমার কতটুকু অবনমন হয়েছে। শাহনাজ একবার আমাকে প্রায় অতিক্রম করে ফেলেছিল। যা হোক, পরে আমার শারীরিক অবস্থা আরো করুণ হয়ে পড়ল এবং এরপর থেকে আমাকে প্রতিরাত্রে বোবায় ধরা শুরু করল। ফলে আমি তখন সন্ধ্যা হলেই ভয় পেতাম। আমার  তখন মনে হতো যে, শ্মশানের দাহ করা সেই বৃদ্ধ দোকানদার প্রতিরাতে বোবার রূপ ধরে আমার কাছে আসে, এবং এর পাশাপাশি এটাও মনে হতো যে, শিশুকালে আমাকে যে কুকুরটা গোরস্তানের ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, সেই বুঝি আসে বোবা হয়ে। তারপর ক্লাশ সেভেনে উঠে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় বাংলা ব্যাকরণে আমি খারাপ রেজাল্ট করে ফেললাম। এটা অনিবার্য ছিল। আব্বা আমার রেজাল্ট দেখে পিটুনি দেয়ার জন্য যথারীতি তাড়া দিলেন। আব্বা যে পিটুনি দেবে তা জানতাম । ফলে প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিলাম। আমি দৌড়ে দরবেশ কাকার  ঘরের ধান রাখার ডোলের মধ্যে পালালাম । পালানোর দরকার হলে ওখানটাতেই বেশি যেতাম। দরবেশ কাকা আমাকে পিটুনি থেকে রক্ষা করতেন। কেন কী অপরাধে আমাকে দাবড়াচ্ছে বাবা, কোনো প্রশ্ন করতেন না কোনোদিন। তবে ঐদিন পালানোর পরে জিজ্ঞাসা করলেন,

– কী করেছিস? মারার জন্যি যে এত দাবড়াচ্ছে!

– পরীক্ষায় খারাপ করচি।

 -খারাপ করচিস ক্যা, এ্যাঁ?

-আমি পড়তি গেলি খালি ঘুম পায় আর মুহিস্ত করলিও মনে থাহে না। মাথা ঘোরে। আর বসা থেকে খাড়া হলি পরে মাথা ঝিম মারে থাহে।

 একদমে বলে  গেলাম আমি। কিন্তু  বোবায় ধরার কথা তাঁকে বললাম না । কারণ আমি জানতাম যে, যদি আমি বলি যে, প্রতিরাতে আমাকে শুধু বোবায় ধরে আর আমি শরীরে শক্তি পাই না,তাহলে তিনি  আমাকে  সোজা আশরাফ কবিরাজের কাছে নিয়ে যাবেন। আশরাফ কবিরাজের কাছে আমি ক্লাশ ফোরে পড়া অবস্থায় একবার গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে  তখন কীসব বিড় বিড় করে পড়ে গোটা তিনেক ফুঁ দিয়েছিলেন আর তার মুখের দুর্গন্ধে আমি আধমরা হয়ে গিয়েছিলাম।

এরপর, সম্ভবতঃ মাসখানেক পরে, একদিন কাকা বললেন যে, পরীক্ষায় ভাল করার দোয়া নেওয়ার জন্য তিনি আমাকে পীর সাহেবের কাছে নিয়ে যাবেন। আমি তখন ভাবলাম যে,পীর সাহেব যদি আমাকে আশরাফ কবিরাজের মতো ফুঁ দেয়, তাহলে তো বিপদ। তাই আমি পীর সাহেবের কাছে যাতে না যেতে হয় সেই ফন্দি আঁটলাম। আমি তখন পীর সাহেবের কাছে আরও যে কারণে যেতে চাচ্ছিলাম না সেটা হলো, পীর সাহেব সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক কথা শুনেছিলাম ততদিনে । তবে পীর সাহেবের কাছে তখনই যেতে হলো না আমাকে ,কারণ পীর সাহেব তখন রহমতপুরে ছিলেন না।

পীরসাহেবের স্থায়ী বসতি ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলা। সেখান থেকে বাংলাদেশে আসতেন সাধারণত শীতকালে। শীতকাল ছিল ওয়াজ-নছিহত ইছালে-ছোয়াবের মৌসুম। শীতকালের পুরোটা সময় তিনি বাংলাদেশে থাকতেন। থেকে বিভিন্ন জালছায় অয়াজ নছিয়ত করতেন। বিনা পারিশ্রমিকেই ওয়াজ করতেন। ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ তাঁর ছিল না । শুধুমাত্র যাতায়াতের জন্য যে যৎসামান্য খরচ হতো ,সেইটুকুই শুধু নিতেন। রহমতপুরের মানুষের প্রতি ছিল তাঁর গভীর ভালবাসা। বাংলাদেশের যে প্রান্তেই তিনি ওয়াজ করতে  যেতেন না কেন, রহমতপুরে ঠিকই ফিরতেন।  এমনকি রাত গভীর হলেও  ফিরতেন। এসে খানকা ঘরে অবস্থান নিতেন। নিজে হাতে রান্না করতেন। মুরিদগণ অবশ্য রান্নার কাজে সাহায্য করত। প্রথমদিকে তাঁর হাতেগোনা কয়েকজনমাত্র মুরিদ ছিল। এরপর আস্তে  আস্তে মুরিদের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল।  যত্ন আত্তির কমতি ছিল না তাঁর। আমার দরবেশ কাকা, কাজেম উদ্দীন আর শমসের খাঁ ছিলেন তাঁর বেশ কাছের ।

 তারপর, মাস তিনেক পরে, যখন আমি যখন অষ্টম  শ্রেণিতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন একদিন দরবেশ কাকা আমাকে পীর সাহেবের খানকা শরীফে নিয়ে গেলেন।  সময়টা শীতকাল ছিল এবং সালটা ছিল ১৯৯২।   দেখি সকালের মিষ্টি রোদে পীরহুজুর একটা জলচৌকির উপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। তাঁর পাশে বসে আছে তিনজন। শমসের খাঁ, আনসার আর খুনে মজিদ।   আরও আছে কয়েকজন, তবে তারা  মুরিদ নয় ,সাধারণ গ্রামবাসী । তারা সোঁদার  তৈরি পাটির উপরে মেঝেতে বসা। আনসার আর খুনে মজিদকে দেখে আমার অস্বস্তি হলো । কারণ আনসার কিছুদিন আগেও ছিল নামকরা সিঁদেল চোর আর মজিদ ছিল আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সদস্য। এই মজিদ আমার বন্ধু লক্ষণের বাবাকে হত্যা করে টাকা ছিনিয়ে নিয়েছিল। বস্তুতপক্ষে এইসব খারাপ লোককে পীর সাহেব তাঁর দরবারে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার কারণে তাঁর প্রতি আমার খারাপ ধারণা জন্মে গিয়েছিল পূর্বেই।

যা হোক, কাকা  আমাকে নিয়ে হুজুরের সামনে দাঁড়ানোমাত্র আমি থতমত খেয়ে গেলাম। আমার এ রকম থতমত খাওয়ার কারণ এটা ছিল যে, হুজুর সম্পর্কে আগে যা যা শুনেছিলাম আর তখন যা দেখছিলাম, দুটোর মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক। দরবারে খারাপ লোককে আশ্রয় দেয়া নিয়ে এবং  জামায়াত ইসলামপন্থী লোকজনের মুখে তাঁর সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শুনে তাঁর প্রতি আমার কিশোর মনেও একটা বিতৃষ্ণা এবং তাচ্ছিল্যের ভাব জন্ম নিয়েছিল । কিন্তু তাঁকে দেখার পর আমার সে তাচ্ছিল্যভাব উবে গেল। দেখলাম যে, তাঁর চাহনী খুবই সাধারণ ও পবিত্র ধরনের । কোনো অহংকার  নেই তাতে। আমার দিকে অনেক মোলায়েম চোখে তাকালেন তিনি । নাম জিজ্ঞাসা করলেন।  অনেক মিষ্টি ও ধীর কণ্ঠ তাঁর। তারপর বললেন , “নামাজ পড়বা, রোজা রাখবা, হাফপ্যান্ট পড়বা না।” তারপর আমার মাথাটা আলতো করে কাছে টেনে নিয়ে কয়েকটা ফুঁ দিলেন। ফুঁ দেবার পর একটা মিষ্টি গন্ধ আমার নাকে উড়ে এলো। অথচ আমি এই ফুঁয়ের ভয়টাই করছিলাম বেশি। এই ফুঁ পাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার ভালো ছিল না। মানুষের নিঃশ্বাস যে এত মিষ্টিময় ও প্রশান্তিদায়ক হতে পারে তা আমার মন তখন বিশ্বাসই করতে চাচ্ছিল না। অনুভূতিটা  যে কী রকম তা বর্ণনা করা এখন আমার জন্য একপ্রকার দুঃসাধ্যই । শুধু এটুকু বলতে পারি নিজেকে কিছুটা আছরগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছিলো এবং হঠাৎ  করেই মনে হচ্ছিলো যে ,আমার  ভেতরে একটা ওলট-পালট কাণ্ড ঘটে গেছে।

 যা হোক,পীরহুজুরের ফুঁ পেয়ে আছরগ্রস্তের মতো দৌড়ে মাদ্রাসা-মাঠে চলে গেলাম আমি। আমি তখন এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম যে কাকাকে একবার বলারও তাগিদ অনুভব করলাম না।  কিন্তু মাঠে পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমি । মাদরাসার মাঠ আর পীর সাহেবের খানকা শরীফের মাঠ তখনও পরস্পরের সাথে মেশানো ছিল । বিভেদ-প্রাচীর নির্মাণ করা শেষ হয়নি তখনও। দেখলাম, জালছার জন্য মাঠে  ছামিয়ানা টাঙানো হচ্ছে । দুইদিন পরেই মাদ্রাসায় বার্ষিক ইছালে ছোয়াব  হবে। মাদ্রাসার হুজুর তালবেলেমরা একযোগে কাজ করছে। আমার দৌড় দেয়া দেখে শিক্ষক-হুজুরদের কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করল আমার কিছু হয়েছে কিনা। আমি বললাম, “ন্নাহ, কিছুই অয় নাই!” আমি দায়সারা উত্তর দিলাম এ কারণে যে, আমি জানতাম যে,এরা পীরসাহেবের ঘোর বিরোধী। তারপর আমি  যেতে যেতে মাঠের মধ্যে হঠাৎ থেমে গেলাম কারণ দেখলাম যে মাঠ থেকে বের হওয়ার  সবকটি রাস্তা বন্ধ। প্রচুর বাঁশ গাদা করা  আছে সেখানে, লোহার  তৈরি পুরাতন গেটের সামনে, ঠিক বের হওয়ার পথে বাঁশের গাদা । বের হওয়ার উপায় নেই। বাঁশগুলো মাদ্রাসার জালছা উপলক্ষ্যে গ্রামের লোকজনের বাঁশঝাড় থেকে কেটে আনা ছিল । আগের দিন কিংবা গত পরশু কেটে আনা ছিল।  অবশ্য কাটার আগে গ্রামের লোকজনদের বলা হয়েছিল যে, ছামিয়ানা টাঙানোর জন্য বাঁশ প্রয়োজন,তাই যাদের বাঁশঝাড় আছে তাদের প্রত্যেককে কমপক্ষে একটা করে বাঁশ দিতে হবে। আমাদের বাঁশঝাড়, যেটি গোরস্তানের পাশে অবস্থিত, সেখান থেকে কয়েকজন তালবেলাম  দুটি বাঁশ কেটেছিল। যেদিন কেটেছিল, সেদিন তারা আকাশী রঙের জোব্বা পরিহিত ছিল।  অবশ্য  দেখলাম, এদিনও তারা একই রঙের জোব্বা পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার দৌড় দেয়া দেখে তারা আশ্চর্য ও কৌতুহলী হয়েছে। কেমন যেন রোগা শরীর তাদের । শীর্ণ। তারা সবাই মাদ্রাসার লিল্লাহ-বোর্ডিয়ে থাকে । আশরাফ হুজুর, যিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি কবিরাজি করেন, তাদের কেয়ার-টেকার।

এভাবে প্রতিবছরই প্রচুর পরিমাণে বাঁশ সংগ্রহ  করা হতো। প্রকৃতপক্ষে এত বাঁশের দরকার পড়ত না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত এ বাঁশগুলো বিক্রি করা হতো।  লোকে বলতো,বিক্রিলব্ধ অর্থের কিছুটা মাদ্রাসা ফান্ডে রাখা হয় আর বাকিটা ম্যানেজিং কমিটির লোকজন ভোগ করে। যাদের বাঁশঝাড় থেকে বেশি বাঁশ কাটা হতো ,তারা এটা নিয়ে অভিযোগের ভঙ্গিতে কথা বলতো । তবে  তারা মাদ্রাসার  কোনো শিক্ষক বা প্রিন্সিপ্যালের বিরুদ্ধে  অবিযোগ করতো না। তারা জানতো যে, প্রিন্সিপ্যাল বা কোনো হুজুর  দুর্নীতির সাথে জড়িত নয়-জড়িত মূলত ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কেরামত শেখ। তবে তাঁর বিরুদ্ধে জোরেসোরে প্রতিবাদ বা অভিযোগ করার ক্ষমতা তাদের ছিল না।

 আসলেই,মাদ্রাসার হুজুরগণ কেউ কোনো প্রকার দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিল না। তবে এটা ঠিক ছিল যে, তারা তখন কেউ কেউ শিক্ষকতার পাশাপাশি এটা- সেটা করে উপার্জন করত। এটাকে দুর্নীতি বলা যেত না। কারণ মূল পেশায় ফাঁকি দিয়ে কেউ এটা করত না। এদের কেউ কেউ তখন মিলাদ মাহফিল করত, কেউবা করত হজ্জ্ব কাফেলার ব্যবসা। কেউ আবার কবিরাজি। তবে শীতকাল এলে এদের কাজ ছিল একটাই–ওয়াজ-নছিয়ত। শীতকাল  ছিল এ ফাজিল মাদ্রাসার হুজুরদের নগদ পয়সা উপার্জনের মৌসুম । তবে সব হুজুরের জন্য নয়, যাদের গলা ভালো , সুর ভালো, জানে ভালো অর্থাৎ যারা ওয়াজ-নসিয়তে পারদর্শী, শুধুমাত্র তারাই ভাল উপার্জন করতে পারত। এ সময়, মানে এই শীতকালে, গ্রামে গ্রামে অবস্থাপন্ন গৃহস্থবাড়িতে, এবতেদায়ী, কওমী, দাখিল, আলিম, ফাজিল, কামিল, বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানে, গোরস্তানে,সংঘে,মসজিদে, এমনকি রাজনৈতিক দলের ঘরেও (পার্টি ঘর) বার্ষিক ইসলামি জালছা হতো। হুজুরগণ টাকার বিনিময়ে এসব জায়গায় ওয়াজ করতে  যেত। ভাল বক্তাদের চাহিদা এত বেশি থাকত যে, তাদের জন্য সিডিউল ঠিক করা মুশকিল হয়ে পড়ত। ফলে তারা ঘন্টা চুক্তিতে ওয়াজ করত। তখন এমনও দেখেছি যে,একজন হুজুর এক রাতে চারটা ভিন্ন ভিন্ন জালছায় ওয়াজ করেছেন।

তখন  আমি অষ্টম শ্রেণিতে উঠে গিয়েছি এবং ওয়াজ শোনা আমার নেশা হয়ে গিয়েছে অনেকটা। বার্ষিক পরীক্ষার পূর্ববতী রাতেও ওয়াজ শুনতে যাই। বাবা আমার এমন  নেশায় খুশি হতে পারেন না। তিনি ধারণা করেন যে,এতে আমার পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত  বলে  জোর গলায় নিষেধও করতে পারেন না তিনি। তিনি শুধু মাকে এটা-ওটা বলেন। আমি তখন  রাতের পড়া ফেলে দূর-দূরান্তের  গ্রামে গিয়ে ওয়াজ শুনতে যাই। একা যাই না অবশ্য, দরবেশ কাকা সাথে থাকেন। রফিকও থাকে মাঝে মাঝে। পারতপক্ষে কোনো মাহফিলই শোনা বাদ দিই না আমি। একবার তো এক শীতে এক হুজুরের একই ওয়াজ আমি আটবার শুনে ফেললাম। হুজুর ঐ ওয়াজটাই তখন বেশি করতেন, কারণ এ ওয়াজে দান-হাদিয়া বেশি পাওয়া যেত। বিশেষ করে মহিলারা দান করত বেশি।  যা হোক, ওয়াজটা শুনতে শুনতে একদম মুখস্থ হয়ে গেল আমার।   শুধু মুখস্থই নয়, তাঁর ওয়াজের মুদ্রাও আমার দখলে চলে আসলো।  কিভাবে আসলো সেটা বলি। আমি খেয়াল করছিলাম যে,প্রতি ক্ষেত্রে তাঁর ওয়াজের প্রতিটি শব্দ,সুর একদম এক রকমের-এমনকি ওয়াজের সাথে তাঁর করা কান্নাগুলোও একরকম,একই সুরের এবং ওয়াজের ঠিক একই জায়গায়।  চতুর্থ থেকে অষ্টমবার পর্যন্ত ওয়াজ শোনার সময় প্রতিবারই আমার  এমন মনে হয়েছিল যে, তাঁর ওয়াজ বরং টেপ রেকর্ডারে বেজে চলছে আর তিনি শুধু ঠোঁট নাড়ছেন ,আঙুল-হাত ছুঁড়ে যাচ্ছেন। তাঁর কান্না,আবেগ,হাহাকার এগুলো যে ওয়াজের কথা দ্বারা তাৎক্ষণিকভাবে সৃষ্ট নয়, তা আমি ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারছিলাম । আমার মনে হচ্ছিল যে, এইসব কান্না, আবেগ হাহাকার এগুলো আগে থেকে বিস্তর অনুশীলনের মাধ্যমে রপ্ত করা এবং, যদি আমিও চেষ্টা করি  তা হলে অনুশীলনের মাধ্যমে  এইসব ওয়াজ  ঠিক ঠিক রপ্ত করতে পারবো।

স্কুলে তখন আমি বঙ্গবন্ধুর ৭ মর্চের ভাষণ বঙ্গবন্ধুর মতো বজ্রনির্ঘোষ কন্ঠে বলতে পারতাম। ফলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ‘যেমন খুশি তেমন সাজ’ ইভেন্টে বঙ্গবন্ধুর মতো ড্রেস পরে ৭ মার্চের ভাষণ পুরোটা আঙুল উঁচিয়ে ঠিকঠাক মুখস্থ বলে প্রথম পুরষ্কার অর্জন করেছিলাম। একইভাবে আমি সিনেমার দুঃখের ডায়লোগগুলো হুবহু বলতে পারতাম । ফলে আমার মধ্যে তখন এই আস্থা জেগেছিল যে,আমি ওয়াজও করতে পারব। এছাড়া নিয়মিত ওয়াজ শুনতে শুনতে আমার মনে এ সুপ্ত ইচ্ছা সৃষ্টি হয়েছিল যে,আমি বড় হয়ে একদিন জবরদস্ত ওয়াজিয়েন হবো। এমন ইচ্ছা হওয়ার পেছনে কিছু কারণ ছিল। কারণগুলো হলো, আমি দেখতাম যে,ওয়াজিয়েনদের অসম্ভব সম্মান,খাতিরের পাশাপাশি ভাল খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। তাছাড়া তাদের আছে মারাত্মক সম্মোহণী ক্ষমতা। তারা শ্রোতাদের একইসাথে হাসায় এবং কাঁদায়। দাঁড়াতে বললে শ্রোতারা কাল-বিলম্ব না করে সাথে সাথে দাঁড়ায়,বসতে বললে বসে,কিছু বলতে বললে আবার প্রাইমারি স্কুলের শিশুদের মতো অবলীলায়  সেটা আওড়ায়। গ্রামের বখাটে মাস্তান ,যে কারো কথা সহজে শুনতে চায় না, ফাজিল টাইপের,তাকেও ওয়াজ শুনে কাঁদতে দেখতাম।  এসব দেখে মনে এ বোধ জেগেছিল যে,  প্রকৃতপক্ষে অন্য কোনো বক্তাদের এমন ক্ষমতা নেই, এমনকি এমন ক্ষমতা নেই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী কোনো রাজনৈতিক বক্তাদেরও ।

 এর পর থেকে ওয়াজিয়েন হওয়ার জন্য আমি মনোযোগ দিয়ে ওয়াজ প্র্যাকটিস করতে থাকলাম । ক্যাসেটে ওয়াজ শুনে শুনে মুখস্ত করে তারপর পড়ার ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনুশীলন করতে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা।  এভাবে কিছুদিন করার পর এক সময় খেয়াল করলাম যে, আমি অনেকটা হুজুরগণের মতোই সুর করে ওয়াজ করতে এবং এমনকি তকবির দিতে পারি। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য একটা জায়গায়, দেখলাম যে ,আমি আসলে কান্নাটা ঠিকমত করতে পারি না। কান্নার মতো আওয়াজ যদিওবা  গলা দিয়ে বের হয়  কিন্তু চোখে পানি আসে না। শত চেষ্টা করলেও আসে না।  সমস্যা কোথায় তা বোঝার জন্য তখন আমি আয়নার মধ্যে আমার কান্নার দৃশ্য খেয়াল করতে থাকলাম। কোনো সমস্যা খুঁজে  পেলাম না । তবে আবিষ্কার করলাম যে, আমার মুখভঙ্গি মোটেও হুজুরের মতো লাগে না। উল্টো আমাকে দেখতে  অদ্ভুত লাগে। মনে হয় যে,আমার বড় বড় দাঁতগুলি অযথা বেরিয়ে আসছে আর ঠোঁটগুলি একটু বেশিই মুখব্যাদান করে ফেলছে। তখন আমার মনে এই বিশ্বাস জন্মাল যে,পৃথিবীতে দুটো জিনিস পুরোপুরি নকল করে করা যায় না- তার একটি হলো কান্না এবং অপরটি হলো হাসি। ওয়াজে বলা বাক্য বা কথার সাথে হৃদয়ে  গ্রোথিত বিশ্বাসের সমন্বয় না হলে কখনও কান্না আসে না। গলায় জোরও তেমন আসে না।

 তারপর আমি আমার ঈমান দৃঢ় করার জন্য মসজিদ পাঠাগার থেকে ইসলামী বই-পুস্তক ও কেতাবাদি পড়তে শুরু করলাম। আমি তাযকেরাতুল আউলিয়া এবং বেশ কিছু সুফিতাত্তি¡ক বই পড়ে ফেললাম কিছুদিনের মধ্যেই এবং সুফিতত্তে¡র উপরে জানার আগ্রহ আমার বৃদ্ধি  পেল।  তারপর একদিন আমি দরবেশ কাকাকে বললাম যে, আমি পীরহুজুরের মুরিদ হতে চাই এবং আরও অনেককিছু জানতে চাই।  এটা বলাতে দরবেশ কাকা খুশি হলেন। কিন্তু হঠাৎ করে আমার এ পরিবর্তনে বাবা একটু উসখুস করতে লাগলেন। তিনি আসলে চাচ্ছিলেন না যে, এত অল্প বয়সে আমি এগুলো করি। তিনি চেয়েছিলেন, আমি শুধু পড়াশোনাতেই নিবিষ্ট থাকি। কিন্তু আমার মধ্যে তখন ওয়াজিয়েন হওয়ার নেশা চেপে বসেছে।

 পরবর্তী কিছুদিনের মধ্যে পীরসাহেবের দরবারে আমি ঢুকলাম বটে কিন্তু পীরসাহেব আমাকে তখনই বাইয়্যেত করলেন না ।  হয়তো বয়সে কম দেখে করলেন না। তবে আমি যথারীতি বয়ান শুনতে এবং অন্যান্য জেকেরানদের সাথে  জিকির করতে শুরু করলাম। আমার দূর্বল শরীরও আস্তে আস্তে ঠিক হতে শুরু করল কারণ আমি ঐ আনন্দজনক বদ-অভ্যাসটা বাদ দিয়েছি ততদিনে । তখন আর আমার মাথা ব্যথা করত না, ঘুমের মধ্যে বোবায়ও তেমন ধরত না। তবে এতসব ইবাদত-বন্দেগীর মাঝেও আমি শাহনাজকে ভুলতে পারতাম না। তার সুন্দর মুখটা খালি মনে পড়তে থাকত। আমি ক্লাশে বসে তাকে  অপলক দেখতে থাকতাম। সাধ মিটত  না তবুও । স্কুলছুটির পর আমি আবার তাকে দেখার জন্য তার বাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটতাম । রাত জেগে গোপনে প্রেমপত্র লিখতাম।  কোনো কোনো রাতে  প্রেমপত্র লেখা শেষ হলে আবার তাহাজ্জুদ নামাজও পড়তাম। তবে আমার এ উপলব্ধি হতো যে, আমি শাহনাজকে ভেবে ভেবে পাপ করছি বোধ হয় । এই পাপবোধটা আগে হতো না, পীরসাহেবের দরবারে যাওয়ার পর থেকে শুরু হয়েছিল এটা ।

 পীর সাহেবের দরবারে  গিয়ে ইবাদত বন্দেগী করা ,স্কুলে যাওয়া আর পড়াশুনা  এই তিন ধরনের কাজ করে আমার দিন পার হচ্ছিল এবং পীরসাহেবের দরবারে নিয়মিত আসা-যাওয়ার কারণে কিছুদিনের মধ্যে বুঝতে পারছিলাম যে, পাশের ফাজিল মাদ্রাসার সাথে পীর সাহেবের খানকা শরীফের একটা দ্ব›দ্ব আছে। দ্ব›দ্বটা মাদ্রাসাপন্থী বনাম খানকা শরীফপন্থী,এ  ঘরানার। দ্ব›দ্বটার প্রকাশ আমার কাছে তখনই প্রকট হয়ে দেখা দিল, যখন দেখতে  পেলাম  যে খানকা শরীফের মুরিদরা মাদ্রাসার ভেতর দিয়ে যাতে চলাচল করতে না পারে তজ্জন্য মাদ্রাসার গেটগুলিতে তালা লাগিয়ে রেখেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। একটা ছোট পকেট গেট আছে, সেটাতেও তালা। কী হিংসা। ফলে মুরিদদেরকে একটি জলাশয়ের সাঁকো পার হয়ে খানকা শরীফে আসতে হতো। বৃদ্ধ মুরিদদের জন্য সাঁকো পার হওয়া যেমন কষ্টসাধ্য ছিল তেমনি ছিল  বিপদজনক।

যা হোক, যত দিন পার হচ্ছিল, ততই বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। গ্রামে তখন স্পষ্ট দুটো গ্রুপ। একটি হলো পীরপন্থী আর আরেকটি হলো পীরবিরোধী। পীরবিরোধী গ্রুপ ছিল মূলত মাদ্রাসার সকল তালবেলেম ও শিক্ষকগণ। জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ, রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী তারা । এ লোকগুলো আবার গ্রামের ভেতরে গোপনে গড়ে ওঠা পূর্ব বাংলা কমিউনিষ্ট পার্টির (লাল পতাকা) সন্ত্রাসী লোকজনের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায়  রেখে চলছিল। তবে বোঝা  যেত যে, তাদের সম্পর্কটা শুধু কৌশলগত—-নৈতিক বা আদর্শগত জায়গা থেকে নয় মোটেও । তারা  চরমপন্থী গ্রুপের লোকজনদের জালছায় দাওয়াত দিত, পোস্টারে নাম রাখত।  কিন্তু এ পর্যন্তই।  এর বাইরে তাদের সাথে আঁতাত ছিল না বলে মনে হতো।

তবে এরকম বিভাজনে আমার খারাপ লাগতে শুরু করেছিল। আমার মনে হয়েছিল যে, মাদ্রাসার তালবেলেমরা যে কোনো সময় লাঠি-সোটা নিয়ে আমাদের জেকেরানদের উপর জিকিররত অবস্থায় আক্রমন করবে। আমাদের  মুরিদরা তো বেশিরভাগই মুরুব্বী, নিশ্চয়ই তাদের সাথে পেরে উঠবো না, এরকম ভাবতাম আমি।  মাদ্রাসার তালবেলেমগুলোর অনেকেই তখন মারামারিতে, বিশেষ করে লাঠি চালনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল। তারা চিকনা শরীরের ছিল। লিল্লাহ বোর্ডিঙের কম পুষ্টির খাবার খেয়ে হাড়গিলে টাইপের হলেও ক্ষিপ্রগতির ছিল। মাদ্রাসার ছাদে আমি তাদের লাঠি-চালনা প্রশিক্ষণ নিতে দেখতাম। ফাজিল ক্লাশের এক ছাত্র ছিল তাদের কমান্ডার।

 যা হোক,যদি আমি প্রথমে বুঝতে পারতাম যে, এ ধরনের বিভাজন আছে, তাহলে হয়তো দরবারে  যেতাম না। কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম, তখন দরবার থেকে বের হয়ে গিয়েও কোনো লাভ ছিল না। অধিকন্তু আমাদের পরিবার আগে থেকেই পীরপক্ষের লোক হিসেবে মার্কামারা হয়ে গিয়েছিল। এমন হয়েছিল মূলত দরবেশ কাকার কারণে।  দরবেশ কাকা ছিলেন পীরের হাতে সর্বপ্রথম বাইয়্যেত হওয়াদের একজন। তবে ব্যক্তিগতভাবে  ক্ষতির চেয়ে লাভই বেশি হয়েছিল আমার। দরবারে ঢোকার পর থেকে আমার ভালই লাগত। আমার একাকীত্ব-বোধ  তখন অনেকটাই ঘুচে গিয়েছিল। আমি মুরুব্বীমতন বেশ কিছু বন্ধু পেয়ে গিয়েছিলাম। স্কুলে আমার তেমন কোনো বন্ধু ছিল না,পাড়াতেও ছিল না। আমার বাড়ির রাখাল ছলিম, যে আমার চেয়ে বয়সে চার-পাঁচ বছরের বড় ছিল, তার সাথে যা একটু ফ্রিভাবে কথা বলতাম। তবে সেও আস্তে আস্তে কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। কেমন যেন গম্ভীর হয়ে থাকত । প্রকৃতপক্ষে ছোটবেলা থেকেই  কেউই আমার বন্ধু হতে চাইতো না । এর প্রধান কারণ ছিল আমার মাথার চুলবিহীন বদখত ক্ষতচিহ্ন। এই ক্ষতচিহ্নটা আমি আয়নায় দেখতাম বার বার । দেখে কাঁদতাম। পাড়ার বয়স্করাও অনেকে আমাকে “কুকুর-খাওয়া” বলে ডাকতো।  এটা আমার জন্য কম কষ্টের ছিল না।

খানকা শরীফে মুরুব্বীদের সঙ্গ পেয়ে আমার সময় ভালোই কাটছিল। মুরিদদের মধ্যে তখন শুধু শমসের খাঁর সাথে এবং খুনে মজিদের সাথে আমার তেমন কথা-বার্তা চলত না। অন্য সবার সাথে আমি ছিলাম বেশ স্বচ্ছন্দ্য । শমসের খাঁর সামনে আমি অপ্রস্তুত হয়ে যেতাম কারণ আমার কাছে তাকে রীতিমতভাবে রহস্যময় মনে হতো। মনে হতো যে, সে প্রকৃতপক্ষেই নাছিমা আপাকে বান মেরেছে। নাছিমা আপা তখন ক্রমান্বয়ে আরও বেশি অসুস্থ হচ্ছিল। সে মাঝে মাঝেই অজ্ঞান হয়ে যেত।

 আর খুনে মজিদ? সে ছিল জেলখাটা সন্ত্রাসী।  মুরিদ হলেও তার চাহনি কেমন যেন ছিল।কাউকে পরোয়া না করা টাইপের । চোখ উল্টিয়ে পেঁচার মতো করে তাকাত। তাকানোর সময় চোখের সাদা-হলুদাভ অংশ বের হয়ে আসত। সে আমার বন্ধু লক্ষণের বাবাকে খুন করেছিল।  তবে খুনে মজিদকে সন্ত্রাসী হিসেবে আমি নিজে ভয় পেলেও অন্যান্যরা এটাকে পজিটিভভাবে দেখতো।  সকলে মনে করতো যে,সে  মুরিদ হওয়াতে দরবারের সকলের জন্য একপ্রকার লাভই হয়েছে, কারণ একমাত্র সে আছে বলেই মাদ্রাসার  জামাতী লোকজন  আমাদেরকে এখনও কিছু বলতে সাহস পায় না।

 কেরামত শেখের লোকজন অবশ্য ততোদিনে বেশ কয়েকবার থ্রেট দিয়ে ফেলেছিল আমাদেরকে। কিন্তু আমার বাবা মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন বলে ( অবশ্য অন্য মাদ্রাসার) প্রিন্সিপ্যালকে বলে-কয়ে তাদেরকে থামিয়ে রেখেছিল। আসলে বংশগতভাবে আগে থেকেই পীরবিরোধী পক্ষের নেতা কেরামত শেখের ( যিনি মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, মনোয়ার চেয়ারম্যানের বাবা) সাথে আমাদের সম্পর্ক  তেমন ভাল ছিল না। এর কারণটা আমি পুরোপুরি জানতাম না । তবে এটুকু বুঝতাম যে, আমার দরবেশ কাকা এমনকি বাবাও, কেন জানি কেরামত শেখের নাম শুনতে পারে না । কেন এমন রেষারেষি ছিল এর কারণ হিসেবে যা একটু-আধটু শুনেছিলাম,  তা হলো, আমার  দাদাকে নাকি গ্রামের হিন্দু মহাজনদের দ্বারা অপদস্থ করিয়েছিল কেরামত শেখের বাবা রহমত শেখ । সেটা ছিল ব্রিটিশ আমলের কথা, ১৯৪২ সালের ঘটনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.